ষষ্ঠ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫৯

সোমবার, ৭ মে, ২০১৮

শুভঙ্কর গুহ




বনেচর


রাস্তা নয় যেন পায়ে পায়ে চলা দাগ। বনবাসীরা হেঁটে হেঁটে দাগ দিয়েছে বহুদিন। একাকী বনের গহিনে প্রবেশ করে রাস্তাটি বড় বড় গাছের নিচের ছায়া আঁধার ধরে বহুদূরে গিয়ে অতি ক্ষীণ রেখা হয়ে তারপরে একবারে জংলি বনলতার গভীরে হারিয়ে গেছে। এই ফালি দাগের মতন মাটির পথের ওপরে পড়ে থাকে নীরব কিছু বেদনা। কিছু ব্যথা। কথায় আছে অঞ্চলের মানুষজন চুপি চিপি এসে এই জঙ্গলের পথের ওপরে ব্যথা ফেলে দিয়ে যায়। পথ সেই ব্যথা আর বেদনা সঞ্চয় করে আপন মনে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। ভারসাম্যহীন খামখেয়ালিপনায়।

উনি বনেচর। সারাদিন জঙ্গলের এই পথের ওপরে হেঁটে হেঁটে অন্যের ব্যথা কুড়িয়ে যান। আর পথের মতন মাটির দাগের সাথে কথা বলতে বলতে কখনো নিঃসঙ্গ ফেউ হয়ে যায়। প্রতিদিন ব্যথা কুড়ানোর পরে বলে - আরও আছে?
পথ বলে -এসেছিল একজন। ডুকরে কেঁদে গেল অনেকক্ষণ, তারপরে ফেলে দিয়ে গেল। আমি তো ছায়ার সাথে আলাপ করছিলাম। বেলা বাড়ছে। আমি একটু ফিরে যাই। আমাকে নদী বাঁধের দিকে অনুসরণ করো।
ফেরার পথটি আজ বড়ই প্রাণচিহ্নহীন। মাঝে মাঝে অতি ক্ষীণ এক অজানা পাখির ডাক ভেসে আসছে থেমে থেমে। চারদিকে কেমন বুনো মরা আলো। হাঁটতে হাঁটতে সে অনেকটাই ফিরে গেল। প্রায় জঙ্গলের সীমানায়। সীমারেখার পাশে স্তব্ধ জলাশয় উঠে আসছে। একটু এগিয়ে গিয়ে সে নদী বাঁধ দেখতে পেল। নদী বাঁধের ওপরে উঠে সে নদী বরাবর হাঁটতে থাকল। পিছনে একবার ফিরে তাকাল। সবে মাত্র অরণ্যরেখা। গাছের পাতার শব্দ ভেসে আসছে আবহ সঙ্গীতের মতন। বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সে দেখতে পেল গাছের ডালে ঝুলে রয়েছে গ্রামীণ ডাকঘর। আর পোস্টম্যান সেই কবেকার সঞ্চিত ঠিকানাহীন চিঠি পত্তরের বোঝা ফেলে দিয়ে বহুদূরে টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে নদী বাঁধের ঢালু ভাঙ্গছে। 

জঙ্গল ছেড়ে বিবরণ অনেকটাই একটি গ্রামের কাছকাছি। দেশলাইয়ের খোলের মতন কাঠের বাড়িগুলি ভাষাহীন স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। অনেকটা এগিয়ে গেল সে।
গ্রামচিহ্ন হারিয়ে যায়। জনপদের চিহ্ন। বনপাশে ছোট শহর। বন পিপাসুদের কাছে আকর্ষণীয়। সে পায়ে পায়ে প্রবেশ করল একটি শহরে। উট পাখির মতন টোটোরিক্সা বিচরণ করছে। আর দানবীয় ডেঁয়ো পিঁপড়ের মতন অটোরিক্সা ব্যস্ত চলাচলে। মাঝে মাঝে দূরপাল্লার বাস বাঁক নিচ্ছে। চৌমাথার বাজার। মধ্যস্থলে পৌরভবন। সরকারি কাছারি ও সারি সারি ফলের দোকান। বন দপ্তরের অফিস। দোকানপাট। হঠাৎ জঙ্গল হারিয়ে শহরটি যেন উপন্যাসের পাতা ওলটানোর মতন নিয়ম মাফিক। পাঠকের নিবিড় পাঠ এগিয়ে যায় লেখকের কলমের সাথে সাথে চূড়ান্ত এক পরিণতির দিকে।
বনেচর একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসল। বুক ভরে বনের বাতাস নিয়ে এসেছিল, সেই বাতাস যতটা পারল ছেড়ে দিয়ে দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল - কিছু ব্যবস্থা আছে?

চায়ের দোকানদার তার দিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকল। কেমন যেন দেখতে মানুষটিকে। এমন মানুষ সে কোনোদিন এই শহরে দেখে নি। মনে হয় এক বিরল প্রজাতির মানুষ। মাথার চুলগুলি জংলি লতাপাতার মতন, গায়ের জামা পোকায় কাটা গাছের পাতা। চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা বুনোভাব রয়েছে। বেঞ্চিতে বসে আছে এমন যেন মনে হচ্ছে বনলতা তার বসে থাকাকে জড়িয়ে রেখেছে। দোকানদার তার খুব নিকটে এসে তার শরীর থেকে বুনো গন্ধ পেল। দোকানদার  তার প্রশ্নটি হেঁয়ালি ভাসিয়ে দিয়ে বলল - কী নেবেন আপনি?
-  ফাল্গুন গেল। চৈত্র এসেছে। পরিযায়ী মন গাছের ডালে বাসা বেঁধেছে। দিতে পারেন কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি শুকনো পাথর ঠোঁটের ওপরে? বিশ্বাস করুন বেদনাহীন জীবন প্রবাহে কোনো নদী নেই। শুধু গাছের শুকনো ডালের মতন পড়ে আছে নদীর দাগ। তাই বলছিলাম গলা ভেজানোর মতন যদি কিছু?
-  আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে না আপনি এই শহরের। আপনি কি এই শহরের? কোনোদিন আপনাকে দেখিনি তো? মনে পড়ছে না।
-  বিচরণ করি।
 - আপনার পরিচয়? কোথায় থাকেন আপনি? কী করেন আপনি?
-  কোথাও থাকি না। থাকতে জানি না।
-  আপনি কে?
-  বনেচর।

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন