কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / দ্বিতীয় সংখ্যা / ১৪১

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য

 


(৬)

অবঘর্ষণ

আবার ইন্দ্রপুরী অ্যাপার্টমেন্টে পা রাখতেই মনের ভিতর কেমন এক বিবমিষা ছেঁকে ধরল। এতো চাকচিক্য, বৈভবের আড়ালে কতো অন্ধকার লুকিয়ে আছে এভাবে, কেই কি জানত? প্রাচীন শুরু তো সংহিতায়। শবব্যাবচ্ছেদকারী চিকিৎসক মৃতদেহে তেল মাখিয়ে তার উপরের চামড়ার আচ্ছাদনকে সরিয়ে ফেলার পদ্ধতিকে 'অবঘর্ষণ' বলা হয়েছে। শুভায়ু দের রহস্যমৃত্যুর মাত্র দশদিনের মাথায়ই সুনন্দর খবরটা যেন আমাদের সেই অবঘর্ষণের দিকেই আকৃষ্ট করে চলেছে। যে ফ্ল্যাটে প্রথমে দেখেছিলাম সুনন্দকে, সেই ফ্ল্যাটেরই বাথরুমে আজ তাকে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম। কতো অনিশ্চিত এই জীবন। ঘটনার আকস্মিকতা বোধহয়  আশুদাকেও ভিতর থেকে বিচলিত করে তুলেছিল। আশুদা বিচলিত হলে বাইরে থেকে বোঝা যায় না। শুধু তার চোখের মণিদুটি আরও ক্ষীপ্রতর হয়ে ওঠে। আর তার চলন আরও ধীরস্থির। আশুদা শান্ত চোখে দূর থেকেই সুনন্দর বডিটা দেখছিল। বাথরুমে বাথটাবে গা এলিয়ে পড়ে আছে সুনন্দ। মুখে ফ্যানা দেখে মনে হতেই পারে, কোনও বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু ঘটেছে। বাথটাবে আধভর্তি জল সামান্য রক্তাভ। সুনন্দ  ডানহাত বাথটাবের বাইরে এলিয়ে পড়ে আছে। মাথা এলিয়ে রয়েছে সেই হাতের ওপর। হাতের দিকে তাকিয়ে চোখ স্থির হয়ে গেল আমার। সুনন্দর হাতে উনালোমের উল্কি। সেই উনালোমের উপরে তিনটি বিন্দু। ট্যাটুর নীচে একটি মাছের ট্যাটু। শরীরে আর কোথাও কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই। তথাগত আমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। আশুদা বলল, "ফরেন্সিক এসেছিল?" তথাগত ঘাড় নাড়তেই আশুদা বলল, "আমাকে রিপোর্টটা পাঠাতে বলো।" বাইরের ঘরে শোকস্তব্ধ নবনীতা বসে আছেন। আশুদা আমাকে সুনন্দর মৃতদেহের কয়েকটা ছবি তুলে নিতে বলে সোফায় গিয়ে বসল।

ঘরের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে আশুদা তথাগতকে জিজ্ঞেস করল, "সুনন্দর বাড়ির লোককে তো একটা খবর দিতে হবে!" আশুদার কথা শুনে নবনীতা বলে উঠল, "ওর কোনও বাড়ির লোক নেই। শুভায়ু ওকে নতুনগ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিল। শুনেছিলাম ওর মা নাকি পাগলি হয়ে ধুলো মেখে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। একদিন একটা গাড়ি তাকেও পিষে দেয়।" আশুদা নবনীতার কথা শুনে নিজে নিজেই বলল, "বুঝলাম।" ঘরের প্রকাণ্ড কাঁচের জানালার বাইরে অন্য ঘরগুলি যেন উঁকি মারছে। আশুদা সেইদিকে তাকিয়ে নবনীতাকে বলল, "সুনন্দ এই বাড়িতে কতো বছর ছিল?"

-বছর বারো তো বটেই।

-ওর শরীরে তো একটা অসুখ ছিল। আমার ধারণা সেটা ট্যুরেট সিণ্ড্রোম। কখনও তার চিকিৎসা করা হয়েছিল?

-একবার একজন নিউরোলজিস্টের কাছে নিয়ে গিয়েছিল শুভায়ু। কলকাতাতেই। ওষুধ দিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু। কিন্তু ছেলেটি খেতে চাইত না। মাঝেমাঝেই মুখে নিয়ে ফেলে দিত।

-এই ঘটনাটা কীভাবে ঘটল?

নবনীতা যা বলল, তা একত্র করে দাঁড়ায়, দুপুরে স্বাভাবিক খাবারদাবার খেয়েছিল সুনন্দ। শুভায়ুর মৃত্যুর পর এই বাড়ির কাজ এখন অনেক কমে গেছে। খাবার খেয়ে স্নানের ঘরে ঢোকার পর বেশ কিছুক্ষণ সারা শব্দ না পেয়ে রান্নার মেয়ে বীণা দরজা ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দেয়। এরপর ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি ডেকে দরজা ভেঙে ফেলার পর সুনন্দর দেহ ওইভাবে পাওয়া যায়। বীণাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তেমন লাভ হল না। "আমি কিছু জানি নে বাবু" বলতে বলতে ভয়ে থরথর করছিল সে। আমরা বেরিয়ে আসার সময় আশুদা নবনীতাকে বলল, "আপনার কাছে একটা খবর জানার ছিল ম্যাডাম। বাঙ্গালোরে আরতি ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ছাড়া আর কোথাও কখনও চিকিৎসা করিয়েছিলেন শুভায়ু?" নবনীতা মাথা নেড়ে জানাল, তার জানা নেই। বেসমেন্টে হাঁটতে হাঁটতে তথাগত জিজ্ঞেস করল, "কী মনে হচ্ছে আশুদা? এটাও কি আরেকটা অস্বাভাবিক মৃত্যু?" আশুদা ভেবে বলল, "নাও হতে পারে। ছেলেটার ট্যুরেট ছিল। তার সঙ্গে কোমর্বিড এপিলেপ্সি থাকতেই পারে। ডাক্তারি শাস্ত্রে ট্যুরেটের সঙ্গে মৃগীরোগ হামেশাই দেখা যায়। ওষুধ খেত না ছেলেটা। ফলে হয়তো একটা স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাস হয়েছিল। হতেই পারে। তবুও মেডিকেল ওপিনিয়ন নিয়ে একবার ময়নাতদন্তে অবশ্যই পাঠিও। আমার মনে হয়, পিজিতে অর্কর সিনিয়র সম্বরণকে দিয়ে অটপ্সিটা করাও। ওর উল্কিটা আমি একটু পরীক্ষা করে দেখতে চাই।"

গাড়িতে উঠে বাড়ি ফেরবার পথে আশুদা হঠাৎ বলল, "আচ্ছা অর্ক। পাখির ছবি দেখলেই তোর কী মনে হয়?" আমি ভেবে বললাম, "পাখিটা আকাশে উড়ছে।" আশুদা সন্তুষ্ট হয়ে বলল, "ঠিক তাই। এবার বল তো। মাছের ছবি দেখলে তোর কী মনে হয়?" আমি ভেবে বললাম, "জলে সাঁতার কাটছে।" আশুদা হেসে বলল, "একদম ঠিক। এবার ভেবে দেখ। শুভায়ু দের শরীরে পাখির ট্যাটু ছিল। শুভায়ুর মৃত্যু হল উঁচু জানলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে। অর্থাৎ অনেকটা আকাশে ডানা মেলে ওড়ার মতো। আবার সুনন্দর মৃত্যু হল জলে ডুবে। সুনন্দর হাতে মাছ আঁকা। যেন সুনন্দ সাঁতার কাটতে কাটতে ডুবে গিয়েছিল।" আমি চমকে উঠে বললাম, "তার মানে এগুলো যদি হত্যা হয়, তার একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে।" আশুদা এবার উৎসাহী হয়ে বলল, "ব্রাভো অর্ক। ঠিক তাই। আততায়ী এক বা একাধিক, যেই হোক, এই ট্যাটুর ভিতর দিয়ে হয়তো তার হত্যার প্যাটার্ন ইঙ্গিত করছে। আমার কী মনে হচ্ছে জানিস?"

-কী?

-নবনীতা অনেক কিছু জানে। ও সবকিছু ঠিকঠিক বলছে না।

আমিও ভাবতে লাগলাম। সত্যিই তো। দু দুটো মৃত্যু তার সামনে ঘটে গেল। অথচ সে কোনও লিড দিতে পারল না। এটা অসম্ভব।

-আরো তথ্য পেলাম, জানিস অর্ক। দোলনচাঁপা নামে কিন্তু সত্যিই একজন বার সিঙ্গার ছিল যার মিসিং ডায়রি আজও লেখা আছে কলকাতা পুলিশের খাতায়। তথাগত জানাল। আমি খোঁজ নিতে বলেছিলাম। এর অর্থ বিনতা আমাদের মিথ্যে বলেনি। তবে আপাতত একটা জায়গায় নিয়ে চল আমাকে। একটু দেখে আসি। একটা সন্দেহ হচ্ছে। নির্মূল হওয়া দরকার।

আমরা চিৎপুরের দিকে এগিয়ে চললাম। একটা লোহা কারখানার সামনে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল আশুদা। সন্ধ্যা নেমে গেছে। আমরা এরপর একটা সরু গলি দিয়ে হাঁটতে থাকলাম।

মনে হচ্ছিল এই পাড়াটা পাইকারি রসদের গোডাউনপাড়া। বেশির ভাগ গোডাউনেই অন্ধকার নামলেই শাটার নেমে যায়। খানিক হাঁটার পর পরম বিস্ময়ে চমকে উঠলাম। একটা হুড পরা ছায়ামূর্তির দিকে আশুদা এগিয়ে গেল। কথোপকথন হলো খানিক। তারপর সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "ভালো আছেন অর্কবাবু?" আলোআঁধারি আর গলার স্বরে আমার চিনতে ভুল হলো না। ছায়ামূর্তিটি আর কেউ নয়, সোহরাব চক্রবর্তী। ত্রিনেত্র রহস্যভেদের সময় কলকাতার স্টুডিওপাড়ার এই প্রতিভাবান সিনেম্যাটোগ্রাফারের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছিল। সোহরাবের সঙ্গে আশুদা কখন যোগাযোগ করল কে জানে! তবে বুঝলাম, আপাতত আমার মনের উৎকণ্ঠা প্রশমিত করেই রাখতে হবে।

সোহরাব আমাদের সরু গলি দিয়ে একটা বড় লোহার গেটের সামনে নিয়ে এল। গেটের ভিতরের ছোট আরও একটি গেট সামান্য ধাক্কা দিতেই খুলে গেল ভিতরে। আমরা ঢুকে পড়লাম তার ভিতরে।

বড় গোডাউনে থরে থরে বড় বড় কার্ডবোর্ডের কার্টন রাখা। আশুদা মোবাইলটর্চের আলো ফেলে কার্টনের উপর লেখা লেবেলগুলো দেখছিল। দু একটি ছবিও তুলে নিল। গোডাউনের এক প্রান্তে একটা ছোট্ট ল্যাবও আছে। সেখানে একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। সোহরাব সেখানে টেবিলের সামনে বসে থাকা অল্পবয়সী ছেলেটিকে গিয়ে কি সব বলল। ছেলেটি ঘাড় নেড়ে আমাদের ল্যাব খুলে দিল। ল্যাবে ঢুকে বুঝলাম গোটা গোডাউনটাই আদপে একটা ওষুধ তৈরির কারখানা। ল্যাবে খানিক এটা সেটা দেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।আমরা বের হতেই ছেলেটি ভিতর থেকে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। সোহরাব আমাদের সঙ্গেই গাড়িতে উঠে পড়ল। আশুদা বলল, "তোমাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই সোহরাব। যেভাবে তুমি গোটা ব্যাপারটা পরিচালনা করলে, তা অভাবনীয়!" সোহরাব সলজ্জ মাথা নেড়ে বলল, "এভাবে বলবেন না। আপনাদের কাছে আমার ঋণ কম নয়। তাছাড়া ইণ্ডাস্ট্রিতে এতোদিন থাকার ফলে অনেক অলিগলি আমার জানা হয়ে গেছে। এই প্রডিউসার ব্রজলাল বাজোরিয়ার ওষুধের গোডাউন যে এই গলিতে, তা সহজেই বের করতে পেরেছিলাম। হরিশ বলে ওই গার্ডটা সদ্য যোগ দিয়েছে ওখানে। ওর টাকার দরকার ছিল। সামান্য টাকাতেই রাজি হয়ে গেল। আমি বলাতে সিসিটিভি বন্ধ করে দরজা খুলে রেখেছিল। কিন্তু যে কারণে আপনি এলেন আশুদা, সেই কাজ হলো? কোনও সূত্র পেলেন?"

আশুদা চিন্তিত চোখেই বলল, "পেলাম। তবে পুরোটা নয়। উল্কিতে ব্যবহারের কালিটা এখানে নেই। তবে ব্রজলালের কোম্পানি ঘুমের ওষুধ তৈরি করে। সুনন্দর পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা পেলে নিশ্চিত হতে পারব,ওকে মেরে ফেলার আগে ওর শরীরে অত্যন্ত বেশি মাত্রায় বেনজোডায়াজেপিন বা ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল কিনা। যদি হয়ে থাকে, তাহলে বাজোরিয়া সেই ওষুধ সরবরাহ করে থাকতেই পারে।"

সোহরাব আজ রাতে আমাদের ফ্ল্যাটেই থাকবে ঠিক হল। আমাদের ঘরে তো মোট দুটো প্রাণী। আশুদা আর আমি। সেখানে সোহরাব থাকলে ভালোই লাগবে। আশুদা বলল, "এই শুভায়ু দে’কে তুমি চিনতে সোহরাব?"

-শুভায়ু দে’কে তো সবাই চেনে আশুদা। খুব গোলমেলে অতীত। তার ওপর জটিল সব সম্পর্ক।

-গোলমেলে অতীত কেন?

-বলব সব। আগে বাড়ি পৌছোই।

মস্তিষ্কের পুষ্টির জন্য অবশ্য উদরের পুষ্টি অত্যন্ত প্রয়োজন। আর সারাদিন আমাদের সেই পুষ্টিটি কাজের ফাঁকে ঘটতেই পারেনি। তাই আমরা তিনজন ফেরার পথে ঢুকে পড়লাম জয় হিন্দ ধাবায়। ওখানকার চিকেন তন্দুরিটা জাস্ট ভোলা যায় না।

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন