কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

 

কালিমাটি অনলাইন / ১৩৮ / ত্রয়োদশ বর্ষ : একাদশ সংখ্যা 

 


বইমেলা আমাদের কাছে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেলা, যা এখন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে উৎসবে রূপান্তরিত  হয়েছে। বিশ্বে বইমেলার আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজিত হয় প্রতি বছর জানুয়ারী মাসের শেষ বুধবার থেকে, যদিও এবছর বিশেষ কারণে নির্দিষ্ট তারিখের আগেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। অন্যদিকে আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশে যথারীতি ১লা ফেব্রুয়ারী থেকেই সারা মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলার আয়োজনের প্রস্তুতি চলেছে। বইমেলা আমাদের জীবন ও যাপনের সঙ্গে এমন ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গেছে, আমরা সারাটা বছর তার আসার প্রতীক্ষায়  থাকি, দিন গুনি।

বইমেলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিশ্বে প্রথম বইমেলার আয়োজন হয়েছিল ইউরোপের জার্মানিতে। ১৪৬২ সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। ইয়োহানেস গুটেনবার্গের ছাপাখানার মেশিন আবিষ্কারের পরে বই প্রকাশিত হতে থাকে। গুটেনবার্গ থাকতেন ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছাকাছি মেঞ্জ শহরে। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের ফলে বই পড়ার জন্য পাঠক-পাঠিকারা উৎসাহিত হন। সেই উৎসাহ দেখে গুটেনবার্গ তাঁর আবিষ্কৃত মুদ্রণযন্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং মুদ্রিত বই বিক্রির জন্য উপস্থিত হন ফ্রাঙ্কফুর্টে। সেখানে তিনি বইয়ের ব্যবসা শুরু করেন। গুটেনবার্গকে দেখে উৎসাহিত হন অনেকেই। তাঁরাও মুদ্রণযন্ত্রে বইছাপা এবং বিক্রি শুরু করেন। সেইসব বই কেনার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে পাঠক-পাঠিকারা আসতে শুরু করে। ক্রমশ জমে ওঠে বইবাজার। এবং এভাবেই ফ্রাঙ্কফুর্টের বইবাজার একসময় রূপান্তরিত হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসানের পর, ১৯৪৯ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টের এই মেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় ‘জার্মান প্রকাশক সমিতি’। এবং ১৯৬৪ সালে এই মেলা অর্জন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মূলত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় মেলা। মোট পাঁচদিনের মেলা। শুরু হয়। মেলার আয়োজক ‘জার্মান পাবলিশার অ্যান্ড বুক সেলার অ্যাসোসিয়েশন’। উল্লেখ করা বাহুল্য, সারা বিশ্বে যত বইমেলা আয়োজিত হয়, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা তার মধ্যে সর্ববৃহৎ।

প্রতি বছর নভেম্বর মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং তার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি রাজ্যে  লিটল ম্যাগাজিন মেলা এবং বইমেলা। এবং এই দুই মেলার আবহেই জানুয়ারি মাসে আয়োজিত হয় কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। যদিও আমরা বলে থাকি ‘আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা’, কিন্তু সরকারীভাবে স্বীকৃত নাম ‘আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলা’ (পূর্বনাম ‘কলিকাতা পুস্তকমেলা’)। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় এই বইমেলা শুরু হয়েছিল বিগত শতাব্দীর ১৯৭৬ সালে। বেশ কয়েকবছর চলার পর ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি অর্জন করে। তবে একথাও প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, যদিও এই বইমেলা আন্তর্জাতিক বইমেলা রূপে বিশেষিত, কিন্তু মেলায় সিংহভাগ অংশগ্রহণ করে বাংলা প্রকাশনা। সঙ্গে অবশ্যই অংশগ্রহণ করে ইংরেজি, হিন্দি, ঊর্দু প্রকাশনাও। এছাড়াও বিদেশি দূতাবাসগুলিও স্টল বা প্যাভিলিয়ন সাজিয়ে নিজ নিজ দেশে প্রকাশিত বইপত্রের প্রদর্শনী ও বিপণন করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ভারত সরকারের বাংলা প্রকাশনা বিভাগগুলিও এই মেলায় অংশ নিয়ে থাকে। সেইসঙ্গে  ফ্রাঙ্কফুট বইমেলার আদলে প্রতি বছর মেলায় অংশগ্রহণকারী একটি বিদেশি রাষ্ট্র ‘ফোকাল থিম’ ও অপর একটি রাষ্ট্র ‘সম্মানিত অতিথি রাষ্ট্র’ নির্বাচিত হয়। সেইসব দেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলি অংশগ্রহণ ক’রে কলকাতা বইমেলার আন্তর্জাতিক মানকে গৌরবান্বিত করে। প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আরও উল্লেখ করা যেতে পারে, কলকাতা বইমেলা বিশ্বের বৃহত্তম অবাণিজ্যিক বইমেলা, ফ্রাঙ্কফুর্ট  বা লন্ডন বইমেলার মতো বাণিজ্যিক বইমেলা নয়। কলকাতা বইমেলায় ফ্রাঙ্কফুর্ট ও লন্ডন বইমেলার মতো গ্রন্থপ্রকাশনা, পরিবেশনা এবং অনুবাদ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি বা বাণিজ্য হয় না। বরং বইয়ের প্রকাশকরা ও পরিবেশকরা সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বইয়ের প্রদর্শনী, প্রচার ও বিক্রি করে থাকে। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতায় তাই এই বইমেলা কলকাতার প্রাচীন ঐতিহ্য ও পরম্পরার অনুসারী।

ন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যশালী বইমেলা বাংলাদেশের ঢাকায় আয়োজিত ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। প্রতি বছর ১লা ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হয় এই বইমেলা এবং শেষ  হয় ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ দিনে। জানা যায়, ১৯৭২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারী চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমীর সামনের বটতলায় কলকাতা থেকে ৩২টি বই এনে একটা চটের ওপর সাজিয়ে বইমেলা শুরু করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত ‘স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ’ (এখন ‘মুক্তধারা প্রকাশনী’) থেকে প্রকাশিত ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকেরা ছিলেন এই বইগুলির লেখক। পরবর্তীকালে এই মেলা ক্রমশই সম্প্রসারিত হয়। বাংলা একাডেমী এবং বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি মেলার উদ্যোক্তা হন। পূর্বে এই বইমেলার নাম ছিল ‘একুশে গ্রন্থমেলা’। ১৯৮৪ সালে মেলার নতুন নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।

প্রতি বছরের মতোই, আশাকরি, ‘আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা’ এবং ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ স্মরণীয় হয়ে থাকবে দুই দেশের অগণিত সাহিত্যপ্রেমী পাঠক-পাঠিকা, লেখক-লেখিকা এবং প্রকাশনা তথা পরিবেশনা সংস্থাগুলির কাছে।

ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা অভিনন্দন জানাই সবাইকে।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

kajalsen1952@gmail.com / kalimationline100@gmail.com

দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675

 

 


<<<< কথনবিশ্ব >>>>

 

কথনবিশ্ব


রোমেনা আফরোজ

 

নারী এবং দাসত্ব



(১)

রেনেসাঁ শব্দটা কি শুধু দেশ এবং জাতির বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, নাকি ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ  করা যেতে পারে? বিষয়টা আমার জানা নেই। তবুও নিজ দায়িত্বে শব্দটাকে আপন বোধোদয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাই। সেই অধিকার নয়বছর যুদ্ধ করে অর্জন করেছি। যুদ্ধটা এখনো অব্যাহত আছে। দশ সাল থেকে একটানা আট বছর ঔষধ গ্রহণ করার পর যখন অ্যাঙজাইটি, ডিপ্রেশনে গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি, তখন স্বভাব ধর্মে ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করা একপ্রকার পাগলামি। তারপরেও পরাজয় বরণ না করে, সাহসের সাথে পথ চলছি।

এই তাত্ত্বিক প্রয়োগ নিজেকে মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্যে নয়, এমনকি রেনেসাঁকে হালকাভাবে গ্রহণ করেছি,  তেমনও নয়, বরং সচেতনতাকে সর্বাধিক মূল্যায়িত করার প্রয়াসে এই সংযোজন। তাছাড়া রেনেসাঁর আক্ষরিক অর্থের সাথে আমার বর্তমান অবস্থার যথেষ্ট সঙ্গতি আছে। আঠারো সালে আমার বোধজগতের পুনর্জাগরণ ঘটেছে। অতীত এবং বর্তমান ‘আমি’র মধ্যে রচিত হয়েছে আকাশসমান পার্থক্য। এই পার্থক্য বোধ ও চেতনার।

এই রাজনৈতিক সচেতনতা বা পলিটিকাল কনশাসনেসের পূর্বে আমি ভাবতাম, সরকারি এবং বিরোধী দলের লোকেরা ক্ষমতার প্রয়োজনে রাজনীতি করেন। আমলারাও একই পথের পথিক। তারা শহুরে রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত। গ্রামের চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররাও রাজনৈতিক কারসাজিতে পিছিয়ে নেই। তারাও গ্রাম্য রাজনীতি করেন, যাকে ইংরেজিতে ভিলেজ পলিটিক্স বলা হয়। কিন্তু আমি অজ্ঞাত ছিলাম যে, প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক প্রাণী। সরল ভাষায় বলা যায়, পারিবারিক রাজনীতির যোগফলই হলো রাষ্ট্রের রাজনীতি। সেই হিসেবে পরিবারের সবাই রাজনীতির বিভিন্ন মারপ্যাঁচ অবলম্বন করে থাকেন। এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কেও স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বামী বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক কলাকৌশল প্রয়োগ করেন। অথচ জীববিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, স্বামী-স্ত্রী একে-অপরের পরিপূরক। তারা ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ, একে-অপরের সুখ-দুঃখ তারা বন্টন করে নেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, ফলশ্রুতিতে একটা সুন্দর প্রজন্ম গঠিত হয়। সর্বোপরি, সুন্দর প্রজন্ম গঠন করার লক্ষ্যেই মানুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, এমন ধারণা নিয়ে সংসারে পা রেখেছিলাম।

আমাকে কেউ জানায়নি, সংসারও রাজনীতির মাঠ, সেই মাঠে আমিও একজন খেলোয়ার। ইচ্ছের বিরুদ্ধে  আমাকেও সেখানে খেলতে হবে। বাস্তবতা অজ্ঞাত ছিল বলে, দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত স্বপ্নে মোহিত ছিলাম। তাই সংসারের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারিনি, কলা-কৌশলের দিক দিয়ে বারবার হেরে যাচ্ছিলাম। আমার পিঠে বেতাল ভূতের মতো চেপে বসেছিল হতাশা এবং বিষণ্ণতা। আমি অবরুদ্ধভাবে বেঁচেছিলাম। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে একটা সুতোর শেষপ্রান্তে ঝুলছিলাম। আমার দেবতা সংসার নামক রাজনীতির মাঠে চৌদ্দ বছর একলা খেলেছেন। একলাই গোল দিয়েছেন। আমি খেলা দেখতে বাধ্য হলেও দর্শক হিসেবে হাততালি দিতে পারিনি। কারণ জয়-পরাজয়ের গ্লানি কাটিয়ে জীবনকে দেখার সক্ষমতা আমার ছিল না। আসলে পারিবারিকভাবে আমাকে দক্ষ সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অক্ষরজ্ঞান প্রদান করলেও তাতে বোধের জগত গঠিত হয়নি। এজন্য আমাকে বিপুল ভুগতে হয়েছে। এজন্য প্রতিটি বাঙালি নারীকে ভুগতে হয়।

(২)

বিবাহিত জীবনে আমাকে যে-বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে কিংবা এখন পর্যন্ত যে-বিরামহীন যুদ্ধ অব্যাহত আছে, তার কারণ পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব। আমার মায়ের মধ্যে ‘নির্ভরশীল ব্যক্তিত্বের ব্যাধি’ (Dependent Personality Disorder) এবং বাবার মধ্যে ‘পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক গতিবিদ্যা’র (Patriarchal family dynamics) সমস্যা ছিল, যা আমার পুরো জীবনকে প্রভাবিত করেছে। যেহেতু সুস্থ মানুষ গড়ার জন্য পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই অভিভাবককে সর্বপ্রথম পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। অন্যথায় শিশুর মধ্যে তৈরি হয় সংকট এবং তা আজীবন লাশের মতো কাঁধে বয়ে বেড়াতে হয়। আমার মধ্যেও বিপুল সংকট ওঁত পেতে ছিল।

আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে একবারের জন্যও আলো-বাতাস দেওয়া হয়নি। অবশ্য তখন পড়াশোনায় তেমন মনোযোগ ছিল না। চারপাশের সবাই বলতো, মেধা কম। মনোযোগ কমকে মেধা কম বলে প্রচার করায়, আমার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি। অথচ বর্তমান মানসিক শক্তি দেখে বেশ বুঝতে পারি, তখন উৎসাহ পেলে ঠিকই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারতাম।

(৩)

এসব ব্যক্তিগত ঘটনা তুলে ধরার কারণ একজন বাঙালি নারীর স্বপ্নের প্রতিবন্ধকতার মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করা। ছোটবেলা থেকে আমার ব্যক্তিগত স্বপ্নকে হত্যা করে, সংসারের স্বপ্নকে প্রধান করে তোলা হয়েছে, যেন এটাই নারীর একমাত্র ধর্ম। এখানে তর্ক উঠতে পারে, নারীর প্রধান কাজ সংসার এবং সন্তান লালন-পালন করা। এ কথা মূলত নারী প্রজাতিকে সংসারের বেড়াজালে বন্দি করে রাখার জন্য বলা হয়। এখানেই ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি, বরং প্রতিদিন এসব কথা টেপরেকর্ডারে বাজানো হয়, যাতে নারীরা বৃত্তের বাইরে পদার্পণ করতে না পারে। জোসেফ গোয়েবলস বলেছিলেন, মিথ্যাকে বারবার বলা হলে তা সত্যের মতো শোনায়। তাই নারীরাও সংসারের স্বপ্নকেই একমাত্র সত্য বলে ধরে নেয় এবং তাদের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় না। এই অবচেতন মনে সেট করা প্রোগ্রাম জন্মজন্মান্তর ধরে চলে আসছে। যদি আমার বক্তব্য ভুল হতো, তবে নারীও পুরুষের মতো একইরকম মানসিক শক্তিতে উন্নত হতো। কিন্তু পুরুষরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, নারীর মানসিক উচ্চতা পুরুষের মতো নয়। এই বিভেদের দায় শুধু নারী প্রজাতির একার নয়। জন্মলগ্ন থেকে নারীর পক্ষে যারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা নারীর মনোজগত তৈরির লক্ষ্যে ন্যূনতম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। উল্টো তারা এমন সব কলা-কৌশল অবলম্বন করেন, যাতে তারা সারাজীবন অধস্তন হয়ে থাকতে পারে। রাজনীতিবিদরা যেমন বিপক্ষ দলের দোষ ত্রুটির কথা বলে তাদের কোণঠাসা করে রাখেন, পুরুষরাও একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নারীদের দমিয়ে রাখেন। এতে তাদের মনে দাসসুলভ মনোভাব তৈরি হয়।

আমি বিবাহ প্রথা বা সংসারের বিপক্ষে নই। তবে সংসারের স্বপ্নকে মুখ্য করে তোলার হেতু নারীর মধ্যে যে-দাসের স্বভাব এবং জ্ঞানের প্রতি অনীহা তৈরি হয়েছে, আমি তার বিপক্ষে। বেগম রোকেয়া তাঁর ‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে বলেছেন: “কোনো রোগীর চিকিৎসা করিতে হইলে প্রথমে রোগের অবস্থা জানা আবশ্যক। তাই অবলাজাতির উন্নতির পথ আবিষ্কার করিবার পূর্বে তাহাদের অবনতির চিত্র দেখাইতে হয়। আমি ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে ভগিনীদিগকে জানাইয়াছি যে, আমাদের একটা রোগ আছে - দাসত্ব”। এই দাসত্ব নারীজাতিকে অন্তঃসারশূন্য প্রাণীতে পরিণত করেছে।

(৪)

একটু মনস্ক হয়ে খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের সমাজের নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্কে কোনো সৌন্দর্য নেই। এদের বহুদূর থেকে দেখলেও স্পষ্ট ধরা পড়ে, এরা সমমনা সম্প্রদায়ভুক্ত নয়। এদের মধ্যে শাসক এবং শোষিতের সম্পর্ক বিদ্যমান! এই বৈষম্যের জন্য নারী প্রজাতির সাথে সাথে সমাজেরও বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। বৃক্ষ ভালো না হলে যেমন ফল সুমিষ্ট হয় না, তেমনি একজন শিক্ষিত মা ছাড়া সভ্য সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। এখানে শিক্ষিত বলতে শুধু অক্ষরজ্ঞানের কথা বলছি না। যে-শিক্ষা নারীর মধ্যকার শক্তিকে জাগ্রত করে এবং যে-শিক্ষার কারণে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে, আমি সেই শিক্ষার কথা বলছি।

সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, আমাদের দেশে নারীদের শারীরিক অসুখ-বিসুখের চিকিৎসা হলেও মানসিক অসুখকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ সমস্ত শারীরিক সমস্যা মন থেকে তৈরি হয়। মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য নারীর মানসিকতায় বিদ্যমান দাসত্বেরও পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে না। এখানে পরিবর্তনের জন্য মনকে আমলে নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে এবং এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

একটা সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য নারীর প্রতি উদার মানসিকতা অর্থাৎ বৈষম্যহীন পরিবার অত্যন্ত জরুরি। কারণ পরিবার হলো সমাজের ভিত্তি। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের সমাজে তেমন আলাপ-আলোচনা নেই। সবাই শুধু রাষ্ট্র নিয়ে ব্যস্ত। এলিট শ্রেণি মূলত সামাজিক শ্রেণি বিভাজনের ক্ষেত্রে পিরামিডের উপর থেকে আরম্ভ করে। আবার মানুষকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে কোষ থেকে আরম্ভ করা হয়। অন্যদিকে কার্ল মাক্স পণ্যকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করেছেন। একটা সমাজকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই বিভিন্নমুখী পদ্ধতি চিন্তার কাঠামোকে সামগ্রিক হতে বাধা দেয়। এতে আমাদের চিন্তাশক্তি ভেঙে যায়। ডেভিড বোহম এটাকে চিন্তার বিভাজন (Fragmentation) বলে চিহ্নিত করেছেন। বস্তুত একটা সমাজকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে এলিট শ্রেণি বিভাজন এবং শাসন (Divide and Rule) নীতিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তাই সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোষ অর্থাৎ পরিবারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বোঝাপড়া, সহযোগিতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা পুরো সমাজকেই প্রভাবিত করবে। তবে মাথায় রাখতে হবে, শুধু রাষ্ট্র এবং পুরুষদের দিক থেকে পরিবর্তন হলেই চলবে না, এজন্য নারীদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 



পি. শাশ্বতী

 

গঙ্গরিডিই কি দেগঙ্গার চন্দ্রকেতুগড়

 




পৃথিবীর ইতিহাসে এই সত্য চিরায়ত যে, নগরসভ্যতা গড়ে ওঠে মূলত নদীকেন্দ্রিক অবস্থানে। আর তাই  নদীমাতৃক দেশ আমাদের ভারতবর্ষেও সমস্ত নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করেই। আবার নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করলে, কালের করাল গর্ভে হারিয়ে যায় কত না শক্তিশালী ঐতিহ্য মণ্ডিত জনপদ। এমনকি আস্ত একটা জাতির ইতিহাসও। এই সেই করাল গ্রাসের শিকার হয়েছিল উত্তর চব্বিশ পরগণার অধুনা দেগঙ্গার চন্দ্রকেতুগড় রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাস।

ইতিহাসের পাতায় চন্দ্রকেতুগড়ের কথা খুব বেশি দেখা যায় না। অথচ মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পার বিবৃতি বহুল প্রচলিত। মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পায় প্রাপ্ত প্রত্নতত্ত্বগুলির অনুরূপ নিদর্শন পাওয়া গেছে চন্দ্রকেতুগড়েও। এগুলি প্রমাণ করে চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনত্ব। এখানে আজপর্যন্ত যেটুকু খননকার্য করা হয়েছে, তার থেকে প্রাপ্ত নানা ঐতিহাসিক প্রত্ন নিদর্শনে এটা প্রমাণিত যে, এই অঞ্চল ছিল এক সময়ের গৌরবোজ্জ্বল একটি বন্দরনগরী। একই সঙ্গে চন্দ্রকেতুগড়, অতীতের এক ব্যস্ততম বাণিজ্যবন্দর। বঙ্গ ও বাঙালির দুর্ভাগ্য, এই সমৃদ্ধ নগরী চন্দ্রকেতুগড়ের কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তার প্রাচীনতা ও গৌরবত্বের সাক্ষী নানা চারণ কবিদের গান ও তৎকালীন সাহিত্যাবলির মধ্যেই বেঁচে আছে। এছাড়া আর কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি পর্যটক ও ঐতিহাসিকদের গবেষণামূলক প্রবন্ধেই যা উল্লেখ পাওয়া যায়। বাকিটা সবই ছড়িয়ে আছে এখানে প্রাপ্ত  প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে; যারা নির্বাক, তবুও সাক্ষ্য দেয় হাজার হাজার বছরের পুরনো জনজীবনের এক অবিশ্বাস্য প্রবহমানতার। হ্যাঁ, কালের নিরিখে তা আজ অবিশ্বাস্যই বটে।

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই অধিবসতির উত্থান ছিল প্রকৃত অর্থে তাৎপর্যময়। গবেষকদের অনুপ্রাণিত করে এর ভৌগোলিক অবস্থান। এর মূলে কতখানি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেরণা বিদ্যমান তা পুরাতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়। মাতলা, পিয়ালী, বিদ্যাধরী, হৃদয়ভাঙা ইত্যাদি নদীর প্রাচীন গতিপথ একদা নৌবাণিজ্যকে কতটা প্রভাবিত করেছে তার পূর্ণ চিত্র আজও রচিত হয়নি।

চন্দ্রকেতুগড়ের মূল সমৃদ্ধি বিকশিত হয়েছে মৌর্য, শুঙ্গ এবং কুষাণযুগের শিল্পশৈলী চিহ্নিত পর্ব সমূহে। যে কালে সাম্রাজ্য বিস্তার, সংঘর্ষ, সাংস্কৃতিক উত্থান ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য সৃষ্টি করেছিল জীবনের বর্ণছটা। কুশাণযুগের পরবর্তী শতাব্দীসমূহে চন্দ্রকেতুগড়ের সমৃদ্ধি নবরূপ ধারণ করলেও এই নগরী অথবা অধিবসতির প্রকৃত গৌরবময় দিনগুলি আরও অনেক আগে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের পতন ও অভ্যুদয়ের মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত হয়েছে। বাণগড় (পশ্চিমদিনাজপুর), মহাস্থানগড় (বাংলাদেশ), তাম্রলিপ্ত (মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত তমলুক), ও হরিনারায়নপুর (২৪ পরগনা জেলা)-এর সমৃদ্ধির যুগে চন্দ্রকেতুগড়ে যে এক সুবিস্তৃত বন্দরনগরী ছিল এতে কোনো সংশয় নেই। সে বিষয়ে তথ্যের অভাব নেই; তাই এটি কোনো কল্পনা নয়, প্রমাণিত সত্য। আর তাই আমরা গর্বিত, সেইযুগের এক প্রাণবন্ত আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির উত্তরসূরি হিসেবে। প্রায় দু-হাজার বছর আগে বঙ্গোপসাগরকে নিয়মিতভাবে অতিক্রম করেছে ভারতীয় এবং বিদেশি নাবিকরা। ভৌগলিক অবস্থান, অধিবসতি স্তর, অফুরন্ত প্রত্ন নিদর্শন, নামের সঙ্গে সাদৃশ্য ও নগরীর জীবনেতিহাস নিয়ে গবেষকদের নিরন্তর গবেষণা স্পষ্ট করে তুলেছে  এখানকার বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যময় সমৃদ্ধ বিলুপ্ত শহর ও সভ্যতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট চন্দ্রকেতুগড়ের গৌরবময় অতীতকে। রহস্যের আবরণ ছেড়ে উজ্জ্বল স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া দ্বিগঙ্গা - যার থেকে প্রচলিত নাম হয়েছে দেগঙ্গা। আর সেখানেই ছিল বেড়াচাঁপা, চন্দ্রকেতুগড়।

তাম্রলিপ্তের ইতিহাস থেকে আমরা জানি, এই বন্দরের হাত ধরেই এক সময় বহির্বিশ্বে বৌদ্ধধর্ম প্রচার থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ, লবণ তৈরি এবং সর্বোপরি এক সমৃদ্ধ বাণিজ্য বন্দর হিসেবে সুপ্রাচীন তাম্রলিপ্ত বা তমলুক বন্দর সর্বজনবিদিত।

সেই জায়গায় কিন্তু খুব বেশি পরিচিত নয় গঙ্গারিডাই বা গঙ্গারিডি জাতি ও ঐতিহ্যে ঐশ্বর্যে সুসমৃদ্ধ রাজধানী শহর গঙ্গে বা গঙ্গার সঙ্গে। এখানে কিছুটা লজ্জা বোধ হয় যে, স্বদেশের কোনো ইতিহাসিক নথিতে  পাওয়া যায়নি এই প্রাচীন মহানগরীর কথা। রোম, গ্রিস, লাতিনের লেখক-ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে উদ্ধার করতে হয়েছে হারিয়ে যাওয়া এই মহানগরীকে। মূলত তাঁরাই ব্যাপারে আলোকপাত করেছে 'পেরিপ্লাস অফ দি ইরিথ্রিয়ান সি' গ্রন্থে। একজন নাবিক এই নগরী সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁর বাড়ি গ্রিসে। গ্রিক ভাষাতে লেখা পুস্তকটির ইংরেজি অনুবাদ করেন ম্যাক্রিন্ডল ১৮৭৯ সালে এবং ডবলু. এইচ সফ ১৯১২ সালে। ১৯২২ সালে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন এক বাঙালি, যার নাম যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার।

আজকের প্রজন্মের কাছে ‘গঙ্গারিডি' এক অজ্ঞাত বিষয়। বলতে গেলে আজকের প্রজন্মের কাছেও এই নামটি বিস্মৃত কোনো এক অধ্যায়। গঙ্গারিডি কোন জাতি, এই রাষ্ট্রের রাজধানীই বা কোথায়? কে-ই বা তার প্রতিষ্ঠাতা? এসব জিজ্ঞাসার উত্তর জানা যায় ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদারের 'বাংলার ইতিহাস' (প্রাচীন) গ্রন্থ থেকে। সেখানে তিনি লিখেছেন– "গ্রিকগণ গঙ্গারিডাই গঙ্গারিডি নামে যে পরাক্রান্ত জাতির কথা উল্লেখ করেছেন তাহারা যে বঙ্গদেশের অধিবাসী তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।” অনেক ঐতিহাসিকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ‘বাংলার ইতিহাস’ ও ‘বাংলার কলঙ্ক’ প্রবন্ধে বলেছেন, গঙ্গারিডির অধিবা সীরা নিঃসন্দেহে বাঙালি। তাদের তেজস্বীতা পরাক্রমশীলতা বাঙালি চরিত্রের সমুজ্জ্বল দিক। শুধু তাই নয়, স্যার জন কাম্বেলও বলেছিলেন, ভারতবর্ষে তো বটেই সমগ্র এশিয়ার মধ্যে বাঙালি একসময় বীরত্ব ও  পৌরুষত্বে এথেন্সের অধিবাসীদের সমকক্ষ ছিল।

শ্রীনাথ সেন সম্রাট শাহজাহানের সময় রাজা উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। কায়স্থ বংশ গরিমায় 'দ্বিগঙ্গার সেন' কুলীন রূপে গণ্য হত। জানা যায়, শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক ও সম্পাদক জলধর সেন এবং বাংলা সাহিত্যের দিকপাল পণ্ডিত সুকুমার সেন দ্বিগঙ্গার সেন পরিবারের সন্তান। দ্বিগঙ্গার সেনেদের আদি রাজ্যপাটও ছিল দ্বিগঙ্গাতেই। শুধু তাই নয় দ্বিগঙ্গার আরও অতীত গৌরবস্মৃতি ধরা রয়েছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় 'বাংলার ইতিহাস' গ্রন্থে লিখেছেন,   বালবল্লভীর অবস্থান আজও অজ্ঞাত, তবুও পণ্ডিতদের কেউ কেউ মনে করেন বালবল্লভী রাজ্যের একসময় খ্যাতি ছিল বিপুল। পণ্ডিত ভবদেব ভট্ট শুধুমাত্র রাজ্যের মহামাত্য ছিলেন না, তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন ব্রাহ্মণদের দশকর্মা পদ্ধতির প্রণয়ন করে। সে সময় এ রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল দেগঙ্গা বা দ্বিগঙ্গা ছিল কর্মমুখর এক জনপদ।  এ সে ছিল দ্বাদশ শতকের কথা। দ্বিগঙ্গা চন্দ্রকেতুগড় পরিমণ্ডলে রয়েছে প্রাচীন মধ্যযুগের অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা। 

দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারও প্রাথমিক স্তরে গঙ্গারিডি তথা বাঙালি জাতির বৈভব, বিত্ত, সাহস ও শক্তির কথা শুনে বঙ্গের দিকে এগিয়ে আসতে সাহস করেননি। গর্বের কথা, বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও জাতীয় ঐক্যের শুভ সূচনায় ছিলেন রাজা নন্দ। অবশ্য মৌর্যরাজ প্রতিষ্ঠাতা প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সময়ই আলোকিত ও আলোড়িত হয় বন্দরনগরী গঙ্গে বা গঙ্গা। সমসময়ের বহুখ্যাত রাষ্ট্র প্রাচ্য ও তার রাজধানী পালিবোথরা বা পাটলিপুত্রের উজ্জ্বল পরিচয় থাকলেও অন্ধকারে রয়ে গেছে কর্ম চঞ্চল নগরী 'গঙ্গে' - যার প্রশংসা উচ্চারিত হয়েছিল ভূগোলবিদ টলেমি ও পিল্লির কণ্ঠে।

বন্দরনগরী গঙ্গের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন জাগে। জানার আগ্রহ হয় হাজার হাজার বছর আগে চন্দ্রকেতুগড়ের কী নাম ছিল, যোগাযোগের প্রয়োজনের যে স্রোতপথ তার উৎসগুলি কোথায়? নানা সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন উত্তর আসে এসব প্রশ্নের।

প্রাচীন কাব্যে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গবেষক গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসুর লেখনী থেকে জানা যায় - “ভারতবর্ষের প্রাচীনতম মানচিত্র গ্রিক ভূগোলতত্ত্ববিদ টলেমির দ্বারা প্রস্তুত হয়েছিল। বর্তমানে দক্ষিণ ২৪ পরগনা যে  ভূভাগে অবস্থিত তাহা উক্ত মানচিত্রে গঙ্গারিডি রাজ্যের পশ্চিমাংশ রূপে প্রকাশিত হয়েছে।” ('Dr.D.C.Sarkar, The City  of Ganga')। জানা যায়, মহান তীর্থক্ষেত্র গঙ্গাসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত ছিল এই গঙ্গেনগরী।





মতান্তরে  বাংলাদেশের যশোর নগর ছিল সুন্দর নগরী 'গঙ্গে'। এর মধ্যে দিয়েই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আর-এক নাম দ্বিগঙ্গা তথা চন্দ্রকেতুগড়। ভৌগলিক তথ্যে এ কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, একদা দেগঙ্গা ও চন্দ্রকেতুগড়ের মধ্যে একটি নদী ধারা প্রবাহিত ছিল। একথার সমর্থন রয়েছে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম প্রকাশিত পত্রিকায়: “Chandraketugarh has a chain of marshes intervented by dried up lands running better the above two places along the north side of the Calcutta- Basirhat Road.This proves that a river was flowing by Deganga and Chandraketugarh  and the latter was an important or a port of maritime activities.”

মনসামঙ্গলের চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা পাল তুলে শুধুমাত্র সিংহল কিংবা সুমাত্রার পথে নয়, বাণিজ্য করতে আসত চন্দ্রকেতুর দেশেও। পতিপ্রাণা বেহুলার ভেলা-যাত্রায় ভেসে ওঠে নদীর গর্জনমুখর ফেনোচ্ছ্বাস। দ্বিগঙ্গার গঙ্গার খাতেই সে যাত্রা অব্যাহত ছিল। এ অনুমান করার মতো গবেষকের অভাব নেই। দিগঙ্গার ভৌগোলিক অবস্থানের বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে কমলাকান্ত সার্বভৌম চরিত দেব ভাষায় লেখা 'দ্বিগঙ্গা রাজবংশমে'। পণ্ডিত মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লিখিত 'বাসুকী কুলগাঁথা’য় সেকথার সমর্থন মেলে:

“ভাগীরথী নদীতীরে দীর্ঘ গঙ্গা গ্রাম

সর্বস্থানে দ্বিগঙ্গা বলিয়া ঘুষে নাম।

সুন্দর সে গ্রামখানি কি শোভা তাহাতে

সেই গ্রামে আদিশূর ছিল রমানাথে।"

দ্বিগঙ্গা বা দেগঙ্গার ইতিহাস ঘাঁটলে যেটুকু জানা যায়, সেটি হল মহারাজ আদিশূরের কাছ থেকে রুদ্র নারায়ণের পূর্বপুরুষ রমানাথ দ্বিগঙ্গা গ্রামটি বসবাসের জন্য উপহার পেয়েছিলেন। পরবর্তী উত্তরসূরি নন্দরাম সেন ইংরেজের চাকরিতে বড় রকমের পদে প্রথম বাঙালি ব্যক্তি। নন্দরাম সেন আদিতে যতদূর মনে হয় দ্বিগঙ্গার সেন কুলোদ্ভব বংশেই মানুষ ছিলেন।

আবার আর-একটি সূত্রে দ্বিগঙ্গাকে দীর্ঘ গঙ্গা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলকাব্যের ছন্দে লেখা ১০০ বছর আগেকার পুঁথি দেখে পূর্ণেন্দু পত্রীর 'পুরনো কলকাতার কথাচিত্র'-এ তুলে ধরা কাব্য দেখে তাই মনে হয়:

“দীর্ঘ গঙ্গা নামে স্থান সেন কুলোদ্ভব

তদপূর্বের বার্তা জানা নাহিক সম্ভব।

এলেন পুরুষ মহা দীর্ঘ গঙ্গা হইতে

জঙ্গল কাটিয়া বাস এখানে করিতে।”

অন্য এক ঐতিহাসিক লিখেছেন, “গঙ্গা নদীর যে দুটি স্রোত এখন ভাগীরথী ও গঙ্গা বলিয়া পরিচিত এই উভয়ের মধ্যবর্তী প্রদেশে গঙ্গারিডি জাতির বাসস্থান ছিল।” বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ঐতিহাসিকদের এ উক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল দেগঙ্গা চন্দ্রকেতুগড়ের শহর সীমা।

ইতিহাসের উত্থান-পতনে এক আসনে বসে সমভাগী হয়েছে দিগঙ্গা ও চন্দ্রকেতুগড়। 'প্রাগৈতিহাসিক চব্বিশ পরগনা' প্রবন্ধে প্রয়াত প্রত্নগবেষক পি.সি. দাশগুপ্ত আলোকপাত করেছেন, চন্দ্রকেতুগড়, গোপালপুর, হরিনারায়ণপুর, আটঘরা ইত্যাদি স্থান বিস্ময়কর ভাবে প্রমাণিত করে যে আজ থেকে ২০০০ বছরের অনেক আগে ২৪ পরগণায় ছিল নানা সুরম্য নগরী ও নৌবন্দর যেখানে নিয়মিত আসত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যতরণী। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বন্দর শহর চন্দ্রকেতুগড়ের সৃষ্টি তাম্রলিপ্ত বন্দরের থেকে কোনো অংশে কম ছিল না -  একথা বলেছেন প্রত্নবিদ ডি.পি. ঘোষ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, চন্দ্রকেতুগড় দ্বিগঙ্গাই কি সেই হারিয়ে যাওয়া রাজধানী 'গঙ্গা'? আজকের বিলুপ্ত 'পূর্ববঙ্গ রেলপথ' থেকে ১৯৪০ সালে প্রকাশিত বাংলায় ভ্রমণ (প্রথম খণ্ড)এ অনুমিত হয়েছে ইতিহাসে পেরিপ্লাস বর্ণিত গঙ্গে বা গঙ্গেরেডিয়া দেগঙ্গাতেই অবস্থিত। গবেষকদের চিন্তায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়, চতুর্থ শতাব্দী থেকে শুরু করে গুপ্ত পরবর্তী সময় পর্যন্ত চন্দ্রকেতুগড় ছিল জাঁকজমকপূর্ণ শহর।

বহুগ্রন্থের লেখক বিনয় ঘোষ ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ (তৃতীয় খণ্ড) গ্রন্থে বলেছেন: 'দেবগঙ্গা' দেগঙ্গা, দেবালয় ও অন্যান্য স্থানীয় স্মৃতি থেকে' কারও কারও মনে হয় গ্রিকদের বর্ণিত প্রাচীন গঙ্গারিডি জাতি ও রাজ্যের সাথে চন্দ্রকেতুগড়ের সম্পর্ক আছে।

অনুসন্ধানী, ঐতিহাসিক, গবেষক সতীশচন্দ্র মিত্র 'যশোহর খুলনার ইতিহাস' (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে সুন্দরবন তথা চব্বিশ পরগনার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে বলেছেন: “গঙ্গারিডি রাজ্যের একটি প্রধান নগর ছিল গঙ্গে বা গঙ্গাবেজিয়া।... দ্বিগঙ্গাই ছিল গঙ্গাবেজিয়া বা গঙ্গা বন্দর।”

বর্তমানের দেগঙ্গার অতীত ইতিহাস দাঁড়িয়ে রয়েছে নানান নামে - গঙ্গার দুটি ধারা নিয়ে দ্বিগঙ্গা, দীর্ঘতার জন্য দীর্ঘগঙ্গা, দ্বীপরূপে অবস্থানের জন্য দ্বীপগঙ্গা, দেবরূপে কল্পিত হতায় দেবগঙ্গা নামগুলির মধ্যে লুকিয়ে  রয়েছে বিস্মৃত নাম 'গঙ্গে' বা 'গঙ্গা'। এমনিভাবেই একদিন আজকের তমলুক প্রাচীন বন্দর তাম্রলিপ্ত আত্মগোপন করেছিল দামলিপ্ত, টামালিটেন তামলিটি প্রভৃতি ইতিহাস সম্মত নামগুলির মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে প্রকাশিত চন্দ্রকেতুগড়ই খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর পেরিপ্লাস বর্ণিত প্রাচীন বাণিজ্যনগরী গঙ্গে এবং খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমির বলা গঙ্গারিদাই - এই অভিমত জানিয়েছেন বানগড়, চন্দ্রকেতুগড় উৎখননাধিকারী ও মহেঞ্জোদড়োতে সশরীরে কাজ করার সৌভাগ্যের অধিকারী অধ্যাপক কুঞ্জগোবিন্দ  গোস্বামী। তাঁরই ভাষায়: "...the site of Chandraketugarh seemingly represents the ancient market town of Ganga of the  Periplus (1st cent A.D.) and Gangaridae of Ptolemy (2nd cent. A.D).”

পুরাতত্ত্ব বিশারদ ও গবেষক ধনঞ্জয় দাস মজুমদার পৌরাণিক কাব্য বিশ্লেষণ করে 'বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস' (দ্বিতীয়  খণ্ড) গ্রন্থে লিখেছেন: “মহাভারতীয় যুগে প্রবঙ্গের রাজধানী ছিল তখনকার পূর্ব সাগরের মধ্যে ও পরবর্তী পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত সমবঙ্গ দ্বীপ। মহারাজবলির উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁহার রাজলক্ষ্মীর অংশভাগী হয়ে এই পূর্ব সাগরে সমুত্থিত দ্বীপ-পুঞ্জের রাজা হন সমুদ্র সেন। সমুদ্র সেনেরই অন্যতম রাজধানী ছিল বর্তমান চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপার নিকট চন্দ্রকেতুগড় দ্বীপে।”


শিবাংশু দে

 

মান্নাম্যানিয়া অথবা অপূর্ব প্রেমের রাগ ভাটিয়ার


 

আজ বেঁচে থাকলে তাঁর শরীরের বয়স হতো একশো ছয় বছর। কোনও চর্চা-বিশ্লেষণ করবো না, শুধু স্মরণটুকুই লিখে রাখি। 

ভার্সাটাইলের বাংলা 'বহুমুখী'। ব্যপ্তিটা ঠিক ধরা যায় না এই প্রতিশব্দে। ভারতীয় সঙ্গীত ও তার বৈচিত্র্যের ব্যপ্তিকে আকাশ বা সমুদ্র কোনও প্রতীকেই যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি ছিলেন সেই নীহারিকাপ্রতিম ব্যাপ্তির অলখ নিরঞ্জন। কতো রকম গান, কতো ভিন্নমুখী, কতো ভিন্ন পারদর্শিতার মাইলফলক অর্জন করে গেছেন সারাজীবন। শুধু নিজের জন্য নয়, আমাদের মতো নির্গুণ শ্রোতাদের হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে। মুগ্ধতার কোনও যুক্তি হয় না। তাই মুগ্ধতা এতো আনন্দ দেয় মানুষ'কে। যুক্তি আমাদের সহজ'কে চেনায়। অনিবার্যকে গ্রহণ করতে প্রেরিত করে। যুক্তির তাড়না সহজসত্য'কে প্রতিষ্ঠিত করে দৈনন্দিন দেওয়া নেওয়ার নশ্বর জগতে। কিন্তু যেভাবে মানুষের মৃত্যু হলেও মানব থেকে যায়, সেভাবেই দাতা বা গ্রহীতার মৃত্যু হলেও মুগ্ধতাটি থেকে যায়। মানুষের সভ্যতায় বিস্ময়বোধ প্রধান চালিকাশক্তি আর মুগ্ধতাবোধ শেষ অর্জন। তিনি আমাদের মুগ্ধ করেছেন, করে চলেছেন কতোদিন ধরে। একজন শিল্পীর এর থেকে বড়ো সার্থকতা আর কী হতে পারে? এই অপূর্ব প্রেম বিধাতা যাঁদের নসিব করেছেন তাঁরা ধন্য। তাঁরা কেউ শিল্পী, কেউ শ্রোতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অলীক সীমারেখাটি অদৃশ্য হয়ে যায়। কে রাজা, কেই বা ভিখারি, কে তার খোঁজ রাখে? আমি এমন একটা প্রজন্মের মানুষ যারা নসিব করে এই সব শিল্পীর অর্জিত পুণ্যের ছায়ায় বড়ো হয়েছে। আমরা কৃতজ্ঞ।

অজয় চক্রবর্তী একবার একটি আড্ডায় বলেছিলেন, তাঁর একটি অনুষ্ঠানে মান্না দে গান শুনতে এসেছিলেন। শেষ হবার পর তিনি অজয়বাবুর কাছে এসে বলেন, “এ জন্মে তো গানটা শেখা হলো না, পরের জন্মে আপনার মতো কারুর কাছে বসে গানটা একটু শিখতে হবে”। তখন অজয়বাবু তাঁর পা ছুঁয়ে বলেন, আজকের অজয় চক্রবর্তী গান শুরু করেছিলো মান্না দে'র অনুকরণ করতে করতেই। শ্যামনগর থেকে কলকাতা, তাঁর প্রাথমিক পরিচয় তৈরি হয়েছিলো, 'ঐ যে ছেলেটা, ভালো মান্না দে'র গান গায়' এই ভাবেই। সারা ভারতবর্ষে কতো লক্ষ গাইয়ে যে ‘মান্নাদা'কে বিগ্রহ বানিয়ে সঙ্গীতচর্চা শুরু করেছেন বা সারাজীবন ধরে তাঁর প্রতি সেই একই মাত্রার শ্রদ্ধা নিয়ে মজে রয়েছেন, তার বোধহয় কোনও ইয়ত্তা নেই। জগজিৎ সিং, সুরেশ ওয়াডকর, যীশুদাস, উস্তাদ আমজাদ আলি খান, কীভাবে ‘মান্নাদা'র গুণমুগ্ধ, তার কিছু পরিচয় ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি।

মান্না দের গান অনেকের মতই, ব্যক্তি আমার সঙ্গীতচিন্তার অনেকটা জায়গা অধিকার করে রাখে। ওঁর গাওয়া বাংলা ও হিন্দি গান, যা বাজারে পাওয়া যায়, প্রায় সবই আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। এছাড়া রয়েছে ওঁর কয়েকটি অনুষ্ঠান, আমার নিজস্ব টেপ করা সংগ্রহ। কখনো সময় সুযোগ পেলে শুধু ওঁর গান নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে রইলো। আসলে অনেক কিছুই লেখার আছে, তাই সেই সব গান নিয়ে কোনও প্রস্তুতিহীন আলোচনায় যাবার ধৃষ্টতা করতে পারি না।

শুধু কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। ছোটোবেলা থেকেই অনেকের মতো ওঁর গান নকল করার চেষ্টা করেছি। সে তো শিব গড়িতে বাঁদরই হতো। কিন্তু বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে একটা উৎসাহব্যঞ্জক পরিহাস কাজ করতো। এভাবেই একটা একটা প্র্যাক্টিক্যাল জোক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, মান্না দে, শিবাংশু দের সম্পর্কে জ্যাঠা। যে সব বন্ধু লেগ পুল করতে এইসব রটনা করেছিলো তারা আবিষ্কার করে গুজবটি বেশ গভীরে চলে গেছে। কলেজে পড়তে অবাঙালি বন্ধুরা একেবারে কনভিনস্ড ছিলো যে ব্যাপারটি সত্যি। এর ফলে যেকোনও অবকাশেই, যেখানে আমি উপস্থিত আছি, 'কানু ছাড়া গীত নাই' গোছের একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়।

'আমাদের দেশের সাধারণ শ্রোতারা, অন্যান্য দেশের শ্রোতাদের মতই 'ন্যাচরাল' গায়কদের অধিক পক্ষপাতী। হেমন্ত, কিশোর, মুকেশ। কিন্তু এমন সফিস্টিকেটেড সাঙ্গীতিক ক্ষমতা আর তৈয়ারি নিয়ে সাধারণ শ্রোতাকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা এদেশে মান্না ছাড়া আর কেউ দেখাতে পারেননি। এখনও তাঁর নাম মানুষের মনে কী ধরনের উন্মাদনা আনে তা আমি দেখেছি। হায়দরাবাদেও যেকোনও অনুষ্ঠানে আমার কাছে শুধু মান্না দের গান শোনানোর আদেশ আসতো। সে ফর্ম্যাল বা ইনফর্ম্যাল, সব রকম পরিস্থিতিতেই। গত বেশ কিছুদিন ধরে নববর্ষ, বিজয়া সম্মেলনী জাতীয় যেসব অনুষ্ঠানে গাইতে হয়েছে, সব জায়গাতেই শ্রোতারা সমস্বরে মান্না দের চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগে গাওয়া গান শুনতে চেয়েছেন। কোনও কটাক্ষ না করে বলি, আজকের বাংলা গানে এমন কি কোনও পারফর্মার আছেন যাঁর গান দশ বছর পরেও কেউ শুনতে চাইবে?

শেষ যে অভিজ্ঞতাটি হয়েছিলো হায়দরাবাদের বৃহত্তম বাঙালি প্রতিষ্ঠান, বঙ্গীয় সংস্কৃতি সঙ্ঘের বিজয়া সম্মেলনিতে। খুব ব্যস্ত ছিলুম অফিসে সেদিন। বাড়ি না ফিরেই অফিস থেকে সোজা পৌঁছেছিলুম সেখানে। কিন্তু পৌঁছোতেই সব্বাই মান্না দে শোনানোর জন্য যে রকম আদেশ করতে থাকলেন, আমি নেহাৎ অপ্রস্তুত। ওঁর গান গাওয়ার আগে একটা ন্যূনতম প্রস্তুতি লাগে। এভাবে হয় না। একটু বিরক্তই লাগছিলো। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো এঁরা তো আমাকে শুনতে চাইছেন না, এঁরা 'মান্না দে'র গান শুনতে চাইছেন। নববর্ষে, বিজয়া সম্মেলনীতে বাঙালিরা মান্না দে শুনবেন না তো কীই বা শুনবেন! খোদ পশ্চিমবঙ্গের হালহকিকৎ জানি না, তবে প্রবাসের বাঙালিরা তো এখনও মান্না দে'র নামেই কসম খেয়ে থাকেন।

বিজাতীয় কামিজ পাৎলুনে, অফিসের পোষাকে স্টেজে। আমার একান্ত সঙ্গী 'পাকড়াশি বাবু কা পেটি' সঙ্গে নেই। তবে গুরুকে স্মরণ করে প্রথম কলেজ জীবনের গানটি, 'ও কেন এতো সুন্দরী হলো'। কী গাইলুম আমি নিজেই ভালো জানি, কিন্তু শ্রোতারা রীতিমতো হর্ষিত। তারপর একজন প্রবীণ শ্রোতা এসে আদেশ করলেন, আমি যেন 'আমার না যদি থাকে সুর' শোনাই তাঁকে একবার। এই গানটির সঙ্গে একটু সজল অনুষঙ্গ রয়েছে আমার। আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর মা যখনই দেখা হতো, এই গানটি আমার থেকে শুনতে চাইতেন। অকালে দেহাবসান হয়েছে তাঁর। এই গানটি তাঁর স্মৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোত হয়ে আছে। গানটি খুব সহজ নয়। মন্দ্র থেকে তারায় সুরের প্রচুর যাতায়াত। কিন্তু তবু অক্ষম চেষ্টা ছিলো কিছু।

এই অভিজ্ঞতা আবার আমাকে শেখালো, মানুষ শুনতে চাইছেন মান্না দের গান, আমার ভূমিকা শুধু তাঁদের স্মৃতিটিকে ট্রিগ্যার করা। আমার মূল্যহীন গান তাঁদের নিয়ে যাচ্ছে মান্না দে নামের একটা সুরের সমুদ্রের কাছে, এইটুকুই সন্তুষ্টি আমার।

বড্ডো বেশি 'আমি' প্রসঙ্গ এসে গেলো। বন্ধুরা মার্জনা করবেন। আসলে মান্না দে'কে নিজের অস্তিত্ত্বের থেকে আলাদা কোনও সন্দর্ভ হিসেবে ভাবিনি কখনও। তাই এই আত্মনাম বারবার, গর্হিত অভ্যেসটি লেখার মধ্যে চলে আসে। পঞ্জিকার একটা তারিখ তাঁর জন্মদিন। কিন্তু তিনি প্রতিদিনই আমার জন্য জন্ম নেন গান হয়ে, সুর হয়ে, আবহমান প্রতিশ্রুতি হয়ে। অন্তত আমার জন্য তিনি এক নৈসর্গিক স্নিগ্ধ মাত্রা। হয়তো তাঁর গান শোনার জন্যই আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়। "মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা।"


শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

 

কিস্‌সা নৌসা কা

 


জুল্মৎকদে মেঁ মেরে শব-এ-গম্‌ কা জোশ হ্যায়

ইক শম্মা হ্যায় দলীল-এ-সহর সো খামোশ হ্যায়

আমার আঁধার দিন ঘিরে, বিরহ-রাতের উপস্থিতি

একটি প্রদীপ টলোমলো, তাও নিভে গেছে সম্প্রতি

বন্ধু, চাঁদনিচৌক মেট্রো স্টেশনের বাইরে এসে, রাস্তা পেরিয়ে এপারে এসো। নতুন রাস্তার কাজ এখনও শেষ হয়নি। সামান্য অসুবিধা হবে হয়তো! উপেক্ষা কোরো। ঈশ্বর সন্নিধানে যেতে হলে ফুল নয়, কাঁটার ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়। লালকেল্লাকে পেছনে রেখে, নানান রঙের পোশাক ঝুলতে থাকা কাপড়ের দোকান দেখতে দেখতে নতুন রাস্তা বরাবর সোজা হেঁটে খারিবাওলি’র দিকে এগোতে থেকো। প্রায় কিলোমিটার খানেক হাঁটার পর হঠাৎই পেয়ে যাবে বল্লীমারান। হে দর্শনার্থী, এবার বাঁ’দিকে ফেরো। রঙের ঝলকানি একই থাকবে, শুধু উপকরণ যাবে বদলে। কাপড়ের যায়গায় এবার থাকবে জুতো’র প্রদর্শনী। নানান রঙের, নানান ধরণের। এখানেই থেমো না বন্ধু। আস্তে আস্তে ঐ বাঁ-হাত ধরেই এগিয়ে এসো। এক অত্যন্ত সুস্বাদু গন্ধ ভেসে আসবে বাতাসে। ছোটুমিঞা চাঁপ রাঁধছে। একটু একটু করে যখন সন্ধ্যে নামবে, একজন দুজন করে নানান মানুষ জড় হবেন তার স্বাদ নিতে। শুরু হবে নানান আলোচনা, জমে উঠবে আসর। না, তুমি এখানেও দাঁড়িও না। আরও কয়েক-পা হাঁটার পর ডান হাতে ঐ যে রাস্তাটা এঁকেবেঁকে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, ওর নাম গলীকাসিমজান। হে আমার পথিক বন্ধু, সে পথ ধরে এঁকেবেঁকে তুমিও এগোতে থেকো। বাঁ-দিকে কয়েকটা দোকানের পর প্রায় দৃষ্টিঅন্তরালে যে একটা বড় প্রবেশদ্বার দেখা যাচ্ছে, সেখানে দাঁড়াও। এখানেই একদিন ঈশ্বর বাস করতেন। এই সেই মন্দির, যার জন্যে এতটা পথ আসা। ‘হাবেলি’, ২৪৬৯ বিরাদরি, গলীকাসিমজান, বল্লীমারান, পুরানী দিল্লী – ১১০ ০০২। মালিক – মির্জা অসদুল্লাহ্‌ খাঁ গালিব। এবার প্রণাম করার সময় হয়েছে বন্ধু। তিনি অবশ্যই সে সম্মানের অধিকারী। আর যদি তুমি শব্দ গেঁথে তোড়া বানাবার কারিগর হয়ে থাক, তাহলে অর্চনা করে ভিক্ষা চেয়ে নাও। তা তোমার প্রয়োজন। এবার তোমার ডানদিকে যে বন্ধ দরজাটা দেখছ, তা এখনই খোলার চেষ্টা কোরো না। বরং সে দরজায় আলতো করে কান পাত, শোনার চেষ্টা কর। ভেতরে ঈশ্বর হয়তো নিজের এক টুকরো জীবন বৃত্তান্ত পরিবেষণ করবেন। ফেলে আসা সুদূর অতীতকথার গজল শোনাবেন। ঐ কি কেউ গম্ভীর গলায় নিজের দৈনসার কলকাতা বাসের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা সুখস্মৃতি গেয়ে উঠলেন –

কলকত্তে কা যো জিক্র কিয়া তুমনে হমনশীঁ

এক তীর মেরে সিনে মেঁ মারা কে হায় হায়

ও সব্‌জজার হায়, মতর্‌রা কে হ্যায় গজব

ও নাজনীন বতাঁ-এ-খুদ-আরা কে হায় হায়

সর অজমা ও উনকী নিগাহ্‌ হ্যায় কী হফ্‌ নজর

তক্‌তরুবা ও উন্‌কা ইশারা কে হায় হায়।

 

যেই না বলেছ কলকাতা কথা হে আমার প্রিয়তম

এ’ফোঁড় ও’ফোঁড় করেছে হৃদয় তীর এক হায় হায়

সে হরিৎ রূপ, শ্যামলী মধুর, দেখি নাই দেখি নাই

ঝলমেল ঐ রমণী রতন কোথা আর হায় হায়

সবুর কর হে, কি ধারালো তার দিঠি কটাক্ষ সেই

তার ইশারার তীর বিঁধে আছে এ হৃদয়ে হায় হায়।

জানি না আজ কতদিন হোল মির্জা দিল্লী ছেড়ে কলকাতা এসেছেন।  প্রায় বছরখানেকের এই সফরে কত শহর, কত গ্রাম, কত পথ, কত নদ, নদী, কানন, বীথী, পেরিয়ে তবে এই স্বপ্নের শহর কলকাতা পৌঁছানো! লোহারু, ফিরোজপুর, ঝির্‌কা, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, বাঁদা, এলাহাবাদ, বারানসী, মুর্শিদাবাদ হয়ে তবে কলকাতা পৌঁছনো।  সন্দেহ নেই, বিপজ্জনক এবং প্রাণান্তকর সফর।  এমনও নয় যে এই সমস্ত যায়গায় তিনি সবসময় যথেষ্ট সম্মান পেয়েছেন! কোথাও কোথাও অসম্মানও সহ্য করতে হয়েছে বৈকি।  কতবার কতজন দিল্লী ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, কিন্তু মির্জা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছেন।  দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে গিয়েছেন নিজের গন্তব্যের দিকে।  শেষমেশ ১৮২৮ সালের এক আসন্ন বসন্তের ভরা দ্বিপ্রহরে পা রাখলেন কলকাতার পথে।

ইদানীং কলকাতায় আর সেভাবে বসন্তকে অনুভব করা যায় না।  রাস্তার দুধারে ফুলে-ফুলে ঝলমল করতে থাকা গাছগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।  সেদিন এ শহরটা প্রাকৃতিকভাবে এমন দীন ছিল না।  আস্তে আস্তে শীত তার ডানা গুটিয়ে নিচ্ছিল, দখীনা বাতাস তার মিঠে আমেজে একটু একটু করে ভরিয়ে তুলছিল মানুষের মন।  ঝরে যাওয়া হলুদ পাতাদের বদলে গাছে গাছে কিশলয়ের দোল।  নববধূর ঘোমটা তোলার মত করে অত্যন্ত সন্তর্পণে কুঁড়িগুলো দল মেলছিল।  চারদিকে সে যে কী এক অপূর্ব শান্তি! বুকভরে শ্বাস নিলেন মির্জা।  হয়তো মনে মনে বলেও ফেললেন – ‘দিল্লীতে কোথায় এ সৌন্দর্য’!

তারপর নানান চাপানউতোর, নানান টানাপোড়েন।  না, কলকাতা তাঁকে কোনোভাবেই তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পারেনি।  না মুসায়রায়, না কাছারিতে।  গজলের আসরে তাঁর ফার্সি জ্ঞান নিয়ে সমালোচনা করা হোল, আর স্যার জন ম্যালকম’এর দরবার তাঁর সঠিক পেনশনের আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিল।  ফার্সি শিক্ষায় গভীর শিক্ষিত একটা মানুষ, লিখিতভাবে ক্ষমা চেয়ে, মাথা নিচু করে, সমস্ত আশাভরসা জলাঞ্জলি দিয়ে, ফিরে গেল দিল্লী, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক চূড়ান্ত অসম্মানের জীবন।  তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষা করছিল খাতকের দল।

সুসংবাদ পৌঁছোতে সময় লাগে, কিন্তু দুঃসংবাদ বাতাসের থেকেও দ্রুতগামী।  মির্জা দিল্লী পৌঁছোনোর আগেই পৌঁছে গিয়েছে তাঁর পরাজয়ের খবর। খাতকেরা সব দল বেঁধে কোর্টে পৌঁছে গিয়েছে।  জজ সাহেব একতরফা ডিক্রি জারি করে তাঁর নামে ওয়ারেন্ট বারকরে দিয়েছেন।  বড় একা মির্জা তখন।  প্রথমে বেশ কয়েকদিন নিজেকে গৃহবন্দী করে রাখলেন।  ঘরের ভেতরে ঢুকে কাউকে বন্দী করার রেওয়াজ তখনও শুরু হয়নি।  কিন্তু কতদিন! কতদিন আর এভাবে থাকা যায়! তাই একদিন বাধ্য হয়েই আত্মসমর্পণ করলেন। এবারে মামলা উঠল মুন্সি বদরুদ্দিন অজুর্দা’র এজলাসে। খুব একটা কিছু তর্কাতর্কি হওয়ার তো কোনও কারণ ছিল না! হয়ওনি। মির্জার পক্ষে কোনো কৌঁসুলিও ছিল না। কেবল সাজা শোনাবার আগে তাঁকে যখন আত্মপক্ষ সমর্থনের অনুমতি দেওয়া হোল, মুচকি হেসে তিনি বললেন,  

কর্জ কী পিতে থে ম্যয় অঔর সমঝতে থে কী হাঁ

রঙ লায়েগী হমারী ফাঁকা মস্তী একদিন।

ধার করে মদ খেয়ে ভেবে গেছি মনেমনে আমি চিরদিন

সার্থক হবেই জানি এই ফাঁকা উচ্ছলতা কোনো একদিন।

জজসাহেবও মৃদু হাসলেন।  নিয়মমত সাজাও শোনানো হোল।  কিন্তু মির্জাকে বন্দী করা হোল না।  বদরুদ্দিন সাহেব নিজের পকেট থেকে সাজার সমস্ত পয়সা সরকারি তহবিলে জমা করার ব্যবস্থা করেছেন।  মির্জা’র শাস্তি হওয়া শুধু অন্যায়ই নয়, পাপ।  জানিনা অল্লাহ্‌পাক মুন্সিজী’কে জন্নত নসিব করেছিলেন কি না!

সে ছিল এক খামখেয়ালী কবি’র তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।  বাড়ি ফিরে অত্যন্ত অসময়ে কাল্লুমিঞাকে তাঁর দৈনন্দিন বরাদ্দ দু-পেয়ালার একটি পরিবেষণের হুকুম দিলেন।  যদিও এই ইংরিজি মদে সেই মৌতাত হয় না, যা ফরাসী মদে হোত, কিন্তু কি আর করা যায়, ভিখারির অত বাছবিচার করলে চলে না।  দু-দিন পর হয়তো এও জুটবে না।  এক চুমুকে সবটুকু খেয়ে নিলেন মির্জা।  জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলেন খানিকক্ষণ। উদাস দৃষ্টি।  যেন কোন সুদূর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। স্বপ্ন দেখতে চাইছেন নৌসামিঞা।  চিরদিন তাই দেখে এসেছেন।  মাত্র তের বছর বয়েসে মায়াঅঞ্জন চোখে, সভাকবি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দিল্লী এসেছিল যে তরুণ, নানান টানাপড়েনের দুর্গম পথ পেরিয়ে আজ সে প্রৌঢ়ত্ত্বেরও প্রায় শেষ সীমায় উপনীত। তবু আজও স্বপ্ন দেখেন তিনি।  আসলে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসেন তিনি।  স্বপ্নবিলাসী নন, বরং স্বপ্নপ্রেমিক বলা যায়।

কতক্ষণ এভাবে বসেছিলেন কে জানে! একসময় সূর্য পশ্চিমে পাড়ি দিয়েছে।  দিনান্তের স্তিমিত আলোও গুটিয়ে আসছে সন্তর্পণে।  ঘরের ভিতর অন্ধকার।  কাল্লুমিঞা আলো দিয়ে যায়।  তাকে এবার দ্বিতীয় পেয়ালা পরিবেষণের আদেশ দেন মির্জা।  সারাদিন কিছু খাননি তিনি।  কাল্লু সে প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে কিছু খাওয়ার অনুরোধ করায় তার দিকে এমনভাবে তাকান, যে সে ভয়ে আর কিছু বলতে পারে না। পেয়ালায় দ্বিতীয়বার শরাব ঢেলে, দেরাজে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে চলে যায় সে।  এ তার দৈনন্দিন কাজ।এরপর মির্জা যতই গর্জন করুন বা আবেদন করুন না কেন, কোনো অবস্থাতেই আর সে দেরাজ খুলবে না।  মির্জা জানেন সে কথা।  কাল্লু চলে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে উঠে প্রথমে জানালা, ও তারপর দরজাটাও বন্ধ করে দিলেন।  এ সময় কোনো অশান্তি চান না তিনি।  ছোট্ট একটা চুমুক দিলেন পেয়ালায়।  অনেকক্ষণধরে আদালতে বলা লাইন দুটো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।  কাগজ-কলমে মনোনিবেশ করলেন।  নতুন এক সৃষ্টির স্বপ্নে ডুব দিলেন মির্জা অসদুল্লাহ খাঁ গালিব।

হমসে খুল যাও, বওয়ক্ত-এ-ম্যায়-পরস্তী এক দিন

ওয়ার্না হম ছেড়েঙ্গে, রখকর উজ্র-এ-মস্তী এক দিন।

গর্‌র-এ-অওজ-এ-বিনা-এ-আলম-এ-ইমকাঁ ন হো

ইস বলন্দী কে নসীবোঁ মেঁ হ্যায় পস্তী এক দিন।

কর্জ কী পিতে থে ম্যয় অঔর সমঝতে থে কী হাঁ

রঙ লায়েগী হমারী ফাঁকা মস্তী একদিন।

নগমা হায় গম কো ভী, এয় দিল, গনীমৎ জানিয়ে

বে সদা হো জায়েগা ইয়ে সাজ-এ-হস্তী এক দিন।

ধৌল ধপ্পা উস সরাপা-নাজ কা শোবা নহীঁ

হম হি কর ব্যায়ঠে থে, গালিব, পেশ-দস্তী এক দিন।

 

নিজেকে উজাড় কোরো সুরার আসরে ওগো কোনো একদিন

নাহলে নেশার ঝোঁকে খুনসুটি করে যাব কোনো একদিন

অভিমানী হোয়ো না গো কোনোদিন ছোঁও যদি সাফল্যের চুড়া

সব শ্রী'র ভাগ্যে জেনো লেখা আছে ঝরেপড়া কোনো একদিন।

ধার করে মদ খেয়ে ভেবে গেছি মনে মনে আমি চিরদিন

সার্থক হবেই জানি এই ফাঁকা উচ্ছলতা কোনো একদিন।

বেদনাবিধুর সুর পরম প্রাপ্তি বলে মেনে নিতে শেখ ওরে মন

নিস্তব্ধ হবেই এই জীবনসঙ্গীত হায় ধীরে ধীরে কোনো একদিন

আপাদমস্তক এক অভিমানী নারী সে যে কলহ স্বভাবা সে তো নয়

আমিই করেছি আগে গোলযোগ, গালিব, সে কোনো একদিন।

 

 

 


মধুবন চক্রবর্তী

 

রামকৃষ্ণ সঙ্গীত আর বিবেকানন্দ কীর্তন

 


ইংরেজী নববর্ষের প্রথম দিবস, আমাদের কাছে আনন্দের দিবস। নতুন বছরের উৎসব যাপনের আনন্দে বিভোর হয়ে ওঠে দাড়া বিশ্ব। পুরনো বছরের সমস্ত আত্মগ্লানি, আত্মশ্লাঘা, বিবর্ণ সময়কে মুছে ফেলে নতুন বছরের নতুন স্বপ্নকে আঁকড়ে বাঁচার আনন্দ। এই আনন্দের কত রকম বহিঃপ্রকাশ। কতরকম স্তর, কতই না তার নাম।

১লা জানুয়ারি, ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই পৌষ ১২৯২ কৃষ্ণা একাদশী তিথিতে কাশীপুর উদ্যানবাটি দেখেছিল আধ্যাত্মিক আনন্দের এক গভীরতম প্রকাশ। দেখেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তলীলা। এই অন্ত্যলীলা পথে তাঁর বিশ্বরূপ দর্শনে বিহুবল হয়ে পড়েছিলেন ভক্তকুল। কল্পতরু হয়েছিলেন প্রাণের ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। রামচন্দ্র দত্ত তাঁর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের 'জীবন বৃত্তান্ত' গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন,

"১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পয়লা জানুয়ারি হইতে ইহা আমাদের পরম সৌভাগ্যের দিন বলিয়া অবধারিত হইয়াছে। ওই শুভদিনে পতিতপাবন দীনবন্ধু রামকৃষ্ণদেব, সাধন_ভজনবিহীন, দীনহীন পতিতদিগের প্রতি সদয় হইয়া কল্পতরুরূপে, করুণাধারা বর্ষণ করতঃ কলির কলুষরাশি পরিপূর্ণ জীবদিগকে কৃতার্থ করিয়া 'তোমাদের সকলের চৈতন্য হোক'… বলিয়া আশীর্বাদ করিয়াছিলেন। অভয়দাতা দীননাথের এই আশীর্বাদ চিরকাল ফলবতী থাকিবে।"...

এক অদ্ভুত বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন ভক্তকুল সেই দিনটিতে। ভক্ত বৈকুণ্ঠনাথ স্বামী সারদানন্দকে বলেছিলেন, "সকল পদার্থের ভিতর ঠাকুরের পূর্ণদর্শন লাভে স্তম্ভিত ও মুগ্ধ হইতে লাগিলাম।" ঠাকুর ঐরূপ ভাবাপন্ন হয়ে সেই সময় উপস্থিত সকল ভক্তদিবকে স্পর্শ করে তাদের ভেতর ধর্মশক্তি সঞ্চারিত করেছিলেন ধর্ম ভাবকে জাগ্রত করেছিলেন।

মহাজীবনের পথিক শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কল্পতরু হয়েছিলেন শুধু এই একটা দিনের জন্যই নয়, সমগ্র জীবনে রোগ, দুঃখ, যন্ত্রণা, জটিলতা গ্লানি সবকিছু পেরিয়েই সত্য স্পন্দনের চৈতন্য অনুভূতির জাগরণের কথা বলে গেছিলেন, সংগীতের মধ্যে দিয়ে কথার মধ্যে দিয়ে ভাবের মধ্যে দিয়ে।  শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপাশক্তির বাঁধ সেদিন যেন ভেঙে উপচে পড়েছিল। কথামৃতে এর একটি ঝলক দেখতে পাওয়া যায়। কথামৃতকার জানাচ্ছেন, 'আজ সকালে প্রেমের ছড়াছড়ি'। নিরঞ্জনকে বলেছেন, “তুই আমার বাপ, তোর কোলে বসবো”। কালীপদর বক্ষ স্পর্শ করিয়া বলিতেছেন 'চৈতন্য হও’ ...আর চিবুক ধরিয়া আদর করিতেছেন। তার এই দিব্যপ্রকাশকে স্বামী সারদানন্দ মহারাজ বলেছেন আত্মপ্রকাশে অভয়দান। শুধু পয়লা জানুয়ারির দিনটি কেন, তার অনেক আগে থেকেই তিনি ভাবসমাধিস্থ হতেন। আর এই ভাব সাধনার বড় মাধ্যমই ছিল সংগীত। সাধনার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম সংগীত নামক পরম শাস্ত্রর কাছে তিনি করেছিলেন আত্মসমর্পণ। সুরজগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠতেন বারংবার। সঙ্গীতকে অবিলম্বন করে ভাবজগতের এক উত্তুঙ্গ শৃঙ্গে পৌঁছে যেতেন। সংগীতের অন্তরে প্রেমকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। খন্ড ব্যক্তি পুরুষের সঙ্গে অখন্ড পরম পুরুষের প্রেমের নিবিড়তম সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। ভারতীয় দর্শনে আধ্যাত্মিক চিন্তার শেষকথা আত্মসমর্পণ। গানের মধ্যে দিয়ে রামকৃষ্ণের বিশেষ চেতনা যেন জাগ্রত হয়েছিল। তিনি নিজে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই হয়তো পয়লা জানুয়ারির দিনটিতে ভাবসমৃদ্ধ হওয়ার সময় তিনি সকল ভক্তদের উদ্দ্যেশ্যে বলেছিলেন 'চৈতন্য হউক।'

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের তুরীয় অবস্থাগুলির সঙ্গে সংগীতের, কথা এবং সুরের এক অবিচ্ছন্ন সম্পর্ক ছিল, যাকে বা যে অবস্থাকে তাঁর অনুগামীরা ভাবসমাধি বলতেন। বা 'সুফি'  ধর্মশাস্ত্রে 'ফানা'র এক সমান্তরাল অবস্থা বলে মনে করা হয়। সংগীতের মধ্যে দিয়ে ভাবসমাধির বেশ কিছু বিবরণ পাওয়া যায়, মহেন্দ্রনাথ দত্তের গদ্য রচনায়। তিনি বলছেন, "অনেক সময় বৈঠকখানায় কথাবার্তা শেষ হইলে পরমহংসমশাই দক্ষিণ দিকের ছোট উঠানটিতে গিয়া কীর্তন করিতেন। রামদাদা ও মনমোহনদাদা প্রথমে কীর্তনের গান আরম্ভ করিতেন। কীর্তনে খোল করতাল বাজিত না। একদিনকার কীর্তনের গান একটু স্মরণ আছে। গানটি হইল-

‘হরি বলে আমার গৌর নাচে

নাচেরে গৌরাঙ্গ আমার হেমগিরির মাঝে'।

কীর্তনের গান আরম্ভ করিলে পরমহংসমশাই কীর্তন এবং মাঝে মাঝে করতালি দিতেন”।

এসব বিবরণ থেকেই প্রমাণিত হয়, কীর্তন, সংকীর্তন ভাবসংগীত শুনতে শুনতে মাঝে মাঝেই তিনি সমাধিস্থ হয়ে যেতেন। এবং অনেক পরে প্রকৃতস্থ হতেন। স্বামীজীর গান তিনি পছন্দ করতেন। নরেন্দ্রনাথ এলেই দু’ চার কথার পর, তাঁকে গান গাইতে বলতেন। কিছুক্ষণ গান শোনার পর ভাবস্থ হতেন। আনন্দঅশ্রু ঝরে  পড়তো তাঁর দু চোখ বেয়ে। অনেক সময় পছন্দ না হলে বলে উঠতেন, 'আলুনি'। মানে ভাববিহীন গান হচ্ছে।

কীর্তনের প্রসঙ্গ আসতেই, এখানে স্বামী বিবেকানন্দের কীর্তন গানের প্রতি শ্রদ্ধার কথাও তুলে ধরতে হয়।

বিবেকানন্দ 'কীর্তন' গানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তা গাইবার সময় ‘আখর যুক্ত’ করে গান গাইতেন। তার নিদর্শন শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে আমরা পাই। উদ্যানবাটি-তে শ্রীরামকৃষ্ণদেব যখন অত্যন্ত অসুস্থ, তখন একদিন একটু স্বস্তিবোধ করার সময় সকলকে বুঝিয়ে বলেন যে, নরেনের হলো ‘বীরভাব’ আর মণির হলো

'’সখীভাব’। তখন নরেনকে ঠাকুর গান গাইতে বলায় নরেন সুর করে গেয়েছিলেন-

"নলিনী দলগত জলমতি তরলং

তদ্বজীবনমতিশয় চপলম

ক্ষণমপি সজ্জন সঙ্গতি রেকা

ভবতি ভবর্ণবতরনে নৌকো"

অর্থাৎ পদ্মপাতার ওপর জল যেমন টলমল করছে, অল্প সময়ের জন্য একটুখানি সাধুসঙ্গ করতে পারলেই, এই সংসারসাগর পার হওয়ার ক্ষেত্রে নৌকো হয়ে দাঁড়ায়। ‌এই গান গাওয়া মাত্র শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, "ওকি ওকি! ওসব ভাব অতি সামান্য”। একথা শুনে নরেন্দ্রনাথ সখীভাবের গান গাইলেন।

বিবেকানন্দ কীর্তন গাইতেন এবং সেইসঙ্গে নৃত্য করতেন। আবার তিনিই বলেছিলেন, "কীর্তন গাইবি কেন? ধ্রুপদ গা, ধ্রুপদের মধ্যে একটা বীরত্বের ভাব আছে"।

বিবেকানন্দ কীর্তনের বিরোধী ছিলেন না, তবে কীর্তন গাইতে গিয়ে পুরুষের মেয়েলিভাবের বিরোধী ছিলেন। তবে রাধাকৃষ্ণের লীলাকে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি বলেছেন, রাধা কৃষ্ণের প্রেমে কাম নেই। রাধা বলেছে কৃষ্ণকে তুমি আমার বুকে পা রাখো আমার কাম অন্তহিত হবে। ভগবানের প্রেমে কামভাব থাকে না, ভগবানের প্রেম পূর্ণ হৃদয়। আপামর মানুষের জন্য কীর্তনের গায়কের মধ্যে নতুনত্বে আগ্রহী ছিলেন, ঠিক নতুনত্ব না হলেও ধ্রুপদাঙ্গের কীর্তন পছন্দ ছিল, যা অনেকেই গেয়েছেন, নরোত্তম দাস ঠাকুর এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। খেতুরীর মহাসভায় ধ্রুপদাঙ্গের কীর্তন পরিবেশন করেছিলেন। প্রভাতকুমার গোস্বামী বলেছেন, "কেউ কেউ তো ধ্রুপদ অঙ্গের কীর্তনকে অভিজাত সংগীতের স্তরে তুলে দিয়েছেন। কীর্তন মানুষের গণ-উপাসনার মাধ্যম হয়ে উঠেছে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না”।

স্বামী বিবেকানন্দ কিছু বিখ্যাত গান রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নাহি সূর্য নাহি জ্যোতি’, যা নির্বিকল্প সমাধি ও আত্মার ধারণা ব্যাখ্যা করে। এছাড়াও তাঁর লেখা আরো কিছু গান এবং স্তোত্র রয়েছে যেমন – “মা আমায় মানুষ করো”, “কে তুমি বাজালে নবীন", “হে মোর স্বামীজি" – ইত্যাদি, যা আধ্যাত্মিক ভাবধারা দ্বারা সমৃদ্ধ বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে পরিবেশিত হয়েছে বহুবার।

সংগীতের ক্ষেত্রে রামকৃষ্ণ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন তো বটেই, সেইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘ব্রহ্মসংগীত’ও বিবেকানন্দকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর লেখা সংগীত ‘কল্পতরু’ গ্রন্থে। এইসব গান তিনি নানাসময় তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণকে শুনিয়েছিলেন। শোনা যায় ১৮৮৫ সালের ১৪ই জুলাই বাগবাজারের বলরাম বসুর বাড়িতে তিনি শুনিয়েছিলেন, “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”, যা শুনে আত্মহারা হয়ে যান রামকৃষ্ণ। এছাড়াও শুনিয়েছিলেন "দিবানিশি করিয়া যতন"। আসলে নরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজেও ছিলেন একজন উচ্চমানের ধ্রুপদী। তাই রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদ আঙ্গিকের কিছু গান তিনি নিজের কন্ঠে তুলে গাইতেন।

বিবেকানন্দের জীবনে একমাত্র পথপ্রদর্শক তো রামকৃষ্ণই। তাঁর মৃত্যুর ন-মাস পর বরানগর মাঠে বসে তিনি গেয়েছিলেন, "আমরা যে অতি শিশু অতি ক্ষুদ্র মন"। এমন কি কৃষ্ণকুমার মিত্রের বিবাহ অনুষ্ঠানেও তিনি রবীন্দ্রনাথের লেখা কতগুলি গান পরিবেশন করেছিলেন। দুই মহামানবের একমাত্র যোগসূত্র ছিল সংগীত।  ঠাকুর সব থেকে বেশি পছন্দ করতেন নরেনের গান শুনতে, বেশি করে শুনতে চাইতেন, "মন চলো নিজ নিকেতনে"।

শ্রীরামকৃষ্ণের পুরো অস্তিত্বেই ছিল সংগীত। বহু গানের আসরে ঠাকুর নরেনের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদাঙ্গের বেশ কিছু গান শুনতেন। অন্যান্য গানও ছিল। সেগুলো হল-

"গগনের থালে রবীচন্দ্র দীপক জ্বলে"... (শিখ ভজনের আশ্রয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের গান)। এখানে কবিগুরুর একটি গানের কথা মনে পড়ে- 

“আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার

চরণ ধুলার তলে,

সকল অহংকার হে"...

স্বামী বিবেকানন্দ দুবার এই গান গেয়ে শুনিয়েছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণকে। এছাড়া “সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর, আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর”।

স্বামী বিবেকানন্দ ছাড়াও আরোও একজনের গান ও তাঁর গায়ন ভঙ্গি রামকৃষ্ণকে আপ্লুত করে তুলত, তিনি হলেন ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল। ধীরে ধীরে রামকৃষ্ণের প্রিয় গায়ক হয়ে উঠেছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথ শুধুমাত্র গীতিকারই ছিলেন না, ছিলেন একজন সাহিত্যসেবক। ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত, শ্রীচৈতন্যের জীবনধর্ম,  কেশবচরিত, বিধানভারত, গীতরত্নাবলী ইত্যাদি গ্রন্থের তিনি রচয়িতা। ত্রৈলোক্যনাথের লেখাও পছন্দ করতেন রামকৃষ্ণ। একবার তিনি তাঁর ভক্তদের বলেছিলেন, তোরা ত্রৈলোক্যের সেই বইখানা পড়িস, ভক্তি চৈতন্যচন্দ্রিকা, তার কাছে একখানা চেয়ে নিস না বেশ, চৈতন্যদেবের কথা আছে”। ত্রৈলোক্যনাথের আর একটি অবিস্মরণীয় সাহিত্যকীর্তি হলো ‘নব বৃন্দাবন’ নাটক, যে নাটকের অভিনেতা ছিলেন কেশবচন্দ্র ও স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ এবং দর্শক ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। কেশববচন্দ্র সেনের অনুরাগী এবং ব্রাহ্ম সমাজের একনিষ্ঠ সাধক। সংগীত ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। ‌ঠাকুরের সংস্পর্শে এসে তিনি আত্মচেতনায় ভরপুর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর গান শুনে বিভোর হয়ে যেতেন রামকৃষ্ণ।

শিমুলিয়া সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ এসেছেন, সঙ্গে রয়েছেন রাম মনমোহন তৈলক্য ও মহেন্দ্র গোস্বামী প্রভৃতি ভক্তরা।। ঘরের মধ্যে ত্রৈলোক গান গাইছেন, ঠাকুর মাতোয়ারা হয়ে নৃত্য করছে্‌ সুরেন্দ্রর দেওয়া মালা যা প্রথমে ফেলে দিয়েছিলেন ঠাকুর, সেই মালা তুলে গলায় পড়লেন তিনি। একহাতে মালা, অন্যহাত দোলাতে দোলাতে গান আর নাচ করছেন-

“হৃদয়ে পরশমণি আমার

ভূষণ বাকি কি আছে রে?

জগতচন্দ্র হার পড়েছি"।

 


প্রদোষ ভট্টাচার্য

 

বড় পর্দায় হিন্দী ছবি নতুন ছবি – ধুরন্ধর (২০২৫)


 

“এক হাজার ক্ষতের মাধ্যমে ভারতের রক্তক্ষরণ ঘটাবো!” ১৯৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের হাতে চরমভাবে পরাজিত হবার পর পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাধ্যক্ষ এবং পরে রাষ্ট্রপতি জিয়া-উল-হক-এর এই উক্তি, যার পূরণ আমাদের পশ্চিমী প্রতিবেশী সেদিন থেকে আজ নিষ্করুণভাবে করে চলেছে।

ছবির শুরুতেই দেখি কান্দাহারে ভারতীয় বিমান অপহরণের অপমানজনক উপসংহার। বিমানে বন্দী ভারতীয়দের মুক্তির বিনিময়ে – তাও এক সদ্য-বিবাহিত যুবককে নির্মম হত্যার পর – ভারতে বন্দী একাধিক সন্ত্রাসবাদীকে ছেড়ে দিতে রাজী হতে হয় দেশের সরকারকে। এরপরে, বিমানে উঠে ভারতের আমলা অজয় সান্যাল (বাস্তবের অজয় দোভাল, অভিনয়ে আর মাধবন) অপহৃত যাত্রীদের দেশে ফেরার কথা বলে আশ্বস্ত করে ডাক ছাড়েন, “ভারত মাতা কী”, কিন্তু যাত্রীরা কেউ “জয়!” বলে প্রত্যুত্তর দেবার সাহস করে না – কারণ সান্যাল সাহেবের মাথার পেছন থেকে একজন অপহরণকারী পিস্তল তাক করে রেখেছে তাদের দিকে!

তারপর আমরা দেখি দিল্লীর সংসদ ভবনে আতঙ্কবাদী হামলা। এতে বিদেশমন্ত্রী (অভিনয়ে আকাশ খুরানা) বাধ্য হন সান্যালের প্রস্তাবে রাজী হতে। ভারতের কারাগারে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত এক অপরাধীকে মুক্ত করে ছদ্মবেশে পাকিস্তানে ঢোকানো হবে। এই ব্যক্তি নাম নেবে ‘হামজা আলি মাজারি’ (অভিনয়ে রণবীর সিং), আপাতদৃষ্টিতে এক বালোচী। সে ধীরে ধীরে করাচীর মধ্যে লিয়ারী অঞ্চলে পাকিস্তানী অপরাধ জগতের অন্যতম ‘ডন’ রেহমান ডাকাইত-এর (অক্ষয় খান্না) বিশ্বাস-অর্জন করে তার দলে প্রবেশ করে ভেতর থেকে পাকিস্তানের কুকর্মের প্রতিকার করবে।

আফগানিস্থান থেকে পাকিস্তানের লিয়ারীতে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে প্রথম বীভৎস ঘটনা। রাতে, নিজের ‘হ্যান্ডলার’ মহম্মদ আলমের (অভিনয়ে গৌরব গেরা) সঙ্গে কথাবার্তার পর আলমের দোকান থেকে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে হামজা মুখোমুখি হয় একদল বালোচী-বিরোধী গুণ্ডার। তাদের নেতা হামজার পাজামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তার গোপনাঙ্গ নিয়ে কামক্রীড়া করার পর নিজের সোৎসাহে নিজের হাতের গন্ধ শোঁকে। হামজা প্রত্যুত্তরে মারামারি শুরু করলে দলটি তাকে মাটিতে ফেলে তার পাজামা টেনে নামিয়ে হামজাকে পায়ুধর্ষণে সচেষ্ট হয়। আমাদের সুরক্ষিত রাখার জন্য যারা শত্রুদেশে যায়, আমরা সাধারণত তাদের জীবন এবং হাত-পায়ের ওপর আক্রমণ হওয়ার কথা ভাবি – তারা যে ধর্ষিত হয়, সে সম্ভাবনা স্বপ্নেও আমাদের মনে আসে কি? সেই মুহূর্তে অকুস্থলে একটি পুলিশ-ভ্যান এসে পড়ায় হামজা রক্ষা পায়, দলটি পালায়। তারা ধরা পড়লেও শাস্তি পেত ধর্ষণের জন্য নয়, সমকামী যৌনকর্মের জন্য, যা এই সেদিন অবধি ভারতেও দণ্ডযোগ্য অপরাধ ছিল, মৌলবাদী মুসলমান দেশে তো আরও তাই! সাম্প্রতিক গাজায় পুরুষ ইজরেলী পণবন্দীদের ধর্ষণ করার পর হামাস কর্তৃপক্ষ ধর্ষকদের প্রাণদণ্ড দেয়, ধর্ষণের অপরাধে নয়, সমকামিতার ‘অপরাধে’। যদি হামজা ধর্ষিতও হতো আর পুলিশ এসে ধর্ষকদের সঙ্গে হামজাকেও তুলে নিয়ে যেত, সম্ভবত সমকামিতার ‘অপরাধে’ ধর্ষক এবং ধর্ষিত – শেষজন বালোচী হবার বাড়তি ‘অপরাধে’ সমানভাবে দণ্ডিত হতো। পাঠকদের স্মরণ করাই, এই ধারাবাহিক লেখার সপ্তম পর্বে (‘ব্ল্যাক ও তার বিপরীতে কিছু ‘বাজে’ ছবি’) উল্লেখিত বদ্রীনাথ কী দুলহানিয়া-র কথা। সেখানেও বিদেশের মাটিতে রাতের বেলায় বরুণ ধাওয়ান অভিনীত নায়ক ও তার সঙ্গীরা একদল দুষ্কৃতির হাতে গণধর্ষিত হতে যাচ্ছিল, এবং ছবির নির্মাতারা, ছবির নায়িকা (আলিয়া ভট্ট) ও তার সঙ্গিনীরা, এবং প্রেক্ষাগৃহের দর্শকেরা এটিকে হাসির খোরাক হিসেবে নেন!

ছবিটি এতদিক থেকে অসাধারণ যে তার সমস্ত গুণ নিয়ে লিখতে গেলে এক পর্বে হবে না। বরং বিভিন্ন চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেতাদের কথা বলি। এখানে একজন নায়ক ও তার বিপরীতে একদল খলনায়ক। রেহমান ডাকাইত-রূপী অক্ষয় খান্নার উল্লেখ আগেই করেছি। লিয়ারীর রাজনীতিবিদ জামিল জামালির (বাস্তবে নবিল গাবোল) ভূমিকায় চমকে দিয়েছেন এতদিন মোটা দাগের ভাঁড়ামি-করা চরিত্রের জন্য পরিচিত রাকেশ বেদী। একাধারে ক্রূরতা এবং হাস্যাস্পদতার অদ্ভুত সংমিশ্রণ তাঁর চরিত্রচিত্রণে। জামালির কন্যা ইয়ালিনার চরিত্রে সারা অর্জুনের চেহারা, অভিব্যক্তি, স্বরক্ষেপ – সমস্ত যথার্থ। ক্ষমতাবান নেতার কন্যা হিসেবে অধিকারবোধে আক্রান্ত, দিনরাত পার্টি করা আর শপিঙে মগ্ন, এবং খোদাই-করা দেহবিশিষ্ট হামজাকে দেখে নির্বোধের মতো মুগ্ধ হওয়া কন্যার চরিত্র সঠিকভাবে সারা ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রেমিকের কথায় পিতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ অফিসার চৌধুরী আসলামের (সঞ্জয় দত্ত) গোপন কথোপকথন ফোনে ‘ভিডিও’ করে হামজার হাতে তুলে দিয়ে ইয়ালিনা কাহিনির অগ্রগতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাকি খলনায়কদের মধ্যে উপর্যুক্ত আসলাম চৌধুরী-রূপী সঞ্জয় দত্ত হিংস্র। আই এস আই-প্রধান মেজর ইকবাল (অভিনয়ে অর্জুন রামপাল, বাস্তবে চরিত্রটির নাম ইলিয়াস কাশ্মিরী) ২৬/১১-র মুম্বাই হামলার আগে আতংকবাদীদের ঠাণ্ডা গলায় বলেন যে, তাজ হোটেলে কোন ‘ফিরিঙ্গী’, বিশেষ করে ইহুদী, যেন না বাঁচে, তারা সব ‘কাফের’। হামজার সামনে টিভির পর্দায় হত্যাযজ্ঞ দেখতে দেখতে রেহমান, ইলিয়াস, সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ে। তাদের ধর্মীয় স্লোগান তোলার দৃশ্যও মানসিক দিক দিয়ে হামজা এবং দর্শকের মনে অশান্তির সৃষ্টি করে।

পাকিস্তানের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব – বালোচী বনাম পাঠান – আর ব্যক্তিগত বিদ্বেষ (আসলামের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া চালিয়েছিল আসলামেরই এক বালোচী সহকর্মী) কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। শেষে বালোচী নেতা রেহমানকে নিকেশ করতে হামজার সঙ্গে হাত মেলায় আসলাম, যার ফলে আসে ছবির রক্তক্ষয়ী শীর্ষবিন্দু।

এর পরের পর্ব ‘প্রতিশোধ’ – আসবে ২০২৬-এর মার্চে। অধীর আগ্রহের সঙ্গে প্রতীক্ষায় রইলাম।