ষষ্ঠ বর্ষ / দশম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৬২

সোমবার, ৭ মে, ২০১৮

সুবল দত্ত




মীমাংসা 

                                        
লোকালয়ের বাইরে যেখানে দুটো রাস্তা সমকোণে মিশেছে সেখানে এখন নাশক ঝড়ের পূর্বাভাস। সুনামিও দিনক্ষণ ধরে আসে না। কিন্তু আগামীকাল চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে নবমীতিথির ঝড়টি প্রতিবছর নিমন্ত্রণ দিয়ে আসে। এই ভর সন্ধ্যেয় অনুজ্জ্বল একফালি চাঁদের আলোয় মোড়ের মাথায় একটি তুলসী থানের মতো কালো গম্বুজ তারপাশে একটা অসমাপ্ত মিনার লোকে বলে, এখানে একটি পুরনো সিদ্ধ বেলগাছ ছিল তার নিচে ছিল এক পরম ভক্ত সাধুবাবার আসনবেদী সেখানে  বসে উনি প্রেম বিলাতেন উনি দেহরাখার পর সেখানের আসেপাশে মুসলমান বসতি ঘন হওয়ার পর ওরা দাবী করে ওই সাধুবাবা পীর পয়গম্বর ছিলেন লোকে বলে, একদিন তারা সেই বেদীর উপর গম্বুজ ও মিনার বানালো তারপর থেকেই সাধুভক্তদের প্রতি বছর এই সময়ে রামনবমীর জুলুস এইদিনটি হিংসার সবচেয়ে বড়দিন এখন সেখানে রোজকার মত প্রদীপ হাতে নিয়ে একটি শীর্ণকায় বিকলাঙ্গ বৃদ্ধা সে একা নয় তার চারপাশে ছায়া ছায়া অশরীরীর মত কয়েকটি টহলদার ঘোরাফেরা করছে কিছু বলছে না কিন্তু মাঝে মাঝে আগ্নেয়াস্ত্রের ধাতব ঠোকাঠুকির আওয়াজ কোমরে বাঁধা শিকলের ঝমঝম আওয়াজ ওই পাড়ার আজ দু’দিন কেউ আসে নাআশ্চর্য! এরকমটা কিন্তু বছরের অন্য কোনো দিন নয় এইপাড়ার মানুষ পুজোতে হোলিতে ওইপাড়ায় যায় আবার ঈদ মানাতে এইপাড়াতে আসে রোজ  সাধুবাবা পুজো পায় পীরবাবার নামে মহিলারা মানত করে প্রদীপ জ্বালাতে আসে কিন্তু বছরের এই একফালি বাঁকা চাঁদনী রাতে এখানে হুড়মুড় করে আতঙ্ক নামে রাত প্রতীক্ষায় থাকে কখন তলোয়ার বর্শা ও বিশাল পতাকা নিয়ে জুলুস এই বেদীগম্বুজের কাছে আসবে আর প্রতিবছর প্রশাসন থাকতেও একদুটো বলি হবেই
-কি বুড়ি? কি মানত করলি পীরপয়গম্বরের কাছে? অন্ধকারের আড়ালে একটি ছায়ার খসখসে গলা
-আমার বেটা বড় বদরাগী গো ভগবান রক্ষা করুন কাল যেন বেঁচে ঘরে ফেরে  ওই একটিই তো রোজগেরে মানুষ ও না বাঁচলে আমরা না খেতে পেয়ে মরে যাব ওকে প্রাণে মেরো না গো!  
-তোর বেটাই তো মারুতি জিহাদি ওকে তো এবার কতল করবই ওই তো বলেছে গম্বুজ ভেঙে এবার সাধুবাবার বেদী কব্জা করবেই আমাদের জমিন আমরা ছাড়ব না অবকী বার ইসপার উসপার
- জমিন আদমী কা কভি নহী হোতা জমিন খুদা কা জিসকো চাহে উঠালে জিসকো চাহে বসালে ঊনকি মর্জি প্রদীপ হাতে বোরখা পরা একজন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসে -তু আপনা দেখ খুদা নে আপনা হাওয়া পানি খানা খিলাকে তুঝে ইতনা বড়া কিয়া ক্যা মরনে মারনে কে লিয়ে?
-খবরদার কাল এখানে কোনো ঔরত বাচ্চা আর বিকলাঙ্গ আসবে না এলেই আগে তোদের কতল করব বুঝলি? এই কথা বলে অন্ধকারে অন্ধকার মিলিয়ে গেল
শান্ত সকালটি নীরবে কেটে গেল দূরে বস্তির দেওয়ালের আড়ালে মারণাস্ত্র নিয়ে  হিংস্রেরা তৈরি দুপুরবেলায় মাইকে কলরব ‘জয় শ্রীরাম’ ও লাল গেরুয়া ঝাণ্ডা  তলোয়ারের দাপাদাপি হঠাত্‍ কোথা থেকে দলেদলে হিন্দু মুসলমান মহিলা শিশু ও বিকলাঙ্গ ঝাঁপিয়ে পড়ল দু’ দলের মাঝে ওদের প্রত্যেকের হাতে ফুল ও ফুলের  মালা ওদের হাতে ধরা ভরদুপুরে প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো পরিবেশ             

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন