![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৮ |
বুম্বা আর পুষ্পপ্রিয়ার গল্প
তিনতলা বাড়ির নিচের তলায় বামদিকের ছোট ঘরটা নির্দিষ্ট করা হয়েছে বুম্বার থাকার জন্য। সেই ঘরে যে খাটটা পাতা হয়েছে তা বামদিকের দেওয়ালে জানালাটার ধার ঘেঁষে। জানালার বাইরেই জমজমাট বড়রাস্তা। সারাটা দিন সেই রাস্তায় কত যে মানুষ, আর কত যে যানবাহনের আনাগোণা! সবারই খুব ব্যস্ততা, সবাই ছুটে চলেছে সমানেই। আগে তিনতলায় থাকত বুম্বা। লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামত। কলেজের ফুটবল দলে নিয়মিত খেলত অফেন্সিভ পজিশনে। রীতিমতো ছটপটে আর প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছিল। কিন্তু তারপর কী যে হলো, একটা অজানা অসুখ তাকে বিছানাবন্দী করল। অনেকদিন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। তারপর একদিন হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে এলো। তাকে রাখা হলো বাড়ির নিচের তলায় একটা ছোট ঘরে। তবে দাঁড়াবার শক্তি ছিল না বুম্বার, শরীরের নিম্নভাগ পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছিল।
সারাটা দিন প্রায় বিছানায় শুয়েই
থাকে বুম্বা। কখনও কখনও বসিয়ে রাখা হয় পিঠে বালিশের ঠেকা দিয়ে। বুম্বা জানালায় চোখ
রেখে রাস্তা দেখে। রাস্তায় অবিরাম ছুটে চলা গাড়ি, ফুটপাতে পায়েহাঁটা মানুষ, রাস্তার
দু’পাশের বিশাল বহুতল আবাসন, ঝাঁ-চকচকে মল। বুম্বা শুয়ে অথবা বসে সারাদিন রাস্তার এইসব
দেখে। সত্যিই কি দেখে? প্রতিদিন একই দৃশ্য দেখতে দেখতে আর নতুন কিছু কি দেখার থাকে?
না, থাকে না। আর তাই নিজেকেই মনে মনে দৃশ্য রচনা করতে হয় বুম্বার। জানালার বাইরে দৃষ্টি
ভাসিয়ে দিয়ে সেইসব দৃশ্য দেখতেও পায়।
ইদানীং পুষ্পপ্রিয়া তো প্রায়ই আসে।
তবে ঘরের ভেতরে আসতে চায় না। বলে, না বাবা, ঘরে ঢুকলে যদি তোর মা-বাবা জানতে পারে!
বুম্বা বলে, জানলে ক্ষতি কী! আমরা
তো বন্ধু, কলেজে একই ক্লাসে পড়েছি।
বুম্বার কথায় পুষ্পপ্রিয়া হাসে।
হাসলে তাকে দেখতে খুব খুব মিষ্টি লাগে। বুম্বার মনে হয়, এই মিষ্টি হাসিটার জন্যই পুষ্পপ্রিয়া
এত সুন্দরী!
মজা করে পুষ্পপ্রিয়া বলে, তাই বুঝি!
আমরা শুধু বন্ধু?
বুম্বা অস্বস্তি বোধ করে। মনের
অন্তরমহলে পুষ্পপ্রিয়াকে নিয়ে সে যা ভাবে, যা কখনও মুখ ফুটে বলে উঠতে পারেনি, কী আশ্চর্য,
পুষ্পপ্রিয়া তা ঠিক বুঝে গেছে!
কোনো কোনোদিন পুষ্পপ্রিয়ার কথায়
অনুযোগের সুর বাজে, আর কতদিন তোকে বিছানায় থাকতে হবে বুম্বা? ডাক্তারবাবু কী বলেছেন?
বুম্বা অসহায়ের মতো বলে, আমি কিছুই
জানি না রে! আমাকে কেউ কিছু বলে না। আচ্ছা পুষ্প, আমি যদি আর ভালো না হই, দাঁড়াতে না
পারি, তাহলে কি তুই আর আসবি না?
পুষ্পপ্রিয়া প্রথমে কোনো উত্তর
দেয় না, কিছু চিন্তা করে, তারপর বলে, তুই যখন ভালো হয়ে যাবি, বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াবি,
আবার কলেজে যাওয়া শুরু করবি, পায়ে ফুটবল নিয়ে দৌড়াবি, আমি তখন আসতে পারব কিনা বলতে
পারছি না। কিন্তু আমি তোকে কথা দিচ্ছি, যতদিন তুই বিছানায় থাকবি, তোর দু’পায়ে দাঁড়ানোর
শক্তি ফিরে আসবে না, আমি আসব। তুই চাইলে প্রতিদিন আসব। তোর ঘরের জানালার বাইরে এসে
এভাবেই আমি দাঁড়াব!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন