কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

সঞ্জয় রায়

 

কবিতার কালিমাটি ১৫৮


অচেনা প্রান্তর

(১)

এ গৃহ, প্রতিদিনের অন্ন, নিশ্চিত জীবন

পরিচিত এ শরীর, এ বেঁচে থাকা,

সবকিছু অচেনা মনে হয়!

 

শ্রম দিয়ে নিজেরা হারায় যারা

জোগায় আহার, অচেনা সবাই

গৃহহীন, অনাহার, অজ্ঞাত জীবন ওদের

কেউ লেখে না এ সব সম্পর্ক-কথা! 

 

নিপুণ সাধনায়

মানুষ শিখে নেয় হিংস্রতা লুকোনোর কৌশল

শিখে নেয় নীতিকথা, ভোগে বাঁচার অভ্যাস!        

 

(২)

কুয়াশায় বেঁচে আছে আস্ত এক প্রজন্ম

সেও এক সম্মিলিত অভ্যাস, কত জন্মের!

 

অসহ্য মনে হয় এ বিলীনতা

তাই ধরেছি মিথ্যা এ বেশ

এ শিরস্ত্রাণ, আভরণ, প্রসাধন, কস্তুরী-গন্ধ

শিখে নিয়েছি না-চেনা শব্দ, সম্মোহন-সংগীত

ঋষি ধ্যান ভেঙ্গে উঠে দাঁড়াবেন এখনি

নির্লিপ্ত মৌমাছিরা ছুটে আসবে দলে দলে…

 

মিথ্যা স্বপ্নে কুয়াশা-স্তর ঘন থেকে ঘনতর হয়

আমরা সদর্পে হেঁটে যাই ফেসবুকে

বিস্মৃতির গভীর অতলে!  

 

(৩)

রোমকূপ চোখ বুজেছে কখন, খবর রাখিনি

স্থবির জীবনে স্তরে স্তরে বিষ জমে

পাথর জমে কোষের প্রতিটি কোনে

ওষুধের গন্ধ খেয়ে নেয় এক জীবন,

গচ্ছিত সম্পদ!

 

বিপ্লবী বাইসনের যে ছবি এঁকেছিলাম যৌবনে

স্মৃতিতে ভাসে না আর, ভেসে গেছে টুকরো কাগজে

দাসত্বে বেঁচে আছি চোদ্দপুরুষ

প্রভুর ছবি এঁকে এঁকে

কখন মেষপালে ভিড়েছি বুঝতে পারিনি

আমি এখন সমবেত হরিনাম গাই!   

 

কারখানায়, খামারে, বস্তিজুড়ে

প্রতিদিনের মৃত্যু লেখায়

হিল্লোল জাগে না ঘুমন্ত চেতনায়

জাগে না কোনো প্রতিশোধ স্পৃহা!      

 

শূন্য দৃষ্টি

বিধবা এক বৃদ্ধা

মাছ-বাজারের পাশে

সকালে সবজি নিয়ে বসে।

 

পুঁজিপাটা নাই, তাই

আনে না বাহারি কিছু

কালো কচু, কচু-লতা, শাপলা

পুঁই পালং ঢেঁকি

পায় যা কুড়িয়ে যেথায় সেথায়

দু-চারটে লেবু

ঢ্যাঁড়শ বড় জোর।

 

কিনি কিছু প্রয়োজনে

কিছু কিনি অনুকম্পায়

দাম-দর করি না তেমন

দু আনায় কী এসে যায়!  

 

কিছু বিকোয়, কিছু শুকোয়

হয় কি লাভ কিছু?

সময় আছে কার সে সব জানার!

 

বৃদ্ধার বয়স বাড়ে

চুল সাদা হয়

কপালে গলায় কালো দাগ জমে

গভীর থেকে গভীরতর হয়

গ্রীষ্মের রোদে সবুজ শুকোয়

বলহীনা বৃদ্ধা চালসে-ঘন চোখে

শূন্যে তাকিয়ে থাকে!   

 

দুঃখ

কোথায় পালাব,

আর কতো হারানো যায়?

এই তো তোমরা ছিলে ক’জন

কাছাকাছি, গা ঘেঁষে

কিছু পরাগ, কিছু সুবাস,

কিছু উষ্ণতা মেখেছিলে!

 

ভালই ছিলাম

তবু আমার পালানোর স্বভাব গেল না

কিসের যে এত দুঃখ

অজগরের মতো ধেয়ে আসে

আর আমি উর্ধশ্বাসে ছুটে যাই 

অন্ধকারে বনের গভীরে!

 

আমি কিন্তু পৌষের সকালের 

প্রথম রোদের মতো বাঁচতে চেয়েছিলাম

ফুলের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলাম!

 

অপেক্ষা

সেই কবে থেকে বসে আছি

তুমি আসবে বলেছিলে

কথা ছিল আমরা হাত ধরে

পায়ে পায়ে হলুদ শস্য খেত পেরিয়ে

নদীর কাছে যাব!

 

কত খেয়া পার হল

ধান এল, বান এল

সবুজ বনানী পুড়ে খাক হল

পাখিরাও উড়ে গেলো সমুদ্রের দিকে

তবু তুমি এলে না!

 

পল্লীর সবাই এখন সীমান্তের ওপারে

ঠাকুরদার ছাউনি ভেঙে পড়ছে

ঝরা পাতার মত ভেসে যাচ্ছে

বৃষ্টিরাও আমায় নিয়ে ছেলেখেলা খেলে

মায়ের তুলসীতলা জুড়ে বিষাক্ত মাকড়

জাল বুনে ঢেকে দিয়েছে আমার জন্মভুমি

এখনো আমি অপেক্ষায় বেঁচে থাকি!  

     

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন