কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ২২ মে, ২০১৫

অন্তরা চৌধুরী

রবীন্দ্র যাপন




রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নতুন করে রচনা লেখার ইচ্ছে আমার নেই। কারণ সেই ক্লাস টু থেকে লিখে আসছি। তাই তথ্য সমৃদ্ধ লেখা থেকে আপাতত মুক্তি নিয়েছি। গত একমাসে সত্যজিৎ রায় ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমরা বড়ই ব্যস্ত। যদিও এই দুজনকে একই ফ্রেমে বন্দী করার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই।

জানেন, রবীন্দ্র যাপন করতে খুব ইচ্ছে করে। অনেকে বলতেই পারেন যে, ‘কে বার করেছে’? সত্যি কেউ বারণ করেনি। কিন্তু ঠিকঠাক রবীন্দ্র যাপন কি করা সম্ভব? বাঙালি যে শুধু পঁচিশে বৈশাখেই রবীন্দ্র যাপন করে তা হয়তো নয়, প্রায় সারা বছর ধরেই করেসত্যি কথা বলতে কি, রাবীন্দ্রিক হওয়ার একটা আলাদা আভিজাত্য আছে। রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝেই চোখে পড়ে, কোনো এক বঙ্গললনা সুসজ্জিত হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত লেখা শাড়িতে। কাঁধে শান্তিনিকেতনের ব্যাগ। কপালে একটা বেশ বড় সাইজের টিপ, খোঁপায় ফুল। সকলের মাঝে থেকেও কিন্তু সে একটা আলাদা মাত্রা পেয়ে যায়। ব্যাক্তিত্বের সীমারেখার পারদ ক্রমশঃ চড়তে থাকে।

পুরুষরাও রাবীন্দ্রিক হবার ইঁদুর দৌড়ে কোথাও এতটুকু পিছিয়ে নেই। বাটিকের পাঞ্জাবী, মুখে খোঁচা দাড়ি আর ওই শান্তিনিকেতনের ব্যাগ নিয়েও সেও যে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা, যে কোনো উপায়ে তাকে এটা প্রমাণ করতেই হয় আবার  মোবাইলের রিংটোনেও রবীন্দ্রনাথ! হঠাৎ জনৈক সঙ্গীত শিল্পীর কন্ঠে ভেসে উঠল- ‘আমার এ পথ, তোমার পথের থেকে অনেক দূরে গেছে বেঁকে’- বোঝাতে চাইল যে সে প্রেমেও রবি, আবার বিরহেও রবি।
 
অর্থাৎ নিজের একটা আলাদা identity তৈরি করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ আদর্শ ঘরানা   মাঝে মাঝে ভাবি জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত কি আছে, যার জন্য রবি ঠাকুর গান  লিখে যাননি! শুধু রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাফিক কাকুদের জন্য তিনি গান লেখেন নি এইখানে তাঁর কিছুটা দূরদর্শীতার অভাব লক্ষ্য করা যায় না না আমি তাই  বলে দোষ তাঁকে দিচ্ছি না সে ধৃষ্টতাও আমার নেই

এখন তো আবার বাংলা সিরিয়ালে রবীন্দ্রসঙ্গীত নতুন ফ্যাশন বাঙালির শয়নে স্বপনে মননে জাগরণে আনন্দে বিরহে সবেতেই রবি ঠাকুর, একথা আমার আগেও অনেকজন বলেছেন আমি শুধু মহাজন যে পথে করেন গমন

দোলের সময় শান্তিনিকেতন না গেলে যেন সমাজে status নষ্ট হবার একটা ভয় কাজ করে তবে সেটা সকলের নয় সারাজীবনে রবীন্দ্রনাথের একটি কাব্য না পড়লেও কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু ড্রয়িংরুমে রবীন্দ্ররচনাবলী থাকা চাইই আপনার অতি  প্রিয়জনের যে কোনো অনুষ্ঠানে ব্যাকগ্রাউণ্ডে যদি হালকা সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়, তাহলে অতিথিরা আপনার রুচির প্রশংসায় পঞ্চমুখ এমনকি দুর্গা পুজোতেও জলতরঙ্গে  রবিঠাকুরের মিউজিক চালিয়ে পুজো কমিটি পেয়ে যাচ্ছে শ্রেষ্ঠ পরিবেশ মনস্কতার  পুরস্কার

তার মানে নিজেদের ইমেজ ধরে রাখার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ভীষ দরকার কিন্তু রবি ঠাকুরের সমসাময়িক এবং পরবর্তীকালে অনেক নতুন সূর্যের আবির্ভাব হয়েছে কিন্তু তাদের অনেকেরই নিজস্ব ঘরানা থাকলেও বাঙালি সেটা গ্রহ করল না কেন? Sofishticated মনোভাবে কি কোথাও ভাঁটার জন্ম নিয়েছিল? আমরা সাহিত্যের ক্ষেত্রে খুব বড়াই করি, একে অপরের ভুল ধরি তখনই, যদি কারো লেখায় রবীন্দ্র প্রভাব পাওয়া যায় অর্থাৎ তার নিজস্বতা বলে কিছু নেই রবীন্দ্রনাথের লেখার স্টাইল এখন নাকি ‘ব্যাকডেটেড’! নৈব নৈব চ কত বড় বড় ভাষণ শুনতে যে হয়,বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া কিছু বুঝল না তার প্রভাব মুক্ত হতে গিয়ে আধুনিক হবার ম্যারাথনে অংশগ্রহ না করলে আর যাই হোক, কফিহাউসে মুখ দেখানো যায় না কিন্তু জীবনের সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে আবার সেই বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে রবিঠাকুর-

      নদীর বুকে যে যার ডিঙা দে ভাসিয়ে
      জীবন নদী খেয়াল খুশি যায় বয়ে যায়
      কোন সাগরে মিলবে নদী বেলা শেষে
      জোয়ার ভাঁটার খেলা সে পথ বোঝারে দায়

এই মনোভাব সকলের নয়, কারো কারো রবিঠাকুর বলেছিলেন, কমল হীরে পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার কিন্তু শিক্ষিত বাঙালির এই বিদ্যে আর কালচারের মধ্যেই যত ঘাত-প্রতিঘাত নিজেদের ইগো নিয়ে আমরা সদা ব্যস্ত, তাই আপনিও যখন যেমন তখন তেমন, এটাই তো আমাদের আদর্শ, তাই নয় কি?
আবার মাছের তেলেই মাছ ভাজি রবিঠাকুরের কাছে-
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে