ধারাবাহিক উপন্যাস
মহাকর্ষের ছায়া
(তৃতীয় পর্ব)
“মা...”
উঠল ডাকটা, তাপসের গলা থেকে। অনন্ত। আকাশের জ্যামিতিক শূন্যতায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল সে ডাক, তাপসেরই দিকে। একবার। দু’বার। তিনবার। প্রতিবার আরও ক্ষীণ, আরও দূরের। যেন অন্য কেউ ডাকছে, অন্য কোনো মাকে, অন্য কোনো আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে।
যা হতে পারত—বিমূর্ত এক ধারণা মাত্র। বেঁচে থাকে অনুমানের জগতে, সম্ভাবনার অনন্ত খোলসে মোড়া। যা হতে পারত আর যা হয়েছে, দুইয়েরই গন্তব্য একটি বিন্দু। চরম। চিরবর্তমান। স্মৃতির ভেতরে পদশব্দ, প্রতিধ্বনি তুলে তুলে। যে পথে হাঁটা হয়নি কোনোদিন, সেই পথ ধরে। যে দরজা খোলা হয়নি কোনোদিন, সেই দরজার দিকে।
ডেকে উঠল একটা পাখি। হঠাৎ। দেখা গেল না তাকে। স্পন্দিত হাওয়ার ভেতরে লুকোনো এক অশ্রুত সুরের টানে ডেকে উঠল আবার। আর ঘটে গেল একটা দৃষ্টিবিনিময়, অদৃশ্য। যা কিছু আছে, সবই যেন আছে দৃষ্ট হওয়ার জন্য। আলো থেকে জন্ম নেওয়া এক জ্যামিতিক নকশায় গৃহীত হয় সব।
যাও, যাও, ফিরে যাও—বলে উঠল পাখিটা। বাস্তবতার এতখানি ভার বেশিদূর বইতে পারে না মানুষ।
মনে হল তাপসের, এসে পৌঁছেছে সে পৃথিবীর এক ঘূর্ণায়মান বিন্দুতে। রক্তমাংস নেই সেখানে, আবার পুরোপুরি রক্তমাংসহীনও নয়। নেই কোনো আগমন। নেই কোনো প্রস্থান। সেই বিন্দুতেই সৃষ্টির আদিম নৃত্য। অতীত আর ভবিষ্যৎ সেখানে একাকার। আলো—উত্তাপহীন, মহাজাগতিক। স্থির, অথচ স্পন্দিত। এই স্পন্দন ছাড়া আর কোনো নৃত্য নেই বিশ্বে। এ বিস্তার সইতে পারে না মানুষের দুর্বল শরীর। তাই জন্ম আর মৃত্যুর আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া ছাড়া আর কোনো নিয়তি নেই তার।
আমার শুরুতে নিহিত আমার শেষ। জেগে উঠি, ভেঙে পড়ি, পর্যায়ক্রমে। চূর্ণ হই। প্রসারিত হই। ধ্বংসস্তূপ হই। পুরোনো পাথরে নতুন দালান, পুরোনো কাঠে নতুন ছাই। মাংস আর মল। মাটি আর ধুলো।
শুকিয়ে যায় সবুজ পাতা, মিশে যায় মাটিতে। নৈঃশব্দ্য, অন্তহীন। তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা, অজানা এক পুনর্জন্মের দিকে। বুকে জমে আছে সময়ের স্তর, অজস্র। অতীতের ভাঙা হাড়। পুরোনো দিনের প্রার্থনা, হারানো। প্রতিটি কাজ, এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি চেষ্টা—এই অনন্ত স্পন্দনের অংশ ছাড়া কিছু নয়। সময় ভাঙে, সময়ই আগলায়। মৃত অতীত নয় ইতিহাস। ইতিহাস বর্তমান। সমস্ত জীবনের খোঁজ শেষে ফিরে আসি সেই ঠিকানায়, যেখান থেকে শুরু। আমার শেষে নিহিত আমার শুরু।
তাপসের বুক থেকেই উঠে এসেছিল সে। নারীসত্তা। সম্পূর্ণ নগ্ন। প্রথমটায় কোনো মাতৃসুলভ উত্তাপ ছিল না তার চোখে। হাত বাড়িয়েছিল তাপস। ভেবেছিল, মিলবে এক চেনা আশ্রয়। কিন্তু সেই নারীসত্তা যখন ছুঁল তাকে, মনে হল ছুঁয়েছে একটা মূর্তি। কাঁচের। নিরেট। পালিশ করা।
বলে উঠল তাপস—
“জ্যামিতি পড়ি আমি, জ্যামিতি জানি। অথচ জ্যামিতির নিয়মে তোমায় পাই না। তবু কেন যে আমার কাছে তুমি জ্যামিতিরই মতো। জ্যামিতি বলে,
দুটি বিন্দু দিয়ে একটিমাত্র সরলরেখা যায়।
অথচ আমাদের দুজনের মাঝে সেই পথটাই দীর্ঘতম। আমারই বা কী দোষ? ভালোবেসেছিলাম তো আমি। বাসোনি তো তুমি।”
কথা বলল না নারীসত্তা।
দৃষ্টি শূন্য। যেন তাকিয়ে আছে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো মৃত নক্ষত্রের দিকে। বুঝল তাপস—বুকের ভেতরের ব্ল্যাকহোলটা আসলে এক তরল শূন্যতা, মহাজাগতিক। জাগতিক কোনো আবেগ বাঁচে না সেখানে। বাঁচে কেবল জ্যামিতি। মনের জট, অপরাধবোধ, একাকিত্ব—মানুষের যত সম্বল, এখানে এসে কয়েকটা স্থানাঙ্ক হয়ে যায় সব। কিন্তু এই স্থানাঙ্ক কি শুধুই মৃত্যুর? নাকি অনাগত কোনো সৃষ্টির নকশা?
রক্তমাংসের স্মৃতি কুয়াশা মাত্র, মায়াবী। অথচ জ্যামিতির নিখুঁত রেখায় চেতনা স্থির হলে বোঝা যায়—সমাপ্তি নয় মৃত্যু। অনন্ত শূন্যতার গর্ভে আত্মাকে নতুন করে মাপার এক গাণিতিক প্রক্রিয়া। ফিতে হাতে দাঁড়িয়ে থাকে শূন্যতা। মাপে। আবার মাপে।
ভাসতে ভাসতে এক নতুন নিয়মে বাঁধা পড়ল তাপস, মহাকর্ষহীন এই জগতে। ছেড়ে গেছে মাধ্যাকর্ষণ। তবু গ্রাস করল তাকে এক দোলন, উদ্দেশ্যহীন। এক টান, মহাজাগতিক। না পারছে পুরোপুরি নক্ষত্র হয়ে উঠতে, যেমন তার মা হয়েছিল বলে এতদিন ভেবে এসেছে। না পারছে মাটিতে ফিরতে। দুলতে শুরু করল সে, দুটি মাত্রার মাঝখানে। পেন্ডুলাম, অনন্ত। এদিক থেকে ওদিক। ওদিক থেকে এদিক। প্রতিটি দোলে ঝরে যায় একটু করে কিছু—একটা নাম, একটা গলার স্বর, ভাতের থালায় লেবু চিপে দেওয়ার শব্দ। থামে না দোলক। থামে কেবল যা ঝরে যায়।
সেই দুলুনির মুহূর্তেই সরে গেল পর্দাটা, একটু। আকাশের নিচে চেনা পৃথিবী। ছায়াহীন, ভরহীন শরীর নিয়ে ওপর থেকে তাপস দেখল তার ছেড়ে আসা শহর। দুটো জগৎ। বৈপরীত্য এতখানি যে এক শূন্যতায় ভরে উঠল তার সদ্য-গড়া চেতনা। নিচে পৃথিবীর ক্যানভাস—গলিত, বিশৃঙ্খল। অবিরাম ঘর্ষণ। ধুলো, ঘাম, ট্রাফিকের ধোঁয়া, জঞ্জাল। মানুষের কান্না, কানফাটানো কোলাহলে। অগোছালো সেখানে সবকিছু। অসমাপ্ত। জৈবিক যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
আর এখানে, এই সোনালি শূন্যতায়, নিজেকে আবিষ্কার করল তাপস—একটি বিন্দু। নিটোল। ঘর্ষণহীন। জ্যামিতিক। টানটান একটা তারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা যেন তার এখনকার অস্তিত্ব। সেই তারের দুই প্রান্তে বাঁধা নেই কিছুই। চারদিকে সোনালি—গলানো পেতলের মতো ভারী, অথচ ওজনহীন। আলো এখানে পড়ে না, ঝরে না। জমে থাকে। ছুঁলে হয়তো শব্দ হত, কাঁসার ঘণ্টার মতো। ছোঁয়ার হাত নেই কারো।
শব্দ নেই এই স্তরে। হাওয়ার ঝাপটা নেই। আক্ষেপও নেই। ‘কষ্ট’, ‘আবেগ’, ‘মৃত্যু’—গাণিতিক বৈধতা নেই এই শব্দগুলোর।
চিৎকার করার চেষ্টা করল তাপস, একবার। কেঁপে উঠল কণ্ঠনালী, ফাঁক হল ঠোঁট। বেরোল না শব্দ। নৈঃশব্দ্যের কম্পনটুকুও পৌঁছাল না কানে—যেন কান দুটোও আর তার নয়। আঙুল দিয়ে ছুঁল নিজের গাল। চোখের জল গড়িয়ে পড়ার কথা ছিল যেখানে। সেখানে মসৃণ, শুকনো এক তল। পালিশ করা মার্বেলের মতো ঠান্ডা। বৃষ্টির পর ভেজা রাস্তার চেনা গন্ধ। মায়ের হেঁশেলে সর্ষের তেলে ফোড়নের ঝাঁজ, যা আগে চোখে লাগত, পরে নাকে। মনে করতে চাইল। দেখল, ঘুরছে স্মৃতিগুলো মাথার ভেতর। ঘুরছে ঠিকই। কিন্তু ভার নেই তাদের। টান নেই। ফাঁকা এক সিনেমা হল। পর্দায় ছবি চলছে, নিঃশব্দে। দর্শকের আসনগুলো সব খালি।
নিচের ওই পৃথিবী—ফুটন্ত, রক্তমাংসের। আর এই জ্যামিতি—নিরাবেগ, হিমশীতল। সেতু নেই দুয়ের মাঝে। আছে কেবল একটা সমান্তরাল রেখা, অলঙ্ঘনীয়। এই গাণিতিক নৈঃশব্দ্যের ভেতর থেকে নিচের কোলাহলের দিকে তাকাল তাপস।
চোখ গিয়ে পড়ল একটা লোকাল ট্রেনের কামরায়। জানলার ধারে বসে বিনায়ক। ছেলেটাকে চিনত তাপস। চরম বিচ্ছিন্নতা তারও, তাপসেরই মতো। কিন্তু মহাজাগতিক স্তরে পৌঁছায়নি বিনায়কের বিচ্ছিন্নতা। আটকে আছে এক যান্ত্রিক আবর্তে।
সারাদিন চক্ররেলে ঘোরে বিনায়ক। লোকাল ট্রেনে ঘোরে। দমদম থেকে মাঝেরহাট। মাঝেরহাট থেকে বালিগঞ্জ। আবার শিয়ালদহ। গন্তব্য নেই। নামার তাগিদ নেই। এই পৃথিবীর বুকে দেয়ালঘড়ির একটা কাঁটা—ঘোরে, অথচ পৌঁছায় না কোথাও। এড়ায় মানুষের সঙ্গ। এড়ায় সমাজ। এড়ায় নিজের অস্তিত্বের ভারও। কামরার দুলুনির সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলেছে এক যান্ত্রিক ছন্দে। ওপর থেকে তাপস দেখল, পকেট থেকে একটা পুরোনো টিকিট বের করেছে বিনায়ক। গন্তব্যের ঘরটা ফাঁকা। টিকিটের কোণ ভাঁজ করে আঙুলে ঘোরায়, একবার, দু’বার। কামরায় ভিড়—বাদামওয়ালার ডাক, কারো মোবাইলে পুরোনো গান, ফেরিওয়ালার হাতে ঝুমঝুমি। পৌঁছায় না কিছুই বিনায়কের কানে। জানলার বাইরে সরে যায় বস্তির টিনের চাল, ডোবার সবুজ জল, ভাঙা এক মন্দিরের চূড়া। সরে যায়। ফিরে আসে না। বিনায়কও ফেরে না। ঘোরে কেবল। শরীর শক্ত হয়ে আসছে ক্রমশ, অনুভূতিহীন, কামরার কাঠের সিটের মতো। মাংসপেশি কীভাবে একটু একটু করে জড় হয়ে ওঠে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ—বিনায়ক।
চমকে উঠল তাপস। গতি আর স্থবিরতার এই খেলায় বাইরের তফাত কোথায়? কাঠের সিটে বসে ঘড়ির কাঁটার মতো শরীরকে জড় করে চলেছে বিনায়ক। আর সে ভাসছে এমন এক শূন্যতায়, যেখানে সময় ঝুলে আছে স্তব্ধ এক পরিধি হয়ে। মাধ্যাকর্ষণকে অস্বীকার করে যা পেয়েছে বলে ভেবেছিল, তা কি কেবলই এক অলৌকিক জড়ত্ব? উত্তর এল না। প্রশ্নটা ভেসে রইল তার পাশে, আরেকটা বিন্দুর মতো।
আরও কাছে এগিয়ে এল নারীসত্তা। মুখ তার অবিকল তাপসের মুখ। অথচ মাখানো এক আদিম নারীত্বের রহস্যে। শীতল আঙুল রাখল তাপসের কপালের কাছে। মনে হল তাপসের—স্মৃতির উষ্ণ ওম আর হিমাগারের এই কাঁচশীতল শূন্যতা একই মুদ্রার দুই পিঠ। একটি জন্ম দেয়। অন্যটি ফিরিয়ে নেয় তার আদিম ছাঁচে।
“ভেবেছিলে মুক্তি পাবে?” প্রতিধ্বনিত হল নারীসত্তার গলা, তাপসের মাথার ভেতর। সুর নেই তাতে। বাতাসের ফিসফিসানি কেবল। “জৈবিক শরীর নিয়ে মুক্তি হয় না। হয় রূপান্তর। সজীব থেকে জড়ে। নক্ষত্র হয়নি তোমার মা। মহাজাগতিক ধুলোয় মিশে গেছে কেবল। তুমিও তাই হচ্ছ। তবে মনে রেখো, মহাশূন্যের এই ধুলোই আদি বীজ।”
কথাগুলো শেষ হতেই ভেসে এল পুরনো পৃথিবীর এক ঝলক ঘ্রাণ, মহাজাগতিক শূন্যতার ঠিক মাঝখানে। মনে পড়ল বহু বছর আগের এক শীতের সন্ধ্যা। জ্বর তখন তাপসের, প্রচণ্ড। কাঁপছিল জ্বরের ঘোরে। কপালে ডান হাতটা রেখেছিল মা। সেই তালুতে এক ওম। খসখসে, অথচ পরম আশ্রয়ের। পৃথিবীর সব ভয় মুছে দিতে পারত। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করেছিল মা, “ভয় নেই রে, আমি তো আছি।” ঘরে জ্বলছিল একটা হারিকেন, পলতে নামানো। দেয়ালে মায়ের ছায়া, মস্ত, নড়ছিল আলোর সঙ্গে। মায়ের শ্বাসের সামান্য উত্তাপ—তাতেই যেন ভরে গিয়েছিল তাপস, এক নিরাপদ নক্ষত্রের আলোয়। সেই আলোর একটা গন্ধ ছিল। তুলসীপাতার। গরম দুধের।
আরেকটা স্মৃতি। আরও পুরোনো। আরও ঝাপসা। বয়স তখন ছয় কি সাত। স্কুল থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি নেমেছিল হঠাৎ। ভিজে একসা হয়ে বাড়ি ঢুকেছিল তাপস। ঠোঁট নীল। দাঁতে দাঁত ঠকঠক। কিছু না বলে সোজা রান্নাঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মা। মোটা একটা গামছায় চুল মুছে দিতে দিতে বকেছিল প্রাণ ভরে—“এই বয়সেই ছাতা ভুলে যাস, বড় হয়ে কী করবি কে জানে।” অথচ বকুনির প্রতিটা শব্দের নিচে লুকোনো ছিল আরেকটা ভাষা। বুঝত না তখন তাপস। অনুভব করত শুধু। এই বকুনিও একরকম জড়িয়ে ধরা।
আরও একবার। অনেক পরে। প্রথমবার পরীক্ষায় ফেল করেছিল তাপস। কিছুই বলেনি মা। পাশে বসেছিল শুধু, কোনো কথা ছাড়াই। একটা প্লেটে আম কেটে দিয়েছিল। ল্যাংড়া, তাপসের প্রিয়। খোসাটা নিজের হাতে অর্ধেক ছাড়িয়ে রাখত মা, যাতে আঠা না লাগে ছেলের আঙুলে। সেই নৈঃশব্দ্য। আমের রসের মিষ্টি, চটচটে গন্ধ। তার ভেতরেই বুঝেছিল তাপস—ক্ষমা কেবল কথায় থাকে না। থাকে প্লেটে সাজিয়ে দেওয়া কয়েকটা হলুদ টুকরোতেও।
তিনটে স্মৃতি। তিনটে ওম। তিনবার মা।
আর আজ? এই আকাশে কপালের ওপর নারীসত্তার আঙুল। ওম নেই। আছে পালিশ করা বরফ, কাঁচের শীতলতা। কিন্তু হঠাৎ একটা জিনিস লক্ষ করল তাপস। এ শীতলতা মৃত্যুর নয়। এক অনন্ত হিমাগারের শীতলতা—যেখানে সযত্নে রাখা থাকে ভ্রূণ, ভবিষ্যতের জন্য। একটা ছায়া, একটা নির্ভরতা খুঁজতে গিয়ে আজ এক নিরেট শূন্যতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তাপস। শিরা-উপশিরার শেষ মানবিক উষ্ণতাটুকু শুষে নিচ্ছে সে শূন্যতা, ঠিকই। মুছে ফেলার জন্য নয়। নতুন করে গড়বে বলে।
বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা—স্পন্দনের বদলে একদিন যা থাপ্পড় মারতে চাইত পাঁজরে—এখন সম্পূর্ণ স্থির।
কে এই নারীসত্তা? তাপসের অবদমিত লিঙ্গপরিচয়? তার নিজস্ব বাসনা? না। শুধু তা নয়। মহাবিশ্বের আদিম শক্তি সে। ধ্বংসাত্মক, আবার সৃষ্টিশীলও। মানুষকে ঠেলে দেয় যন্ত্রের দিকে, জড়ের দিকে। কারণ মানুষের এই জৈবিক রূপ বড় বেশি ত্রুটিপূর্ণ। বড় বেশি যন্ত্রণার। পৃথিবীর সব ক্ষয়ের, সব বিচ্ছিন্নতার অলৌকিক চালিকাশক্তি। পুরোনো খোলস ভেঙে নতুন জন্মের পথ কাটে সে।
নিচে, শহরের রাস্তায়, একটা খোলা ম্যানহোল। তার ভেতরে একদল লোক। ড্রেনের বিষাক্ত গ্যাস আর নোংরা জলের মধ্যে কিছু একটা খুঁজছে। পাতালের অন্ধ সরীসৃপ যেন। কোমরে দড়ি বাঁধা একজনের। ওপরে দাঁড়িয়ে সেই দড়ি ধরে আছে আরেকজন। নামছে লোকটা, ধীরে। কালো জল উঠে আসছে বুক অবধি। গন্ধ পৌঁছায় না তাপসের কাছে। তবু চেনে সে গন্ধটা—পচা ডিম আর মরচের মিশেল, জিভে যার স্বাদ তামার পয়সার মতো। পৃথিবীর বুকে মানুষ ধীরে ধীরে আবর্জনা হয়ে উঠছে। যন্ত্রাংশ হয়ে উঠছে। আর শূন্যতায় ভাসতে ভাসতে বুঝল তাপস—অস্তিত্বের এই নিষ্ক্রিয়তা আসলে এক মহাজাগতিক শীতঘুম।
সময়ের এক নতুন মাত্রা দেখছে তাপস এখন, আকাশের এই জ্যামিতিক শূন্যতায় ভাসতে ভাসতে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—সরলরেখায় চলে না কেউ এখানে। ভেঙেচুরে মিশে গেছে অতিকায় এক জরায়ুর মতো কাঠামোয়। বুক থেকে উঠে আসা সেই নারীসত্তা আর কেবল তার ব্যক্তিগত অবচেতনের সৃষ্টি নয়। খুলে দিচ্ছে সে এক প্রাচীন ইতিহাসের দরজা। দরজার ওপার থেকে ভেসে আসছে পুরোনো কলকাতার ধুলো। বারুদের গন্ধ। পুরোনো নথির ঘ্রাণ—হলদেটে, মুচমুচে, ছুঁলেই ঝরে পড়ে এমন।
পৃথিবীর বুকে, শহরের এক চিলেকোঠার ঘর। স্যাঁতসেঁতে। আলো ঢোকে না। বসে আছে হেমন্ত। দেয়ালে নোনা। চুন খসে খসে ফুটে উঠেছে অচেনা কোনো দেশের মানচিত্র। কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে একটা বাল্ব—ফিউজ, কালো, মৃত পোকার মতো। নিজেকে কখনো ‘আমি’ ভাবে না হেমন্ত। নিজেকে ডাকে তৃতীয় পুরুষে। মানসিক ব্যাধি নয় এই আত্ম-বিচ্ছিন্নতা। নিজেকে একটা জড়বস্তু, নিছক একটা ছাঁচ ভাবার প্রবল আকুতি। এই ছাঁচ হয়ে ওঠার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অবচেতন প্রস্তুতি—নিজের মানবিকতাকে অস্বীকার করে নতুন রূপ ধরার।
আধো অন্ধকারে, পুরনো একটা স্টোভে, চা বানাচ্ছিল সে। ফুটন্ত জলের কয়েক ফোঁটা ছিটকে পড়ল বাঁ হাতের কবজিতে। সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে ফুলে উঠল চামড়া। যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল শিরাগুলো। চিৎকার করল না। যন্ত্রণার একটা শব্দও বেরোল না মুখ দিয়ে। পোড়া জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে, নির্লিপ্ত। তারপর ফিসফিস করে বলল, “হেমন্তের হাত পুড়ে গেছে। হেমন্ত এখন যন্ত্রণা পাচ্ছে।” যেন সম্পর্ক নেই তার এই শরীরের সঙ্গে। এই যন্ত্রণার সঙ্গেও না। যেন দূরে বসে দেখছে হেমন্ত নামের কোনো অচেনা মানুষের কষ্ট। ‘আমি কষ্ট পাচ্ছি’, ‘আমার ব্যথা করছে’—স্বীকার করলেই তো হুড়মুড় করে বুকের ভেতর আছড়ে পড়বে পৃথিবীর যাবতীয় না-পাওয়া, নিঃসঙ্গতা, ফেলে আসা জীবনের সব ক্ষত। অতীতের দীর্ঘশ্বাস, প্রিয়জনের শূন্যতা, নিজের ব্যর্থতার ভার—বইতে রাজি নয় আর। তাই ‘আমি’ থেকে সরে এসে ‘হেমন্ত’ নামের এক তৃতীয় পুরুষের আবরণ। একটা দেওয়াল। নিশ্ছিদ্র।
হৃদয় নেই এই তৃতীয় পুরুষের। তাই নতুন কোনো রক্তক্ষরণও নেই। যন্ত্রণারও ঊর্ধ্বে হেমন্ত এখন। নিরেট এক দর্শক মাত্র।
স্টোভে ফুটে ফুটে কমে আসে চায়ের জল। শব্দটা কানে লাগে টিনের পাতের মতো, পাতলা। পোড়া কবজিতে একটা দপদপে তাপ, ঘড়ির টিকটিকের তালে।
সামনে খোলা পড়ে আছে বাবা সদাশিবের ডায়েরি। জরাজীর্ণ। চল্লিশের দশক থেকে সত্তরের দশক—প্রায় তিরিশ বছর গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করেছেন সদাশিব। নকশাল আন্দোলনের অস্থির দিনগুলো পর্যন্ত। ডায়েরিটা আসলে এক খোঁজের আখ্যান। এক রহস্যময়ী নারীসত্তার খোঁজ। পাতায় পাতায় সময়ের দাগ। চায়ের কাপের বৃত্ত। আঙুলের ছাপ। কোথাও ঘেঁটে যাওয়া অক্ষর। নীল কালি ধূসর হয়ে এসেছে। গন্ধ ন্যাপথলিনের, পুরোনো আলমারির।
সদাশিব লিখেছেন, “যেখানে দাঙ্গা, যেখানে রক্তের বন্যা, সেখানেই টের পেয়েছি নারীসত্তার উপস্থিতি। মানুষের শোক, তাপ, রক্তমাংসের মানবিকতা শুষে নিয়ে একটু একটু করে তাদের যন্ত্র বানায় সে। বাঁ চোখটা তার কৃত্রিম, কাঁচের তৈরি। আঙুলগুলো নড়ে ঘড়ির ভেতরের দাঁতওয়ালা চাকার মতো। অথচ সেই যান্ত্রিক চোখের গভীরে দেখেছি এক মাতৃরূপ। এই উন্মাদ পৃথিবীর অবাধ্য, ধ্বংসোন্মুখ সন্তানদের হাত ধরে সে টেনে নিয়ে চলেছে গভীর এক অন্ধকারে। সেখানে নতুন করে ছাঁচে ফেলা হবে তাদের।”
পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মনে হয় হেমন্তের—সভ্যতার সরল অগ্রগতি নয় ইতিহাস। মানুষের ক্রমশ জড়বস্তু হয়ে ওঠার এক দীর্ঘ, অন্ধকার প্রক্রিয়া। এক মহাজাগতিক গর্ভাধান। আর সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে বসে আছে—নারীসত্তা।
আকাশের শূন্যতা থেকে নিচে তাকায় তাপস। দেখতে পায় হেমন্তকে। খেয়াল করে, অবাক হয়ে—যে নারীসত্তার কথা পড়ছে হেমন্ত, সে আর কেউ নয়, পাশে ভাসতে থাকা এই মেয়েটি। কৃষ্ণগহ্বরের মতো তাপসের বুক থেকে জন্ম নিয়ে যে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে তাকে, সে-ই ইতিহাসের গর্ভাশয়।
ডায়েরির এক জায়গায় লেখা আছে ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গার কথা। দাঙ্গার ঠিক আগে আগে শহরের অলিতে গলিতে এক রহস্যময়ী নারীর আনাগোনা দেখেছিলেন সদাশিব। শরীরে তার এক অস্বাভাবিক কাঠিন্য। মানুষ যখন কাটছে মানুষকে, দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে সে। চোখে তৃপ্তি। কারণ দাঙ্গা মানুষকে সরিয়ে নেয় মানবিকতা থেকে। নিয়ে যায় পাশবিকতায়। শেষে জড়ে।
কিন্তু আজ বুঝছে তাপস—মৃত্যুর তৃপ্তি ছিল না ওটা। ছিল কৃষকের তৃপ্তি। যে জানে, ফসল কাটার পরেই মাটি তৈরি হয় নতুন বীজের জন্য।
পরের পাতায় তারিখ—১৬ই আগস্ট, ১৯৪৬। কলুটোলার এক সরু গলি। নাম হারান পালের গলি। সে রাতে ভরে গিয়েছিল এক অচেনা গন্ধে। পোড়া চুলের গন্ধ। তার সঙ্গে মিশে সস্তা কেরোসিনের ঝাঁঝ। সদাশিব লিখেছেন, গলির মুখে ঢুকেছিলেন তিনি। বুটের তলায় ভাঙা কাচের কুচি, মচমচ। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে কোথাও একটা কুকুর ডেকে যাচ্ছিল একটানা। থামছিল না। আকাশে ধোঁয়া, নিচু, ভেজা কম্বলের মতো। কোথাও উল্টে পড়ে আছে একটা হারিকেন—কাচ ফাটা, শিখা নেভেনি তখনও। দেয়ালে দেয়ালে আলকাতরায় লেখা স্লোগান, অর্ধেক মোছা।
গলির শেষ মাথায় একটা মুদির দোকান, এক কোণে থান কাপড়ের তাকও। নাম “নিতাই স্টোর্স”। টিনের সাইনবোর্ড তখনও ঝুলছে, আধপোড়া। দুলছে বাতাসে, ক্যাঁচক্যাঁচ। দোকানের মালিক নিতাই দাস—চিনতেন সদাশিব। রোজ সকালে চা-পাতা কিনতেন তার কাছে। সেই রাতে নিতাইকে পেলেন দোকানের চাতালে। মুখ উপুড়। ডান হাতের মুঠোয় তখনও ধরা একটা কাঠের গজকাঠি। রোজ কাপড় মাপত যা দিয়ে।
সদাশিব লিখেছেন, সেই নারীকে দেখেছিলেন গলির উল্টোদিকে, এক ভাঙা বাড়ির চৌকাঠে। দাঁড়িয়ে। ঠিক যেখান থেকে দেখা যায় পুরো গলি। পরনে সাদা শাড়ি। রক্তের দাগ নেই একফোঁটাও। টর্চের আলো ফেলেছিলেন তার দিকে। মুখে আলো পড়তেই প্রথমবার চোখে পড়েছিল বাঁ চোখের সেই কাঁচের স্থিরতা। আলো ফিরিয়ে দিচ্ছিল, জানলার কাচের মতো। চিৎকার করে থামতে বলেছিলেন সদাশিব। নড়েনি নারী। পালায়নি। কেবল ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল একটা রেখা, অতি সূক্ষ্ম। হাসি বলা যায় না তাকে। আবার হাসি ছাড়া আর কিছু বলাও যায় না। গলি পেরিয়ে চৌকাঠের কাছে যখন পৌঁছালেন, কেউ নেই সেখানে। মাটিতে একমুঠো সাদা ছাই। তখনও সামান্য উষ্ণ। যেন এইমাত্র উবে গেছে কেউ।
সেই রাতের পর নিতাইয়ের দোকানের সামনে দিয়ে আর কখনো হাঁটেননি সদাশিব। অথচ পথটা পড়ত তাঁর রোজকার রুটিনেই। লিখেছেন, “ভয় পাইনি তার মৃত্যুতে। ভয় পেয়েছিলাম সেই ছাইয়ের উষ্ণতায়। মৃত কিছু অত উষ্ণ হয় না। সে তাপ থাকে কেবল তারই, যা সদ্য জন্মাচ্ছে।”
পরের পাতা অনেক পরের তারিখের। প্রায় দু’বছর বাদে। আবার হারান পালের গলিতে গিয়েছিলেন সদাশিব। নিছক এক অস্বস্তিকর টানে, যা নিজেও বুঝিয়ে বলতে পারেননি। দাঁড়িয়ে ছিল নিতাই স্টোর্সের পোড়া কাঠামো। আধভাঙা টিনের সাইনবোর্ড, মরচে ধরে আরও ঝুলে পড়েছে। কিন্তু দোকানের সামনের সেই চাতালে, যেখানে পড়ে ছিল নিতাইয়ের নিথর শরীর, মাথা তুলেছে একটা অশ্বত্থ গাছ। ছোট্ট। পাথরের ফাটল চিরে। ছাই আর ইটের গুঁড়োর ভেতর থেকে। যত্ন ছাড়া। জল ছাড়া। পাতাগুলো লালচে, কচি, হৃৎপিণ্ডের আকার। হাওয়া নেই, তবু কাঁপছে। অশ্বত্থের পাতা কাঁপেই—হাওয়া থাকুক না থাকুক।
হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন সদাশিব। সরিয়েছিলেন গাছের গোড়ার মাটি। শিকড়ের ঠিক নিচে আঙুলে ঠেকল শক্ত, লম্বাটে কিছু একটা। নিতাইয়ের সেই কাঠের গজকাঠি। দু’বছর আগে যা ধরা ছিল তার মুঠোয়। পচেনি কাঠ, ফুলে উঠেছে শুধু। একটা ফাটল দিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে গেছে অশ্বত্থের এক কচি শিকড়। যেন সেই মৃত হাতের শেষ মাপজোকটুকুই আঁকড়ে বেড়ে উঠছে সে।
সদাশিব লিখেছেন, “সেদিন বুঝেছিলাম, শুধু গ্রাস করতে আসে না ওই নারী। যা নিয়ে যায়, ফিরিয়েও দেয়। অন্য চেহারায়। অন্য সময়ে। যখন আমরা তাকিয়ে থাকি না। ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি কণা তার হাতে বীজ। মরেনি নিতাই। অপেক্ষা করছে—গাছের বাকলে, ফুলের রেণুতে, আগামী কোনো বর্ষার প্রথম ফোঁটায়। যা কিছু রক্তে ভেজে ইতিহাসে, সবই সভ্যতার এক-একটি গোপন গর্ভাধান। ধ্বংসের ছাইয়ের নিচে ঘুমিয়ে থাকে আগামীর অঙ্কুর, অস্ফুট।”
এই লাইনের নিচে দুটো শব্দ লিখে পাতাটা শেষ করেছিলেন সদাশিব। কালি দিয়ে বৃত্ত এঁকে ঘিরে রেখেছিলেন:
“জড়ত্বই বীজ।”
দুটো শব্দ। একটা বৃত্ত। বৃত্তের কোনো শুরু নেই। শেষও নেই।
বোঝে হেমন্ত—সাধারণ কোনো শরীর নয় নারীসত্তা। শক্তির অপচয়, শূন্যতার দিকে অনিবার্য পতন—এসবেরই ছদ্মবেশে থাকা এক আদিম মাতা। নিজেকে তৃতীয় পুরুষে ভেবে হেমন্ত তো অস্বীকারই করছে তার ত্রুটিপূর্ণ মানবিক সত্তা। একটু একটু করে নিজেকে যন্ত্র বানাচ্ছে—যাতে মেলে সেই আদিম মায়ের জরায়ুতে ঢোকার অধিকার।
ঘুরে তাকাল তাপসের পাশের নারীসত্তা। মহাশূন্যের মতো দৃষ্টি। ভাষা নেই তাতে। কিন্তু বুঝল তাপস—মায়ের মতো নক্ষত্র হওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিল, আত্মপ্রতারণা নয় তা। এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র। নক্ষত্র হয়নি মা, ঠিকই। মহাজাগতিক শূন্যতায় বিলীন হয়ে গেছে এক খণ্ড জড় হয়ে। কিন্তু সেই জড়ই তো ভবিষ্যতের নক্ষত্রের কাঁচামাল। সত্যিই তো।
নিচে বসে ডায়েরির শেষ পাতাটা পড়ল হেমন্ত। সদাশিব লিখেছেন, “নারীসত্তাকে খোঁজা মানে নিজের ভেতরের শূন্যতাকে আলিঙ্গন করা। আমরা সবাই এগোচ্ছি তারই দিকে, ক্রমশ। কারণ আমরা সবাই আবার জন্মাতে চাই। নতুন করে।”
বন্ধ করে দেয় ডায়েরিটা। মনে হয়, শিরায় বইছে রক্ত নয়, ঠান্ডা পারদ। মায়ের গর্ভের সেই অ্যামনিওটিক তরল যেন। আগলে রেখেছে তাকে। জানলার শার্সিতে বিকেলের শেষ আলো, ঘোলাটে। নিচের রাস্তায় রিকশার হর্ন, একবার, দু’বার। শোনে হেমন্ত। শোনে না। হাতের পোড়া দাগে আঙুল রাখে। ঠান্ডা লাগে আঙুল, গরম লাগে দাগ। কার আঙুল, কার দাগ—প্রশ্ন করে না হেমন্ত। হেমন্তের দাগ। হেমন্তের আঙুল।
নিচে, পৃথিবীর বুকে, এক অভিজাত পাড়া। ক্ষয়ে যাওয়া। তার একটা ফ্ল্যাটে বসে আছে অর্ক আর শ্রেয়া। স্ক্রিনের সামনে অর্ক। বদলে দিচ্ছে মানুষের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড। মুছে দিচ্ছে মুখের রক্তমাংসের স্বাভাবিক আভা, ফুটিয়ে তুলছে এক কৃত্রিম রূপ, প্লাস্টিকের মতো মসৃণ। মাউসের একটা ক্লিক। একটা মুখ থেকে মুছে যায় বয়সের দাগ। আরেকটা ক্লিক। মুছে যায় হাসির কোণের ভাঁজ। মুখগুলো একে একে একই রকম হয়ে আসে—দোকানের কাচের পেছনে সাজানো পুতুলের সারি। পিক্সেলের নিচে চাপা পড়ে যায় ঘাম, লোমকূপ, গালের একটা তিল। শ্রেয়া হাত বোলাচ্ছে তার ক্রোম-প্লেটেড স্পোর্টস বাইকের ধাতব ফুয়েল ট্যাঙ্কে। পরম আদরে। ট্যাঙ্কের ক্রোমে নিজের মুখ দেখে শ্রেয়া—বাঁকা, লম্বাটে, অচেনা। সেই মুখটাই ভালো লাগে তার। মনে পড়ে ফেলে আসা জীবনের সেইসব রাত। রক্তমাংসের উষ্ণতা মানে তখন লালসা। প্রতারণা। আর কিছু না। পরম আশ্রয়ের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে হাতগুলো ছুঁয়েছিল একদিন, সেই হাতগুলোই রেখে গেছে কালশিটে আর ক্ষতের দাগ—শরীরে, মনে। নরম, ভঙ্গুর শরীরের ভেতরে লুকোনো স্বার্থপরতা কুরে কুরে খেয়েছে শ্রেয়াকে। তাই আজ মানুষের স্পর্শে ঘৃণা তার। ভয়। আঘাত করে না ক্রোম। মিথ্যে স্বপ্ন দেখায় না ইস্পাত। যন্ত্রের আছে এক নির্দিষ্ট অ্যালগরিদম, চালকের বাধ্য সে কেবল। তাই সমস্ত অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘশ্বাস আর বিশ্বাস শ্রেয়া সঁপে দিয়েছে এই শীতল ধাতব শরীরে। পচবে না যা কোনোদিন। বেইমানি করবে না কোনোদিন। একা ফেলে যাবে না কোনোদিন।
বাইরের কোনো শক্তি নয় এই প্রবণতা—মানুষের ক্রমশ যন্ত্র হয়ে ওঠা, বস্তু হয়ে ওঠা। নিজের ইচ্ছেতেই জড়ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করছে মানুষ। অবচেতনে চাইছে মুক্তি, এই ভঙ্গুর, প্রতারণাময় রক্তমাংসের শরীর থেকে। চাইছে ফিরে যেতে এক অস্তিত্বে—ধাতব, যান্ত্রিক, অথচ নিখুঁত।
ওপর থেকে দেখছে তাপস, শ্রেয়া আর অর্কের এই কৃত্রিম উদ্যাপন। বুঝছে—বুক থেকে জন্ম নেওয়া এই নারীসত্তা এই ছন্নছাড়া, যান্ত্রিক মানুষগুলোরই মা। মহাজাগতিক মা।
সল্টলেকের এক কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিক। অপারেশন থিয়েটার। শুয়ে আছে ঈশানী। মাথার ওপর গোল আলো—সাতটা বাল্বের একটা ফুল। মনিটরে সবুজ রেখা ওঠে, নামে। গোনে ঈশানী। এক। দুই। তিন। নিজের হৃৎস্পন্দন মনে হয় অন্য কারো ঘড়ি। ছোটবেলা থেকেই সবচেয়ে বড় শত্রু তার আয়না। চারপাশের মানুষের গড়া সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে চিরকাল সে ‘বেমানান’। গায়ের রং নিয়ে, নাকের গড়ন নিয়ে—স্কুল থেকে নিজের পরিবার পর্যন্ত, সবখানে শুনতে হয়েছে উপহাস। অবিরত। সমাজের দৃষ্টি—নিষ্ঠুর, ধারালো—পেরেকের মতো গেঁথে গিয়েছিল চামড়ার ভেতর। বুঝিয়েছিল, অভিশাপ এই শরীর। ভেতরের একাকিত্ব দেখেনি কেউ। কষ্টগুলোও না। সবাই বিচার করেছে শুধু এই ত্রুটিপূর্ণ জৈবিক খোলসটার। তাই আজ চিরতরে পালাতে চায় ঈশানী, মাংসপেশির এই কারাগার থেকে। চায় এমন একটা মুখ, যা প্লাস্টিক আর সিলিকনের মতো নিখুঁত, অনুভূতিহীন, চিরস্থায়ী। এমন একটা শরীর, যাকে বিচার করতে পারবে না সমাজ। ব্যঙ্গ করতে পারবে না। কারণ রক্তমাংসের দুর্বলতা ছাড়িয়ে তা হয়ে উঠবে এক নিরেট জড়বস্তু।
নাকের হাড় ভাঙতে ছেনি তোলেন ডাঃ সান্যাল। অবশ করার ওষুধের ঠান্ডা ছড়িয়ে গেছে মুখে, সাদা আলোর মতো। হাতুড়ির মৃদু ঠুক। একবার। দু’বার। তিনবার। ব্যথা নেই ঈশানীর। আছে এক তৃপ্তি। কারণ এই যন্ত্রণাহীন কাটাছেঁড়াতেই মুছে যাচ্ছে তার মানবীয় ত্রুটি। নিখুঁত, অপরিবর্তনীয় এক জড়বস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে সে। সৃষ্টির শুরুতে কাদামাটি ছেনে মানুষ গড়েছিলেন ঈশ্বর। আজ নিজেকে ভেঙে সেই কাঁচা মাটিতে ফিরতে চাইছে মানুষ। নতুন জন্মের আশায়।
শহরের আরেক প্রান্তে একটা ক্যাফে। হাতের চামড়ার ভেতর বসানো ধাতব পোর্ট আর মাইক্রোচিপ দেখাচ্ছে শুভ্র। জানলার বাইরে বৃষ্টি। কাচে জলের রেখা—আঁকাবাঁকা, সার্কিট বোর্ডের মতো। “একটু একটু করে নিজেকে সাইবর্গ বানাচ্ছি। যেদিন পুরো শরীরটা যন্ত্র হয়ে যাবে, সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে পুরোপুরি স্বাধীন হব।” কফির কাপে চামচ নাড়ে সে। ধাতুতে ধাতু ঠেকার শব্দ, মিহি। অমরত্বের এই আকাঙ্ক্ষা রূপকথার ফিনিক্স পাখিরই আরেক নাম। নিজেকে ভস্ম করে নতুন করে জেগে ওঠার আদিম প্রবৃত্তি।
শহরের একটা সরকারি হাসপাতাল। করিডোরে বসে আছে লীনা। কোলে একটা পুরোনো ছবি, ভাঁজ খুলে খুলে ছিঁড়ে এসেছে প্রায়। বাবার ছবি। ছবিতে বাবার বয়স চল্লিশ। হাসছেন। কাঁধে ছোট্ট লীনা, হাতে একটা লাল বেলুন। ভেতরের ওয়ার্ডে মরে যাচ্ছেন বাবা, ধীরে ধীরে, নলে বাঁধা শরীর নিয়ে। তিন রাত ঘুমোয়নি লীনা। চোখের নিচে কালি। ঠোঁট ফাটা। হাত দুটো কাঁপছে অবিরাম। এই কাঁপুনি থামানোর ইচ্ছে নেই তার। করিডোরে ফিনাইলের গন্ধ—ধূসর, টিউবলাইটের আলোর মতো। পাশের বেঞ্চে ঘুমিয়ে পড়েছেন এক বৃদ্ধ, মাথা হেলে আছে দেয়ালে। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে চলে যায় একটা ট্রলি, তারপর আরেকটা। প্রতিটি ট্রলির শব্দে মুখ তোলে লীনা। প্রতিবার দেখে—না, বাবার নয়।
নার্স বলেছিল, “একটু ঘুমিয়ে নিন, নইলে নিজেই ভেঙে পড়বেন।” মাথা নেড়েছিল লীনা। তবু ঘুমোবে না। ভাঙার ভয়ে নয়। ভাঙাটাকেই আঁকড়ে বাঁচতে চায় সে। জানে লীনা—এই কাঁপুনি, এই দগদগে চোখ, এই বুক-খালি-করা আতঙ্ক, বাবার প্রতি তার শেষ ভাষা। একমাত্র সত্য ভাষা। এই কষ্ট অস্বীকার করা মানে বাবাকেই অস্বীকার করা।
এবার লীনার দিকেও নেমে আসে নারীসত্তা। যেমন নেমেছিল হেমন্ত, ঈশানী, শ্রেয়া, শুভ্র—এই চারজনের কাছে। শীতল আঙুল ছোঁয় লীনার কপাল। “এই যন্ত্রণার কোনো দরকার নেই,” ফিসফিস করে সে, ঠিক যে গলায় বলেছিল তাপসকে। “এই ভার থেকে মুক্তি দিতে পারি তোমায়। চাইলে আর কিছুই অনুভব করবে না।”
কেঁপে ওঠে লীনা। সরে যায় না। “না।” গলা ভাঙা, প্রায় অশ্রাব্য। তবু দৃঢ়। “কষ্ট হচ্ছে আমার। আমার—আমার বাবা মরে যাচ্ছেন। এইটুকুই আছে আমার। এই কষ্টটুকুই। এটা নিয়ে নিলে আর কিছুই থাকবে না।”
রাগ ফোটে না নারীসত্তার কাঁচের চোখে। হতাশাও না। কেবল এক স্থিরতা—নিরাসক্ত, প্রায় উদাসীন। যেন জানত, এই উত্তরই আসবে। লীনার কপাল থেকে সরে যায় আঙুল। “তবে থাকো তোমার রক্তমাংসেই,” বলে সে, “যতদিন তা তোমায় সইতে দেয়।” তারপর মিলিয়ে যায়, রোদে কুয়াশা যেমন মেলায়। পরাজয়ের কোনো চিহ্ন না রেখে। কপালে থেকে যায় একটা ঠান্ডা ছোঁয়া, মুদ্রার মতো গোল। হাত দিয়ে ঘষে লীনা। যায় না। কোলের ছবিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে। ওয়ার্ডের দরজা খোলে, বন্ধ হয়। খোলে। বন্ধ হয়।
ওপর থেকে দৃশ্যটা দেখল তাপস। ভরহীন শরীরের ভেতর টনটন করে উঠল কিছু একটা। অচেনা। প্রায় বিস্মৃত। নাম হয়তো ঈর্ষা। কিংবা অনুশোচনা। এখনও কাঁপছে লীনা। এখনও ভাঙা। এখনও পুরোপুরি, অসহায়ভাবে মানুষ। জ্যামিতিক প্রশান্তি নেই তার। বিশ্রামের কোনো স্থির বিন্দু নেই। অথচ সেই কাঁপা হাতেই স্পন্দিত একটা প্রাণ—ভাঙাচোরা, ভীত, তবু নিঃসন্দেহে জীবিত। বুঝল না তাপস, দৃশ্যটা তাকে ঈর্ষা দিচ্ছে, নাকি ভয়—তার নিজের অনিবার্য পরিণতির ভয়।
আকাশের বুকে নগ্ন নারীসত্তাটির দিকে চেয়ে থাকে তাপস। নিচে ঘটে চলা সমস্ত রূপান্তরের নীরব অধীশ্বরী যেন সে। অনন্ত এক গর্ভধারিণী। তাপসের শরীরটাও এখন এক স্বচ্ছ আবরণ, হাওয়ায় মিলিয়ে আসছে ক্রমশ। বুকের মাঝখানের কালো তিলটা বড় হয়ে তৈরি করেছিল যে কৃষ্ণগহ্বর, সেটা আসলে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত প্রবেশদ্বার। এক জরায়ু। পৃথিবীর ডাক্তাররা কাটেন চামড়া, কাটেন হাড়। আর মহাবিশ্বের এই মাতৃশক্তি গলিয়ে দেয় গোটা অস্তিত্বটাকেই—নতুন ছাঁচে ঢালবে বলে।
আবার কথা বলল নারীসত্তা। কণ্ঠস্বর উৎসারিত যেন তাপসের করোটির ভেতর থেকেই, বাইরের কোনো বাতাসে ভর না করে। তাপসেরই মুখ, অবিকল। চোখে কেবল অনন্তকালের জমাট শূন্যতা।
“ভেবেছ, এই তরল সোনালি আকাশ কেবল তোমার একার বিচ্ছিন্নতা?” শব্দ হল না। অথচ প্রতিধ্বনি উঠল তাপসের মাথার ভেতর।
“না, তাপস। ব্যক্তিগত স্মৃতির সীমানা পেরিয়ে এসেছ তুমি। ঢুকেছ মানবতার এক যৌথ অবচেতনে।”
বলেই চুপ করে গেল সে। হঠাৎ। তারপর, কোনো ভূমিকা ছাড়াই, গুনগুন করে ভাঁজতে শুরু করল একটা সুর। চেনা কোনো গানের নয়। এমন এক সুর, যা কোথাও শোনেনি তাপস, অথচ শুনেছে বহুবার—ঘুমের ঠিক আগে-আগে, ভুলে যাওয়া কোনো দোলনার পাশে বসে থাকা কারো গলায়। সুরটা কানে বাজল না। বাজল ত্বকে। শিরদাঁড়া বেয়ে নামল, জলের মতো, ধীরে। সুরটার একটা রং ছিল। বাসি হলুদ, দুধের সরের মতো। তিনবার ঘুরে এল সুর। থেমে গেল মাঝপথে—ঠিক যেখানে একটা লাইন শেষ হওয়ার কথা। তারপর কাঁচের বাঁ চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা কিছু। জল নয়। কারণ ভাসতে শুরু করল সেটা। ছোট্ট, স্বচ্ছ এক বুদ্বুদ। তবু কেমন মুক্তোর মতো। সেদিকে তাকাল না নারীসত্তা। মুছলও না। যেন জানেই না ঘটেছে। অথবা জেনেও গ্রাহ্য করল না। জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে গেল তাপস। প্রশ্নের অপেক্ষা না করেই আগের গলায়, আগের স্থিরতায় কথা চালিয়ে গেল নারীসত্তা। গুনগুনানি হয়নি যেন। মুক্তোর মতো বুদ্বুদটাও ঘটেনি যেন।
কেঁপে উঠল তাপসের ভাসমান, ভরহীন শরীর। একটু। ব্যক্তিগত, না যৌথ? মাধ্যাকর্ষণ হারিয়ে যে জ্যামিতিক স্থানাঙ্কে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে, তা কি শুধু তার নিজের অপরাধবোধ? নিজের একাকিত্ব? না। শুধু তার নয়।
নিচে, পৃথিবীর বুকে, চিলেকোঠার ঘরে বসে সদাশিবের ডায়েরিতে ১৯৪৬-এর দাঙ্গার বর্ণনা পড়েছে হেমন্ত। সেই দাঙ্গা, সেই রক্তপাত, মানুষের ওপর মানুষের নির্মমতা—ইতিহাসের পাতায় আটকে নেই কিছুই। যৌথ অবচেতনে কেটে রেখেছে গভীর এক ক্ষত। শুকোয়নি সে ক্ষত আজও। পুঁজ নেই, রক্ত নেই। আছে কেবল একটা টান, ছাল-ওঠা চামড়ার মতো।
“জৈবিক যন্ত্রণা থেকে পালাতে চায় মানুষ। ট্রমা থেকে। হাহাকার থেকে।” এবার তাপসের গাল ছুঁল নারীসত্তার শীতল আঙুল। “আর পালাতে পালাতে অবচেতনেই পা বাড়ায় এই যৌথ শূন্যতার দিকে। বিচার করে না এই শূন্যতা। আশ্রয় দেয় শুধু।”
চোখের সামনে ভেসে উঠল পৃথিবীর খণ্ডচিত্র। নিজেকে তৃতীয় পুরুষে ভাবছে হেমন্ত। সার্জারিতে নিখুঁত মুখ চাইছে ঈশানী। নিজেকে সাইবর্গ বানাচ্ছে শুভ্র। চক্ররেলে ঘুরছে বিনায়ক। ধাতব ট্যাঙ্কে গাল রেখেছে শ্রেয়া। ছবির পর ছবি, সব এক—একটা ফিল্মের রিলের মতো ঘুরে যায় চোখের সামনে দিয়ে। শব্দ নেই রিলের। গন্ধ আছে শুধু, পোড়া সেলুলয়েডের।
“যুগ যুগ ধরে এই প্রবৃত্তি কাজ করছে মানুষের মনে। জড়বস্তু বা যন্ত্র হয়ে ওঠার এই আকাঙ্ক্ষা প্রাচীন দেবত্বের, অমরত্বের আকাঙ্ক্ষারই এক বিকৃত রূপান্তর। রক্তমাংসের ভঙ্গুরতাকে ভয় পায় মানুষ। তাই অবচেতনে ফিরে যেতে চায় সেই আদিম ছাঁচে—ইস্পাতের মতো নিরেট, কাঁচের মতো নিখুঁত, ঘড়ির গিয়ারের মতো নির্ভুল। অর্ক যে পিক্সেলে পিক্সেলে ছবির মানুষের মুখ বদলে দিচ্ছে, ঘড়ির কলকব্জার মতো নিখুঁত মাপে, তা ওই যন্ত্রণাহীন অস্তিত্বে পৌঁছানোরই এক মরিয়া চেষ্টা।”
একদৃষ্টে নারীসত্তার দিকে তাকিয়ে রইল তাপস। কে এ? বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল মায়ের স্মৃতি, একবার। নক্ষত্র হতে চেয়েছিল মা। মিশে গেছে মহাজাগতিক ধুলোয়।
“মা সব সময় দুটো সত্তা ধরে রাখে, তাপস।” তাপসের বুকের ঠিক মাঝখানে হাত রাখল নারীসত্তা। সেখান থেকেই তার শেষ মানবিক উষ্ণতাটুকু শুষে নিচ্ছে এক কৃষ্ণগহ্বর। বুঝল তাপস—আলো আর অন্ধকার, সচেতন আর অবচেতন, পুরুষ আর নারী—তার ভেতরের এই তিন জোড়া আজ একাকার।
মানুষের জগতে ব্যক্তিসত্তার পূর্ণতা মানে হয়তো জৈবিক মানুষ হয়ে টিকে থাকা। কিন্তু এই সোনালি আকাশে, এই মহাজাগতিক স্তরে, পূর্ণতার মানে উল্টো। নিজের অস্তিত্বের সমস্ত মানবিক ত্রুটি, আবেগ, যন্ত্রণা মুছে এক নিখুঁত জড়বস্তু হয়ে ওঠা। খণ্ডিত মানুষ নয় সে আর। মিশে যাচ্ছে নিজের অবদমিত নারীসত্তার সঙ্গে, সম্পূর্ণ। আঙুলের ডগায় একটা ঝিনঝিন—যেন ঘুমিয়ে পড়া হাতে রক্ত ফিরছে। অথবা চলে যাচ্ছে। পৃথিবীর মানুষের কাছে যা মৃত্যু, যা জড়ত্ব, তাপসের চৈতন্যে আজ তা-ই এক মহাজাগতিক পুনর্জন্মের প্রস্তুতি। এই তরল সোনালি আকাশ তবে কি শূন্যতা? নয়। মায়ের গর্ভের সেই আদিম অ্যামনিওটিক তরল। উষ্ণ নয়। তবু নিরাপদ।
আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় তাপস। নারীসত্তার হাতে সঁপে দেয় নিজের হাত। দুটি হাত—একটি একদিন রক্তমাংসের ছিল, অন্যটি চিরকাল শূন্যতার—মিলেমিশে এক। মনে হয়, টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে শরীর। ব্যথা নেই। হয়ে উঠছে অসংখ্য জ্যামিতিক বিন্দু। ছড়িয়ে পড়ছে মহাকালের সেই অনন্ত হিমাগারে। এক থেকে দুই। দুই থেকে অগণন।
শেষবারের মতো নিচে তাকায় তাপস। ঘুরছে ট্রেন। নিভে গেছে স্টোভ। বেজে চলেছে মনিটরের সবুজ রেখা। করিডোরে কাঁপছে একজোড়া হাত। দূরে সরে যায় সব। ছোট হয়ে আসে। বিন্দু হয়ে আসে। শহরটাও একসময় একটা বিন্দু—আলোর, ধুলোর, কান্নার। তারপর সেটুকুও নেই।
জানে তাপস—শূন্যতার এই জরায়ুতে বিলীন হওয়াই শেষ নিয়তি নয়। নতুন জন্মের প্রথম প্রহর এ। এই অন্ধকার শূন্যতার ভেতরেই একদিন স্পন্দিত হবে এক নতুন নক্ষত্রের হৃৎপিণ্ড। জ্যামিতিক স্থানাঙ্কগুলো আবার রূপ নেবে নতুন কোনো জীবনের। পুরোনো পৃথিবীর সব ক্ষয়, সব ত্রুটির ঊর্ধ্বে সেই জীবন। জড়ত্বের চাদরে সন্তানকে ঢেকে দিচ্ছে নারীসত্তা। অপেক্ষা—আগামী কোনো এক মহাজাগতিক ভোরের।
(ক্রমশ)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন