কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

 



কালিমাটি অনলাইন / ১৩৯ / ত্রয়োদশ বর্ষ : দ্বাদশ সংখ্যা 

 


বিগত সাতচল্লিশ বছর যাবত নিয়মিতভাবে প্রকাশিত মুদ্রিত পত্রিকা ‘কালিমাটি’র ১১২তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো ২০২৬ কলকাতা আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায়। এই সংখ্যার আলোচ্য বিষয় হিসেব যে প্রবাদ বাক্যটি বেছে নিয়েছি – ‘নেপোয় মারে দই’ – তাতে আমরা দুটি  চরিত্রের সন্ধান পাচ্ছি, একটি ব্যক্তিবাচক ‘নেপো’ এবং আরেকটি বস্তুবাচক ‘দই’। প্রশ্ন উঠতে পারে, নেপো যেহেতু ব্যক্তিবাচক, তাই তার চরিত্র থাকতেই পারে; কিন্তু দই তো একটা জড়পদার্থ ও প্রাণহীন, তাহলে তার কীভাবে চরিত্র থাকতে পারে? সেক্ষেত্রে আমরা মনে করি, জড়পদার্থ ও প্রাণহীন হলেও দইয়েরও চরিত্র আছে। দই টাটকা নাকি পচা, টক নাকি মিষ্টি ইত্যাদি। বিশেষত এখানে দই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে রূপকার্থে। অর্থাৎ দই এখানে আসলে দই নয়, বরং অন্যকিছু। এবং সেই অন্যকিছুটা নির্ভর করে নেপোর চরিত্র ও কার্যকলাপের ওপর। সুতরাং দইয়ের চরিত্র বোঝার আগে জরুরি হচ্ছে নেপোকে বুঝে নেওয়া। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নেপো শব্দটা এসেছে কোথা থেকে? সাধারণভাবে মনে করা হয়, যার পোশাকিনাম নেপাল, তার ডাকনাম নেপো। বলা বাহুল্য, এটা নিতান্তই সরলীকরণ।  তাহলে তো নেপাল দেশটাকেও সংক্ষেপে নেপো নামে উল্লেখ করা যেতে পারে! জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস রচিত 'বাঙ্গালাভাষার অভিধান’ গ্রন্থে নেপো শব্দের ব্যুৎপত্তি উল্লেখ করা হয়েছেঃ নৃপতি > নৃপ > নেপো (কথ্য ভাষায়)। এই ব্যুৎপত্তির আড়ালে একটা যুক্তি অবশ্যই আছে। নৃপতিরা সব দেশে সব কালে শাসন ও শোষণ চালিয়ে এসেছে প্রজাদের ওপর। প্রজাদের শ্রমের ওপর নির্ভর করে থেকেছে চিরদিন। সেইসঙ্গে প্রজাদের বঞ্চিত করেছে তাদের প্রাপ্য থেকে। প্রজাদের শ্রমলব্ধ অর্থ কেড়ে নিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ এবং ‘সংসদ বাংলা অভিধান’এ নেপো শব্দের অর্থ অতিশয় ধূর্তব্যক্তি রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’এ সুবলচন্দ্র মিত্র নেপো শব্দের অর্থ জানিয়েছেন ফাজিল, ডেঁপো, ধূর্ত ইত্যাদি। আবার কারও মতে আরবি শব্দ নফর অর্থাৎ চাকর থেকে নেপো শব্দটি এসেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের 'বাঙ্গালাভাষার অভিধান’এ একটি শব্দ খুঁজে পাওয়া গেছে, নিপান, কারও কারও মতে এই শব্দটি থেকেই উদ্ভব হয়েছে নেপো শব্দটির। নিপান শব্দটির অর্থ দু’রকমের হয়, যেমন - পশুপাখির জলপান বা স্নানের জন্য নির্মিত ক্ষুদ্র জলাশয় বা চৌবাচ্চা। আবার নিপান শব্দের অর্থ  দোহনপাত্রও হয়, অর্থাৎ যে পাত্রে দুধ দোহন করা হয়। আর এই দোহনের কাজ যারা করত, তাদের বলা হতো নিপানি। এই নিপানিরা যে শুধুমাত্র দুধ দোহন করত তা নয়, বরং দুগ্ধজাত অন্যান্য দ্রব্য যেমন ননী, ক্ষীর, ছানা, দই প্রভৃতি প্রস্তুতের কাজেও তারা নিয়োজিত থাকত। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, সবাই তো আর সৎ হয় না! আর যারা সততাকে এড়িয়ে চলে, তারাই গন্ডগোলটা পাকায়। বলা বাহুল্য, অসৎ নিপানিরা সুযোগ পেলেই চুরি করে বা মেরে দেয় দুধ, ননী, ক্ষীর, ছানা এবং দই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এইসব নিপানিরা শুধু গোয়ালঘরেই নয়, বরং বিরাজ করছে সর্বত্র। সমাজের সব স্তরে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, কলা, ধর্ম, ক্রীড়া, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, আইন-কানুন, নিরাপত্তা – সব ক্ষেত্রেই।

প্রকৃতির দুয়ারে এখন ফাল্গুন মাস। অর্থাৎ বসন্তকাল। আগামী চৈত্র মাসেও তার সহবস্থান আমাদের সঙ্গে। আপনাদের সবাইকে জানাই আমাদের বাসন্তী শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

kajalsen1952@gmail.com / kalimationline100@gmail.com

দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675

 

 

<<<< কথনবিশ্ব >>>>

 

কথনবিশ্ব


রামতনু দত্ত

 

কবি ও শব্দসাধনা

 


শব্দই ভাষার মূল। কবির রয়েছে নিজস্ব ভাষিক জনসমাজ। এছাড়াও আছে প্রকৃতি ও পশুপাখি কীটপতঙ্গের জগৎ। তাও  ছাড়িয়ে আকাশ। শব্দগুণসম্পন্ন  নীলাকাশ বা দিনে সূর্য, রাতে গ্রহতারাদের মহাবিশ্ব মহাকাশ। সবকিছু ছাড়িয়ে নিঃসীম মহাশূন্য। এর বাইরেও থাকে ধারণার জগৎ, জ্ঞানের ও অভিজ্ঞতার অনুভবের উপলব্ধির জগৎ, কল্পনার জগৎ, খেয়ালী মহল, ঈশ্বরতন্ত্র ও রাষ্ট্রতন্ত্রের অদৃশ্যলোক। নিয়মের জগৎ ক্রিয়ার জগৎ অদৃশ্যই হয়। যিনি কবি তিনি সচেতন হবেন। সর্ববিষয়ে অন্তরীক্ষণ জরুরী।

আমরা যা দেখি তা দৃশ্যলোক আর কবি দ্রষ্টা অর্থাৎ তিনি সমস্তই লোকন করেন, চেখে দেখেন, চক্ষণ

করেন, দূরে দৃষ্টি ফেলেন, আনয়ন করেন লোচন চোখ, চক্ষু, অক্ষি, নয়নের দ্বারা। আবার কাছে নিয়ে এসে দেখান ও ত্রাণ করেন নিজেকে এবং সমাজকে। নেত্র বা নেতা বা নেত্রী। বোঝাই যাচ্ছে কবি আর পাঁচজন মানুষের মতো নন। তার মানে সাধারণ মানুষ কবিদৃষ্টির ও কল্পনাশক্তির অধিকারী নন, এমন কিন্তু নয়। কবিমন একটা থাকে মানুষের মধ্যে। তবু সকলেই কবি নয়। কবি মিছিলে হাঁটলে মিছিলের একজন, আবার তফাত থেকে মিছিলকে লক্ষ করলে অন্য একজন। এই স্বতন্ত্র ভিন্ন মানুষটিই কবি। বিভিন্ন ও বিবিধের মাঝে তাঁকে  আলাদা করে চেনা যায়। শব্দের প্রতি তাঁর দুর্বার আকর্ষণ। সব ধরনের শব্দ বা আওয়াজ বা রব তাঁকে টানে। যুগপৎ নীরব ও সরব। একজন কবি নিশ্চিত জানেন  তিনি সমষ্টির অংশ এবং ক্ষমতার নজরে। রক্তাক্ত ক্লেদাক্ত ঘর্মাক্ত পৃথিবীকে কি কবি উপেক্ষা করতে পারেন? বিচার যুক্তিবোধ থাকলেও এক অপার অনুভূতিময়  প্রদেশের তিনি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর যেমন কেন্দ্র থাকে আবার তিনি উপেন্দ্রনাথ। কবি ও আলংকারিক ভর্ত্তৃহরি  বলেছেন, সুকবিতা যদি অস্তি রাজ্যেন কিম্। সুন্দর কবিতাই তাঁর প্রিয়, রাজ্য নয়। তবু প্রশ্ন থেকে যায় কবি কে? আমাদের সময়ে অনেক পত্রপত্রিকা, ফলে অনেক কবি। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই বেশ কয়েক হাজার। এখানে মানদণ্ড হল লিখে ছাপলেই কবি। মানতেই হবে এঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ ভালো কবিতা রচনা করেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে চর্চা হয় না বলে অ-শনাক্ত থেকে যাচ্ছেন। প্রায় চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে কবিতার প্রতি মনোযোগী বলে এমন বলতে পারছি। এখন আর বেশি পত্র পত্রিকা কেনার সুযোগ পাই না। বয়সের কারণেও বটে, অবসরগ্রহণের পর আর্থিক কারণেও বটে। তাছাড়া একজন মানুষ কত পত্রিকা কিনে পড়তে পারবে? এর একটি সীমা আছে, সীমান্ত আছে। তবু ‘সীমান্ত সাহিত্য’ ও ‘কবিতা সীমান্ত’ দীর্ঘদিন পড়েছি। শত শত পত্রিকা বের হয়। বহু দূরের হলে পাওয়াও যায় না।

কবি ক (মস্তিষ্কে) বহু কিছু বহন (ব) করেন, অর্থাৎ কব্ কব্ করেন। কব থেকে কব্যয়, তা থেকে কাব্য। মানুষ বক্ বক্ করেন, যা থেকে বাক্যের জন্ম হয়। বাক্যসৃষ্টিতে জনসাধারণ অনেক এগিয়ে। কারণ অল্প শব্দে অসংখ্য বাক্যরচনা সম্ভব হয়। শিশুদের দিকে তাকান, সবচেয়ে বেশি কথা বলে। অথচ তাদের শব্দভাণ্ডার কত সামান্য। কবিদের শব্দ শিখতে হয়। একে বলে শব্দসাধা। শব্দ থাকে অভিধানে বাক্যে থাকে পদ। শব্দ কীভাবে পদ হচ্ছে তা জানতে ব্যাকরণ বুঝতে হয়। ব্যাকরণ হল শব্দশাস্ত্র। কবির বিরাট দায়িত্ব। তাঁকে ঠিক বানানে লিখতে হয়, কাব্যভাষা নির্মাণ বিনির্মাণ করতে হয়। শব্দ সাধতে সাধতে বা শিখতে শিখতেই সিদ্ধ ও সাধিত শব্দের সম্মুখীন হন কবি। কবির লেখালেখির উপকরণ বহু। ভাষার কৃৎকৌশল যেমন জানতে হয় তেমনই স্বীয় রচনাকৌশলও আয়ত্ত করতে হয়। বেশ ঝামেলার কাজ। পরিশ্রমের কাজ, ধৈর্যের কাজ, লেগে থাকার ব্যাপার। যাঁরা মনে করেন কবিতা লেখা সহজ, এ ধারণা তৈরি হচ্ছে ক্রমশ, তাঁদের মনোযোগ বোধহয় অন্যত্র সরে গেছে। কবি সাধারণ অসাধারণের ভাষায় কান পাতেন, প্রকৃতির প্রতিটি ধ্বনিকণা তাঁকে মুগ্ধ করে। কিন্তু লেখেন নতুন ভাষায়। এই কাব্যভাষা আয়ত্ত করতে হয় দীর্ঘ দীর্ঘ চর্চার ভিতরে। যাইহোক কবি যেমন কব কব করেন, তেমনই কু ডাক ডাকেন, শিবের মতন পাঁচমুখে কুকথা

ক'ন। কুকথা হল তত্ত্বকথা। কবি হবেন তত্ত্বজিজ্ঞাসু ও কাব্যজিজ্ঞাসু। শব্দজিজ্ঞাসাকেই কাব্যজিজ্ঞাসা বলে। আর কু ডাক ডাকবেন। কু হল অতি ভালো ও অতি মন্দ, যা প্রচলিতকে আঘাত করে। কু-কে যে মারে সেই তো কুমার বা কুমারী। মহাকবি কালিদাসের কুমারসম্ভবম্ বা প্রয়াত কবি নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্ষেত্রসম্ভব’ 

উভয়ই প্রচলিতকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে। কবির মাথায় কী গভীর দায়িত্ববোধ। এখনও এই কমিটমেন্টের পরিচয় পাচ্ছি-                                    

"আমি শুধু জানি মৃত্যুর চেয়েও বেশী গভীরতা আছে জীবনের কাছে"। ( অনন্ত দাশ - 'শ্রেষ্ঠ কবিতা')

সেই ঋগ্বেদ থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের ভাষায় কবিতা লেখা হচ্ছে। পাঠের সময় মনে হয় না চার হাজার বছরের ব্যবধান। এই যে আবহমান কবিতা তার যে ভাষা, শুনেও শোনে না কেউ তাকে। "উতঃ ত্বঃ শৃণ্বন্ ন শৃণোতি এনাম্"। (ঋগ্বেদ)। সেদিনও যেমন আজও তাই। তবুও কবিদের শব্দের প্রতি কী সুগভীর অনুরাগ। কবিতার পাঠক হলে পাঠিকা হলে হাড়ে হাড়ে তা টের পাবেন। সবার কবিতাই পড়ুন, বিচারে নির্বিচারে চারুপাঠ নিন, আনন্দপাঠ নিন, কিন্তু সুকবিকে চিহ্নিত করুন। কবিতা হল "শ্রেষ্ঠম্ উ প্রিয়ানাম্" - প্রিয়ের মধ্যে প্রিয়তম। আবহমান ভাষার ভাঙাগড়ার মধ্যে আজও টিকে আছি আমরা।


শ্রেষ্ঠা সিনহা

 

 

প্রয়াণ-শতবর্ষে পাশ্চাত্য কবি রাইনার মারিয়া রিলকে

 


কাব্য-কবিতা সংরূপ সাহিত্যের অন্যতম প্রধান তথা মূল সংরূপ। সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে কাব্য-কবিতার অন্দরমহল সুসজ্জিত হয়েছে নানান নক্ষত্রের কলমে। তাঁদের মধ্যে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাশ্চাত্য কবি হিসাবে স্বীকৃত জার্মান কবি রাইনার মারিয়া রিলকে তথা রেনে কার্ল উইলহেলম জোহান জোসেফ মারিয়া রিলকে। তিনি অস্ট্রো-জার্মান কবি হিসাবে প্রখ্যাত হলেও, তাঁর সাহিত্য কীর্তির উৎকৃষ্টতা জার্মান সাহিত্যেই সর্বাধিকভাবেই পরিলক্ষিত হয়। কাব্য-কবিতার সমান্তরালে উপন্যাস এবং গদ্যের ক্ষেত্রে তার বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। রিলকের সাহিত্য কীর্তি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য গীতিময়তা।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর এই কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০২৬ সালতার প্রয়াণ শতবর্ষের কাল। মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও দেশ কাল ভাষা সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে জার্মানির কবি আজও বাংলা সাহিত্যনুরাগী মানুষ তথা বিশ্ব বিভিন্ন প্রান্তরে আলোচ্যমান। তার কাব্য কবিতার সঙ্গে বাঙালির প্রথম পরিচয় ঘটে এলিজির মাধ্যমে অর্থাৎ ‘দুইনো এলিজি’র কবি হিসেবে তিনি বঙ্গীয় মহলে সর্বাধিক সমাদৃত। আসলে ১৯১২ থেকে ১৯২২ সালের ব্যবধানে ডুইনো ক্যাসলে বাসরত অবস্থায় তার বিখ্যাত এলিজি কবিতাগুলির মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যে নিজের স্বাক্ষর বজায় রাখেন কবি।

আসলে এলিজি বলতে বোঝায় শোক গাথা বা শোক মূলক কবিতাকে। সম্পূর্ণ একাকীত্বে কাটানো এই বিস্তৃত সময় জুড়ে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন তার এক অতলান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই দশটি কবিতা সংকলনে। আসলে জন্ম এবং মৃত্যু মানব জীবনের শ্বাশত সত্য। মধুকবি কথা অনুসারে, মানবজন্মের সঙ্গে মৃত্যুর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। এই অভেদ্য নিয়মাবলীর সঙ্গে ঐশী সম্পর্কে সরলরৈখিক সূত্র পরিলক্ষিত হয় রিলকের কবিতায়। যদিও জন্ম থেকেই কবির সঙ্গে মৃত্যুর একটি সমান্তরাল সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তাঁর জন্মের পূর্বেই পূর্বজ দিদির মৃত্যু ঘটে। ফলে তাঁর নামে  উল্লেখিত ‘রেনে’ শব্দটির পাশাপাশি সমগ্র জীবন জুড়ে মৃত্যুর এক অমোঘ চিহ্ন পরিবহন করেছেন রাইনার মারিয়া রিলকে। স্বভাবতই ডুইনো দুর্গে বসবাসরত অবস্থায় আবাল্যকালীন পরলোক তথা মৃত্যু সম্পর্কিত জগতের বিষয়ে অধিকতর আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় কবির মধ্যে। কবি যেন মানবলোক থেকে প্রেত লোকের একটি সূক্ষ্ম সেতু বন্ধন করেছেন। যার মাধ্যমে তার আত্ম অনুসন্ধানের পাশাপাশি দৈবিক শক্তির উন্মোচনের ভাবটিও পরিব্যপ্ত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত প্রতিভাবান কবি বুদ্ধদেব বসুর তরজমা অনুসারে বলা যায়,

“আরাধ্য সে আমাদের, যেহেতু সে শান্ত উপেক্ষায়

তার সাধ্য সংহার আনে না

প্রতি ভিন্ন দেব দূত ভয়ংকর।

তাই আমি চেপে রাখিনি নিজেকে, ব্যাকুল কন্ঠে গিলে ফেলি,

          অন্ধকারে উদগত ক্রন্দন ধ্বনি”

পাশ্চাত্য কবির এই মৃত্যুচেতনা তথা শোকগাথা মূলক কবিতার সুর পরিলক্ষিত হয়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভানুসিংহের পদাবলীর অন্তর্গত ‘মরণ’ শীর্ষক কবিতায়;

 ‘মরণ রে,

তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।

মেঘবরন তুঝ, মেঘজটাজুট,

রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট,

তাপবিমােচন করুণ কোর তব

মৃত্যু-অমৃত করে দান।

তুঁহু মম শ্যামসমান৷’

আলোচ্য ক্ষেত্রে কবি মানব জীবনের অন্তিমতম পর্যায়কে আরাধ্য ‘শ্যামের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই ‘শ্যাম’ সম মৃত্যু যেন কবির কাছে পরমাত্মার সঙ্গে মানবাত্মার কথোপকথনের প্রতিরূপ। সেই সঙ্গে জার্মান কবির মতই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় ঐশী ভাবনার পরিচয়ও লক্ষ্য করা যায়।

আসলে সমগ্র মানবজীবনের বৃত্তটি জন্ম থেকে মৃত্যুর সংলগ্নতায় পরিপূর্ণ হয়। জীবন ও মৃত্যুর সুক্ষ রেখা দুটি পরমাত্মার সুচারু হাতের দোলায় দোদুল্যমান। মৃত্যুর অমোঘ নির্দয় আঘাত চিত্তের ভয়কে দূরীভূত করে। যেন এক প্রবল ঝড় ঝঞ্ঝার সম্মুখীন হয় জীবাত্মা। প্রসঙ্গক্রমে বিখ্যাত কবি শেলির ‘ode to the west wind’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। এই সংকলনে কবির ভাবনায় অনুরনিত হয়েছে সত্যের সারস্বত রূপ,

“Be thou sprit fierce,

My Sprit! Be thou me, impetuous one!”

মৃত্যুচেতনার পাশাপাশি তার কবিতায় অবসাদগ্রস্ততা, বিচ্ছিন্নতা, বিষন্নতার অনুসঙ্গও লক্ষ্য করা যায়। প্রাগ শহরে জন্মগ্রহণের পরবর্তী সময়ে মারিয়া রিলকের জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে তাঁর তার অভিভাবকদের দাম্পত্যকালীন বিচ্ছেদ। যদিও ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কের বন্ধুর পরিস্থিতিও কবিকে চূড়ান্তভাবে প্রভাবিত করেছে।

পরবর্তীকালে মহাযুদ্ধকালীন সময়ের দূর্বিপাক জনিত বিষাদগ্রস্থতা কবিকে প্রভাবিত করে। আদতে মহাযুদ্ধ  বঙ্গীয় সমাজজীবনের পাশাপাশি বিশ্বের সমগ্র মানবতা তথা মনুষ্যত্ববোধকে সন্দেহ, সংশয়, সন্ধিহানের সম্মুখীন করে তোলে। মানুষের মনে জন্ম নেয় একে অপরের ক্রুরতা। অবশ্যই সামাজিক মনোভাবের সম্মুখীন হয় মনুষ্যত্ব। কবিদের অনুভূতির স্তর সর্বজনীন ভাবে সূক্ষ্মতর। গ্রিক মনীষী অ্যারিস্টটলের কথা অনুযায়ী কবিরা সর্বসাধারনের তুলনায় অধিকতরভাবে শ্বাশত সত্যকে অনুভব করেন। ফলে তাদের চিন্তা চেতনা এবং মননের আলোকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় লক্ষ্য করা যায়। রাইনার মারিয়া রিলকের কবিতায় সেই বিষণ্ণকালীন মনোভাব ‘বিবাহ’ শীর্ষক কবিতায়,

“সে এখন বিষণ্ণ

 

সে নীরব, শব্দহীন, নিঃসঙ্গ।

 

দেখো – সে যন্ত্রণায় বিদ্ধ।

 

তোমার রাত্রিগুলি

 

তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল

 

অনেকটা স্থানচ্যুত পাথরের মতো

 

আর তার রাত্রিগুলি ছিল মৃদু উত্তেজনাময়।

 

তোমার ভোঁতা কামনা দিয়ে তুমি শতবার

 

তাকে বিনষ্ট ও বিষাক্ত করেছিলে।

 

অবশ্য তুমি শুধু একবার

 

যেন মধ্যযুগের দাতা হয়েছিলে

 

এবং নীরব নিঃশব্দ আঁধারে

 

তার পাশে নতজানু ছিলে,

 

এখানেই তোমার পৌরুষ

 

তোমার নিজস্ব বৃত্ত থেকে নিষ্ক্রমণ।”

 

রিলকের এই নিঃসঙ্গ জীবন স্মরণ করায় প্রকৃতি-পিয়াসী কবি জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিগত জীবন তথা কাব্য কবিতার পরিসরকে। কবি জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিগত জীবন রক্ত স্নাত হয়েছে সম্পর্কে ব্যস্তানুপাতিকতায়। ‘হাজার বছর ধরে’ কবি যেন পরিভ্রমণ করে চলেছেন তার সেই প্রার্থিত ভালোবাসার সন্ধানে। বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিবেশ পরিস্থিতিতে একদিকে আর্থসামাজিক রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতি অন্যদিকে অন্তর মুখী দ্বন্দদানিকতার বিচরণ নেই কবির মধ্যে যেন এক ‘বোধ’- এর উন্মেষ ঘটে; যে বোধের অনুরণনের কারণে কবির কাছে এক অবিদ্য সূক্ষ্ম গণ্ডি রচিত হয়। বলা যেতে পারে কোভিদ সমান্তরালেই যেন চলাচলই যেন তার বিশিষ্টতা;

“পথে চ’লে পারে—পারাপারে

উপেক্ষা করিতে চাই তারে;

মড়ার খুলির মতো ধ’রে

আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে

তবু সে মাথার চারিপাশে,

তবু সে চোখের চারিপাশে,

তবু সে বুকের চারিপাশে;

আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।

আমি থামি—

সেও থেমে যায়;”

আসলে সর্বজনীন ভাবে কবিদের সূক্ষ্ম অনুভূতির স্তর গুলি সমানভাবেই সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই অনুভূতির নানান রকম বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায় প্রাচ্য থেকে প্রাশ্চাত্য সাহিত্যে। কবি মারিয়া রিলকের জীবনে নারী অনুসঙ্গ বারংবার লক্ষ্য করা গিয়েছে। বস্তুবাদী এই কবির লেখনীতে প্রতিভাত হয়। ‘গোলাপ’ তার সৌন্দর্যের সুগন্ধের পাশাপাশি সমগ্রহ বিশ্বজনীন ভাবে ভালোবাসার অন্যতম প্রতিভু হিসেবে পরিচিত। মারিয়া রিলক এর কবিতার অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে লক্ষ্য করা যায় গোলাপের উপস্থিতি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় তাঁর বিখ্যাত ‘গোলাপ গুচ্ছ’  শীর্ষক রচনাংশের কথা।

‘তুলো না স্মরণস্তম্ভ। গোলাপেরা হবে প্রস্ফুটিত

তারই জন্য প্রতি গ্রীষ্মে ফিরে ফিরে অফুরান।

কেননা সে অর্ফিয়ুস। সে-ই হয় রূপান্তরিত

এতে কিংবা ওতে। অন্য কোনো নামের সন্ধান

আমাদের অকর্তব্য। একবার, চিরকাল ধরে

গান যদি জাগে তা-ই অর্ফিয়ুস। সে আসে, এবং চলে যায়।’

অস্ট্রো-জামার্ন কবি তাঁর এই গোলাপ কেন্দ্রিক প্রভূত উন্মাদনার কারণে সাহিত্যে ‘গোলাপের কবি’ হিসেবেও সমাদৃত হয়েছেন। কবিতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও গোলাপের প্রতি একটি চিরন্তন ভালবাসার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় কবির স্বভাব- বৈচিত্রে। উল্লেখিত অংশে লক্ষ্য করা যায় তাঁর সেই আশাবাদটি। আর সেই ভালোবাসা আশাবাদের ওর সঙ্গে কবির কলমে তার জীবনের অমক পরিণতির চিত্রকল্পটিও প্রতিভাত হয়। লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত কবি তাঁর প্রেয়সীকে নিবেদন করেছিলেন একগুচ্ছ গোলাপ। কিন্তু সেই গোলাপ ফুল সংগ্রহ করতে গিয়েই গোলাপের কাঁটার ক্ষতে সংক্রমিত হন মারিয়া রিলকে। গোলাপগুচ্ছ কবিতায় ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের এ প্রতিফলন বিধৃত হয়েছে তাঁর ‘ গোলাপগুচ্ছ’ শীর্ষক কবিতাবলীতে,

‘হে গোলাপ, কার/ বিরুদ্ধে তোমার ওই উদ্যত কাঁটাগুলি/ রয়েছে বলে মনে হয়?/ তোমায় কি সশস্ত্র হতে। বাধ্য করেছে তোমার/ কোমল সংবেদন?/…’

আলোচ্যক্ষেত্রে কবি যেন ভালোবাসার প্রতিভু গোলাপের সঙ্গে সংযুক্ত সে কাঁটাগুলির প্রতি এক অমক প্রশ্ন নিক্ষেপ করেছেন। যন্ত্রণাদিগ্ধ মানব জীবনের সুখ স্পর্শ ভালোবাসার মাধ্যমেই পরিব্যক্ত হয়। অথচ সেই ভালোবাসার সঙ্গে বিরহ কাতরতা একই মুদ্রার দুই তলের মত সম্পর্কযুক্ত। এক্ষেত্রে গোলাপ এবং তার কাঁটাগুলি সেই অনুভূতির সুখস্পর্শ এবং যন্ত্রণাদিগ্ধ সম্পর্কের কথায় স্মরণ করায়। 

বর্তমান সময় তথা ২০২৬-এ ২৬ জানুয়ারি প্রাশ্চাত্য কবি রিলকের প্রয়াণ শতবর্ষ উদযাপিত হয় ডুয়ার্স সমাচারের উদ্যোগে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।


তৈমুর খান

 

নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য আত্মগত পর্যটন হয়েও বৃহত্তর মানবমহিমায় পরিব্যাপ্ত



 

সমকালীন বাংলা সাহিত্যে নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় একটি অত্যন্ত বিশিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ নাম। নব্বইয়ের দশকের কবিদের মধ্যে তাঁর কাব্যভাষা, উপস্থাপনার ভঙ্গি এবং জীবনবোধ তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর সাহিত্য মূলত অন্তর্মুখী, মিতবাক এবং গভীর জীবনদর্শনের ফসল।

নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ১২ই নভেম্বর ১৯৫৪তে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আর প্রস্থান করলেন ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে। কর্মজীবনে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত আই এ এস অফিসার এবং সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। মূলত তিনি রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস, ছোটগল্প এবং কবিতাই লিখেছেন বেশি। গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনির মধ্যে ‘চিতিসাপের বিষ’, ‘হত্যাকাণ্ডের আড়ালে’-এর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, অনেক লেখক রহস্য বা ডিটেকটিভ সাহিত্য রচনা করেন বাস্তব জীবনের জটিলতা বা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে। একে একধরনের 'Intellectual Escapism' বা বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন বলা যেতে পারে। যেখানে লেখক এবং পাঠক উভয়েই একটি ধাঁধার সমাধান করতে গিয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা থেকে সাময়িক বিরতি নেন। তাঁর লেখায়ও এই জগৎ তৈরির প্রবণতা প্রবল ছিল। তবে তাঁর কাব্যশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মিতভাষিতা। তিনি দীর্ঘ বর্ণনার চেয়ে অল্প শব্দে গভীর ব্যঞ্জনা তৈরি করতে পছন্দ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—

নির্জন এক তারা’

‘পাখির মতো চেয়ে থাকা’

‘জল ও জালের নকশা’

‘শব্দের ঘরবাড়ি’

‘নীলকুঠির গান’

তাঁর কবিতায় চিত্রকল্পের এক অদ্ভুত জাদুকরী প্রভাব লক্ষ করা যায়। তুচ্ছাতিতুচ্ছ অতি সাধারণ দৃশ্যকেও তিনি এক গভীর দার্শনিক রূপ দিতে পারেন। অত্যন্ত পরিমিত শব্দ ব্যবহার করে বৃহৎ ভাবনাকে ফুটিয়ে  তোলেন।  কবিতায় শব্দের চেয়েও অনেক সময় স্তব্ধতা বা 'Silence' বেশি কথা বলে। আধুনিক নাগরিক জীবনের ক্লান্তি এবং গ্রামীণ প্রকৃতির সুন্দরের যে সহাবস্থান তা তাঁর কলমে বারবার ফিরে আসে। তাঁর জীবন-ভাবনা মূলত মানুষ, প্রকৃতি এবং অন্তহীন একাকিত্বের এক জটিল রসায়ন। কবিতায় জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং নির্মোহ। সেই কারণেই  কবিতায় প্রায়ই জীবনের নশ্বরতা এবং আধুনিক মানুষের যান্ত্রিক জীবনের হাহাকার উঠে এসেছে। সমালোচকরা বলেন, তাঁর কলমে একধরনের "Elegy of boredom" বা একঘেয়েমির হাহাকার ফুটে উঠত। তিনি হয়তো অবসাদগ্রস্ত হয়ে থাকতেন বলেই তাঁর এই লেখাগুলো অবচেতন মনের সেই যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ। তাঁর সাহিত্যদর্শন ও কবিতার ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু উদ্ধৃতি ও পংক্তি নিচে দেওয়া হলো, যা তাঁর মনের গভীর হতাশা ও 'পলায়ন'-এর ইঙ্গিত বহন করে।

অস্তিত্বের সংকট ও হতাশা:

তাঁর লেখায় প্রায়শই উঠে এসেছে নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার হাহাকার। একটি বহুল পঠিত ভাবনায় তিনি লিখেছেন—

"আমার হওয়া হয়নি, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া হয়নি কিছুই। এক এ উদাসীনতা ছাড়া। সারাজীবনটাই মনে হয়, খুব একা ছিলেন তিনি। আমিও অজ্ঞাতে এ একা থাকার দীক্ষা নিয়ে থাকতে পারি... তাঁকে ভালোবাসি না, ভালোবাসার সময়ই পাইনি।"

এটি সরাসরি তাঁর আত্মদর্শনমূলক উক্তি, যেখানে নিজের জীবনকে এক 'অসম্পূর্ণ' ভ্রমণ হিসেবে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট। এখানে 'তিনি' হতে পারেন তাঁর স্রষ্টা কিংবা তাঁর নিজেরই কোনো হারিয়ে যাওয়া সত্তা।

আধুনিক জীবনের শূন্যতা:

তাঁর 'লাঠি' কাব্যগ্রন্থটি আধুনিক জীবনের রুক্ষতা এবং মানুষের একাকিত্ব নিয়ে লেখা। সেখানে তিনি রূপক অর্থে লাঠির ব্যবহার করেছেন, যা বার্ধক্য, অসহায়ত্ব এবং আত্মরক্ষার প্রতীক। এই বইয়ের ভাবনাসূত্রে পাওয়া যায় এমনই এক হাহাকার—

"একটি মানুষ শুধু লাঠি হাতে একা একা হাঁটে

মহানির্বাণের পথে তার হাতে থেকে গেছে নিরক্ষর চাবি..."

এই পংক্তিটি তাঁর কবিতার ভাবনার সারসংক্ষিপ্ত রূপ, যেখানে মানুষ শেষ যাত্রায় একা, এবং তার অর্জিত সব কিছুই তখন অর্থহীন বা 'নিরক্ষর' চাবির মতো।

সুখ ও দুঃখের দ্বৈততা:

তাঁর অণুকবিতা বা ছোট কবিতার সংকলন 'প্রজাপতি বসেছে প্রিয় ফুলে'-তে তিনি দেখিয়েছেন আনন্দ আর বিষাদ কীভাবে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সমালোচকদের মতে, এই বইয়ের কবিতাগুলো "হর্ষ এবং বিষাদ-সিক্ত অন্তবিহীন মুহূর্তের টুকরো ছবি"। একটি ভাবনায় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন—

"আলোর নিচেই থাকে গাঢ় অন্ধকার,

উচ্ছ্বাসের আড়ালে জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস।"

আবার 'নীল প্রেমিক' বা 'হে প্রেম' কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতেও তিনি গতানুগতিক প্রেমের কবিতা লেখেননি। তাঁর কবিতায় প্রেম কেবল আবেগ নয়, বরং এক ধরনের আত্মানুসন্ধান। তিনি বিশ্বাস করেন, ভালোবাসা এক ধরনের 'নিভৃত একাকিত্ব'। তাঁর কবিতার একটি অন্তর্নিহিত সুর হলো— "যা অব্যক্ত রয়ে গেল, তার মধ্যেই প্রকৃত সুন্দরের বাস।"

তাঁর এই পংক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়: "আমার হওয়া হয়নি"- এই বোধটি তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল। আই এ এস অফিসার হিসেবে সফল কর্মজীবন থাকার পরেও সাহিত্যের পাতায় তিনি নিজেকে বারবার 'ব্যর্থ' বা 'অসম্পূর্ণ' হিসেবে আবিষ্কার করেছেন। তাঁর কবিতায় 'একা মানুষ', 'বন্ধ দরজা', বা 'অন্ধকার'-এর উপমা বারবার ফিরে এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতেন। অর্থাৎ তাঁর কাব্যশৈলীতে আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব সংকট এবং অন্তর্নিহিত একাকিত্বই তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান সুর। তবে এই একাকিত্ব বিষণ্ণতার চেয়েও বেশি আত্মানুসন্ধানের। তাই তিনি ভিড়ের মাঝেও এক নিভৃতচারী সত্তাকে খুঁজে চলেন। প্রকৃতি তাঁর কাছে কেবল দৃশ্যাবলী নয়, বরং জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাছ, পাখি, মেঘ বা নদীর রূপক ব্যবহার করে তিনি মানুষের মনের গহীন কথাগুলো বলেন। তাঁর জীবন ভাবনায় প্রকৃতি অনেক সময় শিক্ষক বা সহচরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাঁর কবিতায় 'শূন্যতা' বা 'অভাব' একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। যা নেই বা যা হারিয়ে গেছে, তাকেই যেন তিনি শব্দের স্থাপত্য দিয়ে নতুন করে গড়ে তুলতে চান। জীবনের নশ্বরতাকে মেনে নিয়েও তার ভেতরে সুন্দরের যে ছোঁয়া আছে, তাই তাঁর লেখনীর মূল উপজীব্য। নীলাঞ্জন বিশ্বাস করেন যে, সব কথা শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তাই তাঁর জীবন ভাবনায় মৌনতা বা নীরবতা এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। জীবনের অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পেতে চান শান্ত সমাহিত অনুভবের মধ্য দিয়ে।

নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের গল্পগুলিতেও তাঁর জীবন ভাবনার প্রভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি এবং মানুষের একাকিত্বের কথা বারবার ফিরে এসেছে। নিঃসঙ্গতা ও বাস্তবতা নিয়ে তাঁর একটি উক্তি: "একা লাগলেও থাকা অভ্যাস করতে হবে। অনেককেই ওরকম থাকতে হয়।" (উৎস: গল্প 'আশ্রয়') এই উক্তিটির মাধ্যমে তিনি আধুনিক মানুষের জীবনের এক চরম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন, যেখানে ভিড়ের মাঝেও মানুষ একা এবং সেই একাকিত্বকেই তাকে সঙ্গী করতে হয়।

নাগরিক বিষণ্ণতা নিয়েও তিনি বলেছেন : "বিকেল বেলাতেও শহরের কোথাও কোনো ঔজ্জ্বল্য নেই। পথচারীদের মুখেও যেন বিষণ্ণতা লেগে আছে।" (উৎস: 'আশ্রয়') শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা কীভাবে মানুষের মুখের স্বাভাবিক হাসি কেড়ে নেয়, এই বর্ণনায় তা স্পষ্ট।

সামাজিক দ্বিচারিতা নিয়েও তাঁর গভীর অভিজ্ঞতা: "আমি তো একটা ভাল কাজ করছি। ও সব গল্প-উপন্যাসে চলে... বাস্তবে সম্ভব নয়।" (উৎস: গল্প 'বড় মানুষ') এখানে তিনি সমাজের সেই রূপটিকে দেখিয়েছেন যেখানে ভালো কাজ করার আদর্শ কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে সমাজ তাকে চরিত্রহীন আখ্যা দিতেও দ্বিধা করে না।

তাঁর কিছু গল্পে (যেমন—পিকাসোর ছবি বা পরাবাস্তব কিছু গল্পে) তিনি দেখিয়েছেন যে 'Art is the ultimate escape'। অর্থাৎ, রূঢ় বাস্তবতা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো শিল্পের জগৎ। একে যদি 'পলায়নপ্রবণতা' ধরা যায়, তবে তা নেতিবাচক অর্থে নয়, বরং একজন শিল্পীর আত্মরক্ষা (Defense Mechanism) হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি হয়তো মনে করতেন, বাস্তব জগৎ যেখানে মানুষকে কষ্ট দেয়, কল্পনার জগৎ সেখানে তাকে আশ্রয় দেয়।

বর্তমান অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য পাঠককে এক গভীর প্রশান্তি দেয়। তিনি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা উচ্চকিত প্রতিবাদের পথে না হেঁটে, মানুষের ভেতরের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ছুঁয়ে যেতে পছন্দ করেন। তাঁর সাহিত্য পাঠ করা মানে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো। তিনি কখনো সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটেননি। বরং তাঁর সাহিত্য কীর্তি বাংলা কবিতার শুদ্ধতাকে রক্ষা করেছে। তাঁর জীবন ভাবনা আমাদের শেখায় কীভাবে যান্ত্রিক সভ্যতার মধ্যেও নিজের কোমলতাটুকু বাঁচিয়ে রাখা যায়।

মাঝে মাঝে তিনি আমাদের প্রকৃতির কাছেও নিয়ে গেছেন : "এই সুদীর্ঘকাল মানুষ প্রকৃতির কথা, পরিবেশের কথা ভাববার অবকাশ পায়নি।" (উৎস: 'আমলাকথা') মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতির নেশায় কীভাবে আমরা প্রকৃতিকে ভুলে গেছি, সেই অভাববোধ তাঁর রচনায় বারবার ফুটে ওঠে। সব মিলিয়েই তাঁর সাহিত্য এক আত্মগত পর্যটন হয়েও বৃহত্তর মানব মহিমায় পরিব্যাপ্ত। প্রকৃতিও সেখানে নিবিড় সংযোগে সংযুক্ত।

 

 

 


পি. শাশ্বতী

 

বাগ্দেবী বিদ্যাদায়িনী

 


প্রচলিত যে দেবী সরস্বতীর বরে দেবীর বরপুত্র কালিদাস মহামূর্খ থেকে মহাপণ্ডিত হয়েছিলেন, সেই আদিকাল থেকে সনাতন ধর্মে, বৈদিক যুগ থেকে পৌরাণিক যুগ পেরিয়ে বর্তমান কালেও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজিতা হয়ে আসছেন দেবী সরস্বতী। এই সুদীর্ঘ কালে সরস্বতী বন্দনায় সনাতন ধারায় কিছু বিবর্তন অবশ্যই ঘটেছে। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে, সর:+ বতুপ +ঈ (স্ত্রী লিঙ্গে)। সর: শব্দের অর্থ জল বা জ্যোতির আধার, বতুপ্ অর্থে বিদ্যমান, আর তার সঙ্গে স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় দিয়ে নামশব্দটি হল ‘সরস্বতী’। এভাবে সরস্বতী শব্দের লক্ষণার্থ হলো, যে দেবীর মধ্যে জল বা জ্যোতির প্রবাহ বিদ্যমান তিনি সরস্বতী। পরমপুরুষের অনন্ত অনাদি জ্ঞানের অপ্রকাশিত ভাণ্ডার অপার করুণা বলে বিগলিত হয়ে ধরিত্রীর বুকে সরস্বতী রূপে প্রবাহিত হচ্ছে।

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে রচিত সুপ্রাচীন ঋকবেদে সরস্বতী দেবতার কথা প্রথম পাওয়া যায়। আর্যাবর্তে প্রবাহিত সরস্বতী স্রোতস্বিনীকেই ঋষিরা বন্দনা করেছিলেন দেবীরূপে। দুর্ভাগ্যক্রমে সরস্বতী নদী বর্তমানে লুপ্ত। এই নদীর বাস্তবতা নিয়ে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলেও কোনো কোনো গবেষক আর্কিওলজিক্যাল ও জিওলজিক্যাল সার্ভের মধ্য দিয়ে কিছু কিছু তথ্য এই নদী সম্পর্কে পেয়েছেন। তারা মনে করেন, এই নদীর অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে আর্যদের সম্পর্কে বহিরাগত তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হবে। অথচ এই সরস্বতী নদীকেই আর্যরা তৎকালে প্রধান পবিত্র নদী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং দেবী হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে আরাধনা করতেন। পরবর্তীকালে সনাতন ধর্মীয়দের কাছে গঙ্গা নদী উপাস্য। যাইহোক, আর্যরা এই পবিত্র সরস্বতী নদীর তীরে সাধনা করতেন, স্তোত্র রচনা করতেন, যজ্ঞ সম্পাদন হত, উদ্গীত মন্ত্রের ধ্বনি নদীর তীরে তীরে ছড়িয়ে পড়তো। শুধুমাত্র  সাধন সহায়কই নয়, সরস্বতীর স্রোত মানুষের জীবন জীবিকারও সহায়ক হয়ে উঠেছিল। সাধনার সিদ্ধি এবং জীবকুলের জীবন রক্ষায় এক পরম কল্যাণময় ভূমিকা ছিল এই নদীর। তাই সরস্বতী শুধু নদী নয়, পরম ব্রহ্মের কল্যাণময়ী শক্তি হয়ে তাঁদের কাছে ধরা দিয়েছিল। তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছিল অনেক মন্ত্র বা সূক্ত। সরস্বতী নদী স্বাভাবিকভাবেই বাগ্দেবীতে পরিণত হলেন।

(সরস্বতি) (সংস্কৃত: सरस्वती, সরস্ৱতী, উচ্চারিত [sɐrɐsʋɐtiː]) হতেন। প্রধান দেবী এবং জ্ঞান, শিক্ষা, অধ্যয়ন, শিল্প, বাক্, কবিতা, সঙ্গীত, পরিশুদ্ধি, ভাষা ও সংস্কৃতির দেবী হিসেবে পূজিত  লক্ষ্মী ও পার্বতীর সঙ্গে তিনি ত্রয়ী গঠন করেন। সরস্বতী সর্বভারতীয় দেবী। তিনি শুধু হিন্দু ধর্মেই নয়, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মেও পূজিতা হন। সরস্বতী মাতৃকা দেবী  জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বাক্য, প্রজ্ঞা, জ্ঞানার্জন ও নদী দেবী ব্রিটিশ লাইব্রেরির কিউরেটরের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, "বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী, একটি নদীর তীরে উপবিষ্টা। তার পা একটি পদ্ম ফুলের উপর স্থির, বেদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি তাল পাতার পাণ্ডুলিপি তার পাশে রয়েছে এবং তিনি বীণা ধারণ করেছেন, একটি রাজহাঁস তাঁর বাহন হিসেবে কাছাকাছি অবস্থান করছে।" সংস্কৃত লিপ্যন্তর সরস্ৱতী Devanagariसरस्वती অন্তর্ভুক্তি। দেবী, নদী, ত্রিদেবী, গায়ত্রী আবাসসত্যলোক, মণিদ্বীপমন্ত্র॥ ওঁ ঐং সরস্বত্যই নমো নমঃ ॥ / ॥ ওঁ বদ বদ বাগ্বাদিনি স্বাহা ॥প্রতীকসমূহসাদা রং, পদ্মে অধিষ্ঠিতা, বীণা রঞ্জিতা, সরস্বতী নদী,তাঁর বাহনরাজহংস। উৎসব শ্রীপঞ্চমী ও নবরাত্রি উৎসবের সপ্তম দিন। ব্যক্তিগত তথ্য সহোদর লক্ষ্মীসঙ্গী সরস্বানসন্তানসারস্বত। তিনি বৈদিক যুগের অন্যতম প্রধান দেবী (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৫০০), এবং পরবর্তী সময়েও হিন্দু ধর্মেও তাঁর গুরুত্ব ধরে রেখেছেন। বেদে, তাঁর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে। নদীর সাথে সম্পর্কিত দেবী হিসেবে, সরস্বতী তার শুদ্ধিকরণ ও উর্বরতা বৃদ্ধির দ্বৈত ক্ষমতার জন্য পূজিত হন।পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে, বিশেষত ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলিতে, সরস্বতী ক্রমশ বৈদিক বাক্ দেবী রূপে বাকের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে ওঠেন, এবং পরবর্তীতে এই দুই সত্তা একীভূত হয়ে একক দেবী হিসেবে পরিগণিত হন।সময়ের সাথে সাথে তাঁর নদীর সাথে সম্পর্ক কমতে থাকে এবং বাক্, কবিতা, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির সাথে সংযুক্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শাস্ত্রীয় ও মধ্যযুগীয় হিন্দু ধর্মে, সরস্বতী প্রধানত শিক্ষার, শিল্পের এবং কাব্যিক অনুপ্রেরণার দেবী হিসেবে স্বীকৃত, এবং সংস্কৃত ভাষার উদ্ভাবক হিসেবে গণ্য হন। তিনি সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার কন‍্যা হিসেবে অথবা তাঁর সৃষ্টিরূপে যুক্ত। এই ভূমিকায়, তিনি তাঁর শক্তি  উপস্থাপন করেন এবং বাস্তবতাকে একটি স্বতন্ত্র মানবিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেন। তিনি সেই বাস্তবতার মাত্রার সাথে যুক্ত হয়ে স্বচ্ছতা ও বৌদ্ধিক শৃঙ্খলাকে চিহ্নিত করেন।

শাক্তধর্ম প্রথায় সরস্বতীকে সর্বোচ্চ দেবীর সৃজনশীল রূপ হিসেবে পূজা করা হয়। বৈষ্ণবমতে তিনি বিষ্ণুর অন্যতম পত্নী হিসেবে গণ্য হন এবং তাঁর ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেন। তবে, এই পুরুষ দেবতাদের সাথে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, সরস্বতী একজন স্বতন্ত্র দেবী হিসেবে সঙ্গী ছাড়াই পূজিত হন। তিনি শান্ত ও দীপ্তিময় শুভ্র বর্ণের নারী হিসেবে চিত্রিত হন। তিনি সাদা পোশাক পরিহিতা এবং সাদা পোশাক সত্ত্ব (পবিত্রতা ও কল্যাণ) গুণের প্রতীক। তাঁর চারটি বাহু রয়েছে, এবং প্রতিটি হাতে একটি প্রতীকী বস্তু ধারণ করেন: একটি গ্রন্থ, একটি জপমালা, একটি পদ্ম বিশ্বজুড়ে সরস্বতীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত অনেকগুলি হিন্দু মন্দির রয়েছে। সেসবের মধ্যে কাশ্মীরে অবস্থিত শারদা পীঠ (৬ষ্ঠ–১২শ শতাব্দী) অন্যতম প্রাচীন মন্দির। সরস্বতী সমগ্র ভারতে বিশেষত তাঁর নির্দিষ্ট উৎসব দিন, বসন্ত পঞ্চমীতে ব্যাপকভাবে পূজিতা হন। বসন্তের এই পঞ্চম দিনটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সরস্বতী পূজা ও সরস্বতী জয়ন্তী নামেও পরিচিত। এই দিনে শিক্ষার্থীরা তাঁকে জ্ঞান ও শিক্ষার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে সম্মান জানায়। ঐতিহ্যগতভাবে, এই দিনটি ছোট শিশুদের প্রথম বর্ণমালা লেখা শেখানোর মাধ্যমে চিহ্নিত হয়।

বৌদ্ধধর্মে, তিনি বিভিন্ন রূপে পূজিতা হন। সেসবের মধ্যে একটি হল পূর্ব এশিয়ার বেনজাইতেন (辯才天, "বাক্ ও প্রতিভার দেবী")। জৈন ধর্মে, সরস্বতী তীর্থঙ্করদের উপদেশ ও বাণী প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবী হিসেবে পূজিতা হন। ঋগ্বেদের প্রথম, সপ্তম, অষ্টম ও দশম মন্ডলে সরস্বতী দেবতা নিয়ে অনেকগুলি সূক্ত পাওয়া যায়। তার মধ্যে বাগ্দেবী প্রতিষ্ঠার সমর্থনে প্রথম মন্ডল এর তৃতীয় সূক্তের ১১ ও ১২ ঋক দুটি প্রণিধান যোগ্যঃ

চোদয়ীত্রি সুনৃতানাং চেতন্তী সুমতিনাং

যজ্ঞং দধে সরস্বতী।।১১

মহো: অন: সরস্বতী প্রচেতয়িতি কেতুনা।

ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি।। ১২

অর্থ: নিত্য সত্য প্রিয় বাক্যের উৎসস্বরূপিনী, সুমতি ব্যক্তির চেতনা প্রদায়িনী সরস্বতী দেবী আমাদের যজ্ঞ অভিলাষ করেছেন।।১১

প্রভূত জল সৃষ্টিকারীনি ও জ্ঞানের উদ্দীপনাকরিনী সমগ্র বিশ্বে বিরাজিত দেবী সরস্বতীর ধ্যান করি।।১২

ধ্যান ও প্রণামমন্ত্র অনুসারে দেবী সরস্বতী শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মাসনা, শ্বেতবস্ত্রাবৃতা, দ্বিভূজা, বীণা-পুস্তকধারিণী, হংসরূঢ়া রূপে পূজিতা হলেও বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত তথা সকল জ্ঞানের আধার। মা সরস্বতী বিভিন্ন পুরাণ, বেদ, তন্ত্রে বিচিত্র লীলাময়ীরূপে বর্ণিত হয়েছেন। দেবীর প্রতিটি রূপের আলাদা আলাদা তাৎপর্য আছে।

ঋগ্বেদে বাগদেবীর তিনটে মূর্তির কথা বলা হয়েছে, ভূঃ বা ভূলোকে ইলা, ভূবঃ বা অন্তরীক্ষে সরস্বতী এবং স্বর বা স্বর্গলোকে ভারতী। জগতে দেবী সরস্বতী তাঁর জ্ঞানজ্যোতি দ্বারা চিন্ময়ীরূপে পরিব্যপ্ত। বৈদিক স্তুতির মধ্যে দেবী সরস্বতীর তিনটি রূপের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। কোথাও ‘দেবীতমে’ অর্থাৎ দেবী শ্রেষ্ঠা, কোথাও ‘অম্বিতসে’ অর্থাৎ মাতৃশ্রেষ্ঠা, আবার কোথাও ‘নদীতসে’ বা নদী শ্রেষ্ঠা রূপে বন্দনা করা হয়েছে।

শিবপুরাণের সরস্বতী তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, চতুর্ভূজা, ত্রিনয়না, শিরে চন্দ্রকলাশোভিতা, বর ও অভয়মুদ্রা-শোভিতহস্তা, সর্বলক্ষণসম্পন্না, শ্বেতপদ্মে উপবিষ্টা, নীলকুঞ্জিত কেশশোভিতা। অগ্নিপুরাণে সরস্বতী পুস্তক অক্ষমালিকা, বীণাহস্তা চতুর্ভূজা।

আবার এই অগ্নিপুরাণেই অন্য এক স্থানে ‘বাগেশ্বরীর’ ধ্যানে সরস্বতী চতুর্ভূজা, ত্রিলোচনা, পুস্তক অক্ষমালা বর ও অভয়মুদ্রাধারিণী। লক্ষ্যণীয় যে এই পুরাণেই আবার দেবী সরস্বতীকে অষ্টাভূজা রূপেও বর্ণনা করা হয়েছে। গড়ুর পুরাণে দেবী সরস্বতীর শক্তি আট প্রকার। যথা শ্রদ্ধা, ঋষি, কলা, সেবা, তুষ্টি, পুষ্টি, প্রভা ও মতি। তন্ত্রশাস্ত্রে এই আটশক্তি হলেন যোগা, সত্যা, বিমলা, জ্ঞানা, বুদ্ধি, স্মৃতি, মেধা ও প্রজ্ঞা।

স্কন্দপুরাণে সুসংহিতায় সরস্বতীর মস্তকে জটা, মুকুটে চন্দ্রকলা, ত্রিনয়না ও নীলগ্রীবা। দেবী এখানে শিবশক্তিরূপে বর্ণিতা।

বায়ুপুরাণে সরস্বতী চতুর্ভূজা, হংসারূঢ়া, বামদিকের দুই হাতে গ্রন্থ ও বরমুদ্রা, আর ডানদিকের দুই হাতে যথাক্রমে জপমালা ও বরমুদ্রা। দেবী এখানে ব্রহ্মশক্তি হিসেবে বর্ণিতা হয়েছেন।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে দেবী চতুর্ভূজা, পীতবসনা, নানা অলঙ্কারে অলঙ্কৃতা, বীনাপুস্তকধারিণী, ব্যাখ্যা মুদ্রা ও বরমুদ্রাধারিণী। এই বর্ণনা থেকে মনে হয় চতুর্ভুজা, পীতবসনা অর্থাৎ বিষ্ণুর শক্তি রূপে সরস্বতী বর্ণিত হয়েছেন।

মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবী দুর্গার অপর রূপ হিসেবে দেবী সরস্বতীকে দেখানো হয়েছে। এই পুরাণের শ্রীশ্রী চণ্ডীতে মহাসরস্বতী রূপে শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করেছিলেন। এই মহাসরস্বতী গৌরবর্ণা, অষ্টভূজা। তাঁর হাতে ছিল বাণ, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘণ্টা। এখানে মা বিদ্যাদাত্রী রূপে নয় অন্যায়ের প্রতীক দুষ্ট অসুরদ্বয়কে বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে একথা মনে রাখতে হবে যে বাঙালির দুর্গাপুজোয় মা দুর্গার মেয়ে রূপে সরস্বতী অন্য ভাই বোনদের সঙ্গে পূজিতা হন। তবে এই মা সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্র প্রণাম মন্ত্র সব এক হলেও এই সরস্বতী পৌরাণিক সরস্বতী নন।

কালিকাপুরাণে সরস্বতীর বাম হাতে বীণা ও পুস্তক আর দক্ষিণহাতে মালা ও কমণ্ডলু, শুক্লবর্ণধারিণী, মহাচলের পৃষ্ঠেস্থিতা, শ্বেতপদ্মের ওপর উপবিষ্টা, শুক্লবস্ত্রা ও শুভ্র অলঙ্কার ভূষিতা। প্রাচীন ভারতবর্ষে মা সরস্বতী সিংহের ওপর আসীনা ও হাতে শূল ধারণ করে আছেন এই মূর্তিতে পূজিতা হতেন। আমাদের সমাজে মা সরস্বতী শুধু শুক্লাবর্ণা জ্ঞানদাত্রীরূপেই নয়, অন্য রূপে আলাদা মন্ত্রেও পূজিতা হন। যেমন তন্ত্রমতে নীল তারা বা নীল সরস্বতী রূপ পূজিতা হন। এই দেবীর উপাসনা করলে ভক্ত অপার জ্ঞানের অধিকারী হন। দশমহাবিদ্যার নবম ‘দেবী মাতঙ্গী’ আসলে তন্ত্রমতে সরস্বতী।

বৈদিক মতে ও তন্ত্র মতে দেবী সরস্বতী বিভিন্ন রূপে ও ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে পূজিতা হন। তবে সরস্বতীদেবী যে মতে যে রূপেই পূজিতা হন না কেন তিনি কলুষতাহীন সদ্‌ জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রীদেবী। তাই প্রাচীন যুগ, আর্যযুগ, পরবর্তী আর্য যুগ বেদ-পুরাণ থেকে শুরু করে তন্ত্রদেবী হিসেবেও দেবী সরস্বতী পূজিতা হয়ে আসছেন।

বেদে ব্রহ্মশক্তি এবং দেবতাকে এক করে দেওয়া হয়নি। ব্রহ্মশক্তি একক, অবিনশ্বর, অনন্ত, অসীম, অশেষ। এই পরমশক্তি সৃষ্টির সমস্ত কিছুতেই বিরাজিতা, পৃথিবী, অন্তরীক্ষ, দ্যুলোকের যে যে প্রাকৃতিক বিষয়ের মধ্যে শক্তির প্রকাশ দেখা যায় তা ব্রহ্মশক্তিরই প্রকাশ। প্রাকৃতিক বিষয়ে শক্তির বিশেষ প্রকাশকে ঋষিরা দেবত্ব ও চেতনত্ব আরোপ করেছেন। সেই অর্থে সরস্বতী নদী দেবতা এবং মানবজাতির জ্ঞান উন্মেষণে তাঁর কৃপা কামনা করেছেন।

কোন কোন ধর্মগুরু সরস্বতীকে বৈদিক দেবতা বলে স্বীকার করতে চান না, তাঁদের মতে তিনি পৌরাণিক দেবী। কিন্তু পুরাণের সরস্বতী সংক্রান্ত রূপক কাহিনী গুলি বিশ্লেষণ করলে বেদের মূলতত্ত্বের সঙ্গে তাঁর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। পুরাণের সঙ্গে বেদের একটা গঠণগত পার্থক্য আছে। বেদে এক এবং অদ্বিতীয় ঐশ্বরিক শক্তিকে বহুরূপে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের মধ্যে লক্ষ্য করা হয়েছে এবং সেই সব বিষয়ে চেতনত্ব আরোপ করা হয়েছে। পুরাণে সেই শক্তির রূপবিকাশকে তত্ত্বভিত্তিক অবয়ব বা রূপ দেওয়া হয়েছে এবং তৎসংক্রান্ত রূপক কাহিনী নির্মাণ করা হয়েছে। সব দেবতার মতো পৌরাণিক সরস্বতী দেবতা ব্যতিক্রমী নন।

দেবী সরস্বতীর উৎপত্তি সম্পর্কে  পুরাণে পুরাণে বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। পুরাণকারগণ যে যাঁর মতো করে সরস্বতী চিন্তাকে স্বাধীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কোন কোন পুরাণ মতে, যেমন ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে সরস্বতী দেবী ব্রহ্মার মুখগহ্বর থেকে সৃষ্টি হয়েছিলেন। পাশাপাশি পদ্মপুরাণে সরস্বতী কে দক্ষকন্যা বলা হয়েছে। আবার ভাগবত পুরাণে দেখা যায়, সরস্বতীর সৃষ্টি বিষ্ণুর জিহ্বাগ্র থেকে। সুতরাং সরস্বতীর সঠিক পিতা বা উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক আছে। অপেক্ষাকৃত আধুনিক মৎস্যপুরাণ পরমাত্মার মুখনিঃসৃত শক্তির মধ্যে সরস্বতীকে প্রধান বলেছেন।

সরস্বতীর স্বামী নিয়েও একইভাবে পুরাণকারদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী মত পরিলক্ষিত হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে তিনি বিষ্ণুপত্নী, ভাগবত পুরাণ মতে দেবী ব্রহ্মার পত্নী, স্কন্দ ও শিবপুরাণে শিবের ঘরনী, পদ্মপুরাণে কশ্যপ মুনির স্ত্রী। সুতরাং দেবী সরস্বতীর স্বামী নিয়েও ঘোর সংশয়।

তবে সবটাই ভক্তকুল পুরাণ রচয়িতাদের কল্পনা এবং পুরাণ কারদের স্বতন্ত্র প্রতীক চিন্তা এরকম প্রভেদের মূল কারণ। কিন্তু কোনভাবেই তাঁরা কেউই বৈদিক মূল সত্য থেকে বিচ্যুত হননি।  কারণ দেবতাদের পিতা -পতি কিছু হয় না। একই শক্তির ভিন্ন প্রকাশ। নিত্য সত্য জ্ঞানের আকর স্বয়ং ব্রহ্ম’। সেই ব্রহ্ম’ শক্তিকে মহাব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় ত্রিধাবিভক্ত করা হয়েছে — সৃষ্টি-স্থিতি-লয় (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর)। মহাসৃষ্টির জ্ঞান তথা ব্রহ্মার মুখ থেকে নিঃসৃত হয়ে বিষ্ণু তথা পালন কর্তার জিহ্বাগ্র দিয়ে ঐশী জ্ঞানধারা সরস্বতী রূপে ধরায় প্রবাহিত হয়েছে। যা ছিল স্তব্ধ,হিমালয়ের মতো অটল -অচল, তাই হল নির্ঝরিনী। আর্য ঋষিরা মননের দ্বারা সেই জ্ঞান ধারণ করলেন আর বাঙ্ময় হয়ে শিষ্য শিষ্যান্তরে দান করে গেলেন। এই হল সরস্বতী দেবীর উৎপত্তি ও প্রবহমানতার গূঢ় তত্ত্ব।

দেবী সরস্বতীর রূপকল্পনাতে বলা যায় যে নিরাকার সাধনা সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজ নয়।এজন্যই ঋষিরা অসীমকে সীমায় বাঁধতে প্রতিমার রূপ দেন। জ্ঞান- সাধনার উপযোগী প্রতিমূর্তি সরস্বতী প্রতিমা তাঁদেরই ধ্যানোপলব্ধি।

দেবী সরস্বতী প্রতিমা সব পুরাণেই চতুর্ভুজা। তবে বাংলা তথা পূর্ব ভারতে দ্বিভূজা দেখা যায়। পুরাণ অনুসারে দেবীর চার হাতে অক্ষমালা, পুঁথি, বীণা,পদ্মফুল সহ বরাভয় মুদ্রা থাকে। এই চতুর্ভুজ চতুর্বেদের প্রতীক কিংবা মন,সচেতনতা, বুদ্ধি, বৃত্তির পরিচয়।

অক্ষমালার মাধ্যমে সারস্বত সাধনায় ত্যাগ,সংযম,একাগ্রতা ও নিরাসক্তির প্রয়োজনীয়তাকে বোঝানো হয়েছে। পুঁথি বা পুস্তক পরা ও অপরা বিদ্যায় সম্যক জ্ঞানের আবশ্যিকতাকে সূচিত করে।বীণাযন্ত্রের অপূর্ব সুরমূর্ছনা মহাজগতে বিস্তারিত পারমার্থিক আনন্দের প্রতীক। বরাভয় মুদ্রা ও পদ্মফুলে শুদ্ধ জ্ঞানার্জনে একনিষ্ঠ সাধকের প্রতি দেবীর পরম আশ্বাস ব্যক্ত।

দেবীর নিকট যে যবের শীষ আর আম্রমুকুল রাখা হয় তা নদী বিধৌত উর্বর ভূমিতে কৃষিবিদ্যা ও উদ্যানবিদ্যাকে নির্দেশ করে। লেখনী ও মস্যাধার লিপিকৌশলে দক্ষতা অর্জনের ইঙ্গিত বহন করছে। পুরোহিত মন্ত্র বলেন,”… সরস্বতী পরিবারেভ্য নমঃ”। আসলে দেবীর এগুলি নিয়েই পরিবার। পরিবারের আর এক সদস্য হল তাঁর বাহন।

প্রাচীন ভারতের মূর্তিতে দেবী সিংহপৃষ্ঠে আসীনা। মনে হয়, সরস্বতী নদীতীরের অরণ্যে সিংহের অস্তিত্বের প্রভাব বাহন নির্বাচনে পড়েছে। তাছাড়া সিংহ বলবত্তা, বীর্যবত্তা, লক্ষ্যজয়ে কঠোর সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক। তবে পৌরাণিক যুগে বাহনের পরিবর্তন ঘটেছে। স্থানভেদে পার্থক্যও আছে। উত্তর -দক্ষিণ ভারতে সরস্বতী ময়ূরবাহনা। পূর্বভারতে তিনি হংসারূঢ়া। হংসবাহনে বায়ুপরাণের সমর্থন আছে। এছাড়াও হংস হল গতির প্রতীক। হাঁস ডাঙায় হাঁটে, জলে সাঁতার কাটতে পারে, আবার শূন্যে উড়তে পারে। অর্থাৎ পৃথিবী, অন্তরীক্ষ এবং দ্যুলোকের জ্ঞান তার করায়ত্ত। মহাবিশ্বের মহাজ্ঞানের আসনে দেবীর অধিষ্ঠান। সাধককে হতে হবে রাজহাঁসের মতো অপরা বিদ্যার মধ্যে থেকে পরাবিদ্যা গ্রহণে সক্ষম।

প্রার্থনা মন্ত্রে বলা হয়েছেঃ

যা কুন্দেদুতুষারহারধবলা যা শ্বেতপদ্মাসনা।

যা বীণাবরদণ্ডমণ্ডিতভূজা যা শুভ্রবস্ত্রাবৃতা।।

দেবী সর্বশুক্লা—গাত্রবর্ণ, বস্ত্র, অলঙ্কারাদি, বীণা,পদ্ম, সব কিছুই সাদা, নির্মল।

পদ্মপুরাণে স্তবমন্ত্রে বলা হয়েছেঃ

শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা।

শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা।।

শ্বেতাক্ষশুভ্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।

শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কার শোভিতা।।

কিন্তু শিবপুরাণমতে দেবী তপ্তকাঞ্চনবর্ণা। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে তিনি শুভ্রবসনা নন, পীতবসনা। স্কন্দপুরাণে দেবীর মস্তকে জটা এবং নীলগ্রীবা।

দেবী বহু নামে বন্দিত—–সরস্বতী,সারদা, মহাশ্বেতা,শতরূপা,ভারতী, বীণাপানি, বাণী, সনাতনী, বাগ্দেবী, বাগীশা, বাগীশ্বরী, বাঙ্ময়ী,বিদ্যাদেবী,গীর্দেবী,কাদম্বরী,সর্বশুক্লা।মানুষ মরণশীল কিন্তু  মননশীল।তার মধ্যে সুপ্ত হয়ে আছে অসীম শক্তি। জাগতিক মোহমায়ার আবরণ ছিন্ন করে নিত্য সত্য লাভ করে সে দেবত্বে উত্তোরিত হতে পারে। মহীয়ান অমৃত জ্ঞানের স্তব্ধতার তপস্যা ভঙ্গ করে আলোকের ঝর্ণাধারায় অবগাহন করতে পারে।বসন্ত পঞ্চমীর পুণ্যলগ্নে জ্যোতির্ময়ী দেবী সরস্বতীর নিকট অমৃতের পুত্রদের একটাই প্রার্থনা হোকঃ সকল বিভবসিদ্ধৈ পাতু বাগ্দেবতা নঃ।।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


মধুবন চক্রবর্তী

 

বিয়ের গান



 

দুই মনের মিলনের উৎসবে, মানুষের মেলায জড়িয়ে থাকে সুর, কথা, কথোপকথন, প্রেম, আনন্দ। বিবাহ হল সেই প্রাচীন রীতি, যেখানে দুই চোখের মিলন, দুই মনের যুগলবন্দী, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় গান, গানের মধ্যে জড়িয়ে থাকে বিষয়ভিত্তিক কথা। অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রাসঙ্গিক কথার মধ্যে দিয়ে বিবাহের বিভিন্ন পর্যায়ের চালচিত্র একসময় তুলে ধরা হত এই বিয়ের গানে। যেখানে বিয়ের প্রাক_প্রস্তুতি পর্ব থেকে একেবারে শেষ আচার পর্যন্ত খুঁটিনাটি বিবরণ গাঁথা থাকত এই গানে। মহিলারাই এই গানের একমাত্র ধারক বা স্রষ্টা ছিলেন। দল বেঁধে ছন্দবদ্ধ ভাবে তাঁরা গান গাইতেন। এখনও সেই রীতি বেশ কিছু জায়গায় প্রচলিত থাকলেও, বিয়ের গানের সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। বৈশাখ উদযাপন পয়লা বৈশাখ দিয়ে শুরু হলেও, শেষ হয় বিয়ের মরসুম দিয়ে। বিয়ের মরসুম শুরু হয়ে গেছে। হেমন্ত ক্ষণস্থায়ী ঋতু হলেও, বিয়ে নামক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত শুরু হয়ে যায় এই ঋতু থেকে। তারপর শীতের অলিন্দে আলগা রোদ আর বর কনের আলগা প্রেমের ঘনত্ব বাড়তে থাকে শীতের আমেজ দিয়ে। তার প্রস্তুতি পর্ব শুরু।

যদিও বিয়ের মরশুম অবশ্য চৈত্র সেলের কেনাকাটায় নতুন বছরের উৎসবের ছোঁয়া দিয়েও শুরু হয়। চৈত্র সেলে নববর্ষের উপহার আর বিয়ের কেনাকাটার জন্য ভিড়, আমোদ প্রমোদের তরী ভাসিয়ে দেওয়া হয় গ্রীষ্মের খরতাপে। তাই সেইটার গ্রীষ্ম এই দুই ঋতু জুড়ে বিয়ের মরশুম জুড়ে থাকে। তবে একটা সময় ছিল যখন এই বিয়ের প্রস্তুতি পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত "বিয়ের গানে"র ঐতিহ্য।

বিয়ের গান ছাড়া বিয়ের মরশুম ভাবাই যেত না। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে সেই গানের চরিত্র। বদলেছে সামাজিক রীতি নীতির চেহারাও। কানাডার ছেলের সাথে যখন অস্ট্রেলিয়ার মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয় কলকাতারই কোনও পাঁচ তারা মহলে, তখন তার আনন্দের চেহারা কি লৌকিক বা আঞ্চলিক থাকে? বিয়েতে এখন প্রবেশ করেছে প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া ফ্যাশনের কারিশমা। বাঙালি সংস্কৃতি থেকে সরে গিয়ে এখন বরকনে পড়ছেন ভিন্ন ঘরানার ভিন্ন সংস্কৃতির পোশাক-আশাক।

বিয়ের গানের জায়গায় প্রবেশ করেছে ফিউশন মিউজিক। ডিজের গান।

ভোজনরসিক বাঙালীর কলাপাতায় চেটেপুটে খাওয়ার সেই জিভে জল আনা চেহারাটাই এখন উধাও, ঠিক যেরকম ভাবে লোকসংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ, অঙ্গ ও বিশেষ ধারার বিয়ের গানও হারিয়েছে তার জাকজমক, জৌলুস। এখন বিয়ের আনন্দ উৎসবের সাথে জড়িয়ে গেছে বাজার চলতি জনপ্রিয় কিছু হিন্দি গান, ব্যান্ডের গান, পাঞ্জাবি ভাঙ্গরা স্টাইল, অথবা কোনও  বাংলা গান, কিংবা  ভাইরাল হওয়া কোনোও মিউজিক ভিডিও। সে সব গানের সাথে কোমর দুলিয়ে নাচের হিড়িকও তো কম নয়।   সামাজিক রীতি অনুযায়ী, প্রচলিত ধারাকে বা সংস্কৃতিকে বহন করে যাওয়াটাই রীতি বা রেওয়াজ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেই প্রথাকে ভেঙে প্রযুক্তির যুগে আধুনিকতার মোড়কে এখন বিয়ের গানের মধ্যে ঢুকে পড়েছে বিদেশি সুর, বাংলা ব্যান্ডের সুর অথবা অন্য কোন বাজার চলতি সুর।

বৈশাখ মানেই তো শুধু আম পোড়া শরবত, নানা স্বাদের আম, হালখাতা, মিষ্টিমুখ চৈত্রসেল কিংবা রবি ঠাকুরের হরেক রকমের বৈশাখী গান বা কবিতাই তো নয়, এর পাশাপাশি আরেকটি বিশেষ উৎসব তা হল বধূবরণ। একটা সময় ছিল যখন অনেক আগে থেকেই বিবাহের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। যাকে বলে বিবাহ প্রাক প্রস্তুতি পর্ব। এই পর্বের মুখ্য চরিত্র ছিল বিয়ের গান। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান অনুযায়ী বিয়ের গান বাধা হতো। আর এই গানকে ছন্দবদ্ধ করে বিভিন্ন ফরম্যাটে বেঁধে ফেলতেন একদল মহিলা। আশীর্বাদ থেকে শুরু করে দ্বীরাগমন পর্যন্ত প্রতিটি আচার অনুষ্ঠান নিয়ে তৈরি হত 'বিয়ের গান'।.গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে নাপিতের মুখ থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী

এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নিয়ে মজাদার গান বাঁধতেন। গান বাঁধতেন অন্তঃপুরের মহিলারা। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের বিয়েতে ভিন্ন রকম গানের প্রচলন আচার অনুষ্ঠানের তফাৎ থাকলেও মেজাজটাই তো আসল রাজা গানের মুড সেই আনন্দের ধারাকেই বয়ে দিয়ে যায়। একটা সময় যখন হিন্দুদের বিয়েতে মেয়েলি আচার অনুষ্ঠানের প্রধান অঙ্গই ছিল মঙ্গল গান মঙ্গল অর্থাৎ যা কল্যাণময় দুই মনের মানুষের কল্যাণ সাধনে ব্রতী ছিলেন সবাই আর গানের মধ্যে দিয়েই সে মঙ্গল সাধন ঘটানো হতো। এই অনুষঙ্গ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বিয়েতেও যুক্ত হয়েছিল পরবর্তীকালে।

এবার আসি গ্রামের কথায়। গায়ে হলুদের সময় গাওয়ার জন্য 'গীত গাওনি' মহিলাদের ডাক পড়তো দূরদুরান্ত থেকে। এখন এই গানের ধারা প্রায় অবলুপ্তই বলা চলে। তবুও প্রত্যন্ত গ্রামের এখনও বেশ কিছু জায়গায় গীতগাওনি গাওয়া হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখে মুখে এই গান গেয়ে আসছেন মহিলারা যা আঞ্চলিক ভাষায় রচিত থাকে বড় হয়ে তারাও গাইতে থাকে এবং সেই গান পৌঁছে যায় মানুষের মুখে মুখে মূল গানের সঙ্গে সময়ের বিবর্তনের ছায়া কিছুটা হলেও এখন জড়িয়ে গেছে। কিছু সংযোজন বিয়োজন ঘটলেও মূল গানের আস্বাদন কিন্তু একই থেকে যায়। বিয়ের গানের রচয়িতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিলেন নারীরা তারাই গান পরিবেশন করতেন। নারী মনের আবেগ উৎকণ্ঠে আনন্দ বেদনা হাসি কান্না সুখ-দুঃখের তীব্র অনুভূতি প্রকাশভুক্ত এই গীত গাওনি গানে পাশাপাশি নতুন বরকোণের জীবনের পরম সুখানুভূতির প্রকাশটুকু মিশে থাকত এই প্রচলিত সুরে ও কথায়।  বর কনের উদ্দেশ্যে যেসব গীত বা গান গাওয়া হত, তার মধ্যে প্রচলিত একটি গীত বা গানের কথা এখানে লিপিবদ্ধ করলাম-

কালা বাইগুনের ধালা ফুল

রুমালে গাথিয়া তুল

কইনা লো তোর দয়াল বাবাজির মায়া তুল বরির গাছে কুমড়ার ফুল

রুমালে গা্থিয়া তুল

বিয়ের গান মানে কি শুধু আনন্দের গান বা উৎসবের ছোঁয়া? সেখানেও আছে বিষাদেরও সুর। আছে বিরহের সুর। যেমন আগমনী ও বিজয়ের গানেও আমরা পাই বিষাদের মূর্ছনা। বাপের বাড়ি ছেড়ে

শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় কনের মনের যে কষ্ট বা বেদনা তার নিদারুণ বর্ণনা পাওয়া যায় এই বিয়ের গানে। বিয়ের গানের একটি বিশেষ স্তর হল 'কনে বিদায়ের গান'... যে গান শুনলে চোখের জল বাঁধ মানে না।

মন কিন্দাইলাম বনে বনে

আরো কান্দন কান্দে ঘুমায় ও বনে বনে আরো কান্দনে কান্দে গো মায় ও বনে বনে

আরো কান্দন কান্দে গো মায় ও নিরলে বসিয়া'...

পাশাপাশি রয়েছে 'বরকনের গান'…

যেখানে বর তার কনেকে অনুরোধ করছে সঙ্গে যাওয়ায় জন্য। কিন্তু কনে বলছে বরের দেশে ভাতের কষ্ট, কাপড়ের কষ্ট আছে কিনা? বর তাকে আশ্বস্ত করছে। কনের যাতে কোনোও ধরনের কষ্ট না হয়,

তার জন্য সে সব ব্যবস্থাই নেবে প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ, বেদনা বিষাদ, বিদায় এই সবকিছু জুড়ে রয়েছে মানুষের জীবন। সেই জীবনের গল্প গাঁথাই তুলে ধরা হয় "বিয়ের গানে"।

যেমনভাবে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়" শাক্ত-পদাবলী"র আর এক উল্লেখযোগ্য গানের ধারা আগমনী ও বিজয়ের গানেও পাওয়া যায় সেই বিষাদ বেদনা ও আনন্দের সুর। শাক্তপদাবলীর দুটি ধারা। একটি হল "উমাসঙ্গীত" আরেকটি "শ্যামাসংগীত", যেখানে রয়েছেন উপাস্য এবং উপাসক। উমাসংগীতে যেমন উমার জীবনের পাঁচালী এবং মা মেনকার ব্যাকুলতা তীব্রভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা বাঙালি জীবনের চিরকালীন এক বিরহের ছবি। তেমন পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘরোয়া কাহিনী। সমসাময়িক যুগ ও জীবনের করুণরসের অভিব্যক্তি ঘটে আগমনি ও বিজয়া গানে। এটা ঠিকই বিয়ের গানে জড়িয়ে নেই কোন পৌরাণিক কাহিনী বা দেব দেবীর কথা। তবে এখানেও গ্রাম বাংলার অতি বাস্তব চিত্র। জীবনের চলচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।রয়েছে  নারীর অন্তরের খুঁটিনাটি।

বিয়ের গানের বিভিন্ন ধারার মধ্যে সিলেট অঞ্চলের ধামাইলের উল্লেখ করা যেতে পারে যে কোন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে গীত নৃত্যের মধ্যে দিয়ে এই ধামাইল অঙ্গের গান পরিবেশিত হয়। বর্তমানে এখনও সনাতন বিয়ের অনুষ্ঠানের অধিক প্রচলন, যা সর্বাধিক প্রচলিত এবং প্রসারিত সিলেট অঞ্চলে। সিলেট অঞ্চলে এর জনপ্রিয়তা থাকলেও, পার্শ্ববর্তী জেলা সমূহ বিশেষ করে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণ বাড়িয়ার কয়েকটি উপজেলায় এই গানের প্রচলন দেখা যায়। একটি বিখ্যাত ও বহুল প্রচলিত ধামাইলঙ্গের গানের কথা মনে পড়ছে-

লীলাবালি লীলাবালি

বড় যুবতী সই গো

বড় যুবতী সই গো

কি দিয়া সাজাইমু তোরে"...

প্রায় চারশ, সাড়ে চারশ বছর আগেকার রচিত এই গান যা মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। যা আজও অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রাসঙ্গিক। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে মঞ্চে এই গান ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি আসলে একটি মুসলিম বিয়ের গীত। ধামাইল অঙ্গের গান। নৃত্য সহযোগে পরিবেশিত হয়। বিশিষ্ট লোক সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক লোকসংগীত গবেষক ডঃ অভিজিৎ বসু জানালেন এই কথা। আরো জানালেন হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েতেও যা আনন্দের সঙ্গে নৃত্য গীত সহযোগে পরিবেশিত হয় এবং মুসলিম সমাজের বিয়েতেও তাই। অর্থাৎ এই গানটি সর্ব ধর্মের সমন্বয়ের কথা বলে। অনেকে বলেন এই গানের রচয়িতা  ও গীতিকার রাধা রমন দত্ত। কিন্তু এত বছর পরেও এই গানটির রচয়িতা সুরকার সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। রাধারমন দত্ত অসংখ্য ধামাইল গানের জনক।তিনি একাধারে বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল, ধামালি নৃত্য গীতের প্রবর্তকও বটে। তার রচিত ধামাইল গান সিলেট ও ভারতের বাঙ্গালীদের কাছে অধিক সামাদৃত যা সমবেত নারী কন্ঠে গাওয়া হয় এবং বিয়ের গানের একটি বিশেষ অঙ্গ হিসেবেই ধরা হয়ে থাকে।  আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বিয়ের গান' কুঞ্জ সাজাও গো' যা বাসর শয্যার সময় গীত হয়ে থাকে। হিন্দু সমাজে বিয়ের গান হিসেবে প্রচলিত অত্যন্ত জনপ্রিয় এই গানটিও সর্ব ধর্মের উজ্জ্বল নিদর্শন।

শাহ আব্দুল করিম রচিত এই গানটি এতটাই জনপ্রিয় বর্তমানের বিয়ের আসরেও অধিক সমাদৃত। এই গানের সমাদর সমাজের প্রায় সর্পস্তরে। এটি ধামাইল অঙ্গের গান একসময় ধামাইল নৃত্যের সঙ্গেও এই গানটি গাওয়া হতো। যুগ যুগ ধরে মুখে মুখে এই গানটি গেয়ে আসা হচ্ছে। লোক সাহিত্যের এমন অনেক লোকসংগীত আছে যা শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য নয়, মুসলিম সমাজেও গৃহীত হয়েছে এবং অন্যান্য ধর্মেও যা বহুল প্রচলিত। আসলে লোকসংগীত কোন নির্দিষ্ট ধর্মের কথা সবসময় বলে না, সম্প্রীতির কথাও বলে। লালন সাঁই থেকে হাসন রাজা রাধারমন দত্ত থেকে শাহ আব্দুল করিম সকলেই সম্প্রীতির কথাই বলেছেন। বলেছেন মানব ধর্মের কথা।

মধ্যযুগের কবিদের একাধিক কবিতা সাহিত্যে 'ধামালি' শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। যা বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ব্যবহৃত হয়েছে। মহাকবি সঞ্জয় রচিত মহাভারতেও ধামালীর ব্যবহার পাওয়া যায়। মরমী কবি রাধারমন দত্ত এই ধামাইলের বিকাশে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। পল্লী নারীর হৃদয়ের গভীর আকুতিকে রাধা কৃষ্ণের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রকাশ করেছেন তিনি। যা বিয়ের গানের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহুবছর ধরে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বিয়ের বিভিন্ন পর্বে বিশেষ করে মঙ্গলাচরণ, গায়ে হলুদ, জলভরা, দ্বিরাগমন প্রভৃতি উপলক্ষে ধামাইলের আয়োজন করা হয়, যার পরিবেশন রীতি সম্পূর্ণ আলাদা। ছন্দব্ধ করতালির মাধ্যমে তাল এবং লয়কে নিয়ন্ত্রণ করা হয়. হাওড়া অঞ্চলে করতালি কে বলা হয় থাপা। বাকিরা কণ্ঠ মেলান এবং নৃত্য সহযোগে ঘুরতে থাকেন. এই গানের বিভিন্ন রকম পর্ব হচ্ছে

বন্দনা

আসর

বাঁশি

জলভরা

গৌর রূপ

শ্যামরূপ

বিচ্ছেদ

কোকিল সংবাদ

মানভঞ্জন

মিলন

সাক্ষাৎ খেদ

বিদায়

আউট গান

মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে রাধাকৃষ্ণের প্রেম কাহিনী থাকলেও, বিয়ের গানের মধ্যে বরকনেকে সেই রাধা কৃষ্ণের রূপেই দেখা হয়। খালিয়াজুরির নয়াগাঁও গ্রামে মহুয়া ধামাইল দল তারা দীর্ঘদিন ধরে এই গান পরিবেশন করে আসছেন। প্রচার ও প্রসার করে আসছেন এই ধামাইল গানের। বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়াও করিস এই জন্য আমার কাজ। বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়াও নবজাতকের ষষ্ঠী মাসিক ব্রত অন্নপ্রাশন সীমন্ত সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই ধামাইলের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

গ্রামীণ বাংলার গান মানে জাদুর স্পর্শ। বিষয় ভেদে, অঞ্চল ভেদে, ভাষায় বদল, সুরও বদলে যায়। বৈচিত্রের সমাহার ভাদু, চটকা, ভাটিয়ালি, আকরাই, ঝুমুর, গম্ভীরা, কীর্তন, পাশাপাশি রয়েছে বিয়ের গান যা বিষয়বৈচিত্র্যে এক অসাধারণ মাধুর্য রেখে যায়। এই গানের অঙ্গ হিসেবেই রয়েছে কনে সাজানোর গান, কনে বিদায়ের গান, আলপনার আলাদা গান, যে সমস্ত গান মহিলারাই বাঁধেন পরিবেশন করেন এবং শ্রোতাও সেখানে মহিলা। রয়েছে জল আনার গান যা অত্যন্ত মজার এবং খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কাহিন্দু রীতির বিয়েতে স্ত্রী আচার যেরকম থাকে সেরকমই আরেকটি আচার হল জলভরা"। বিয়ের দিন বর কনেকে স্নান করানোর জন্য বাড়ি থেকে এও স্ত্রীরা কাছাকাছি কোন নদী বা পুকুর থেকে জল নিয়ে আসেন। নিয়ম অনুযায়ী বিজোড় সংখ্যায় মেয়েরা থাকবেন। সাত অথবা নয় জন কিংবা এগারোজনের মত মহিলারা যেতে পারবেন ঘাটে। কাছে থাকবে কলসি আর সেই সঙ্গে বিয়ের আরোও বেশ কিছু উপকরণ থাকবে। এরপরে শুরু হবে জল ভরার গান এই গান গাওয়া হয় ঘাটে গিয়ে উলুধ্বনি দেওয়া হয়। শঙ্খ বেজে ওঠে চটুলতা, রসিকতার মিশ্রণে সাজানো এই গানে কখনোও রাধা কৃষ্ণের উপমাও উঠে আসে। যেরকম-

"ওগো সাঝের বেলা কে তোরে

জল আনতে বলেছে

কে জল আনতে বইলাছে

ঘরের জল বাইরে ফেলে যমুনার জল আনতে গেলে

না জানি কোন কালার সনে প্রেম মইজাছে'...

রাধাকৃষ্ণের লীলার সঙ্গে গ্রামীণ মেয়েদের সুখ দুঃখের কথা মিলিয়ে অসাধারণ অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় এই গানে। দৈনন্দিন জীবন যাপনের নানান খুঁটিনাটি ছবি উঠে আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। বাংলার সংস্কৃতিতে বিয়েতে বরাবর বিয়ের গান বা বিয়ের গীতের প্রভাব। একসময় বিয়েতে আমন্ত্রিত বউদের বলা হত বিয়ের গান গাইবার জন্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই রকম। আগেই সিলেট অঞ্চলের কথা বলেছি রংপুরের চিত্রটাও একইরকম। আবার টাঙ্গাইলেও তাই। আগে গীতগাওনি মহিলাদের ডাক পড়ত।

 

শুধুমাত্র হিন্দু রীতিতে কেন মুসলিম সমাজেও এই বিয়ের গান অধিক প্রচলিত ছিল যা এখনো ব্যাবহৃত হয় বেশ কিছু জায়গায়। শুধু চিত্ত বিনোদনের জন্যই এই গান নয়, মুসলিম মহিলাদের নানান সুখ দুখ বেদনা যন্ত্রণা আনন্দের কথা ও প্রকাশিত হয় এই গানের মধ্যে দিয়ে। নানান প্রথা ও পরম্পরার কথা প্রকাশিত হয় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক রীতি আছে। সেই অনুযায়ী বিয়ের গীত পরিবেশিত হয়। বর আসার অনেক আগে থেকে শুরু হয় এই গান। নানা স্তরের নানা পর্যায়ের গান। বর আসার আগে প্রতিবেশীরা বলেন এই গানের কথায়-

"দুলহান সাজাও আম্মা খুবসুরত করিয়া

দামান আসেছে দেখি পাগড়ি নাড়িয়া"...

মা তখন প্রতিবেশীদের উত্তর দিয়ে বলছেন আসুক নারী পুতার দামান চিন্তার ন্যায় কিছু কামরাঙ্গা রঙ পার্টি পিঁধে বেটি যাবে পিছু পিছু। মেয়ে মহলে বরের রূপ বর্ণনা করার একটা রেয়াজ আছে সব সম্প্রদায়ের মুসলিম গিতের মধ্যেও সেই একই রেওয়াজ-

"কোথায় গিলা পুতের মা

দামান দেখো আইয়া

রূপের বান ডাইকা দিল কত মিষ্টি লইয়া"

কিছু গান প্রচারিত আবার কিছু মুখে মুখে ও রচিত হয়ে জনপ্রিয় হয়েছে এ বিয়ের গীতার সঙ্গে তালবদ্ধ হিসেবে থাকে বাংলা ঢোল বা মাদল মহিলারা এই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থাকেন। এক সময় বর্ধমান জেলার পিন্দিরা গ্রামে আমিনা বিবির লেখা একটি বিয়ের গীত খুবই জনপ্রিয় হয়। প্রথম পংক্তি ছিল-

"কেন ভাঙলি রে তুই চারা গাছের আম ওরে বেহুদা গোলাম"

সম্প্রতি গবেষক লেখিকা মনোয়ারা খাতুনের গবেষণাধর্মী একটি বই প্রকাশ পেয়েছে যেখানে বাঙালি মুসলিম সমাজের উৎপত্তি বিস্তার এবং প্রসারের পটভূমিতে খুব সুন্দর এবং সাবলীল ভাবে মুসলিম বিয়ের গানের বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। বইয়ের মুখবন্ধ এবং লেখিকার নিজের কথা থেকে জানা যায়, বিয়ের গীতের সংস্কৃতি তার পরিবারগত এবং একইসঙ্গে ঐতিহ্যগত। মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত একজন যিনি ওই সংস্কৃতির ধারক বাহক তিনি নিজেই যখন তাঁর সংস্কৃতি সম্পর্কে লেখেন, তার একটা আলাদা গুরুত্ব অবশ্যই থাকে। কারণ তিনি সমাজের ভেতর থেকে সেই সংস্কৃতিকে দেখতে পারেন।

মনোয়ারা খাতুনের রচনার ভিতরে আছে "আমাদের গাওয়া, চারপাশের এবং দূর দূরান্ত থেকে সংগ্রহ করা বিয়ের গীতগুলোর আমি একজন উপস্থাপক মাত্র। এই গ্রন্থের আমি কথক, গীত আসরের গুণমুগ্ধ দর্শক, গায়ক আবার নায়ক। 'কত কথা হলো বলা কত কথা'...”। বাকি পর্যায়ে কথা বলেছেন গবেষক লেখিকা মনোয়ারা খাতুন। তার সংযোজন- "এই সমস্ত মেয়েলী গীতগুলো নারীদের রচনা। এই গীত, সংস্কৃতির স্রষ্টা, ধারক এবং বাহক মুসলিম নারী সমাজ। মৌলিক অলিখিত এক ঐতিহ্যকে বয়ে চলেছে তারা যুগের প্রভাবে ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মূল কাঠামোটি অটুট আছে"।

গ্রন্থটি কেবল সংগ্রহ ও সংকলনমূলক নয়, বিশ্লেষণমূলকও বটে। যা পাঠকদের অবশ্যই সমৃদ্ধ করবে মুসলিম  সমাজের লোকসংস্কৃতি ও বিয়ের গান সম্পর্কে জানতে। বাঙালি মুসলিম সমাজে লোকসংস্কৃতির বেশিরভাগটাই ধরে রেখেছেন মুসলিম মহিলা সমাজ অধ্যাপক ডক্টর মকবুল ইসলাম বলেছেন ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির লৌকিক রূপটিকে আঁকড়ে রাখার যাবতীয় কৃতিত্ব মুসলিম মহিলা সমাজেরই প্রাপ্য।

বিবাহ কেন্দ্রিক আচার অনুষ্ঠান সংস্কৃত ধারার একমাত্র সম্রাজ্ঞী তারাই। তার কথায় মুসলমান মাত্রাটিকে সরিয়ে রাখলে বলতে হয় পরিবারে এবং সমাজে নারীর এক রকমের প্রান্তীয়তা আছে আর তার দিকটা হল অন্তর প্রান্তীয়তা বা ইন্টারনাল মার্জিনালিটি। পাশাপাশি জনপ্রিয় বা প্রচলিত বাংলা আধুনিক গানের সুরেও এই বিয়ের গান রচিত হয়। স্বর্ণযুগের আধুনিক বাংলা গান ও তার সুর ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল একসময় মুসলিম বিয়ের গানকে। যেমন শ্যামল মিত্রের গাওয়া-

"কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে"

এই গানের সুরে সেরিনা বিবি একসময় বেঁধে ফেলেছিলেন বিয়ের গীত-

"কি নামে ডেকে বলবো বিয়াইকে

তোমার ছোট মেয়ে দিবে আমাদের ঘরে

ঘড়ি নিব,‌ সাইকেলে নিব, নিব মাকুরি

বউ হবে ছোট পাড়া খুব সুন্দরী"

একটা সময় মুসলিম সমাজে এই বিয়ের গীত ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। লোকসংস্কৃতির এক বিশেষ অঙ্গ "বিয়ের গীত" বা “বিয়ের গানে"র যে অপার  সৌন্দর্য বা অলঙ্কার, আজকের প্রজন্ম তা যেন অনুধাবন করে। বাংলার এই লোক সংস্কৃতিকে যেন বাঁচিয়ে রাখেন। ভিন্ন সংস্কৃতিকে গ্রহণ মানে নিজের সংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলা নয়। তাকে ধারণ করে লালন করা আজীবন।