কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

পি.শাশ্বতী

 

রাঢ়বাংলার গাজন

 


(শেষ অংশ)

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা

বাংলার গ্রামীণ মাটিতে এখানে-ওখানে বাবা ভোলামহেশ্বররে আরাধনা নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে বাংলা মায়ের কোলে এই মহাদেব শিবের উপাসনা একটি প্রাচীন প্রথা। আর তাই তো তাঁর নামে গড়ে উঠেছে একটির পর একটি জনপদ। এমনকি গ্রামবাংলার শিবমাহাত্ম্যে জাগ্রত কোনো গ্রামের অসংখ্য সদ্যোজাত পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় বাবা ভোলনাথেরই কোনো না-কোনো বিকল্প নামের সঙ্গে মিলিয়ে। যেখানে মহাকালের স্রষ্টাকে কেবলমাত্র মন্দিরের বিগ্রহ হিসাবেই দেখা হয় না, সমাজের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে তিনি পূজিত হন।

তেমনই একটি বিগ্রহের মন্দির আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা অঞ্চলে সত্যপুর বা মাড়তলা গ্রামে। সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর এই মন্দিরটি এমনই এক আধ্যাত্মিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। জনশ্রুতি আছে যে, এই মন্দিরের মহিমা ও 'সত্যের' শক্তির কারণেই এই জনপদটি 'সত্যপুর' নামে পরিচিতি লাভ করেছে। জনপদ হিসাবে বাংলার বুকে অতি প্রাচীন স্থান 'মাড়তলা'র এই মন্দিরটি আজও মধ্যযুগীয় স্থাপত্যরীতি এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের গাজন উৎসব রাঢ়বাংলা তো বটেই, গোটা বাংলাতেই একটি বিরলতম ঐতিহ্যের মিশ্র ধর্মীয় উৎসব। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব বা অনুষ্ঠান হিসাবে নয়, সুপ্রাচীনকাল থেকেই এটি লোকসংস্কৃতি এবং হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মানুষের অটুট বিশ্বাসের এক মিলনমেলা। যতদূর জানা যায়, রাজা মুকুট নারায়ণের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছিল এই উৎসব। ন্যায়পরায়ণ রাজা এই উৎসবের মূল মন্ত্র হিসাবে স্থাপন   করেছিলেন 'সত্যের জয়গান'। যা আজও এই জনপদের মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। তীব্র বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যখন ঢাকের গুরুগম্ভীর আওয়াজে মাড়তলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের সমাগম প্রমাণ করে এই উৎসবের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন রূপ।

গাজন সন্ন্যাসীদের কঠোর ত্যাগ ও কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে দিয়ে যেমন পালিত হয় গাজন উৎসব, তেমনই এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বসে যায় বর্ণাঢ্য গ্রামীণ মেলার আসর—সব মিলিয়ে সত্যেশ্বরের এই বৈশাখী গাজন মেদিনীপুরের লোকায়ত সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল, যা যুগ যুগ ধরে ভক্ত হৃদয়ে ভক্তি ও ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন রচনা করে চলেছে।

স্থানীয় জনশ্রুতি এবং বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে সত্যেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস। ভারতের আরও অনেক শিব ক্ষেত্রের মতোই এখানকার শিবলিঙ্গটিও 'স্বয়ম্ভু' লিঙ্গ। অর্থাৎ যে লিঙ্গ মাটি ফুঁড়ে নিজে থেকেই আবির্ভূত হয়েছেন। এই বঙ্গের মহাপীঠ তারকেশ্বর বা বীরভূমের অজয় নদীর তীরে এক প্রাচীন শিবলিঙ্গের উদ্ভবের সঙ্গে এই লিঙ্গের উদ্ভবের ইতিহাসও একই সূত্রে গাঁথা। বহু বছর আগে এই অঞ্চলটি যখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল, তখন এক গোয়ালা লক্ষ করেন যে, তাঁর একটি গাভী প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট ঝোপের মধ্যে গিয়ে তার দুধের বাট থেকে অবিরাম বিশেষ একটি জায়গায় দুধ ঝরিয়ে দিচ্ছে।  পর পর কয়েক দিন এই একই দৃশ্য দেখার পর তিনি কৌতূহলী হয়ে গ্রামবাসীদের সেখানে ডেকে আনেন। গ্রামবাসীরাও দূর থেকে ওই একই ঘটনা লক্ষ করে জায়গাটি খনন করলে এই শিবলিঙ্গটি খুঁজে পান। এই ঘটনাকে তাঁরা মহাদেবের অলৌকিক কৃপা বলে বিশ্বাস করে নেন। তাঁদের আরও বিশ্বাস জন্মে যে, বাবা ভোলামহেশ্বর গ্রামবাসীদের সব রকম বিপদাপদ থেকে রক্ষা করতেই এই জঙ্গলে আবির্ভূত হয়েছেন।

সেই সময় গড়কিল্লার মুকুট নারায়ণ ছিলেন এই অঞ্চলের একজন ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাবৎসল রাজা। তিনি এই খবর শোনামাত্র নিজে সেই জঙ্গলে গিয়ে এই অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে বিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি এবং সমস্ত গ্রামবাসী মহাদেব মহেশ্বরের অশেষ করুণা লাভ করেছেন বলে প্রচার করে দিয়ে এই জায়গায় একটি মন্দির তৈরির নির্দেশ দেন। ইতিহাস অনুযায়ী তাঁর রাজত্বকালে সময় ছিল ষোড়শ শতাব্দীতে। ফলে সেই হিসাব অনুযায়ী সত্যেশ্বর মহাদেবের মন্দিরটি ওই সময়ই  গড়ে উঠেছিল। যদিও অন্য একটি মত অনুযায়ী রাজা স্বপ্নদেশ পেয়ে বা অলৌকিক কোনো ঘটনার সাক্ষী হয়ে এই 'স্বয়ম্ভু' লিঙ্গটির ওপর মন্দির তৈরি করেন। সে যাইই হোক, নবরত্ন আকৃতির নির্মাণশৈলী অনুযায়ী এই প্রাচীন শিব মন্দিরটির বর্তমান বয়সকাল প্রায় ৬০০ বছর।

সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের গাজন উৎসবের রীতিনীতি রাঢ়বাংলার অন্যান্য জায়গার  থেকে কিছুটা পৃথক বলেই মনে করা হয়। সন্ন্যাসী ও ভক্তাদের ভক্তিভরে সমস্ত আচার মেনে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন তো আছেই, সেই সঙ্গে এই মন্দিরে নয় ভোগের ব্যবস্থা প্রচলিত। তাই এই মন্দিরকে নয় ভোগের মন্দিরও বলা হয়। প্রতিবছর বিভিন্ন জায়গা থেকে শয়ে শয়ে 'সন্ন্যাসী' বা 'ভক্ত্যা' এই গাজন উৎসবে যোগ দেয়। প্রতিদিন ভোরে স্থানীয় জলাশয়ে উত্তরমুখী হয়ে স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে মন্দিরের গর্ভগৃহ পর্যন্ত 'দণ্ডী কাটা' বা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানানো এই উৎসবের এক আবশ্যিক রীতি। গাজন উৎসবের সূচনা হয় পুকুরে ঘট ডুবিয়ে একটি মাগুর মাছ বলি দিয়ে দুর্গাপুজোর মাধ্যমে।  গাজনের শেষ দিন‌ও মাগুর মাছ বলি দেওয়া হয়। মূল উৎসবের রাতে 'মাড়তলা' প্রাঙ্গণে ঢাকের বাদ্যি ও ধূপের ধোঁয়ায় উন্মত্ত হয়ে সন্ন্যাসীরা শিব-পার্বতীর মহিমা গেয়ে 'বোলান' নৃত্য পরিবেশন করেন। এই নৃত্য দেখার জন্য দূর দূর প্রান্তের মানুষেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।

এখানকার গাজন উৎসবের সূচনা কিন্তু অন্যান্য গাজন উৎসবের সূচনা তারিখের মতো নয়। এখানে বৈশাখ মাসের ২১ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। একেবারে   শেষ দিনে হয় ‘জলঢালা’ উৎসব পালন । তবে চৈত্রসংক্রান্তির আগে নির্দিষ্ট নীলপূজার দিন‌ও জলঢালা উৎসবটি পালন করা হয়। এই দু-দিন ছাড়া অন্য কোনো দিন ভক্তরা সরাসরি শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে পারেন না। তখন জল ঢালতে হলে পুরোহিতদের হাত দিয়েই বাবার মাথায় জল ঢালতে হয়। রাজা মুকুট নারায়ণের সময়কাল থেকেই এই নির্দিষ্ট সময়ে উৎসব পালনের রীতি চলে আসছে বলে মনে করা হয়।

রাজা মুকুট নারায়ণের সময় থেকে আজও পর্যন্ত এই এলাকার মানুষের কাছে সত্যেশ্বর মহাদেব একজন 'জাগ্রত বিচারক'। প্রচলিত জনশ্রুতি— প্রাচীনকালে গ্রামে কোনো চুরি বা বিবাদ হলে অভিযুক্ত মানুষটিকে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য স্বীকার করে নিতে হত। যদি সে সত্যিই নির্দোষ হত, তাহলে তার গায়ে আঁচড়টি পড়ত না। কিন্তু যদি কেউ দোষী হওয়া সত্ত্বেও মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে, তৎক্ষণাৎ তার রক্তবমি শুরু হয়ে যেত। শুধু তাই নয়, সত্যেশ্বর শিবের ভয়ে সেই সময় চোর-ডাকাতরা পর্যন্ত সত্যপুর গ্রামে ঢুকতে সাহস পেত না। আজ যদিও সময় বদলেছে, মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের বিভাজন হয়েছে, তাই হয়তো সেদিনের মতো হাতে হাতে ফল পাওয়া যায় না, কিন্তু গ্রামবাসীদের বিশ্বাস— সত্যেশ্বর শিবকে অস্বীকার করলে আজও তার যথাযথ ফল পেতে হয়।

এখানকার মন্দির সম্পর্কে আরও একটি অলৌকিক ঘটনার কথা আজও লোকমুখে শুনতে পাওয়া যায়। এক সময় মন্দিরের সেবাইতরা পুজোর জন্য একটি বিশেষ তামার ঘড়া ব্যবহার করতেন। জনশ্রুতি আছে, মহাদেবের কৃপায় সেই ঘড়ার জল কখনোই নাকি শেষ হত না।

বৈশাখী গাজনের সময় যখন প্রথা অনুযায়ী সন্ন্যাসীরা আগুন বা কাঁটার উপরে ঝাঁপ দেন, তখন তাঁরা সকলেই অক্ষত থাকেন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস যে, মহাদেবের আশীর্বাদেই এটা হয়।

বৈশাখ মাস থেকেই প্রকৃতির বুকে নেমে আসে যে দাবদাহ— জ্যৈষ্ঠে সেই দহন হয়ে ওঠে অসহনীয়। বৃষ্টির যদি দেখা না পাওয়া যায় এলাকার পর এলাকার মাঠঘাটের মাটি হয়ে যায় ফুটিফাটা। তাই প্রকৃতির সেই  অকৃপণ আচরণ শুরু হওয়ার আগে মহাদেবের কৃপা প্রার্থনা করে বৃষ্টির কামনায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।

এই গাজন সম্পর্কে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। গাজনের সন্ন্যাসীদের মধ্যে প্রধান হলেন ‘পাটভক্ত্যা’। এই  পাটভক্ত্যা কিন্তু যে-কোনো মানুষ হতে পারেন না। মূলত প্রতিবছর গড়কিল্লার মাইতি পরিবার, দেউল ভোক্ত্যা সত্যপুরের পন্ডিত পরিবার ও কোটাল ভোক্ত্যা সী পরিবার থেকেই পাটভক্ত্যা হন।

এবার আসা যাক সত্যপুর মাড়তলার  গাজনকে কেন্দ্র করে যে মেলার আয়োজন হয় তার আঙ্গিক ও জাঁকজমক নিয়ে কিছু কথয়। এই মেলাটি কেবল একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়, এটি কয়েক শতাব্দীর বিবর্তনশীল ইতিহাসের এক জীবন্ত লোকইতিহাস। এই মেলার প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা মুকুট নারায়ণের রাজকীয় ঐতিহ্যও। মধ্যযুগের শেষভাগে রাজা মুকুট নারায়ণের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই মিলনমেলাটি ক্রমেই বিস্তার, আয়তন এবং গুরুত্বে বিশাল আকার ধারণ করে। এটি একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক মেলা হলেও এখানে পার্শ্ববর্তী ওড়িশা রাজ্য ও বাঁকুড়া জেলার সীমান্ত থেকেও বণিকরা আসতেন ব্যবসার প্রত্যাশায়। প্রতিবছর রাজা মুকুট নারায়ণ  নিজে এই মেলার উদ্বোধন করেন। সেই সময় মেলার মূল আকর্ষণ ছিল বাঁশ ও বেতের নিপুণ হস্তশিল্প, মাটির তৈরি পুতুল, হাঁড়ি-কুড়ি, নানা রকমের খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি। রাতে শুরু হত হ্যারিকেন বা লণ্ঠনের আলোয় কবিগান, বোলান গান এবং নানা রকম পৌরাণিক পালাগান— যা গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল।

সময়ের সাথে সাথে মেলার চরিত্র আমূল বদলে গেছে। এখন এই মেলা কলকাতার আধুনিক ও বাণিজ্যিক মেলার মতোই রূপ ধারণ করেছে। ফলে এখন শুধুমাত্র ডেবরা নয়, গোটা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্যতম বড় মেলায় পরিণত হয়েছে। মেলার পরিসর ও সময়ও বেড়েছে অনেক। বর্তমানে একমাস ধরে চলে এই মেলা। পুরোনো দিনের সেই কবিগান, পালাগানের জায়গায় থাবা বসিয়েছে নামীদামি শিল্পীদের নিয়ে বিচিত্রানুষ্ঠানের আসর। পাশাপাশি আধুনিক যাত্রা ও লোকসংগীতের আয়োজনও।থাকে। তবে এত পরিবর্তনের মাঝেও মেলার সেই সর্বধর্ম ও সত্যের মহিমার আত্মিক সুরটি আজও প্রবাহমান।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন