কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

স্মৃতিকণা সামন্ত

 

হর কি পৌড়ি

 


(১)

বয়স্ক কাকের মতো আমিও এখন তীর্থ প্রত্যাশী। গঙ্গার জলে জমানো পাপের নিরাময় খুঁজি, দানধ্যান সাধু সন্ন্যাসীও ভার কমায় খানিক। এইসব বিশ্বাস নিয়ে হেঁটে যাই নদীর দিকে রোজ। হরিদ্বারে যেখানে আছি সেটা সিন্ধিদের কথায় তীর্থাশ্রম, আসলে বেশ ভাল মানের এক হোটেল কিন্তু খরচ আশ্চর্য রকমের কম। কথামতো এও গঙ্গার গায়ে, গঙ্গা বয়ে গেছে সারা হরিদ্বার জুড়েই, পুণ্য সঞ্চয়ের ঠিকানা কেবল হর কি পৌরি ঘাট। গড়পড়তা পুণ্যার্থীর মতো আমিও সেই ঘাটের উদ্দেশে হাঁটি। পায়ে সওয়ার হওয়ার মারাত্মক কিছু সুবিধা থাকে, আছেও। তীর্থযাত্রী আর পর্যটকের পার্থক্যই হল আধুলি সিকি ছুঁড়ে দেওয়ায়। তীর্থযাত্রী যাতায়াতের রাস্তায় মন্দিরে গাছতলায় যেখানে খুশি দাঁড়িয়ে দু চারআনার বিনিময়ে পুণ্যসঞ্চয়ের কড়ার করে, আর পর্যটক ওই দু চারআনাই খরচ করে আরামের খোঁজে। হেঁটে যাওয়ার আরও এক গোপন কারণ থাকে, শহর চেনা। প্রতিটা জায়গার দোকান হাটবাজার ঘরবাড়ি বাইরে থেকে দেখে যতই একরকম মনে হোকনা কেন, আসলে এক মিহি পার্থক্য লেপ্টে থাকে সবসময়। বাইরে থেকে হঠাৎ চোখে না পড়লেও একটু নেড়েচেড়ে দেখলেই টের পাওয়া যায়। আমিও হাঁটতে হাঁটতে নাড়াচাড়া করি দোকানপাট, মানুষজন। মাথার ওপর সুনজর রেখেছে মার্চের সূর্য।রোদের তাপ টাটকা আশীর্বাদের মতোই মাথায় নিয়ে হাঁটছি। রিকশার ঠ্যালা, স্কুটারের গুঁতো, অটোর ধমক খেতে খেতে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। ঠান্ডাই, মটকা কুলফি, লস্যির দোকানগুলো তাকিয়ে আছে আমারই দিকে, কোনও নরম চোখের সুন্দরীর মতো।

বিনবিনে ভিড়, ভিনভিনে মাছির সাথে ধাক্কাধাক্কি করতে করতে চোখ চলে যাচ্ছে খাবারের দোকানগুলোর দিকে।

মস্ত সাইজের ছোলে বাটোরে, আর ভাত সবজি ভাজি একই দোকানে পাওয়া যায়। মিষ্টির দোকানগুলোর কাঁচের শোকেস ঠেলে গন্ধ বেরিয়ে পড়ছে রাস্তায়, জবজবে ঘাম গড়াচ্ছে কপাল বেয়ে। নিজেকে বেশ ওই মাছিদের দলের মনে হচ্ছে এখন। হাতা বেড়ি খুন্তি হাঁড়ি কড়াই আর কম্বল চাদরের পাশাপাশি দোকানগুলো এখনও লোকে ঠাসাঠাসি। তীর্থভূমির লিখিত নিয়মেই ঘনঘন রুদ্রাক্ষ গোপীচন্দন শালু আর স্টিলের ওপর পিতলের প্রলেপ দেওয়া বাসনকোসনের দোকান বসে আছে সার দিয়ে। ঘাটের যত কাছাকাছি আসি ততই বাড়তে থাকে সার দিয়ে বসা ভিক্ষুক আর মাছির ঘনত্ব। স্নান সারার আগে কিংবা স্নান সেরে ফেরার পথে পুণ্যার্থী উপুড় হাত হয়, বের করে আনে আধুলি সিকিটা, কেউ চাল ডাল। ভারতবর্ষের মতো দেশে এইসব লক্ষ লক্ষ ভিক্ষুকদের বাঁচিয়ে রাখার পিছনে ধর্মই সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। উল্টোদিকে এক ধর্মশালা, তারই নীচে লঙর বসেছে। দুপুরের রোদ ছায়া বাড়াতে বাড়াতে রেলিং টপকে নামে রাস্তায়। ভিক্ষুকের দল তখন লঙরে ছোটে। ঘাটের ধাপে নামতে নামতে সঙ্গী হয় সারমেয়। সে আমার সাথে স্বর্গ নাকি নরকের দোর অব্দি যাবে জানাতে ইচ্ছে হয় খুব। ভাষার চূড়ান্ত গরমিলে সেকথা তাকে জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না। সারমেয়টি পিছুপিছু আসে, বাঁয়ে পড়ে থাকে রাশিরাশি শিব বিষ্ণু বজরংবলী আর অত্যন্ত ক্ষমতাশালী নানান দেবদেবী।

হর কি পৌড়ির মুখে একটা এলেবেলে সাইনবোর্ড টাঙানো। রীতিমতো ধমক দিয়ে সরকারি নোটিস ঘাট চত্বরে যেন কোনোমতেই  কোনোরকম দান কিংবা চাঁদা না দেওয়া হয়।ফাইনাল ধাপে নামতেই পাশ দিয়ে কুলকুল বয়ে যায় গঙ্গা, বাঁধানো চাতালের নিরাপদ উচ্চতায় হাঁটি, পা ভেজেনা, রোদ পুড়িয়ে দেয় পা। শ্রদ্ধার সাথে খালি পা আর ঢেকে রাখা মাথার কি যেন নিবিড় এক সম্পর্ক আছে এদেশে। তাই জুতো খুলে রাখার ব্যবস্থা নানা জায়গায়।

একদল রাজস্থানী মহিলা স্নান সারছে। রঙিন ঘাঘরা হোলি খেলছে বুঝি নদীর জলে। জীবনের শেষ হিসেবটা চুকিয়ে ফেলার যেসব পারলৌকিক কাজ এইখানে এই ঘাটে সেসব সম্পন্ন হলে শিবলোকে পাকাপাকি থাকার ও মোক্ষ লাভের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে বারবার। সেই আশায় এই ভরা দুপুরেও কিছু মানুষ শ্রাদ্ধের কাজ সারছে ঘাটে, পুরোহিতরা নানান উপাচারের আলাদা আলাদা রেটের লিস্ট নিয়ে বসে আছে সারাদিন। শুধু ইচ্ছাটুকু প্রকাশের অপেক্ষা, বাকি ব্যবস্থা ওরাই করবে। যদিও উপকরণে হেরফের হবে না বিশেষ, কিন্তু বিশ্বাসে হেরফের হবে অবশ্যই।

আমাদের দেখেই পুরোহিত এক দশহাজারি শ্রাদ্ধে পৃথিবীর মাটি থেকে যাবতীয় পূর্বপুরুষদের সমূলে মুক্তির প্রস্তাব দিল। কিন্তু পেটে খিদে আর মাথায় রোদ নিয়ে সে প্রস্তাব খুব তেমন লোভনীয় মনে হল না, মোক্ষের যথাযথ বিপণন এবং বিজ্ঞাপনের অভাবও কি খানিক দায়ী রইল? ভাবতে ভাবতে ঠিক সেই টেবিলটার সামনে এসে পড়েছি। উর্দি পরা পাকানো গোঁফের লোক রশিদ লিখছে খসখস…

নাম--

বাবার নাম--

জেলা--

উর্দির প্রতি আজন্ম এক সমীহে ভুলেই গেছি ঘাটের মুখে টাঙানো শ্রীহীন সাইনবোর্ডের সতর্কবাণী। একশ টাকার নতুন নোটে আমার প্রথম পুণ্য অর্জনের গ্যারান্টি লেখা হয়। পবিত্র এই ঘাটের দেখভালের জন্য এই টাকা আমার ট্যাঁক থেকে গঙ্গায় বিসর্জনের সাক্ষী রইল একটা উদার রোদের দুপুর, কুলকুল জলের শব্দ আর এক উদাসীন সারমেয়।

 

(২)

তীর্থাশ্রমে সাজোসাজো ব্যাপার। গেটের মাথায় ফুলের মোটামোটা মালা, ধূপ সুগন্ধি। বয়স্ক ম্যানেজারমশায়ের মুখ আজ বেশ ভক্তি গদগদ, বেড় দিয়ে পরা সাদা ধুতি, সাদা হাফসার্ট, কপালে তিলকের টিপ। বাকি কর্মচারীরাও বেশ সাত্বিক পোশাকে, কিচেনে দুটো স্পেশ্যাল সবজি রান্না হচ্ছে সেদিন। সকালে চা খেতে যাওয়ার সময়  বলেছিল কুক ছেলেটি। আজ ওদের গুরুদেব  আসার কথা, সঙ্গে গুরুমা।

গুরু ব্যাপারটা ঠিক ওই এজেন্ট বা মিডল ম্যানের মতো। ঈশ্বরের সাথে ডাইরেক্ট কন্ট্যাক্ট করেন গুরু বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে, শিষ্য তার তুলনায় অনেক কম আয়াসে ঈশ্বরের সাথে নিজের রিলেশন তৈরি করতে পারে গুরু মারফত। কিংবা ধরা যাক, আর্কিমিডিসের থিওরি। স্কুলে পড়ানোর সময় মাস্টারমশাই এমনভাবে বলেন যেন উনি নিজেই আর্কিমিডিসের কাছে বসেছিলেন সেসময়। ছাত্রদের শুধু আস্থা রাখতে হয় মাস্টারমশাইয়ের পড়ানোয়, ভাল শিখতে পারলেই উৎরে যাওয়ার চান্স ষোলআনা। আমাদের দেশে গুরুপরম্পরার লম্বা ইতিহাস। একলব্য আর কর্ণের মতো শিষ্যও দুর্লভ নয়। কাজে কাজেই এদেশের যাবতীয় গুরু অসীম প্রতিপত্তির মালিক।

ম্যানেজার জানিয়েছেন গুরুদেব পদার্পণ করবেন সন্ধ্যায়।

পুরাণ যাই বলুক, হর কি পৌরির নামডাকের পেছনে ওই আরতি। আরতি শুরুর অনেক আগে থেকে এসে দখল করতে হবে সিঁড়ির ধাপ। রিকশা চড়ার সুবিধা হল যখন চলতে শুরু করে রাস্তাঘাট যেন ওপেন থিয়েটারের মঞ্চ হয়ে ওঠে ধীরেধীরে। চালক যদি দয়ালু হয় তবে সেই হয়ে উঠবে সূত্রধর। এই আশ্রমের ওপর তার এক অক্ষম রাগ।

-আপ ইসমে ঠেহরে?

-হাঁ, আচ্ছা হ্যায়।

-ইয়ে আশ্রম বোলকে বিজনেস কর রহে হ্যায়।

-লেকিন ইনতেজম তো বঢ়িয়া লাগা।

-হোগা হি, ইয়ে আশ্রমকে নাম পে হোটেল চল রাহা হ্যায়।

- ফরক ক্যায়া হ্যায়?

-টেক্স মে।

ভোটের সময় যেসব আমজনতাকে মূর্খ অনপঢ় বলে নেতারা আফিম খাওয়াতে আসে তারা দিলারামের রিক্সায় চড়ার পর সেই ভুল শুধরে নেবে নিশ্চয়।

দুপুরে যে চাতাল শুনশান ছিল প্রায় এখন সেখানে লোক ভরতে শুরু হয়েছে। চৌকি পাতা হয়েছে জায়গায় জায়গায়। যারা সিঁড়ির ধাপে জায়গা পাবে না তাদের জন্য নিশ্চয় এই ব্যবস্থা। সকালের একশ টাকা জলে ভেসে যায়নি ভেবে নরম হল মন খানিক। সিঁড়ির চেয়ে চৌকিই পছন্দ হল বেশী। সিঁড়িতে ভিড়ও খানিক, এদিকে চৌকি ফাঁকা। চৌকির উপরেই বসব।

বসতে গেছি কি যাইনি,হাঁ  হাঁ করে ছুটে এল চৌকির মালিক। সাদা ধুতি, শার্ট, গলায় ভাঁজ করা উত্তরীয়, মাথায় টিকি।

-পূজা করানা হ্যায়?

-নেহি।

-তব বৈঠনে কে লিয়ে এক এক আদিমকা পঁচাশ রূপেয়া লাগেগা!

মনের দুঃখে উঠে পড়ি। আজ অব্দি কোনোদিন কোনো বাসের কন্ডাক্টর আমার সাথে এমন ব্যবহার করেনি।

পরের খালি চৌকিটার আশপাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ আসে না। ভয়ে ভয়ে বসেই পড়ি। মালিক বোধহয় কোনও কাজে গেছিল। মুখ মুছতে মুছতে এসে বলে টিকট বানায়া?

কাউন্টার কোথায়! কেনই বা টিকিট!

বসতে হলে টিকট লাগবে। টিকট হল সাদা কাগজ টুকরো করে কেটে নাম্বার লেখা। টিকটের দাম ৭৫। ভিড় যত বাড়বে টিকটের দামও ঠিক তেমনই বাড়বে।

তৃতীয় চৌকির মালিক এক কমবয়সী ছেলে। কালো মুখে লাজুক হেসে বলে এই চৌকি পাতার জন্য ঘাট কমিটিকে পয়সা দিতে হয়। বসার জন্য তাই কিছু না পেলে সে উসুল হবে কি করে? টিকিটের দাম চল্লিশ।

ততক্ষণে ধাপেধাপে অগুনতি মাথা, আয় ব্যয়ের হিসেব ঢুকেছে আমার মাথাতেও। টিকিট কেটে ফেলি।

দুপুরের বিষণ্ণ ক্লান্ত সব দেবদেবীরা সেজেগুজে রেডি হচ্ছে। সাদা উনিফর্মে পুরোহিত, আর সারসার প্রদীপ। ভিড়ের মধ্যে গুনগুন, গমগম, হইহই। যারা আগে দেখেনি তারা উৎকন্ঠিত মুখে গলা বাড়িয়ে, যারা দেখেছে তারা ঠিক কতটা অভিজ্ঞ এবং কত অনায়াসে কি কি করে ফেলা যায় সেসব নিয়ে বিস্তারে জ্ঞান। কেউ কেউ বিরক্ত মুখ, তাদের বাচ্চা ট্যাঁ ট্যাঁ করে কাঁদছে।

ভিড়ের মধ্যে ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়ছে একদল নীল উর্দিধারী। ঘাটের সুরক্ষার বিষয় তবে ফেলনা নয়! সবাইকে ধমকে চমকে চুপ করানোর খানিক চেষ্টা করে শুরু হল ভাষণ।

পবিত্র ঘাটের এক বিরল মুহূর্তের সাক্ষী আমরা। মোক্ষদায়িনী মা গঙ্গার আশীর্বাদ সজোরে বর্ষিত হোক আমাদের মাথায়, টাক থাকলে তার দায়িত্ব মাথার মালিকের ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই যে এমন পুণ্য অর্জনের দুর্লভ সুযোগ তাতে সোনায় সোহাগা হতে পারে দেবী গঙ্গার পায়ে আমার পবিত্র দানে। যার যেমন সামর্থ্য...

কিন্তু, কিন্তু হ্যাঁ, দান একশ এক টাকা বা বেশী হলে তার নাম গোত্র বংশ বাবার নাম, ঠিকানা ইত্যাদি সগৌরবে ঘোষণা করা হবে, এই অগণিত পুণ্যার্থীর মাঝে। এমন মোক্ষম সুযোগ কে ছাড়তে চায়! একটা একশ টাকার নোট আসতেই গড়গড় করে তার ডিটেল বলে যায় নীল উর্দি, চোখের সামনে এমন সাফল্য অনেককেই অনুপ্রেরণা দেয়। তারই মধ্যে পরজন্মের এবং ইহজন্ম সম্বন্ধে একটু অবিবেচক যারা তারা কেউ দশ বিশ পঁচিশ এবং কেউ বা লবডঙ্কা ঠেকায়। তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনও গ্যারান্টি এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয়।

জলে সন্ধ্যার ছায়া পড়তেই শুরু হয়ে গেল গঙ্গা আরতি। রড বের হওয়া সিমেন্টের খাঁচার মন্দিরগুলোয় কান পেতে বসল ছোট বড় মেজ দেবদেবীরা। জনতা আর দেবতার মাঝে সীমানা টেনে কুলকুল বইছে পতিতপাবনী গঙ্গে। নর্দমার সাথে ঘোলা জলের কোনও তফাৎ নেই সেই মুহূর্তে। জলের বুকে তিরতির কাঁপছে প্রদীপের ছায়া, অন্ধকার গাঢ় হয়ে নামছে হর কি পৌরির চাতালে।

কালো রঙের হন্ডা সিটি এসে থামল গেটের সামনে। ফুল জল টীকায় এলাহী আয়োজন। ম্যানেজারের জোড় হওয়া দুই হাত আলগা হয় না কিছুতেই। কর্মচারীরা ব্যস্ত। সাদা কুর্তা চুড়িপা'য় গুরুদেব নামলেন, মাথায় ফুল বর্ষিত হল। নামলেন গুরুমা। ডেনিম আর লখনৌ স্টিচের কাঁচা হলুদ শর্ট টপে গুরুমা নয়নহরণ। বুকের কাছে ঝুলছে দুপুরের সানগ্লাস, এলায়িত কেশ লীলায়িত হাসি গুরুমা গুরুদেবের পাশে পারফেক্ট ফিট। দুহাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ভেতরে গেলেন গুরু আর গুরুমা। আরও একবার জয়ধ্বনি দিল সবাই। এই বিল্ডিঙের ফ্রন্টডেস্কে,সিঁড়ির পাশের দেওয়ালে, কিচেনের কোণে কোণে ঝোলানো এই পরম শক্তিমান গুরুর ছবি। শিবের সাক্ষাৎ অবতার স্বরূপ এই মহাপুরুষ গুরুপ্রথার প্রতি আমার উৎসাহ যোগাল এবং ভক্তির যেখানে যেখানে জল সেখানে উৎসাহের ধূলিকণা মিশে তৈরি হল থকথকে কাদা, এইই আসল ভক্তি গদগদ অবস্থা ভেবে আমিও নিশ্চিন্ত হলাম।

আমার মতো অনেকেই ফিরছে আরতির পর। অনেকের হাতে বোঁচকা বাঁধা চাদর সোয়েটার। লুধিয়ানার পশমী পোশাক হরিদ্বারের মাহত্ম্যে হাবুডুবু খেতে খেতে ট্রেনে চড়ে পাড়ি দেবে ভারতের ঘরে ঘরে। 'তেরা দেশ মেরা দেশে'র আদর্শ উদাহরণ। উদাহরণ নদীটিও। গোমুখ থেকে নামতে নামতে পুণ্যের ঢল বাইতে বাইতে, শহর আর শহুরে কারখানার পাপ লাঘব করতে করতে বহু উঠোন বাগান মাঠ ঘাট টপকে যখন সাগরের কাছে যায় তখন সে আর কিশোরী মেয়েটি নেই। জীর্ণ স্থবির কলঙ্কময় জীবনের বোঝা নিয়ে সাগরের কাছে সুখ খোঁজে নদী। সে তখন মাতা নয়, দেবী নয়, নেহাতই এক ভারাক্রান্ত নারী।

সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে নামে হর কি পৌরির ঘাটে। বাঁধানো চত্বরে আলো নেই বিশেষ, অন্ধকারে প্রদীপের আলো বহুদূর দেখা যাওয়ার অব্যর্থ ব্যবস্থা। বিকেলে যাদের দেখিনি তারা সন্ধ্যায় এল। ঝোলায় কিংবা ঝুড়িতে পাতার বাটি, তাতে ফুল, কর্পূর। কর্পূর জ্বেলে জলে ভাসিয়ে দিলেই তরতর করে টেনে নিয়ে যাবে স্রোত। ভাসানোর সময় মনস্কামনা জানানোর নিয়ম,যদি সেই বাটি ভেসে যায় প্রদীপ সমেত তবে তো ইচ্ছেপূরণ রোখে কার সাধ্যি, আর উল্টে গেলে বিধি বাম।

তের চোদ্দ বছরের ছেলেটাকে ইগনোর করা গেল না কিছুতেই, কিন্তু। আমার বাটি ভাসানোর পর পরই প্রদীপ নিভে উল্টে গেল। ব্যাপারটা সুবিধার নয় মোটে। এমনিতেই ভয়ঙ্কর পাপীতাপী মানুষ, তাও মাঝ নদীতে যাওয়ার আগেই ভরাডুবি হওয়া চূড়ান্ত না ইনসাফি। মনে সন্দেহ হল তবে কি বিকেলে একশটা টাকা অন্ততঃ দেওয়া উচিত ছিল আমার?

আর এত লোকজনের মধ্যে গঙ্গামাইয়া আমাকেই ঠিক নোটিস করলেন! ভীষণ অভিমানে গলা বুজে এল। কুলকুল করে গঙ্গা তখন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শয়ে শয়ে প্রদীপ জ্বলা বাটি, অন্ধকারে আশার মতো উজ্জ্বল ইচ্ছেপূরণের নাও। প্রদীপ ভেসে যাচ্ছে ঘাট ছাড়িয়ে দূরে, আরও আরও দূরে।

গুরুদেবের পা মোছানো আশীর্বাদী কাপড় মুখে মাথায় ঘষছে ম্যানেজার মশায়। গুরুই স্বয়ং শিব, অন্ততঃ আখড়ার প্রচার তাই বলে। প্রদীপ সমেত যেসব বাটি ভেসে গেল জলে তারা সব আটকে পড়ল করপোরেশনের পাতা লোহার জালিতে। মনোষ্কামনার তরীগুলি থেমে গেল কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে। শুধু সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মুগ্ধ তীর্থযাত্রী নিশ্চিন্তে ফিরে গেল ঘরে ইচ্ছেপূরণের অপেক্ষায়। রাত আরও গভীর হওয়ার আগেই গুরুদেব ফিরে গেলেন হোটেলের ঘরে। শীতল এক রাত নামল হরিদ্বারে।

 

 

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন