কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য


 

(৯)

উরুক্ষিতৌ

আশুদা ইদানিং প্রতিদিন সকালে বেদবেদান্ত নিয়ে বসে। গতকাল অনন্তপুর পৌঁছোতে আমাদের বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা রাতে একটা স্বল্পদামের হোটেলে থেকে আজ সকালে মহেন্দ্র নাইডুর খোঁজে বের হবো ঠিক করেছিলাম। রাতে থাকা খাওয়ার বন্দোবসাত জগৎ আর সাদিকই করল। ওদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, মহেন্দ্রর ক্লিনিকটা অনন্তপুর রেলস্টেশনের কাছাকাছি। কী আছে সেই 'মেনতেনু ক্লিনিক'এ কে জানে যার টানে শুভায়ু সবাইকে লুকিয়ে কলকাতা থেকে ছুটে আসত। আশুদা বলেছিল, এই 'মেনতেনু' আসলে প্রাচীন মিশরীয় হাইরোগ্লিফিক একটি শব্দ। প্যাপিরাস থেকে 'ট্যাটু'র প্রতিশব্দ হিসেবে এই শব্দ মেলে। মিশরের রাজাদের হাতে যখন 'আইসিস' আর 'নেপথিস' এর উল্কি কাটা হত, তখন প্যাপিরাসে সেই পদ্ধতিকে বলা হত 'মেনতেনু'।এই শব্দ অনুবাদ করলে হবে 'অনুলিখিত' বা 'খোঁদাই করা'। আশুদা চায়ে চুমুক দিতে দিতে হোটেলের জানলার বাইরে ট্রেনের আসাযাওয়া দেখতে দেখতে বলল, "আমরা একটা বিস্তৃত যজ্ঞগৃহে ঢুকে পড়েছি, বুঝলি অর্ক। বিস্তৃত, কারণ এই ট্যাটুর ইতিহাস সুবিস্তৃত। সেই প্রাচীন পলিনেশিয়া থেকে হাল আমলের থাইল্যাণ্ড ভারত সামোয়া। এই বিস্তীর্ণ যজ্ঞগৃহে শুভায়ু দের মতো দেবতাদের স্তুতিবন্দনা করছি আমরা। ঋকবেদের পঞ্চম অধ্যায়ে জগতী ছন্দে বললে সেই শ্লোক হবে, কৃধী নো অদ্য বরিবঃ স্বস্তিমদুরুক্ষিতৌ গৃণীহি দৈব্যং জনম।"

অনন্তপুর অন্ধ্রপ্রদেশের একটি ব্যস্ত শহর। তার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে রেলস্টেশনটি। জগৎ আর সাদিক জায়গাটা চেনে। তারা আমাদের সরাসরি নিয়ে গেল মহেন্দ্র নাইডুর ক্লিনিকে। মাঝারি আকারের দো তলা বাড়ি। সাইনবোর্ডে ক্লিনিকের নাম ছাড়াও মহেন্দ্রর নাম লেখা। একতলার কাঁচের দরজা পেরিয়ে অপেক্ষাগৃহ। সেখানে বসে আছেন বেশ কয়েকজন মধ্য ও বৃদ্ধ বয়সের মানুষ। এই বয়সেও ট্যাটু করবার প্রবণতা দেখে চমৎকৃত হলাম। আমাদের ওয়েটিং রুমে বসিয়ে জগৎ ভিতরে কথা বলতে গেল। সেই সময়ে আমি লক্ষ্য করলাম, এই ক্লিনিকে কাজকর্মের পদ্ধতি বেশ অন্যরকম! প্রথমে মানুষগুলিকে একটা প্রশ্নোত্তরের কাগজ ধরানো হচ্ছে। সেটা পুরণ করে জমা দেবার পর তাদের ডেকে নেওয়া হচ্ছে কনসালটেশন রুমে। অনেকটাই ডাক্তারি পলিক্লিনিকের মতো। সেখানে তাকে একটি বিশেষ প্রেসক্রিপশন করে দেওয়া হচ্ছে যেটা নিয়ে তাঁরা  উপরের তলায় চলে যাচ্ছেন। সেখানে ট্যাটু করবার পর একটা ফলো আপ তারিখ দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশ খানিক এইসব দেখতে থাকার পর আমাদের ডাক পড়ল। আমরা এগিয়ে গেলাম কনসালটেশন রুমের দিকে। সেখানে একজন মধ্যবয়স্ক ফর্সা গোলগাল মাথায় তিলক লাগানো লোক  বসে। প্রণাম করে বলল, তাঁর নাম মহেন্দ্র নাইডু। আমাদের তিনি বসতে বলে হিন্দিতে আমাদের আসবার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আশুদা সরাসরি শুভায়ুর একটি ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, সে এখানে এসেছিল কিনা। মহেন্দ্র ঘাড় নেড়ে হেসে বলল, এসেছিল। তারপর সে কম্পিউটারে এন্ট্রি লিস্ট দেখতে বসল। সেখানে শুভায়ুর নাম বেশ কয়েকবার আছে। কিন্তু আরও চমকে দিল আমাদের সেই তালিকা! তালিকায় শুভায়ু দে ছাড়াও রয়েছে নবনীতার নাম। আরও একটা নাম আছে যা আমাকে একেবারেই অপ্রস্তুতে ফেলে দিল। অলোকেশ দত্ত! তার মানে অলোকেশ আমাদের কাছে সবকিছু খুলে বলেনি। অনেক কিছুই গোপন করেছে! কিন্তু কেন? তবে কি সেও এই হত্যাকাণ্ডর সঙ্গে জড়িত? এইসব ভাবনার ফাঁকেই আশুদা মহেন্দ্রকে জিজ্ঞেস করল 'মেনতেনু ক্লিনিক'এর কথা। মহেন্দ্রর বাবা ছিলেন একজন গ্রামীণ ডাক্তার। মহেন্দ্রর বাবা পেশা গ্রহণ না করে এই ক্লিনিক খোলে কুড়ি বছর আগে। এখন এই ক্লিনিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসে।

-ক্যায়া খাস হ্যায় ইস ক্লিনিকমে?

আশুদার এই প্রশ্নে মহেন্দ্র সামান্য হেসে ডেস্কটপটা আমাদের দিকে ঘুরিয়ে বলল,"আপকো দিখাতা হুঁ।দেখিয়ে।"আমরা সেই ডেস্কটপে প্রেজেন্টেশন দেখতে লাগলাম। ক্রমে স্পষ্ট হল, মেনতেনু ক্লিনিক শুধুই একটি ট্যাটু পার্লার নয়। সত্যিই মহেন্দ্রর এই পার্লার একটা ডাক্তারি পলিক্লিনিকের মতো!

মহেন্দ্রর সঙ্গে কথা বলতে বলতে ট্যাটুজগতের এক অজানা পৃথিবীর দরজা খুলে গেল আমার সামনে। মহেন্দ্রর এই ট্যাটু পার্লার শুধুই প্রসাধনের জন্য বা বিনোদনের জন্য খোলা হয়নি। মেনতেনু ক্লিনিক ট্যাটুর মাধ্যমে রোগের চিকিৎসা করে! এককথায় বলা যায়, মেনতেনু ক্লিনিক আসলে একটা 'ট্যাটুথেরাপি ক্লিনিক'। প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ অসুখ সারাতে ট্যাটুর ব্যবহার করে এসেছে। কখনও সেই ব্যবহার্য ট্যাটু হয়ে উঠেছে কোনও অশরীরী অশুভ আত্মার থেকে সেই মানুষটিকে রক্ষা করার কৌশল। আবার কখনও নিঁখুত দক্ষতায় সেই ট্যাটু ব্যবহার করা হয়েছে নির্দিষ্ট রোগ সারাবার জন্য। সাধারণত এই ধরণের চিকিৎসার প্রমাণ ঐতিহাসিকরা সেন্ট লরেন্স দ্বীপপুঞ্জে একাধিক ক্ষেত্রে পেয়েছেন। সেখানে বক্ষাস্থির উপর উল্কি করা হতো হৃদরোগ সারাবার জন্য। চোখের উপর কালো দাগ দেওয়া হতো দৃষ্টিশক্তি উন্নতিসাধনে। যিনি এগুলি করতেন, তার নাম দেওয়া হতো 'শামান'। কখনও তিনটি বিন্দুর ত্রিকোণ আরোগ্যর চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কখনও ট্যাটুর সময় বেরিয়ে আসা রক্ত ধরে নেওয়া হতো 'অশুভরক্ত'। এই অশুভরক্ত ব্যাধির কারণ। তাই তাকে বের করে আরোগ্য দেবার প্রথা ছিল। কখনও কখনও কামশক্তি বাড়িয়ে তুলতেও ট্যাটুর ব্যবহার করা হতো। মহেন্দ্র ট্যাটুথেরাপির সেই প্রাচীন তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে এই মেনতেনু ক্লিনিক খুলেছে। নবনীতা সেখানে এসেছিল বাতের সমস্যা নিয়ে। এই উল্কিচিকিৎসকদের একাংশের ধারণা, শরীরে দুষ্ট রোগ প্রবিষ্ট হয় নানান অস্থিসন্ধি বা গাঁটের ফাঁক দিয়ে। নবনীতার চিকিৎসা যখন অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতিতে আশাপ্রদ হলো না, হয়তো তখনই তিনিও তখন শুভায়ুর সঙ্গে এখানে এসেছিল।

-রিউমাটয়েড আর্থরাইটিস। নবনীতার হাতের গরণ আর চলার ভঙ্গিমা দেখে প্রথম দিনই আমার সন্দেহ হয়েছিল।

আশুদা মহেন্দ্রর কথা শুনতে শুনতেই আপনমনে বলল। তারপর অলোকেশের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে মহেন্দ্র একটু কুণ্ঠিত হয়ে বলল,"উয়ো হাম আপকো নেহি বাতাতে।ইয়ে সাব কনফিডেনশিয়াল হ্যায়। লেকিন আপলোগ পুলিশকে আদমি হো। ইস লিয়ে বাতা দিয়া।"

অলোকেশ দত্তর সমস্যা তার যৌনাঙ্গে। কতো বিচিত্র এই মানবমন। কে বলবে কলকাতার এই বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিজের চিকিৎসা পরীক্ষিত পদ্ধতিতে না করে অপ্রচলিত এই ট্যাটুথেরাপির শরণাপন্ন কেন হলেন। কিন্তু এই গোপনীয়তা কেন? মহেন্দ্র হেসে বলল।

-হাম বাতানে কে লিয়ে মানা কিয়ে থে। বাতানে সে ইয়ে থেরাপি কাম নেহি কারতা।

-উয়ো কিঁউ?

মহেন্দ্র রহস্যময় হেসে বলল,"যো আনজান প্রেতাত্মা ইয়ে সব বিমারি ঘটাতে হ্যায়, উসকে খিলাপ ইয়ে সিম্বল লোগোকো বলনে সে কাম নেই করতে!"

একরাশ বিস্ময় নিয়ে আমরা মেনতিনু ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে এলাম। শুভায়ু এই ক্লিনিকে এসেছিল তার অসুখ সারাতে। অ্যালোপ্যাথির ওপর তার বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। আশুদা জিজ্ঞেস করেছিল, শুভায়ু তার শরীরে কোন ট্যাটুচিহ্ন আঁকবে বলেছিল।উত্তরে মহেন্দ্র চিহ্নটা দেখালো। আপাতভাবে সেই চিহ্নটা 'ঘোড়ার নাল'এর মতো। মহেন্দ্র বলল,এই চিহ্ন শুভায়ু তার পিঠির ওপর এঁকেছিল। আশুদা দেখে গম্ভীর হয়ে বলল,"ইন্টারেস্টিং"।

গাড়িতে বসে আশুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা, শুভায়ু ওই অশ্বক্ষুরের উল্কি আঁকাতে কলকাতা থেকে অনন্তপুর উড়ে এল কেন? ইচ্ছে করলেই তো ওই নকশাটা আসিফ এঁকে দিতে পারত!"

আশুদা হেসে বলল,"তুই মহেন্দ্রর কথাগুলো ঠিক মতো ফলো করিসনি। ও কী বলল শুনলি না? 'প্রেতাত্মা'। এই 'শামান' বা উল্কিচিকিৎসকরা কেউ সাধারণ মানুষ নয়। উল্কির চিকিৎসাটা খানিকটা শরীরে, আর অনেকটাই অবচেতন মনে। যন্ত্রণা সহ্য করার ভিতর যে রেসিলিয়েন্স, সেটা উল্কি শেখায়। অর্থাৎ সহজভাষায় ধৈর্যশক্তি আর সহনশীলতা। এই চিহ্ন কে আঁকছে, কখন আঁকছে, কোথায় আঁকছে, সবকিছুই ট্যাটুথেরাপিবিশ্বাসীর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া মহেন্দ্ররা যে রঙ ব্যবহার করে ট্যাটু আঁকে তা ভেষজ। ওর কথা অনুযায়ী ওদের একটা মেডিসিনাল ভ্যাল্যু আছে। সেই ভেষজ উপাদানও সঠিক মাত্রায় কলকাতায় কেউ দিতে পারত বলে আমার জানা নেই। আর শুভায়ুর শরীরের ওই চিহ্নটা শুধুই অশ্বক্ষুরচিহ্ন নয়!"

-তাহলে?

আশুদা চিন্তিত হয়ে বলে,"যতোদূর জানি, ওই চিহ্ন শুধুই সৌভাগ্য আনে না। কোনও ব্যাক্তি ওই চিহ্ন নির্দিষ্ট লোককে দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে আঁকানো মানে হল সেই লোকটি বিশ্বাস করছে তার আশপাশের কোনও কিছুই আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। কোনও এক অদৃশ্য শক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।  এমনটাই বলছে মনোবিদ শার্লি এম ফারগুসন রেপোর্টের তত্ত্ব।

-অলোকেশ আর বিনতা বলছিল, শুভায়ু শেষের দিকে সকলকেই সন্দেহ করত।

-ঠিক তাই। প্রথাগত মনোচিকিৎসায় শুভায়ুর মন ছিল না। তাই সে মহেন্দ্রর কাছে ছুটে এসেছিল। তাকে দেখেও নবনীতাও।

-আর অলোকেশও! আশ্চর্য!

-ঠিক। কিন্তু আমি একটা অন্য বিষয় নিয়ে চিন্তিত অর্ক!

-কোন বিষয়?

-সম্বরণের কাছে আমি যখন শুভায়ুর মৃতদেহটা দেখতে গেলাম, তখন আমি তার পুরো শরীরটাই খুঁটিয়ে দেখেছি। আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে সেই দেহে পিঠের উপর কোনও অশ্বক্ষুরচিহ্ন ছিল না!

-তার মানে রহস্যমৃত্যুর আগে শুভায়ু কারোকে দিয়ে ওই চিহ্নটা মুছে ফেলেছিল!

-ঠিক তাই। কিন্তু কেন? তার মানে কি শুভায়ুর অসুখটা শেষদিকে সেরে গিয়েছিল? কে মুছল সেই চিহ্ন? আসিফ? কলকাতায় গিয়ে এই প্রশ্নর উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে।

মেনতেনু ক্লিনিক যেন একই সঙ্গে অনেক উত্তরের সঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্নপত্র খুলে দিয়েছে আমিদের সামনে। গভীর ব্যবচ্ছেদের পর কোনও ধমনীর অস্বাভাবিক শাখাপ্রশাখা যেমন অনেক অচেনা প্রশ্নর জন্ম দেয়। সেই উত্তর খুঁজতে আমরা ঘরে ফিরে চললাম।

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন