ক্যালিডোস্কোপের ভেতর যে মানুষ : মণীন্দ্র গুপ্তের জীবন,
কবিতা ও অক্ষয় মালবেরি
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু কণ্ঠস্বর আছে যারা কখনো উচ্চকিত
হয়নি, কিন্তু তাদের নৈঃশব্দ্য এতটাই গভীর যে সেই নৈঃশব্দ্যের ভেতরে কান পাতলে শোনা
যায় একটা ভিন্ন সুর — এমন সুর যা সমকালীন কোলাহলের মাঝে হারিয়ে যায়নি, বরং সেই কোলাহলের
বিপরীতে নিজস্ব একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। মণীন্দ্র গুপ্ত (১৯২৬–২০১৮) সেই দুর্লভ
কণ্ঠস্বরদের একজন।
পঞ্চাশের দশকে বাংলা কবিতায় যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উচ্ছ্বসিত
রোমান্টিকতা আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রায় দিব্যোন্মাদ আবেগ পাঠককুলকে উদ্বেল করে
তুলছে, যখন হাংরি আন্দোলনের কবিরা ভদ্রলোক-সভ্যতার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলার শপথ নিচ্ছেন,
ঠিক সেই সময়ে মণীন্দ্র গুপ্ত নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন সব আন্দোলন থেকে। কোনো ম্যানিফেস্টোতে
তাঁর স্বাক্ষর নেই, কোনো সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সভায় তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি নেই। অথচ তাঁর
কবিতা ও গদ্য একটি স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করেছে — যে জগতে প্রবেশ করলে পাঠক বুঝতে পারেন,
বাংলা সাহিত্যের মূলধারার পাশে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারা বয়ে চলেছিল।
১৯২৬ সালে অবিভক্ত বাংলার বরিশালের গৈলা গ্রামে মণীন্দ্র গুপ্তের জন্ম।
এই গৈলা গ্রাম আপাতদৃষ্টে একটি সাধারণ স্থাননাম, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই
নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র — এই গৈলা গ্রামই ছিল জীবনানন্দ
দাশের মা কুসুমকুমারী দাশের জন্মভূমি। সুতরাং মাটির স্তরে, ভূগোলের নিরিখে, মণীন্দ্র
গুপ্ত সেই একই মাটির সঙ্গে সংযুক্ত যে মাটি থেকে উঠে এসেছিলেন বাংলা কবিতার সবচেয়ে
রহস্যময় কণ্ঠস্বরটি।
অথচ শ্রী গুপ্তের শৈশব জীবনানন্দের মতো সুস্থির পারিবারিক পরিবেশে
কাটেনি। মাত্র দশ মাস বয়সে মাকে হারান তিনি। মাতৃহীন এই শিশু বড় হয়েছেন পিতামহ-পিতামহীর
কাছে, তারপর মাতামহ-মাতামহীর কাছে, তারপর আসামের বরাক উপত্যকায় মামার বাড়িতে। এই
ঘর-বদলের ধারাবাহিকতা তাঁর জীবনে একটি বিশেষ মানসিক গড়ন তৈরি করেছে — যে মানুষ কোনো
একটি জায়গায় শিকড় গাড়তে পারেনি, কিন্তু প্রতিটি জায়গার মাটির গন্ধ, বৃষ্টির শব্দ,
গাছের ছায়া তার অবচেতনে জমা হয়েছে। পরবর্তীকালে এই জমা স্মৃতিগুলিই হয়ে উঠেছে তাঁর
সৃষ্টির কাঁচামাল।
এই বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা মণীন্দ্র গুপ্তকে আলাদা করে দিয়েছে তাঁর সমকালীনদের
থেকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনী অর্ধেক জীবন-এ লিখেছেন যৌবন পেরিয়ে যাওয়ার
বেদনার কথা — সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট কেন্দ্র আছে, একটি "আমি" আছে যে হারায়
এবং হারানোর জন্য শোক করে। কিন্তু মণীন্দ্র গুপ্তের অক্ষয় মালবেরি-তে সেই "আমি"টিই
যেন কিছুটা অস্থায়ী, যেন স্মৃতির ক্যালিডোস্কোপে ঘুরতে থাকা একটি কাচের টুকরো, কখনো
এক রঙ নিচ্ছে, কখনো আরেক রঙ।
প্রকাশক যখন অক্ষয় মালবেরি-র ভূমিকায় লিখেছেন — "আত্মজীবনী
লিখতে গিয়ে নিজের জীবনকে কেউ দেখে দূরবীনে, কেউ দেখে অনুবীক্ষণের লেন্সের তলায়। মণীন্দ্র
গুপ্ত দেখেছেন নিজের তৈরি এক ক্যালিডোস্কোপে"
— এই বাক্যটি শুধু একটি প্রকাশকীয় প্রশস্তি নয়, এটি সত্যিকার অর্থেই একটি সঠিক সাহিত্যিক
মূল্যায়ন।
বাংলা কবিতার পঞ্চাশের দশক একটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়। দেশভাগের
ক্ষত তখনো তাজা। কলকাতা শহর শরণার্থীতে ভরপুর। ভারতীয় গণতন্ত্রের নতুন স্বপ্ন একদিকে,
অর্থনৈতিক বাস্তবতার নির্মম চেহারা আরেকদিকে। এই দ্বন্দ্বময় পরিবেশে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের
নেতৃত্বে কৃত্তিবাস পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একদল তরুণ কবি বাংলা কবিতাকে একটি নতুন দিকে
নিয়ে যেতে চাইলেন। তাঁদের কবিতায় এলো আমেরিকান "কনফেশনাল পোয়েট্রি"র প্রভাব
— ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যৌনতা, হতাশা, বিদ্রোহ এবং প্রেম নিয়ে সরাসরি কথা বলার সাহস।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আরও তীব্র, আরও আপোষহীন। "অবনী বাড়ি
আছ" থেকে শুরু করে "যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো" পর্যন্ত তাঁর কবিতায়
একটি প্রায়-দিব্য অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে গভীর আত্মদহন। শক্তির কবিতায় ঈশ্বর আছেন,
কিন্তু সেই ঈশ্বর রুষ্ট বা করুণাময় নন — বরং তিনি একটি রহস্যময় উপস্থিতি যাকে কবি
অনুভব করেন নেশার ঘোরে, প্রকৃতির মাঝে, প্রেমের ভেতরে।
এই তিন কবির তুলনায় মণীন্দ্র গুপ্তের অবস্থান নির্ধারণ করতে হলে বলতে
হয় — তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন। সুনীলের কবিতায় যে বহির্মুখী
আবেগ, শক্তির কবিতায় যে তীব্র অন্তর্দহন, বিনয়ের কবিতায় যে অতিরিক্ত বৌদ্ধিক তৎপরতা
— এর কোনোটিই মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় নেই। তাঁর কবিতা যেন একটি শান্ত পুকুরের মতো
— উপরিভাগ নিরুত্তাপ, কিন্তু তলদেশে চলছে একটি গোপন স্রোত।
তিনি "ভাববাদী বা বস্তুবাদী নন, তিনি নাগা-কুকিদের মতো কিছুটা
সর্বপ্রাণবাদী।" এই সর্বপ্রাণবাদ মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতাকে একটি বিশেষ রং দেয়।
তিনি যখন কোনো কিছু নিয়ে ভাবেন, তখন তাঁর কল্পনা চলে যায় মানুষের আদিম অবস্থার দিকে
— শিবপিথেকাস, রামপিথেকাস, পিকিং মানুষ, নিয়ান্ডারথালের ক্ষুধা ও ভয়ের দিকে।
মণীন্দ্র গুপ্ত কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৪০-এর দশকে, কিন্তু তাঁর
প্রথম কাব্যগ্রন্থ নীল পাথরের আকাশ বেরোয় ১৯৬৯ সালে — প্রায় তিন দশক পরে। এই তিন
দশকের নীরবতা কোনো অকর্মণ্যতার চিহ্ন নয়। এটি একটি বিশেষ সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার অংশ।
জীবনানন্দ দাশও জীবদ্দশায় সেইভাবে কবিতা ছাপাতে চাইতেন না। মণীন্দ্র গুপ্তের ক্ষেত্রেও
এই নীরবতাটা একটি সৃষ্টিশীল নীরবতা — যার মধ্যে কবিতা পাকছিল, পরিণত হচ্ছিল।
বাংলা সাহিত্যে আত্মজীবনীর একটি সমৃদ্ধ ধারা আছে। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি
থেকে শুরু করে লীলা মজুমদারের আর কোনোখানে পর্যন্ত এই ধারায় বিচিত্র সব কণ্ঠস্বর।
কিন্তু মণীন্দ্র গুপ্তের অক্ষয় মালবেরি এই ধারার মধ্যে থেকেও একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন
প্রজাতির রচনা। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি একটি মহাপুরুষের আত্মদর্শন — সেখানে শৈশবের
ঘটনাগুলি পরিণত বয়সের দার্শনিক দৃষ্টি দিয়ে ব্যাখ্যাত হয়েছে, সবকিছুই একটি কেন্দ্রীয়
জীবনদর্শনের দিকে ধাবিত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অর্ধেক জীবন অনেক বেশি খোলামেলা, সাহিত্যিক
জীবনের নানা ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের একটি উজ্জ্বল আলোকচিত্র। কিন্তু
মণীন্দ্র গুপ্ত এই দুটি পদ্ধতির কোনোটিই অনুসরণ করেননি।
অক্ষয় মালবেরি আসলে একটি গদ্যকবিতার মতো বই। তিনি নিজেই বলেছেন, এটি
"উপন্যাস নয়, প্রচলিত আত্মজীবনীও নয়, একজন দুঃখী-না সুখী-না মানুষের চিহ্নপত্র।
কাঁচা কঞ্চির কলমে বনের সবুজ কালিতে হোগলার পাতায় লেখা।" এই বাক্যটিতেই লুকিয়ে
আছে বইটির আত্মা। বইটির তিনটি পর্ব তিনটি ভিন্ন কালখণ্ডকে ধারণ করেছে। প্রথম পর্বে
আছে বরিশালের গ্রামীণ শৈশব — যেখানে যৌথ পরিবারের বিশাল অন্দরমহল, নদীময় প্রকৃতি,
নানা ধরনের আত্মীয়ের বৈচিত্র্যময় চরিত্র। মায়ের অনুপস্থিতি এই পর্বে একটি মর্মান্তিক
শূন্যতা তৈরি করেছে, কিন্তু সেই শূন্যতাকে লেখক ক্রন্দনসিক্ত করে উপস্থাপন করেননি।
দ্বিতীয় পর্বে আসামের বরাক উপত্যকায় মামার বাড়ির কৈশোর। নতুন পরিবেশ,
নতুন স্কুল, নতুন বন্ধুত্ব, এবং বইয়ের সঙ্গে এক গভীর প্রেম। শিব্রাম, কোনান ডয়েল,
হেমেন্দ্রকুমার থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, প্রেমেন্দ্র মিত্র — সব গোগ্রাসে
গিলতেন তিনি। এই পাঠাগ্রহের ভেতর দিয়ে তৈরি হচ্ছিল একজন কবির দৃষ্টি।
তৃতীয় পর্বে আছে যুদ্ধকালীন কলকাতা, ক্ষণকালীন কেরানিগিরি, সেনাবাহিনীতে
যোগদান এবং সেনাজীবনের বর্ণময় অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লাহোরের ব্যারাকে
বাংলা যুগান্তর পত্রিকার পুরনো সংখ্যায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের "তেলেনাপোতা আবিষ্কার"
খুঁজে পাওয়ার বর্ণনাটি এই পর্বের একটি অসাধারণ মুহূর্ত।
অক্ষয় মালবেরি-র সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর গদ্যের মান। এ গদ্যে
জীবনানন্দের মতো ঘনত্ব আছে, কিন্তু জীবনানন্দের বিষণ্নতার ভার নেই। বিভূতিভূষণের মতো
প্রকৃতিপ্রীতি আছে, কিন্তু বিভূতিভূষণের সেন্টিমেন্টালিটি নেই। আবার মাহমুদুল হকের
মতো শব্দচাপা ঘনত্ব আছে, কিন্তু সেই গদ্যের মতো অন্ধকার নেই। এটি একটি অনন্য মিশ্রণ।
মণীন্দ্র গুপ্তের একটি বিখ্যাত আত্মোপলব্ধি আছে বইটিতে — "আমি
তখন থেকেই নিজেকে চিনি। আমার মতো মানুষকে দিয়ে কোনো কীর্তি সম্ভবপর নয়। যতটুকু না
হলে নয় ততটুকু... এইভাবে খুদে খুদে হাতে একটু একটু নিয়ে, একটু একটু দিয়ে, পৃথিবীকে
বিরক্ত না করে এতদিন কাটল।
মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় প্রকৃতি এবং মৃত্যু প্রায়ই একসঙ্গে আসে,
কিন্তু সেই মৃত্যু ভয়ের বিষয় নয়, বরং একটি স্বাভাবিক পরিণতির মতো, একটি অনিবার্য
বিলীনতার মতো।
বেলপাতা ও টুপটাপ বৃষ্টির জলের নিচে
চাপা পড়ে আছে শিবলিঙ্গ।
সেই ভিজে পাতার স্তূপের নিচে
দিন : আষাঢ়সন্ধ্যার মতো,
রাত : দেহ-মাটি-হয়ে-যাওয়া বনগর্ভের মতো।
ওখানে, ঐ সম্পূর্ণ অবলম্বনহীনতার
নৈঃশব্দ্যে
আমি শিবলিঙ্গের মতো আছি— শুধু এই
কল্পনাতেই
আমি প্রলয়ের ধারণা পাই।
এই কবিতাটিতে "অবলম্বনহীনতার নৈঃশব্দ্য" কথাটি মণীন্দ্র
গুপ্তের কবিতার চাবিকাঠি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় যে কাতরতা আছে — "কেউ
কথা রাখেনি" — সেখানে একটি প্রত্যাশার বেদনা আছে। কিন্তু মণীন্দ্র গুপ্ত প্রত্যাশার
বাইরে চলে গেছেন। তিনি অবলম্বনহীনতাকে ভয়ের চোখে দেখছেন না, বরং সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে
একটি শান্তির সন্ধান পাচ্ছেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন: "অবনী বাড়ি আছ?" — এই প্রশ্নটি
একটি অস্তিত্বের সংকটের চিহ্ন। মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় এই খোঁজাখুঁজি নেই। তাঁর কবিতায়
পাওয়া ও না-পাওয়ার দ্বন্দ্ব অনেক শান্তভাবে মীমাংসিত — জীবন যা দিয়েছে তাকে নিয়ে
কাজ করো, যা দেয়নি তার জন্য কাতর হয়ো না।
তাঁর ম্লান জীবন কবিতায় এই দর্শনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ:
দিন যায়। পরতে পরতে জমে ধুলো। সে চলে যাবার পর
অর্গানের রীডে— যাকে আমি সুরের পাঁজর বলতাম—
আর কেউ আঙুল রাখে না। না রাখুক আমি বেশ আছি।
বাড়িময় আলস্যের ঘুম-ঘুম ঘোর, আকাঙ্ক্ষারা ফটকের বাইরে থাকে—
বিরক্ত করে না। ঝরা পাতার তলায় ঢাকা এই বাড়ি, এই ম্লান জীবনেরও
একরকম সুখ আছে, একরকম আস্বাদন আছে — আমি বেশ আছি।
এই কবিতায় "আমি বেশ আছি" কথাটা দুবার আসে, এবং এই পুনরাবৃত্তি
কোনো জয়ধ্বনি নয়, বরং একটি শান্ত স্বীকৃতি। বিনয় মজুমদারের কবিতায় যে নিঃসঙ্গতার
আর্তনাদ আছে তার সঙ্গে এই কবিতার তুলনা করলে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিনয় তাঁর
নিঃসঙ্গতাকে বহন করতে পারেননি। মণীন্দ্র গুপ্ত সেই একই নিঃসঙ্গতাকে একটি বাসস্থান হিসেবে
গ্রহণ করেছেন।
তাঁর কবিতায় একটি বিশেষ ছবির ব্যবহার বারবার আসে — ছোটবেলায় নামতা
লেখার স্লেটে পরীর গল্প লেখার ছবি:
নামতা
লেখার স্লেট পেয়েছি সেই কবে কোন্ ছেলেবেলায়;
ভুল
করে নীল পরীর গল্প মকশ করেছিলাম তাতেই
বাড়ির
সবাই ঘুমোলে পর ঘর-পালিয়ে দুপুরবেলায়।
নামতাগুলো
সব মুছেছে ঘুরতে-ফিরতে হাতে হাতেই;
পরীর
সেই গল্পটাই শুধু নৌকো হয়ে যাচ্ছে ভেসে
বিকেলে
লাল মেঘের তলায়—
এই কবিতায় নামতা অর্থাৎ বাস্তবের নিয়মকানুন মুছে গেছে, কিন্তু পরীর
গল্প — অর্থাৎ কল্পনা, স্বপ্ন, সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ — টিকে আছে। এটি একটি রূপক
যা মণীন্দ্র গুপ্তের সমগ্র জীবনবোধকে ধারণ করে।
মণীন্দ্র গুপ্ত শুধু কবি নন, তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ গদ্যলেখকও। তাঁর
প্রবন্ধগ্রন্থ চাঁদের ওপিঠে (১৯৯১) বাংলা সাহিত্য-সমালোচনায় একটি ভিন্নধর্মী সংযোজন।
বইটির নামেই তাঁর দার্শনিক অবস্থান স্পষ্ট — চাঁদের আলোকিত পিঠ নয়, তিনি দেখতে চান
অন্ধকার পিঠটিকে।
এই প্রবন্ধগ্রন্থে তিনি বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে
আলোচনা করেছেন, কিন্তু সেই আলোচনা কোনো প্রচলিত একাডেমিক সমালোচনার ছাঁচে ঢালা নয়।
তাঁর প্রবন্ধে আছে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি — যে দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণের
চেয়ে অনুভবকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এই দিক থেকে তুলনা টানা যায় বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন
বাংলার একজন অগ্রগণ্য সাহিত্য-সমালোচক যিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক এবং প্রবন্ধকার।
তাঁর কালের পুতুল বা রবীন্দ্রনাথ: কথাশিল্পী জাতীয় রচনায় একটি উৎকৃষ্ট বিশ্লেষণী
মন কাজ করেছে। মণীন্দ্র গুপ্তের প্রবন্ধে সেই বিশ্লেষণী তৎপরতা অনেক কম, কিন্তু একটি
স্বতন্ত্র অন্তর্দৃষ্টির শক্তি অনেক বেশি।
সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও মণীন্দ্র গুপ্তের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। পরমা
পত্রিকার সম্পাদনা এবং রঞ্জিত সিংহের সঙ্গে মিলে এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন প্রকাশ
ছাড়াও তিনি তিন খণ্ডে সংকলিত করেছেন আবহমান বাংলা কবিতা — হাজার বছরের বাংলা কবিতার
একটি ব্যাপক সংকলন। এই কাজটি কেবল একজন পরিশ্রমী সম্পাদকের কাজ নয়, এটি একজন মানুষের
বাংলা কবিতার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার প্রকাশ। ২০১০ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার, ২০১১ সালে
সাহিত্য আকাদেমি — মণীন্দ্র গুপ্ত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন, কিন্তু অনেক দেরিতে।
আটের দশকের কোনো পাঠক যদি জিজ্ঞেস করতেন বাংলা কবিতার প্রধান কণ্ঠস্বর কে, তাহলে বেশিরভাগ
উত্তরে সুনীল, শক্তি, বিনয়ের নাম আসত। মণীন্দ্র গুপ্তের নাম আসত অনেক পরে, বা আসতই
না।
এই বিস্মৃতির কারণ হলো তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। তিনি কোনো গোষ্ঠীর
সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, কোনো বিতর্কে জড়াননি, কোনো আন্দোলনের মুখ হননি। সাহিত্যিক সুপরিচিতির
জন্য অনেক সময় এই ধরনের দৃশ্যমানতা দরকার হয়। মণীন্দ্র গুপ্ত ছিলেন নিভৃতচারী।
আরেকটি কারণ তাঁর কবিতার প্রকৃতি। তাঁর কবিতা সহজে আবৃত্তিযোগ্য নয়।
শক্তির "অবনী বাড়ি আছ" বা সুনীলের "কেউ কথা রাখেনি" — এই কবিতাগুলির
একটি তাৎক্ষণিক আবেদন আছে। মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা ধীরে ধীরে কাজ করে, অনেকটা মাটির
নিচে জলের মতো যা উপরে দেখা যায় না কিন্তু সবকিছুকে সিঞ্চিত করে।
কিন্তু বিচিত্র এক পরিণাম এখানে। যে অক্ষয় মালবেরি ১৯৯১ সালে প্রথম
প্রকাশিত হয়েছিল, সেই বইটি আজ পাঁচ শতাধিক পাঠক রেটিং করেছেন, গড় রেটিং ৪.৫৫ — এটি
অত্যন্ত উঁচু স্কোর। বইটি পড়া মানুষেরা এক ধরনের অদ্ভুত নেশার কথা বলেন — যে নেশা
থেকে বেরোতে ইচ্ছে করে না, যে নেশা মনে করিয়ে দেয় নিজের শৈশবের কথা, নিজের হারানো
দিনগুলির কথা।
এটি এমন একটি বইয়ের লক্ষণ যা হয়তো প্রকাশের সময় সেইভাবে আলোচিত
হয়নি, কিন্তু ধীরে ধীরে, পাঠক থেকে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে, একটি গোপন ক্লাসিকের
মর্যাদা পেয়েছে। এই মর্যাদাটি প্রচারের ফল নয়, পাঠকের অভিজ্ঞতার ফল।
২০১৮ সালে মণীন্দ্র গুপ্তের মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। দীর্ঘ
এই জীবনে তিনি দেখেছেন অবিভক্ত বাংলার শেষ দিনগুলি, দেশভাগ, স্বাধীনতা, বাংলাদেশের
জন্ম, বৈশ্বিক রাজনীতির নানা উথালপাতাল। কিন্তু এই ঘটনাক্রমের ভেতরেও তিনি নিজের একটি
ছোট্ট জগৎ বজায় রেখেছিলেন — যে জগতে বৃষ্টির শব্দ শোনা যায়, বেলপাতার গন্ধ পাওয়া
যায়, মেঘের রং বদল দেখা যায়। তাঁর কবিতা ও গদ্য আজকের পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক কারণ
সেগুলো মানুষের অভিজ্ঞতার এমন একটি স্তরকে স্পর্শ করে যে স্তর কখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়
না — স্মৃতির স্তর, শৈশবের স্তর, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের স্তর, এবং নিজেকে নিয়ে একটি
শান্ত কৌতূহলের স্তর।
তিনি কখনো বলেননি তাঁর কবিতা মহান, কিন্তু সেই কবিতা টিকে আছে। মালবেরি
গাছে ফল পাকে, ঝরে যায়, আবার আসে — কিন্তু গাছ থাকে। অক্ষয় এই গাছটি।
মণীন্দ্র গুপ্তকে পড়লে বোঝা যায় বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ
সত্য — মহান সাহিত্য সবসময় উচ্চকণ্ঠে আসে না। কখনো কখনো সে আসে খুব নিচু স্বরে, প্রায়
ফিসফিস করে, যেন কেউ একা একা কথা বলছে নিজের সঙ্গে। সেই ফিসফিসানি শুনতে হলে কান পেতে
থাকতে হয়, ধৈর্য রাখতে হয়।
সুনীলের কবিতা পড়লে মন উত্তাল হয়, শক্তির কবিতা পড়লে মন দীপ্ত হয়,
জীবনানন্দের কবিতা পড়লে মন অন্তর্মুখী হয়। মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা ও গদ্য পড়লে একটি
বিশেষ অনুভূতি হয় — মনে হয় কোথাও একটা পরিচিত কিছু আছে যেটা অনেকদিন ভুলে গিয়েছিলাম।
সেই পরিচিতি শৈশবের, প্রকৃতির, এবং নিজের সঙ্গে নিজের মেলামেশার।
তাঁর ক্যালিডোস্কোপ ঘোরে, আর প্রতিটি ঘূর্ণনে তৈরি হয় একটি নতুন ছবি
— যে ছবি একসঙ্গে পরিচিত এবং অজানা, একসঙ্গে সুন্দর এবং বিষণ্ণ, একসঙ্গে ক্ষণিক এবং
— যেমন বইটির নামে আছে — অক্ষয়।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন