![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৮ |
পালা ভাঙার পরে
কলকাতায় নয় নয় করে থিয়েটারের এখনো মোটামুটি বাজার আছে। এই তো আমি পেশাদার অভিনেতা, রোজগার ভালই হচ্ছে। ‘চন্দ্রশোভা’ নাটকের মূল চরিত্র পরাগ সেন আমিই করছি। নায়িকার নাম কুসুমিকা। নতুন মেয়ে, তবে মন্দ অভিনয় করে না, দেখতেও সুন্দরী। মাঝে মাঝে একটু যেন মন টানে। তারও কি আমাকে কিছু মনে হয়? কে জানে। তবে নাটকের নায়ক হিসেবে মন পাওয়ার অধিকার তো আমার আছে!
সেদিন নাটক শেষ হবার পর রোজকারের মতো ড্রাইভারকে গাড়ি আনতে বললাম। সে বলল, “স্যার. এসিটা চলছে না বলে দোকানে এনেছিলাম। মিস্ত্রিকে গাড়ির অনেক কিছু খুলতে হয়েছে। কালকের আগে পাওয়া যাবে না। আপনি স্যার আজ অ্যপ-ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসুন!”
কী আর করা যাবে, ট্যাক্সি বুক করলাম। একটু পরেই ফোন টিং করে ওঠাতে দেখলাম ওই ট্যাক্সি আসবে না। পরেরটা আসতে সতেরো মিনিট। উফ, বিরক্তিকর। মঞ্চের একপাশে ঠায় বসে আছি - এখন গোটানোর পালা চলছে। পরাগ সেন কেষ্টবিষ্টু ধরনের লোক, তার সাজানো বৈঠকখানা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। যে গদি আঁটা চেয়ারে পরাগ বসে, সেটা আসলে পুরনো রংচটা প্লাস্টিকের চেয়ার একটা। ওপরে লাল গদিটদি চাপিয়ে সাজানো। গদি তুলে ফেলাতে ওটকে কেমন যেন নগ্ন বিশ্রী দেখাচ্ছে। অন্য আসবাবও সরানো হয়ে গেল। এদিকে কুসুমিকা মেকআপ তুলে সাজঘর থেকে বেরিয়ে ডাকল, “মুকুলদা…” বলতে বলতে মুকুল ওদিক থেকে এসে হাত ধরাধরি করে কুসুমিকাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি বসে বসে দেখলাম। মুকুল ভিলেনের পার্ট করে – ওর হাত থেকে পরাগই কুসুমিকাকে রক্ষা করে এসেছে গত দুঘণ্টা ধরে।
ভাবছিলাম, এতগুলো লোক – কেউ তো আমাকে জিজ্ঞেস করল না, কেন বসে আছি? গাড়ি লাগবে কি না? আমি তো বড়সড় চরিত্রেই ছিলাম, তবে? আমি কারোর কাছেই কি কিছু নই? না কি নাটক শেষ মানে সব শেষ! সুজিত সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল, একটা কথাও বলল না। নাটকের মধ্যে সুজিত পরাগের প্রাণের বন্ধু।
একলা বসে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। এতক্ষণ ছিলাম পরাগ সেন। নাট্যকার যেমন লিখেছেন তেমন কেউ বন্ধু, কেউ প্রেমিকা, কেউ শত্রু হয়ে মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। আর এখন? এখনকার আমি মানুষটা কে? পরাগ সেন তো নই, কারণ নাটক শেষ, দর্শকরাও চলে গেছে। মঞ্চের এক কোণা থেকে সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে আমার অভিনয়ের ফ্ল্যাশব্যাক দেখতে পাচ্ছি যেন। কত দুঃখ, কত সুখ, কত প্রেম, কত সখ্য, কত অপ্রত্যাশিত ঘটনা…। আমি তার ভেতরে ছিলাম, মনপ্রাণ দিয়ে অভিনয় করছিলাম। এখন তারা নেই, সাজানো মঞ্চও নেই। আমি তাহলে কে, আমি কেন, আমার কি কিছু করার আছে?
বিশুর কথায় ঘোর ভাঙল। “সব হয়ে গেছে, এবার হল বন্ধ করব…”
আমি উঠলাম। যবনিকা পড়ার পর যে এমন হয় তা জানতাম না। এর মধ্যে কোনো মানে উঁকি দিচ্ছে কি? জানি না। তবে ব্যাপারটা একটুও ভাল লাগছে না। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। উফ, কতক্ষণে যে ট্যাক্সিটা আসবে…

এই ব্যাপারটা শুধু মঞ্চের 'নাটক'-এ নয়। জীবনের 'নাটক'-এও সতত ঘটতে দেখা যায়। বাঘা বাঘা সাহেবরা চাকরি থেকে অবসর নেবার পরের দিনই কেমন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যান। শুধু 'দেহপট' নয়, 'চিত্তপট' থেকেও বিদায় নিতে হয় অকস্মাৎ। এই পরিবর্তনটি কে কেমন ভাবে স্বীকার করতে পারেন সেটাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়টি স্বপ্রকাশ করে তোলে।
উত্তরমুছুনভালো লাগলো ,
চরিত্র ও ভূমিকা - অর্থে, ক্যারেক্টার এবং রোল - এই দুটো শব্দ অনেক সময় একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও - এ দুটি বস্তুত আলাদা বটে । জীবনকেও রঙ্গমঞ্চ বলা হয়েছে কারণ জীবনের চরিত্রগুলোর ভিত্তিতেই ভূমিকা সাজানো হয়ে থাকে । আর অভিনেতাদের ভূমিকা অনুযায়ী নিজেদে সাজতে হয় । এখানেই প্রমাদ ঘটে। যারা বাড়ি যাবার আগে নিজেদের ভিতরের আর বাইরের মেক আপ মুছে নিতে পারে - তারা উভয় ক্ষেত্রে ভরসাম্য বহন করে বাঁচার মত করে বাঁচে আর যারা একজয়গায় আটকে যায় তাদের জীবনে নৈরাশ্য সাথে হয় ।
উত্তরমুছুন