সুবর্ণরেখা: মিথের বিমিশ্রণের আড়ালে
আত্মধবংসী ঋত্বিক
--তোমার নাম কী?
--সীতা।
--কোথায় থাকো তুমি?
--আমাদের নতুন বাড়িতে।
--চলো তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি।
--তুমি রামায়ণ পড়েছ?
--না।
--সেই এক সীতার গল্প।
পাঠক ঠিকই অনুমান করতে পেরেছেন। উপরের কথোপকথনটি ঋত্বিক ঘটকের ধ্রুপদী চলচ্চিত্র 'সুবর্ণরেখা' (The Golden Thread)-র অন্যতম চরিত্র সীতা এবং আয়রন ফাউন্ড্রির ম্যানেজারের সংলাপ। পরিত্যক্ত এরোড্রোমের কংক্রিটের রানওয়ের ফাটলের উপর দিয়ে চলতে চলতে এগিয়ে যেতে থাকে সংলাপ দুজন অসমবয়সী বিপরীত লিঙ্গের চরিত্রের মধ্যে - একজন কৈশোরের প্রান্তে উপনীতা, আরেকজন বার্ধক্যে প্রবিষ্ট। একজন ত্রস্তা হয়ে ছুটে এসে মুখ লুকায় আরেকজনের বক্ষে। অপরজন পরম মমতায় একে দেন আশ্রয় ভরসা। একজন জানতে চায় রামায়ণের কাহিনি। অন্যজন বলে চলেন সাবলীলভাবে, সহজে সংক্ষেপে - মিথিলারাজ জনক কর্তৃক কর্ষণকালে কৃষি ক্ষেত্রে সীতা প্রাপ্তি - আবির্ভাব থেকে সীতার পুনরায় ধরিত্রী বক্ষে ফিরে যাওয়া - রামায়ণের কাহিনি। পৃথিবী দুভাগ হয়ে তাকে বুকের মধ্যে নিয়েছিল। সে অনেক পরের কথা। মাঝখান থেকে সপ্তকাণ্ড রামায়ণ।
পরম স্নেহভরে কথাগুলি বলতে থাকেন ম্যানেজার। জনক রাজার মতো, ফাঁকা মাঠে তিনিও পেয়েছেন আরেক সীতাকে। পরম যত্নে তাকে তিনি দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর নিজস্ব রামায়ণ। যে রামায়ণ প্রচলিত রামকথা নয়। মর্যাদা পুরুষোত্তম রামের বিজয় গাথা নয়। যে রামায়ণ সীতার আবির্ভাবকে নির্দিষ্টায়িত করে নির্মাণ করতে চায় সীতায়ণ।
তবে কি ঋত্বিক সীতায়ণ শোনাতে চান এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। নাকি দেখাতে চান সীতার পাতাল প্রবেশ? তা না হলে ম্যানেজারের মুখে সীতায়ণ চলাকালীন চলার পথের ফাটলের দিকে লেন্স ধরেন কেন ঋত্বিক?
সীতার পাতাল প্রবেশকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা চলে। সীতা ধরিত্রীকন্যা। ধরণী দ্বিধা হয়ে তাকে শেষ আশ্রয় দেয়। আমাদের দেশে বিবাহিত মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় না পেলে পিত্রালয়ে ফিরে যায়। কিন্তু সীতা ফেরেন তাঁর মায়ের কাছে। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতায়ন এই ধরণীর দুভাগ হয়ে সীতাকে বুকের মধ্যে নেওয়া। মাইথোলজিক্যালি দেখতে গেলে সীতার মিথ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কৃষি মিথগুলির অন্যতম। গ্রিক-রোমান কৃষি মিথের সঙ্গে সীতার মিথের অদ্ভুত সাদৃশ্য বর্তমান। যা কিছু ভিন্ন তা কেবল এথনিকাল বা স্থান-জলবায়ু ভেদে কৃষ্টিগত পার্থক্য। গ্রিক পার্সিফোন বা রোমান পজারপাইনের কাহিনিতে দেখা যায় রোমান কৃষি দেবী সেরেসের কন্যা পজারপাইনের পাতাল প্রবেশের ঘটনা। সেরেস শব্দ থেকেই cereal শব্দটির উৎপত্তি। যার অর্থ শস্যদানা। আবার proserpine শব্দটিও prosperity বা সমৃদ্ধিকে মনে করায়। সীতার অর্থ ক্ষেত্রে কর্ষণ রেখা বা লাঙলের দাগ। পজারপাইনের কাহিনিতে পাতাল হল মৃতদের জগৎ। কারণ গ্রিক-রোমান সভ্যতায় মৃতদেহ ভৌমস্থ করা হত। মৃতদের রাজত্বের রাজা ছিল ঘন কৃষ্ণবর্ণ প্লুটো। প্লুটো বলপূর্বক পজারপাইনকে পাতালে টেনে নিয়ে যায় অনুর্বর পাতালকে শস্য-সুফলা করার তাগিদে। সীতাও রাবণ কর্তৃক অপহৃতা হন। পজারপাইনের কাহিনি অনুসারে পাতাল প্রবেশ পজারপাইনের মৃত্যুর শামিল। কারণ মৃতদের ভূমিতে পজারপাইনকে মাতৃহারা হয়ে থাকতে হয়। সেরেস বাধ্য হয় বছরের ছয়মাসের জন্য আত্মজার পাতাল নিবাস মেনে নিতে। এই ক্ষেত্রে পাতাল প্রবেশ পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে সেরেস-পজারপাইন মা-মেয়ের পরাজয়। সীতার পাতাল প্রবেশকেও এইভাবে সীতার পরাজয় রূপে দেখা যেতেই পারে। ঋত্বিক ছবিতে দেখান প্রধান চরিত্র সীতার মৃত্যু। এরোড্রোমের ফাটল যেন সেই পরাজয়কেই ইঙ্গিত করে। এই ফাটল যেন ধরণীর দ্বিধা হওয়ার ফাটল। পজারপাইনের মিথ আসলে কষিভিত্তিক মাতৃতান্ত্রিক সভ্যতার বুকে পিতৃতান্ত্রিক প্রতিস্থাপনের পদধ্বনি সূচিত করে। ভারতবর্ষে যেভাবে সীতার কথা রামায়ণ হয়ে যায়।
তবে কি ঋত্বিক এই চলচ্চিত্রে এইরকম overlapping of myth-কে গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন? আজকের নিবন্ধ এই বিষয়কেই নিবদ্ধ করে এগিয়ে চলুক তবে।
চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে দর্শকের মনে বার বার ভেসে ওঠে সীতার গাথা। রাজা জনক কর্তৃক পালিতা সীতার কথা। চলচ্চিত্রের সীতাও তার অকৃতদার দাদা ঈশ্বর চক্রবর্তীর (অভী ভট্টাচার্য অভিনীত চরিত্র) দ্বারা লালিতা পালিতা। রামায়ণের রাজর্ষি জনক ও ব্রহ্মচারী নিষ্কাম কামিনীবিমুখ। তিনি রাজর্ষি হয়েও পারেননি তাঁর দুহিতা সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা-পাতাল প্রবেশ থেকে বাঁচাতে। ঈশ্বর চক্রবর্তীও পারেননি- অত বড় ফাউন্ড্রির ১২.৫ শতাংশের অধিকারী এবং ম্যানেজার হয়েও তাঁর সীতার সতীত্ব এবং জীবন রক্ষা করতে। তাঁর সীতা সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষাতে জয়লাভ করতে আত্মঘাতিনী হয় তাঁর চোখের সম্মুখে। রামায়ণের সীতা মৃত্যুবরণ করে অমৃতা হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন ভারতীয় জাতির জননী দেবী মাতা। চলচ্চিত্রের সীতা (মাধবী চক্রবর্তী অভিনীত চরিত্র) মরেও বেচেঁ থাকে তার পিতৃতুল্য দাদার পরাভূত বিবেকের কাছে। তবে যেন ঋত্বিক দেখাতে চান আধুনিক সীতাদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। দেশভাগ এইসব সীতাদের করেছে ছিন্নমূল-মাতৃপিতৃহীন। ছিন্নমূল মানুষও ভাগ্যের সাথে সংগ্রাম করে শূন্য থেকে শুরু করে- একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়। ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলার স্বপ্ন দেখতে দেখতে- ধানের ক্ষেতের দেশ, রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলার দেশ, যে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল সীতাকে- দাদার হাত ধরে সীতা এসে উপস্থিত হয় তার স্বপ্নের নতুন বাড়িতে। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে। একটি উষর পতিত দেশ স্টেশন মাস্টারের কথায় “এ পোড়ার দেশ”। সঙ্গীত শিক্ষায় পারদর্শিনী করে তোলে তাকে তার শূন্য থেকে গড়ে ওঠা দাদা যিনি উচ্চ প্রতিষ্ঠিত এবং স্নেহ সহোদরাকেও সুস্থিত ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠাতা করতে চান। দেশভাগ-উত্তর ছিন্নমূল বাঙালির চির আকাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠার মূর্ত প্রতীকস্বরূপ এই ঈশ্বর চক্রবর্তী। দেশভাগের হড়পা বান ঠেলে মাথা তুলে দাঁড়ানো সীতার পথে এবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় জাতিভেদ। অভিরাম বাগদীকে বিয়ে করে সে জাতিচ্যুতা-গৃহচ্যুতা হয়। আত্মহনন হয় তার শেষ পরিণতি। ঋত্বিক দেখান ভারতবর্ষ তার সীতাদের বাঁচাতে পারে না। পুরো চলচ্চিত্রটাই যেন একটা হতাশার দিকে যাত্রা। যার শুরু হয় এরোড্রোমের ফাটলের দিকে আলোক সম্পাত দিয়ে।
চলচ্চিত্রের সীতা কামনা করে অভিরামকে (সতীন্দ্র অভিনীত চরিত্র)। শালবনে নির্জনে চলে তাদের গোপন অভিসার। ঋত্বিক এই দৃশ্যে রেখেছেন চরিত্র যুগলের ফিসফিস করা সংলাপ। গা শিরশির করে দর্শকের। উভয়ের ভিতরকার শারীরিক সম্পর্কের আঁচকে দৃশ্যায়িত না করে শব্দায়িত করেন ঋত্বিক নিপুণভাবে- শিহরণকে পৌঁছে দেন দর্শকের মেরুদণ্ডে। সহস্র সহস্র বছরের অধিক পুরাতন সীতা কথাকে ভাঙতে থাকেন ঋত্বিক বিভিন্নভাবে। রামায়ণের রাম-সীতার আরণ্যক দাম্পত্যের কথা মনে পড়তে থাকে দর্শকের। সীতা-অভিরামের সম্পর্কের নিবিড়তা এমনই যে বিবাহবাসর থেকে পালিয়ে যায় সীতা অভিরামের হাত ধরে যে কিনা তখন মায়ের মৃত্যুর ফলে অশৌচগ্রস্ত। যে অবস্থায় দারপরিগ্রহ বর্ণ হিন্দুর কাছে নিষিদ্ধ।
সীতার এই পলায়ন মেনে নিতে পারেন না ঈশ্বর চক্রবর্তী। তিনি হতাশা বা ডিপ্রেশনের রোগী হয়ে ওঠেন। যে ম্যানেজার পদে তিনি নিযুক্ত সেটি প্রাক্তন ম্যানেজারের পদচ্যুতির ফলে প্রাপ্ত। প্রাক্তন ম্যানেজার তাঁর কন্যা পালিয়ে বিবাহ করাতে ডিপ্রেশনের রোগী হয়ে যান। তাঁকে উন্মাদ আখ্যা দিয়ে পদচ্যুত করা হয়। শেষপর্যন্ত ঈশ্বর চক্রবর্তীও পদচ্যুত হন। হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এবার আমাদের মনে পড়তে থাকে সতী মিথ- পিতার অমতে কন্যার বিবাহ। পিতা যাকে ঘৃণা করেন সেই ব্যক্তির কণ্ঠেই বরমাল্য দান। প্রজাপতি দক্ষ প্রজাসৃষ্টিকারী- মৃত্যুরোধী। তিনি তীব্রভাবে শিব-শব-প্রলয়ের দেবতা- বিদ্বেষী। দক্ষ কন্যা সতী বিবাহ বাসরে শিবকেই পতিত্বে বরণ করেন। ব্রাহ্মণ ঈশ্বর চক্রবর্তী বাগদী অভিরামের থেকে দূরে সরাতে চান ভগিনীকে। সীতা বিবাহ বাসর পরিত্যাগ করে অভিরামকে আশ্রয় করে। সতী তাঁর পিতার সম্মুখেই দেহত্যাগ করেন। সীতা তাঁর দাদার সামনেই আত্মঘাতিনী হন। এইভাবে সীতা মিথকে সতী মিথের সঙ্গে ওভারল্যাপিং বা সমাপতিত করার ঋত্বিক। ঈশ্বর চক্রবর্তী মদিরা সেবনপূর্বক আত্মহারা হয়ে কামাতুর নিশি অভিযান করেন হরপ্রসাদের প্ররোচনায়।
হরপ্রসাদও পূর্ব বাংলার উদ্বাস্তু। উদ্বাস্তু পল্লীতে একটু নেতাগোছের। স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। নিজেই সংস্কৃত ও বাংলা পড়াবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। ঈশ্বর চক্রবর্তী ঘাটশিলার নিকটে ছাতিমপুরে চাকুরি নিয়ে চলে যাচ্ছেন জেনে তাঁকে পলাতক বলে তিরস্কার করেন। এইভাবে নিজেকে আদর্শবাদী রূপে দেখাতে চান। কিন্তু তিনি নিজে দারিদ্র্য মুক্তির কোনো উপায় করতে পারেন না। প্রবল দারিদ্রে তাঁর স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। তাঁর স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁদের সন্তানদের যেন ঈশ্বর চক্রবর্তী আশ্রয় দেন। কিন্তু হরপ্রসাদ নিজে তাতে বাধ সাধেন। আসলে হরপ্রসাদের স্ত্রী এই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে দারিদ্র্য মুক্তির উদ্যোগ এবং উপায় দুটিই ঈশ্বর চক্রবর্তীর অবহিত। অভিরামকে তিনিই শিক্ষিত শিষ্ট করে তুলেছেন। সামনে অভিরামের দুর্দান্ত ভবিষ্যৎ- ঈশ্বর চক্রবর্তী তাকে জার্মানি পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। তাই হরপ্রসাদের স্ত্রী ঈশ্বর চক্রবর্তীর আশ্রয় তাঁর সন্তানরা পাবে এই আশা রেখে পৃথিবী থেকে পলায়ন করেন।
ব্যর্থ হরপ্রসাদ ব্যর্থ স্ত্রীকে বাঁচিয়ে রাখতে। সন্তানদের প্রতিপালন করতে- প্রতিষ্ঠা দিতে। আসলে হরপ্রসাদ আদর্শবাদের মুখোশ পরিহিত একজন, ঋত্বিক যে মুখোশ টেনে খুলে দেন। অর্থাভাবে যে সচ্চরিত্র-সজ্জন, অর্থ থাকলেই সে পরিবর্তিত হয়ে যায় ভোগ-লোলুপ মেফিস্টোফিলিস-এ। হ্যাঁ,মেফিস্টোফিলিস নরকের রাজপুত্র, শয়তানের ছায়া- প্ররোচনা-প্রতারণার ঘৃণ্য নারকীয় নায়ক। ঈশ্বর চক্রবর্তী যখন নিলম্বিত হয়ে আত্মহত্যা করতে যান- গভীর নিশীথে- তখন সহসা আবির্ভাব ঘটে হরপ্রসাদের। মেফিস্টোফিলিসের মতো তার শির আবৃত, দৃষ্টি ক্রুর শয়তানের মতো। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তিনি বলেন: "রাত কত হইল? উত্তর মেলে না।" মেফিস্টোফিলিসও এইভাবে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে প্রলুব্ধ করেছিল ডক্টর ফাউস্টাস-কে। ডক্টর ফাউস্টাস- নিষ্কাম, পরোপকারী, জ্ঞান সন্ধানী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ঈশ্বর চক্রবর্তীও অনুরূপ। সেই রাতে যদি চক্রবর্তী মরতে পারতেন তবে তিনি বেঁচে যেতেন। নষ্ট হত না তাঁর সৎ-চরিত্র-কৃচ্ছসাধন। দেখতে হত না কন্যাসম ভগিনীর মৃত্যু। তিনিও মেফিস্টোফিলিসস্বরূপ হরপ্রসাদের প্ররোচনায় বিক্রয় করে দিলেন আত্মাকে শয়তানের কাছে অনেকটা ডক্টর ফস্টাসের মতো, মেফিস্টোফিলিসের প্ররোচনায় যিনি আত্মাকে বিক্রয় করেন লুসিফারের কাছে।
হরপ্রসাদ এক প্রকার স্বীকারই করে নেন যে টাকার অভাবে সে কলকাতার ‘বীভৎস মজা’ উপভোগ করতে পারেননি। ঈশ্বর চক্রবর্তীর টাকা আছে। তাকে তিনি প্রলুব্ধ করেন সেই ‘বীভৎস মজা’ উপভোগের সহচর হতে। তীব্র হতাশায় উন্মাদ প্রায় হয়ে ঈশ্বর চক্রবর্তীও প্ররোচনায় পা দিয়ে দেন। রেসের মাঠ-জুয়া-নাইট ক্লাব-মদিরা সেবন-মধ্যবিত্তের আদর্শ গ্রাসকারী সর্বনরক পেরিয়ে ঈশ্বর চক্রবর্তী এবার আসেন দারিদ্র্যগ্রস্ত কূলবধূর দারিদ্র্যের সুযোগ নিতে। সেই ব্যাভিচারের সামনে পড়ে সীতা- তাঁর ভগিনী। তিনিই তাঁর ভগিনীর প্রথম খরিদ্দার। পুরাণে দক্ষ-প্রজাপতির কন্যা গমনের কথার উল্লেখ আছে। ঈশ্বর চক্রবর্তী ও দক্ষ-প্রজাপতিকে এই স্থলে দণ্ডায়মান করান ঋত্বিক ঘটক- সতী মিথ-সীতা মিথ মিলেমিশে যেতে থাকে। প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েও তাঁর ভগিনী সীতা নিজের চরিত্রকে ভূলুণ্ঠিত হতে দেয়নি। আবার ফিরেও যায়নি তার ধনাঢ্য দাদার আশ্রয়ে। যে বিদ্যা সে অর্জন করেছিল সেই সঙ্গীতকে আশ্রয় করেই বাজারে নামে সে। চরিত্র খুইয়ে নয়। ঋত্বিক একটি মেলোড্রামাটিক পরিস্থিতি তৈরি করেন এই মুহূর্তে। দাদার দাঢ্যের কাছে কিছুতেই পরাজয় স্বীকার করে না সীতা। আত্মহত্যা করেন। এইভাবে সে হয়ে ওঠে সতীর মতোই অনঙ্গ বিজয়ী। আব্রাহামীয় ধর্মগুলির পুরাকথায় দেখতে পাই নরকের রাজা পাপের লুসিফার তার কন্যার সিনের গর্ভে জন্ম দেয় ডেথ বা মৃত্যুর। মিথের ওভারল্যাপ করান ঋত্বিক। যেন এইভাবে নরক রচনা করেন। শয়তান-পাপ-মৃত্যু সেখানে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী নরকের রাজা যমরাজ। মৃত্যুরও দেবতা তিনি। যম তার ভগিনী যমুনাকে রমণ করেছিলেন। পদস্খলিত ঈশ্বর চক্রবর্তীও অজান্তে ভগিনী গমন করতে চলেছিলেন। ঋত্বিক যেন সীতা মিথের আড়ালে চালিয়ে নিয়ে থাকেন যমের কাহিনি-পুরাকথা। নাইট ক্লাবের দৃশ্যটি স্মরণ করলেই এই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঈশ্বর চক্রবর্তী এবং হরপ্রসাদের মাথায় যথাক্রমে শিং এবং গাধাটুপি পরান ঋত্বিক। যমদূত এবং মহিষাসুরের মাথায় শৃঙ্গ মুকুট- আমাদের কাছে পরিচিত দৃশ্য। ঈশ্বর চক্রবর্তী যেন যম। হরপ্রসাদ- যমদূত অথবা যমের সহচর চিত্রগুপ্ত।
এবার নাইট ক্লাবের দৃশ্যে মাতাল হরপ্রসাদের সংলাপগুলিতে মনোনিবেশ করা যাক। বিশৃঙ্খলাগ্রস্ত নাইট ক্লাবে- যেন নরকের গোলমাল বা হেলিশ প্যান্ডেমোনিয়াম- বসে আকণ্ঠ মদিরাহত হয়ে তিনি বলতে থাকেন কঠ উপনিষদের ঋষি বজ্রশ্রবার পুত্র নচিকেতার পুরাকথা। পিতা নচিকেতাকে যমকে- মৃত্যুকে- দান করেছিলেন। যমের কাছে নচিকেতা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে চান। যম তাঁকে পরিবর্তে ‘দেব দুর্লভ’ অর্থ-কাম-কামিনী দান করতে চান। নচিকেতা এই সমস্ত অসদ বস্তুর লোভ পরিহার করে সদ্ বস্তু- আত্মজ্ঞান লাভ করতে চান। হরপ্রসাদের কথা অনুযায়ী: "নচিকেতা ওয়াজ আ ফুল।" নচিকেতা বড়োই বোকা। হরপ্রসাদ নিজেকে নচিকেতা বলেন। কিন্তু তিনি নিজেই নিজের আত্মজদের পালন করতে অক্ষম। নিজেই একপ্রকার নিজের পুত্র কন্যাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন। মৃত্যুঞ্জয়ী নচিকেতার সম্পূর্ণ বিপরীত তিনি। ঋত্বিক তাঁকে বজশ্রবার মতোই আদর্শচ্যুত বাক্তি- নিষ্ঠুর ক্রুর পিতার ভূমিকায় নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রের শুরুতে পরার্থপর হরপ্রসাদ শেষপর্যন্ত আত্মপর-স্বার্থপর রূপে প্রতিষ্ঠিত হন ঋষি বজশ্রবার মতোই।
ঋত্বিক এইভাবে যমের কাহিনি, প্রজাপতি দক্ষের কাহিনি, মেফিস্টোফিলিস-লুসিফারের কাহিনি- একটিকে আরেকটির সঙ্গে বিজড়িত করে সমগ্র চলচ্চিত্র জুড়ে যেন দেখাতে চান পৌরুষের অধঃপতন কিম্বা অপপুরুষায়ন। হরপ্রসাদ প্রাচীন ঋগ্বেদিক মন্ত্রকে- নচিকেতার উচ্চারিত মরণজয়ী স্তোত্রকে উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত - ওঠো-জাগো-নিজের প্রাপ্য নিজে বুঝে নাও- বিদ্রূপ করতে থাকেন। আধুনিক ভারতের পথপ্রদর্শক এবং আধ্যাত্মিক পিতা স্বামী বিবেকানন্দের বড়ো পছন্দের এই মন্ত্র। হতাশাগ্রস্ত ভারত জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার মর্ম বোঝানোর জন্য ভারতবর্ষের এই বীর সন্ন্যাসী বারবার এই মন্ত্র উচ্চারণ করতেন। মৃতপ্রায়- মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত ভারতবাসীকে তিনিই স্মরণ করান: "শৃন্বন্তু বিশ্বে ভোঃ অমৃতস্য পুত্রাঃ"- শোনো হে বিশ্বের অমৃতের সন্তানগণ। তিনি যেন বর্তমান ভারতের নচিকেতা যিনি জাতির উদ্দেশ্যে শোনান এই মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্র- দেন তাদের সঞ্জীবনী- জাগরণের ডাক। আজও আপামর ভারতবাসী "উত্তিষ্ঠত জাগ্রত" এই বৈদিক মন্ত্রকে স্বামীজির বাণী হিসাবেই জানে। যুগনায়ক বিবেকানন্দ ভারতবাসীর কাছে চির-যৌবনের প্রতিমূর্তি। নচিকেতার মতোই তিনিও মরণজয়ী পৌরুষের প্রতিভূ।
মাতাল হরপ্রসাদ "উত্তিষ্ঠত জাগ্রত" মন্ত্রকে বিদ্রূপ করতে গিয়ে যেন স্বামীজিকেই ব্যঙ্গ করে বসলেন। ঋত্বিক যেন সচেতনভাবেই এই দৃশ্য-সংলাপ নির্মাণ করে মারাত্মক ঝুঁকি নিলেন। দাঙ্গা বিধ্বস্ত, বিভক্ত, ভগ্ন ভারতের উত্থানের আশা জাগিয়ে ছিল যে মন্ত্র সেই মন্ত্রকে বিদ্রূপ: ছিন্নমূল সর্বহারা বাঙালি যে মন্ত্রকে রক্ত প্রবাহে বইয়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল সেই মন্ত্রকে বিদ্রূপ! উদ্বাস্তু বাঙালির স্বপ্ন ছিল নতুন বাড়ি- নতুন দেশ নির্মাণ। স্বামীজি তাদের জাতীয় নায়ক। এই বিদ্রূপ আরো ঘনীভূত হল যখন ঋত্বিক হরপ্রসাদকে দিয়ে বলালেন: "অ্যাটম বম্ব দেখে নাই, যুদ্ধ দেখে নাই। মন্বন্তর দেখে নাই। দাঙ্গা দেখে নাই। দেশভাগ দেখে নাই।" এত সরাসরি স্বামীজিকে ইউটোপিয়ান বলে আক্রমণ।
এই মুহূর্ত থেকেই দর্শকের মনে অবচেতনে তৈরি হতে থাকে চলচ্চিত্রটির প্রতি একপ্রকার বিবমিষা। উদ্বাস্তু-হতাশাগ্রস্ত বাঙালির চমক রিলিভ বা স্বপ্ন নির্মাণের একটি জায়গা ছিল ছায়াছবি। উদ্বাস্তুর জয়যাত্রা সিনেমার পর্দায় দেখার জন্য বাঙালি দর্শক টিকিট কাটেন একথা ঋত্বিক জানতেন- দারুণভাবে জানতেন। কিন্তু তবুও সচেতনভাবে তিনি বুনে চলেন এই হেরে যাওয়ার আখ্যান। উদ্বাস্তু পরিবারের কর্তা নায়কের মতো পুরো পরিবারকে উদ্ধার করেন। ত্যাগ স্বীকার করেন। স্বামীজি তো জাতিকে ত্যাগই শিখিয়েছেন। ঈশ্বর চক্রবর্তী ও হরপ্রসাদ বিপরীতে উৎকট ভোগ-লালসায় লিপ্ত। এই অপপুরুষায়ন, এই ভোগ দিয়ে ত্যাগকে লাঞ্ছনা বাঙালি দর্শক যেন আর নিতে পারেন না। বিশেষ করে স্বামীজির বাণী-আদর্শ প্রবল প্রতাপে আচ্ছন্ন করে রেখেছে বাঙালি মনন। ঋত্বিক নির্মমভাবে সেই মননকে আক্রমণ করেন।
‘সুবর্ণরেখা’ চলচ্চিত্রটিকে এইভাবে যেন ইচ্ছা করেই ফ্লপ করান ঋত্বিক। আত্মধ্বংসী যজ্ঞের হোতা- ঋত্বিক তিনি। সচেতনভাবেই তিনি এই হতাশার যাত্রা শুরু করেছেন। ইচ্ছা করেই করেছেন এই নরক রচনা। দর্শক চলচ্চিত্রের শুরুতে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে- স্বর্গ নির্মাণের। চলচ্চিত্রের শেষের দিকে সেই স্বপ্নকে স্বর্গকে ঋত্বিক আছড়ে ভাঙেন নরকের ভূমিতে। নচিকেতা-বিবেকানন্দ-ত্যাগ-আদর্শ সব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠে নরকের করাল নৃত্য। বাস্তবে সর্বহারা বাঙালি দর্শকের ইচ্ছাপূরণ- উইল ফুলফিলমেন্টের আলস্যকে নির্মমভাবে নরকের আগুনে পোড়ান ঋত্বিক। দেখান বাঙালির পরাজয়। ইচ্ছা করেই এটি করেন ঋত্বিক। চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে ঈশ্বর চক্রবর্তী সীতাকে বলেন, যেখানে মানুষ আনন্দ পেতে চায় সেখানে সে বা অভিরাম সব সময় তাদের সঙ্গীতে বা লেখাতে দুঃখকে ফুটিয়ে তুলছে। এ বাস্তবে চলে না। অভিরামকেও তিনি একই অভিযোগ করেন। প্রকাশকের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত অভিরামও দীর্ঘশ্বাস ফেলে সীতাকে বলে যে তার লেখা দুঃখকেন্দ্রিক কাহিনি বাজারে চলবে না। জীবন দুঃখের নির্মাণ। তবু মানুষ সুখ চায়- লেখাতে, শিল্পতে, চর্যায়, চর্চায়। অর্থাৎ ঋত্বিক যেন স্পষ্টভাবে দর্শককে জানিয়ে দিতে চান যে দর্শক হয়তো সিনেমার পর্দায় স্বপ্ন সন্ধানে এসেছেন- এসেছেন মুহূর্তের জন্য বাস্তব যন্ত্রণা ভুলে স্বর্গসুখ পেতে, কিন্তু তিনি তাকে দেবেন নরক যন্ত্রণা। ইচ্ছা করেই। নরক থেকে কাউকে না দর্শককে না চলচ্চিত্রের চরিত্রকে পালাতে দেবেন না ধ্বংসনিষ্ঠ ঋত্বিক ঘটক।
ঋত্বিক যেন চ্যালেঞ্জ করেন স্বামীজির একটি কথাকে সীতা-সতী-সাবিত্রীর দেশ এই ভারতবর্ষ। ঋত্বিক দেখালেন আধুনিক ভারত না পারে সীতাকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারে সতীকে বাঁচিয়ে রাখতে। পুরাণের সতী কিংবা রামায়ণের সীতা- প্রাচীন ভারতের নারীত্বের আদর্শ মূর্তি বা আর্কেটাইপ- তারাও প্রাণত্যাগ করেন বা স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেন। চলচ্চিত্রের সীতা যার মধ্যে সীতা-সতী-সাবিত্রীকে মিশিয়ে দিয়েছেন ঋত্বিক- সেও আত্মহত্যা করে। পার্থক্যটা শুধু হল প্রাচীন ভারতের সীতা-সতী দেবীত্বের মর্যাদা পায় আর আজকের সীতা নরকের বিস্মৃতিতে তলিয়ে যায়। যম-নচিকেতার আখ্যানের পিছনে ঋত্বিক লুকিয়ে রাখেন যম-সাবিত্রীর আখ্যান। নচিকেতার মতো সাবিত্রীও যমের থেকে লাভ করেন মহাজ্ঞান- মৃত্যু রহস্য। বারংবার চেষ্টা করেও সাবিত্রীকে প্রতিহত করতে পারে না যম। বাধ্য হয় সাবিত্রীর পতি সত্যবানের জীবন ফিরিয়ে দিতে। রাজকন্যা সাবিত্রী দরিদ্র বনবাসী সত্যবানকে স্বেচ্ছায় বরমাল্য দান করেছিল তার পিতা অশ্বপতির আপত্তিকে উপেক্ষা করে। সে ত্যাগ করেছিল রাজপ্রাসাদের স্বাচ্ছন্দ্য। ঈশ্বর চক্রবর্তীর ভগিনী সীতাও দাদার আপত্তি উপেক্ষা করে, দাদার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের মায়া ত্যাগ করে হাত ধরে কপর্দকহীন, বাস্তুহীন অভিরামের। অভিরামের অকালমৃত্যু- সীতার অকাল বৈধব্য- খরিদ্দার রূপে ঈশ্বর চক্রবর্তীর সহসা আবির্ভাব- সীতার আত্মহত্যা- এ তো যেন সাবিত্রীর জীবনে যমের আবির্ভাব। ঈশ্বর চক্রবর্তী যমের মতো এসেছেন তাঁর ভগিনী সীতার জীবনে।
পুরাণের সাবিত্রী যমরাজকে বলেছিলেন যে, স্বামী ভিন্ন তার জীবন বৃথা। যম তার স্বামী সত্যবানের সূক্ষ্ম শরীর নিয়ে যাবার সময় সাবিত্রীও যমের অনুগমন করে। যমকে যুক্তিজালে আবদ্ধ করে সে ফিরিয়ে আনে সত্যবানের প্রাণ। নচিকেতার মতোই সাবিত্রীও হয়ে ওঠে মৃত্যু বিজয়ী- মৃত্যুজ্ঞান প্রাজ্ঞ। সাবিত্রীকে সেই জ্ঞান দিয়ে, যমরাজও হয়ে ওঠেন আত্মধন্য- কৃতার্থ। সাবিত্রীকে সত্য বলতে কুণ্ঠিত হননি যমরাজ। কারণ তিনি ধর্মের প্রতিমূর্তি। জীবকে তিনি সংযত করেন তাই তিনি যম। পুণ্যবানের কাছে যম আনেন স্বর্গের সুষমা আর পাপীকে নির্বাসিত করেন নরকের পুতি গন্ধে। ঈশ্বর চক্রবর্তীও সীতার জীবনটাকে স্বর্গের স্বাচ্ছন্দে ভরাতে চেয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের প্রথমে অন্তত তাই দেখান ঋত্বিক। কিন্তু সীতা যাকে ভালোবেসেছিল সেই অভিরামকে সীতার থেকে দূরে সরাতে উদগ্র হয়ে ওঠেন। পুরাণের যমরাজ সাবিত্রীকে অর্থ-সম্পদ-আয়ু-বংশধারা প্রভৃতি আশীর্বাদে ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। নির্লোভ সাবিত্রী শুধুমাত্র চেয়েছিলেন পতির প্রাণভিক্ষা। ঈশ্বর চক্রবর্তী যখন সীতাকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রলোভন দেখিয়েও ব্যর্থ হলেন তখন আঘাত করে বসলেন সীতাকে। ঈশ্বর চক্রবর্তীর নৈতিক পতন শুরু হল। তিনি যমরাজের মতোই সত্যনিষ্ঠ, নীতিনিষ্ঠ। কিন্তু তাঁর আর ধর্ম দেবতা হয়ে ওঠা হল না। ধর্মদেব যমরাজ প্রাণ নিতেও পারেন আবার পারেন জীবন দান করতে। স্বর্গ-নরক সবই তাঁর পাপ স্বরূপ কর্মে আবদ্ধ। ঈশ্বর চক্রবর্তী- চলচ্চিত্র যত এগোয় ঋত্বিক দেখাতে থাকেন যমের ব্ল্যাক আদার বা অন্ধকার দিক রূপে মৃত্যুর করাল গ্রাস যেখানে অবশ্য সম্ভাবী। ঈশ্বর চক্রবর্তী সীতার জীবনে বয়ে আনে নরকের পূতিগন্ধের বার্তা। ঋত্বিক যেন দেখাতে চান আজকের সাবিত্রী ব্যর্থ তার সত্যবানকে বাঁচাতে। আজকের সাবিত্রী যেমন হেরে যায় তেমনই যমরাও হেরে যায়। আজকের যমরাজ আর স্বর্গ রচনা করতে পারে না। নরকই তার সম্বল।
কিন্তু একদিন ঈশ্বর চক্রবর্তী তাঁর বালিকা ভগিনীকে আশ্বস্ত করেছিলেন তাকে তাদের নতুন বাড়িতে নিয়ে যাবেন বলে। উদ্বাস্তু পল্লীর পঙ্কিল জীবন থেকে মুক্তি লাভের স্বর্গ সেই স্বপ্নের নতুন বাড়ি। ছবির শুরুতে দেখা যায় সীতার নতুন বাড়ির অনুসন্ধান করছে প্রথমে হরপ্রসাদের কাছে। হরপ্রসাদ তাকে আশ্বস্ত করছেন আর বলছেন যে তিনি আছেন, সীতার দাদা ঈশ্বর চক্রবর্তী আছেন, তাঁরাই তাকে তার নতুন বাড়িতে নিয়ে যাবে। পরিচালকের নিষ্ঠুর পরিহাসে হরপ্রসাদ আর ঈশ্বর চক্রবর্তীর সামনেই শেষ পরিণতি বেছে নেয় সীতা আরেক উদ্বাস্তু পল্লীতে; নতুন বাড়ি-নতুন স্বর্গের স্বপ্নটি যখন চারিয়ে গেছে তার সন্তান- পরবর্তী প্রজন্ম বিনুর মধ্যে।
বিনু তার সীতা মায়ের থেকে শিখেছিল ধানের ক্ষেত্রের রৌদ্র ছায়ার
লুকোচুরি খেলার গান। সোনার রোদ- সোনার ধান- সোনার সীতা।
শোনার সীতারে হয়েছে রাবণ পল্লীর পথ পরে
মুঠি মুঠি ধানের গহনা তাহার পড়িয়াছে বুঝি ঝরে
(জসীমুদ্দিন)
জনক দুহিতা সীতা প্রকৃতি কন্যা। রাজধানীতে পালিতা হলেও জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছিল তাঁর প্রকৃতির সান্নিধ্যে। "ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ার" গানটিকে ছবিতে রেখে ঋত্বিক ধান্যক্ষেত্র-উর্বরতা চরিত্র-সীতাকে একাকার করতে চেয়েছেন। চরিত্র-সীতা প্রকৃতির সান্নিধ্যেই চেয়েছিল তার নতুন বাড়ি। বিনুকেও সেই স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছিল সীতা। পৌরাণিক নায়িকাগণের সীতা, সতী, সাবিত্রী, দময়ন্তী, দ্রৌপদী- প্রত্যেকেরই জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটে অরণ্যযাপনে- প্রকৃতির কোলে। এঁরা সকলেই প্রকৃতি কন্যা। উর্বরতার উৎস-স্বরূপ। এবং স্বাধীনতা-স্বাতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক। স্বামীজি তাই বারবার স্মরণ করিয়েছেন আধুনিক ভারতের নারীদের যে তারা সীতা-সতী-দময়ন্তীর দেশের কন্যা। ঋত্বিক এই পৌরাণিক নারীদের ব্যর্থতা ফুটিয়ে তোলেন এই চলচ্চিত্রে- এইভাবে দেখান প্রকৃতির পতন।
চলচ্চিত্রে নতুন বাড়ির খোঁজে বেরিয়ে সীতা দেখে তার দাদা তাকে এনেছেন একটি অনুর্বর দেশে- স্টেশন মাস্টারের কথায়, "এ পোড়া দেশে"। নারীকে ঋত্বিক দেখান প্রকৃতিকাঙ্ক্ষী। আর বিপরীতে দেখালেন পুরুষের গোল্ডরাশ। পৌরাণিক সীতা একদিন এই গোল্ডরাশ- স্বর্ণচক্রে মোহিত হয়েছিলেন। রাক্ষস মারীচ তাকে সোনার হরিণের রূপ পরিগ্রহ করে প্রলুব্ধ-প্রতারিত করেছিল। চলচ্চিত্রে মারীচের মতোই আবির্ভাব ঘটে মুখার্জির। সে সীতাকে ঠাট্টার ছলে বলে, "আমার নতুন গিন্নিটি বটে।" সীতা তাকে জিজ্ঞাসা করে, "আমরা কী নতুন বাড়িতে যাচ্ছি?" মুখার্জি বলে: "ই গিন্নি, নতুন দেশটি, নতুন বাড়িটি।" সে আরো বলে: "সুবর্ণরেখা- সোনার রেখাটি, তার পাশেই তোমার বাড়িটি।" সোনার রেখার মায়াকাজল পরাতে চায় এই মারীচ- মুখার্জি সীতার চোখে। তখনই ঈশ্বর চক্রবর্তী প্রতিবাদ করেন এই স্বপ্ন বুনোট- মিথ্যা মায়ার। পৌরাণিক সীতার জীবনে সর্বনাশ ডেকে এনেছিল মারীচ। মুখার্জি সীতা-অভিরামের মিলন পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বাল্মীকি রামায়ণে অরণ্যবাসিনী সীতা স্বর্ণ-মৃগ দেখে মোহিত হন। রামকে তিনি প্ররোচিত করে ওই মৃগ তাঁকে এনে দিতে। বিশ্বের ইতিহাসে, আমরা দেখি সোনার লোভে মানুষ নির্বিচারে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে। অরণ্যকে ধ্বংস করে উৎখনন হয় স্বর্ণ- গভীর অরণ্যে মানুষ খুঁজে পায় স্বর্ণখনি সমূহ- শুধু স্বর্ণখনি নয়, পৃথিবীর সকল খনি অঞ্চলই ছিল আদিতে অরণ্যাবৃত অঞ্চল। অরণ্যের বুকে স্বর্ণ মৃগ রূপ ধারণকারী মারীচের আগমন যেন বনানীকে ধ্বংস করে শিল্পায়নের ভয়ঙ্কর হাতছানি। রামের স্বর্ণ মৃগের পশ্চাৎধাবন করা তো একপ্রকার গোল্ডরাশ। মানুষের গগনভেদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ধনসম্পদের বাসনাই তো স্বর্ণমৃগ- গোল্ডরাশ। রামের ওই গোল্ডরাশের সময়েই রাবণ সীতাহরণ করে। স্বর্ণলঙ্কা- স্বর্ণপ্রাসাদ- কুবেরের ধন যেখানে সঞ্চিত আছে- সেই স্থানের অধিকারী রক্ষপতি রাবণ। রামায়ণে স্বর্ণ শুধু মোহ উদ্রেককারী নয়, স্বর্ণ বন্দীদশারও প্রতীক। মানুষের আত্মা বন্দী হয়- ছটফট করে এই গোল্ডরাশ-এ। এটাই প্রকৃতির পতন- বিশ্বপ্রকৃতি ও মানুষ প্রকৃতি উভয়েরই।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন