ষষ্ঠ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ক্রমিক সংখ্যা ৫৯

সোমবার, ৭ মে, ২০১৮

অপরাহ্ণ সুসমিতো


অমঙ্গলে মঙ্গল


যখন রাতের শীত ট্রেনের মতো পালাতে থাকে রোদের আগমনে, তখন তাকে প্রচ্ছন্ন সকাল বলা যায়।
এরকম প্রচ্ছন্ন সকালে মঙ্গলজানের কাজে আসতে ইচ্ছা করে না। রায়ের বাজার বস্তি ঘুমানোর জন্যে আরামদায়ক নয়মঙ্গলজান জিগাতলার বাসা থেকে পাওয়া  ম্যাজেন্টা রঙের জামাটা পরে কাজে চলে যায়। এই রঙের ছোট কামিজে ওকে বেশ সুখী দেখায়।
মঙ্গলজানের জন্ম মঙ্গলবারে বলে ওর নাম মঙ্গলজান। রায়ের বাজারের চ্যাংড়া ছেলেরা কেউ কেউ ওকে শুধু ‘জান’ বলে আহ্লাদ করে।  
এই বাড়িতে তার দু’ ঘন্টা কাজ, মাসে তিন হাজার টাকা। শুরুতে না বললেও এখন  একটু বাড়তি মসলা বাটা, অতিথি আসবে বলে তোলা বাসন ধুইয়ে নেওয়া, ছাদে গাছে পানি দেওয়া, এমনকি মুদি দোকানে যাওয়া, বাড়ির কর্ত্রীর চুলে তেল দেওয়া এসব কাজও তাকে করতে হয়। তার মতো সুঠাম শরীরের মেয়েমানুষ এসব ফ্ল্যাটবাড়িতে দেখা যায় না।  
নাজিরগঞ্জে থাকতে স্বামীর ঘরে মঙ্গলজান কত কাজ করত, তা এরা ভাবতেও  পারবে না। তবুও মাঝেমধ্যে বাড়ির কর্ত্রী যখন চিৎকার করে ধমকায়, একই কাজ আবার শুরু থেকে করায়, বারবার হাত ধুয়ে নিতে বলে, যেন তার হাতে ডাস্টবিন;  তখন অসহায় লাগে। মনে হয় এক ঝটকায় সব ফেলে পাল্টা জবাব দিতে। কিন্তু সে সামলে নেয়।

কয়েক মাস সামলে চলতে হবে। যেন গর্ভের প্রাথমিক মাস। জিগাতলার আপা কথা দিয়েছে অফিসে একটা কাজ নিয়ে দেবে। অফিসের ডেস্ক পরিস্কার, চা বানানো আর দুপুরের রান্না। চাকরিটা পাওয়া মাত্রই এই কাজ ছেড়ে দেবে। ভেবে রেখেছে, ম্যাডামের মুখের উপর এই চাকরবাকরের কাজ ছুঁড়ে দেবে সে।  
রুটি সেঁকতে গিয়ে হাত পোড়ে, বাসন মাজতে গিয়ে একটা দুটো ভাঙে। সে অবশ্য ভাঙা কাপ পিরিচ প্লেট চটজলদি সরিয়ে ফেলে। জিজ্ঞেস করলে বলে দেয়, দ্যাখেনি।  এমন অভিনয় করে যেন আকাশ থেকে পড়ল এইমাত্র। কল থেকে দীর্ঘক্ষণ পানি  পড়ার শব্দে এক ধরনের মোহ থাকে, অতীতমুখী টান থাকে। মঙ্গলজানের নিজেকে হিন্দি সিরিয়ালের ছোট কামিজ পরা নায়িকার মতো লাগে।
ম্যাডামের ছেলেটা আড়চোখে ওর দিকে তাকায়, গা ঘিনঘিন করে। আরো যন্ত্রণা হলো, ম্যাডামের স্বামীও ওকে দেখলে ‘চোলিকা পিছে কেয়া হ্যায়’ সুর তোলে। ঘর  ঝাড়তে ছেলেটার ঘরে ঢুকলে ভয় করে। আবার ভাবে কাজের বাসায় এরকম একটু হয়ই।
টোটার কথা মনে হয়। কী করছে টোটা এখন? নতুন বউয়ের সাথে সংসার টিকলো  তো? গাড়ি চালানোর চাকরিটা আছে? টোটার সঙ্গে মঙ্গলজানের দশ বছরের সংসার ছিল। শেষের দিকে কী যে হলো, প্রায়ই গায়ে হাত তুলতে শুরু করল। বাজার করে  না, রাতে বাসায় ফেরে না, বাচ্চাদের জন্যেও কোনো টান নেই। শেষমেশ একদিন বিকেলে নতুন বউ নিয়ে হাজির।
পাড়ার মুরুব্বিরা এসে বলল, সতীনের ঘর বিলাপ করার মতো ব্যাপার নয়বলল,  মানিয়ে নিতে। সে তখন মূর্খ মেয়ে, সতীনের ঘর ছেড়ে কোথাও যে চলে যাবে, সেটাও অসম্ভব। মঙ্গলজান দু’ বাচ্চা  নিয়ে বাপের বাড়ি হাজিরসবাই হায় হায়  করে উঠল। সেই শোক সপ্তাখানেকের মাঝেই শেষ।  

মঙ্গলজান তার একমাত্র সম্পত্তি শরীরটা নিয়েই ঢাকার পথে পাড়ি জমাল। ভেবেছিল পারবে না এত বড় শহরে এত মানুষের শহরে টিকে থাকতে। কিন্তু  ইতিমধ্যে সে তিন বছর পার করে দিয়েছে। বাড়িতে টাকা পাঠায় নিয়মিত। কাজ ছাড়লে চলবে না।
দুপুরের কাক, ম্যাডামের ছেলের দরজা বন্ধ করে কী যেন করা, ছেলের বিছানার তোষকের নীচে ধারালো চাপাতি, বিকেলের শব্দবিহীন চা, প্রাক সন্ধ্যায় ঢল ঢলানো ম্যাডামের গা মালিশ আর এত মানুষের এত লোভ!
কই, টোটা তাহলে নতুন বউ আনল যে!  
টোটার কথা মনে আসতেই গা গোলাতে শুরু করে। শরীরের মাংসপেশী দুর্বল ঠেকল। হনহন করে ম্যাডামের ছেলের ঘরে গিয়ে হাতের ঝাড়ু ফেলে মঙ্গলজান শীতল চোখে জিজ্ঞেস করে- ভাইজান আমারে কি খুব খারাপ দেখা যায়?



0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন