কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

অম্লান বোস

 

সমকালীন ছোটগল্প


সংলাপ - এপার ওপার

--এপাড়ায় এসেও সেই একই রকম দেরী? আগেকার মতো শরীর থাকলে তো এই ভীড়ের চাপে এতক্ষণে গম পেষাই হয়ে, ঘামে ভিজে ময়দার লেচি হয়ে যেতাম।

--না না, কী করব! দেখো না, বেরোতেই দেরী হয়ে গেল।  

--সে তো দেখতেই পাচ্ছি। সারা জীবনের অভ্যেস কি আর এত তাড়াতাড়ি ধুয়ে ফেলা যায়? কত চেনা লোক দেখছি গডিয়াহাটে, কোন কথাই বলতে পাচ্ছি না। কোলাকুলি, হাতমেলানো সবই তো কোভিডের গুঁতোয় বন্ধ।

--সেটা মানছি, তবে আমাদের তো এখন কারুর সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থাও নেই!  

--হ্যাঁ, সেটা সত‍্যিই। তবে দেরী হবার কারণটা তো জানা গেল না? আজকাল তো আর হেমা মালিনীর মত  মেকআপের দরকার নেই - চেনা বামুনের পৈতে লাগে না। তাও আবার ১৮ বছরের চেনা!

--উফ্ - কী ভীড দেখেছ? ভাগ্যিস আজকাল আমাদের আর নতুন করে কেনাকাটার দরকার পড়ছে না, সব দেওয়া নেওয়ার সম্পর্কগুলো তো কাট-অফ্ হয়েই গেছে। আচ্ছা, বলো তো আজ হঠাৎ এখানে আসতে বললে কেন এত দিন বাদে?

--অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কথাটা - তোমার চলে যাবার দিনেই কী করে…

--এখন আর বলতে বাধা নেই, সেটাই তো অবশ্যম্ভাবী ছিল - তাই না? তোমার সৃষ্টি করা নাটক আর অশান্তি আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। একটা এসপার নয় ওসপার করার কথা আমাকে সারাক্ষণ ভাবাচ্ছিল।

--কেন মহুল, আমি তো তোমাকে বুঝিয়ে বলেইছিলাম…

--আমি জানি সেটা কোনদিনই সম্ভব হত না। তুমি কোনমতেই রেশমীকে ছাড়তে পারতে না। মোবাইল-এ বাই চান্স ওর আল্টিমেট মেসেজটা দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ওর জন্যে তুমি আমাকে একেবারের মত সরিয়ে দিতেও তৈরী।

--আহা - থাক না ওসব কথা…

--কেন, থাকবে কেন? আমি তোমাকে অনেকবার বলেছিলাম ওর হাবভাব, চালচলন, তোমার সঙ্গে ন্যাকামি,  ওর চাউনী, খোলা আকাশের মত সাজপোষাক আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। তুমি একদিকে ওর সঙ্গে অশ্লীল সম্পর্ক ক্রমাগত অস্বীকার করে গেছ, আর অন্যদিকে আমাকে পৃথিবী থেকে সরাবার প্ল্যান করছ।

--অশ্লীল সম্পর্ক? কী বলতে চাইছ তুমি? আচ্ছা মহুল, শোন এই গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজে, হকারদের চিৎকারে ভালভাবে কথা বলা যাচ্ছে না। চলো না, আমাদের পুরনো জায়গা ওয়েসিসে বসে একটু শান্তিতে কথা বলি?

--যেতে চাইছ যখন, চলো। তবে তুমি সারা জীবনে যা অশান্তি করে গেছো, এখন শান্তি খুঁজছো কী বলে?

--আরে চলোই না -  প্লীজ্!

* * * * * * * *

ইয়াশ আর মহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওয়েসিস-এর কোণার দিকে একটা আলো অন্ধকার টেবলে গিয়ে স্থিতু হল - কারুর দৃষ্টি আকর্ষণ না করেই। বিয়েবাড়ির নতুন ডিজাইনার্স গয়না, শাড়ি বা চোখটানা ড্রেস ছাড়া আজকাল অবশ্য কেউ কারুর দিকে নজরও দেয় না। আর এই সময়টাতে, এত বেশী গোলমালে, আলোর মধ‍্যে আজকাল কেউ বসতেও চায় না রেস্টুরেন্টে এসে, তাই কিছুক্ষণের জন্যে নিশ্চিন্তে থাকা যাবে।

এবার মহুল বললো -- হ্যাঁ, বলো কী বলছিলে?

--বলছিলাম, তুমি যেদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, ঠিক সেদিনই…

--হ্যাঁ, তোমার জানার কথাই নয়। কারণ, তুমি তো জানতে না  ৬-৭ দিন আগে তোমাদের ফোনে কথাবার্তায় আর মেসেজে শুনতে পেয়েছিলাম, পরের মাসের ২২ তারিখেই তোমরা রেজিস্ট্রী করতে যাবে এবং ধর্মীয় রেকর্ডটা পরিস্কার রাখতে হলে তার আগেই আমার একটা ব্যবস্থা করা তোমাদের অতি অবশ্যই দরকার ছিল।

--এখন তো বলতে বাধা নেই, সেটা সত্যিই। আমি সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম - আর রেশমী দিন দিন মারাত্মক হয়ে উঠছিল। ভীষণভাবে ব্ল্যাকমেলিং করছিল আমায়, অফিসের কোলিগদের সঙ্গেও যোগসাজস চালাচ্ছিল। তাই সকালে উঠে বারান্দায় আর বাইরের ফুলগাছগুলোতে রোজ নিয়ম করে তোমার জল দেবার সুযোগটা নেবার চেষ্টা করেছিলাম। আগের দিন রাত্তিরেই রেলিঙের সব বোল্টগুলোকে আলগা করে রেখেছিলাম। ঝুঁকে পড়ে রোজকার মত জল দিতে বা হাত বুলিয়ে আদর করতে গেলেই তো রেলিংটা…

--হ্যাঁ হ্যাঁ, জানতাম আমি। তুমি যখন তোমার ঐ বিবাহিতা বেশ্যাটাকে বোঝাচ্ছিলে তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম তোমরা একটা মারাত্মক প্ল্যান করতে চলেছ। আমি বুঝেছিলাম যে, আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এবং আমাকে খুব তাড়াতাড়ি একটা কাউন্টার অ্যাকশন নিতে হবে, তাই শুরু করলাম বাথটাবে ইলেক্ট্রিক  শকের নাম করে ইলেক্ট্রিশীয়ান তরুণকে প্রায় রোজই ডাকা। তোমাকে দিয়েই ডাকাতাম, মনে আছে?

--তা আমি কিন্তু কোনদিনই শক খাইনি।

--তুমি অনেকবারই এ কথা বলেছ। সত্যি শক মারতো নাকি আমাকে, যে তুমি শক খাবে? ওটা তো বারবার বলে মিথ্যেকে সত্যি করার জন্যেই। তরুণকে বড় অঙ্কের টাকা ধরিয়ে ব্যবস্থা করতে হয়েছে না? হাই ভোল্টেজ কারেন্ট - জলের টেম্পারেচার একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় এলেই মারাত্মক শক্ মারবে।  

--উফ্ - আর আমি ভেবেছিলাম, তুমি যখন ফুলগাছে সোহাগ ভরে আদর করে জল দিতে গিয়ে রেলিং ভেঙ্গে আটতলা থেকে নিচে বাঁধান চাতালে পড়ে যাবে, তখনই আমি চান করতে ঢুকবো। তোমার খবর নিয়ে শশব্যস্ত কাজের লোকজন, আতঙ্কিত বাসিন্দারা, সিকিউরিটি গার্ড সবাই জমা হয়ে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজা ধাক্কা দেবে, বেল বাজাবে, আমি তখন বাথটাবের প্রায় ফুটন্ত গরম জলের নিবিড় আলিঙ্গনে। ভেজা গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে দেরী করেই দরজা খুলব। সবাই জানবে আমি এ ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ জানি না - অ্যালিবাই পরিষ্কার। কিন্তু তুমি? তুমি ঐ সাংঘাতিক শক্ থেকে বাঁচতে কী করে?

--আমার অসুবিধা নেই কারণ, আমি তোমার মত জল অত বেশী  গরম করি না, তাই আমার কোন রিস্ক্ নেই। আর, তুমি জানো যে আমি বরাবরই চান করি তোমার আগেই, অনেক কম টেম্পারেচারে, তারপর গাছে জল দিয়ে, ফুল তুলে পূজোয় বসি। সব হয়ে যাবার পরে সময় করে একবার তরুণ এসে কানেকশানটা ঠিক করে দিয়ে যাবে আর জেরার সময় পুলিশকে ও হলফ করে বলবে যে তুমি ওকে বারবার ডেকে লাইন টাইনগুলো চেক করতে বলেছ। সত্যিই লাইনে একটা অদ্ভুত শর্ট সার্কিটহোত কখনো কখনো, বারবার চেষ্টা করেও ধরা যাচ্ছিল না ।

--উফ্! কী সাংঘাতিক প্ল্যানিং তোমার!

--আর আমি? তোমার পড়ে যাওয়াটা দেখেই আমি ছুটে বাথরুমের দিকে গেলাম। বাথরুমে ঢোকার ঠিক আগেই, নীচে ধূপ্ করে একটা জলভরা হাঁড়ি ফেটে যাওয়ার আওয়াজ আর মুহূর্তের মধ্যেই অশান্ত উত্তেজনার কলরব শুনতে পেলাম। নিশ্চিন্ত মনে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে জলভরা টাবটাতে শুয়ে পড়ে গীজারের সুইচ চালিয়ে দিলাম।  জলটা খুব তাড়াতাড়িই গরম হতে শুরু করলো।

দুজনেই এখন নিথর নিস্তব্ধ, দুজনের মুখের দিকে দুজনের শীতল দৃষ্টি। মানুষজন আসতে শুরু করেছে এবার। কাস্টমারদের নিচু, চাপা গলা, পানপাত্রে তরল পানীয় ঝিরঝির করে ঢালা আর গ্লাসে ঠোকাঠুকির মিষ্টি টুংটাং আওয়াজ হাল্কা আলোয় একটা স্বপ্নের ঘোর সৃষ্টি করেছে। এই টেবিলটাও এখন আর খালি পড়ে থাকবে না। দুজনের কথাবার্তাও শেষ। একটা লম্বা নি:শ্বাস ফেলে ইয়াশ উঠে দাঁড়িয়ে মহুলের চোখে চোখ রেখে বললো, বোঝা গেল। চলো, ফিরে যাই এবার।

পাশের টেবিলের সিজলার চিকেনের গরম ধোঁয়ার পাশ কাটিয়ে, শশব‍্যস্ত বেয়ারাদের যাতায়াতের তোয়াক্কা না করে, ঠান্ডা হাওয়া সাঁতরে ওরা বন্ধ দরজাটার মধ্যে দিয়ে অবলীলায় ভেসে বাইরে চলে গেল সবার অগোচরে, দরজার ঠিক বাইরেই অপেক্ষারতা একঝাঁক কল্লোলিনী তরুণীর ফাঁপানো চুলের ঢেউ-এ শীতল শিহরণ তুলে -

কেউ কিছু বোঝার আগেই অবয়বহীন বিদেহী আত্মা দুটি নিবিড় অন্ধকারে আকাশে মিলিয়ে গেল।

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন