ধারাবাহিক উপন্যাস
রক্তগোলাপের উত্তরাধিকার
(দুই)
অমিয়েশ চৌধুরীর মৃত্যুর চব্বিশ ঘণ্টাও পেরোয়নি। অথচ মনে হচ্ছিল, বাড়িটা যেন এক রাতের মধ্যেই অন্য একটা জায়গায় বদলে গেছে। যে বাড়িতে একসময় শিল্পপতি, মন্ত্রী, বিদেশি প্রতিনিধি, সাংবাদিক—সারাক্ষণ মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত, সেখানে এখন অদ্ভুত এক নীরবতা। যেন পুরো বাড়িটা নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে। কর্মচারীরা ফিসফিস করে কথা বলছে। পরিবারের লোকজনও একে অপরকে এড়িয়ে চলছে।
মামনিদি প্রায়ই বলে,"মানুষের মুখ যতটা কথা বলে, তার চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে তার নীরবতা।"
সকালে আমরা আবার চৌধুরী ভিলায় পৌঁছালাম। পুলিশ তখনও বাড়ির বিভিন্ন অংশ ঘিরে রেখেছে। শুনলাম, ফরেনসিক টিম রাতভর কাজ করেছে। স্টাডি রুম সিল করে দেওয়া হয়েছে।
গাড়ি থেকে নেমে মামনিদি কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি জানি, এই সময় ওর মাথায় একটা কথাই ঘুরছে। একজন বুদ্ধিমান খুনি শুধু প্রমাণ লুকিয়ে রাখে না। সে তদন্তকারীর সামনে এমন কিছু সূত্রও রেখে যায়, যাতে সবাই সেগুলোর পেছনেই ছুটতে থাকে। আর আসল সত্যিটা থেকে যায় আড়ালে। মামনিদি সেই আড়ালটাই খুঁজছিল।
প্রথমেই আমরা দেখা করলাম অমিয়েশবাবুর ব্যক্তিগত আইনজীবী অরূপ মিত্রর সঙ্গে। তিনি ও বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। মুখে ক্লান্তি, চোখেমুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
মামনিদি কোনো ভূমিকা না করেই জিজ্ঞেস করল,"নতুন উইলটা কোথায়?"
ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে বললেন,
"এখন পুলিশের কাছে।"
কিছুক্ষণ পর ফাইলটা এনে দেওয়া হলো। মোটা একটা নথির ভেতরে রাখা অমিয়েশ চৌধুরীর শেষ উইল। অন্তত যেটুকু উদ্ধার হয়েছে। মামনিদি ধীরে ধীরে পাতাগুলো উল্টে দেখতে লাগল।
আমি ওর মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ পঞ্চম পাতায় এসে ও থেমে গেল। আঙুল দিয়ে কাগজের একটা জায়গা ছুঁয়ে বলল,"এখানে দেখুন, শেষ পাতাটা নেই।"
আমি ঝুঁকে দেখলাম। খুব নিখুঁতভাবে পাতা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। ভালো করে না দেখলে বোঝাই যায় না।
অরূপ মিত্র মাথা নাড়লেন, "হ্যাঁ।"
"ওই পাতাতেই কি সম্পত্তি বণ্টনের বিবরণ ছিল?"
"ঠিক তাই।"
ঘরে হঠাৎ সবাই চুপচাপ হয়ে গেল।
মামনিদি চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,
"তার মানে শুধু খুন নয়, কেউ তথ্যও সরিয়েছে।"
আইনজীবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"আমারও তাই মনে হচ্ছে।"
"আপনি জানেন শেষ পাতায় কী লেখা ছিল?"
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, "জানি।"
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
"কিন্তু পেশাগত গোপনীয়তার কারণে সেটা আমি বলতে পারব না।"
ইন্সপেক্টর সৌমেন একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, "একজন মানুষ খুন হয়েছেন।"
অরূপ মিত্র শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
"তবু আমি আইন ভাঙতে পারব না।"
মামনিদি মৃদু হেসে বললেন, "আমি আপনাকে আইন ভাঙতে বলছি না। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দিন।"
ও একটু ঝুঁকে বলল, "নতুন উইলে কি এমন কিছু ছিল, যা জানাজানি হলে পরিবারে বড় অশান্তি হতে পারত?"
ভদ্রলোক কোনো উত্তর দিলেন না বটে।
তবে তাঁর চোখই সব বলে দিল। মামনিদি আর চাপ দিল না। বরং পুরোনো উইলটা দেখতে চাইল। দুটো নথি পাশাপাশি রেখে বেশ কিছুক্ষণ ধরে মিলিয়ে দেখল ও।
প্রায় পনেরো মিনিট পরে বলল,"পুরোনো উইলে সম্পত্তি তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে -- অরিন্দম, অর্ক আর মল্লিকার মধ্যে।"
মামনিদি টেবিলে আঙুল ঠুকল।
"কিন্তু নতুন উইলের শেষ পাতাটা কেউ ইচ্ছে করেই সরিয়েছে।"
ঘরে সবাই চুপচাপ।
মামনিদি নিজেই বলল, "কারণ ওই পাতায় এমন কারও নাম ছিল, যাকে কেউ দেখতে চাইছিল না। যদি আগের বণ্টনই থাকত, তাহলে শেষ পাতাটা গায়েব করার কোনো দরকার ছিল না। অর্থাৎ কেউ নতুন সিদ্ধান্তটা আড়াল করতে চাইছে।"
এরপর শুরু হলো পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ। প্রথমে এলেন অরিন্দম চৌধুরী। মেপে কথা বলেন। উত্তর দেওয়ার আগে ভাবেন। মুখে কোনো আবেগ নেই।
মামনিদি জিজ্ঞেস করল, "আপনার বাবার সঙ্গে শেষ কথা কবে হয়েছিল?"
"ডিনারের সময়।"
"উইল নিয়ে আলোচনা হয়েছিল?"
"হয়েছিল।"
"কী লেখা ছিল জানতেন?"
"না।"
"অনুমান?"
অরিন্দম হালকা হাসলেন।
"অনুমান দিয়ে ব্যবসা চলে না।"
মামনিদি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, "আপনি কি কোম্পানির পুরো নিয়ন্ত্রণ চাইতেন?"
এই প্রথম অরিন্দমের মুখে সামান্য অস্বস্তি ফুটে উঠল।
"নিজের কাজের স্বাধীনতা সবাই চায়।"
"আমি সেটা জিজ্ঞেস করিনি।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন,
"হ্যাঁ, চাইতাম।"
"আপনার বাবা রাজি ছিলেন না?"
তিনি স্বীকার করলেন, এ নিয়ে বাবার সঙ্গে প্রায়ই মতবিরোধ হতো।
তারপর এল অর্ক। ঘরে ঢুকেই সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিল। পুলিশ বাধা দিতেই বিরক্ত হয়ে বলল, "আমাকেই কি খুনি ভাবছেন?"
মামনিদি শান্তভাবে বলল,"আমি এখনও কাউকে কিছু ভাবছি না।"
"তাহলে এত প্রশ্ন কেন?"
"উইলে কী ছিল, জানতেন?"
"না।"
"বেশি সম্পত্তি পাওয়ার আশা ছিল?"
অর্ক তিক্ত হেসে বলল,
"আমার বাবা কাউকেই বিশ্বাস করতেন না।"
"আপনাকেও?"
"বিশেষ করে আমাকে না।"
মামনিদি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
"খুনের রাতে এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটার মধ্যে কোথায় ছিলেন?"
"নিচে।"
"কেউ দেখেছে?"
"অনেকেই।"
উত্তরটা একটু বেশিই দ্রুত এল।
মামনিদি সেটা খেয়াল করল। আমিও।
সবশেষে এলেন মল্লিকা। সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে সংযত। আর অদ্ভুতভাবে সহযোগিতাপূর্ণ। এমন মানুষদের ব্যাপারে মামনিদি অবশ্য সবসময় একটু বেশি সতর্ক থাকে।
মল্লিকা ধীরে বলল,"এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না বাবা আর নেই।"
তিনি জানালেন, বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালোই ছিল।
মামনিদি জিজ্ঞেস করল,"উইল নিয়ে কোনো মতবিরোধ ছিল?"
মল্লিকা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,
"আমি সম্পত্তি নিয়ে ভাবি না।"
মামনিদি সঙ্গে সঙ্গে বলল, "মজার ব্যাপার, যারা এই কথাটা বলে, অনেক সময় তারাই সম্পত্তির হিসাব সবচেয়ে বেশি করে।"
এই প্রথম দেখলাম মল্লিকার মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল। দুপুরে আমরা আবার স্টাডি রুমে ফিরলাম।
মামনিদি এবার বইয়ের আলমারিগুলো খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল। একটা পুরোনো ফাইলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সাদা-কালো একটা ছবি। প্রায় তিরিশ বছরের পুরোনো। ছবিতে তরুণ অমিয়েশ চৌধুরী। তাঁর পাশে আরেকজন মানুষ। পেছনে লেখা,
"দেবব্রত আর আমি। নতুন শুরুর দিন। ১৯৯৪।"
মামনিদি অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। রেনুআপা জিজ্ঞেস করল, "দেবব্রত কে?"
পুরোনো এক কর্মচারী জানাল, দেবব্রত ছিলেন অমিয়েশবাবুর ব্যবসায়িক অংশীদার। অনেক বছর আগে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।
কথাটা শুনেই মামনিদির চোখে সেই পরিচিত ঝিলিকটা ফিরে এল দেখলাম।
আমারও সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল স্টাডি রুমের দেয়ালে লেখা কথাটা,
"বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যু।"
ফিরে আসার পথে মামনিদি শুধু একটা কথাই বলেছিল, "মানুষ সাধারণত দুটো কারণে খুন করে -- রাগ থেকে, অথবা লাভের আশায়। এই ঘটনায় দুটোই আছে। আর যখন রাগ আর লাভ একসঙ্গে কাজ করে, তখন সত্যিটাকে চাপা দিতে অনেক সময় টাকাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে।"
অমিয়েশ চৌধুরীর খুনের তদন্তের তৃতীয় দিনে এসে এমন এক নতুন সূত্রের সন্ধান মিলল, যা আমাদের প্রায় তিরিশ বছর পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ মামনিদির বাড়িতে পৌঁছে দেখি, ও ইতিমধ্যেই কাজে ডুবে গেছে। ডাইনিং টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নানা কাগজপত্র। পুরনো সংবাদপত্রের কাটিং, কোম্পানির রিপোর্ট, ব্যবসায়িক রেজিস্ট্রেশনের কপি, আর ঠিক মাঝখানে রাখা সেই কালো-সাদা ছবিটা। ছবিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন অমিয়েশ চৌধুরী আর দেবব্রত মুখার্জি। দুজনের মুখেই হালকা, নিশ্চিন্ত একটা হাসি।
ঠিক তখনই রেনুআপা বালিগঞ্জের বন্ডেল রোডের বাড়ি থেকে এসে পৌঁছাল। ঘরে ঢুকেই মামনিদিকে দেখে বলল, "রাতে ঘুমিয়েছ?"
মামনিদি না তাকিয়েই মুচকি হেসে বলল,"কী যে বল, রেনু! খুনি যদি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে, আমি কেন পারব না?"
দুপুরের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম কলকাতার পুরনো কোম্পানি রেজিস্ট্রি আর্কাইভে। ছাতাপড়া পুরনো ভবন, চারদিকে ধুলোমাখা ফাইলের স্তূপ আর পুরনো কাগজের সেই চেনা গন্ধ। যাঁরা সেখানে কাজ করছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগই বয়স্ক কর্মচারী। মনে হচ্ছিল, যেন এই পুরনো নথিপত্রের সঙ্গেই তাঁদের জীবন কেটে গেছে।
প্রায় দু'ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলল। ১৯৯৪ সালে অমিয়েশ চৌধুরী আর দেবব্রত মুখার্জি মিলে ইস্টার্ন মেরিটাইম লজিস্টিকস নামে একটা শিপিং কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন। শুরুতে ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু ১৯৯৮ সালে হঠাৎ করেই দেবব্রত কোম্পানি থেকে সরে দাঁড়ান। কয়েক মাসের মধ্যেই অমিয়েশ একাই কোম্পানির মালিক হয়ে যান। আর তার ঠিক এক বছরের মধ্যেই কোম্পানির মূল্য কয়েকশো গুণ বেড়ে যায়।
রেনুআপা বিস্মিত গলায় বলল, "ব্যাপারটা তো খুব অদ্ভুত। কোম্পানির ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই এত উজ্জ্বল ছিল, তাহলে দেবব্রত ঠিক সেই সময়ই বেরিয়ে গেলেন কেন?"
আরও খোঁজ নিয়ে জানা গেল,কোম্পানি ছাড়ার পর দেবব্রত মুখার্জির জীবন দ্রুত ভেঙে পড়েছিল। ঋণের বোঝা বাড়তে বাড়তে একসময় বাড়িটাও বিক্রি করতে হয়। শেষ পর্যন্ত সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি আত্মহত্যা করেন।
কথাগুলো শুনে আমি কিছুক্ষণ একেবারে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম।
পরদিন আমরা উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে গেলাম। সেখানকার এক পুরনো বাড়িতে থাকেন দেবব্রত মুখার্জির স্ত্রী, সুলেখা দেবী। এখন তাঁর বয়স প্রায় আশি। চোখে মোটা চশমা, মাথাভর্তি সাদা চুল।
অমিয়েশ চৌধুরীর নাম উচ্চারণ করতেই ভদ্রমহিলার চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। কথা বলতে বলতে জানা গেল, দেবব্রত আর অমিয়েশ শুধু বন্ধু ছিলেন না, প্রায় দুই ভাইয়ের মতো সম্পর্ক ছিল তাঁদের। একসঙ্গেই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তারপর একদিন অমিয়েশ দেবব্রতকে একটি চুক্তিপত্রে সই করতে বলেন। বলেন, কোম্পানিকে বাঁচাতে এটা খুব জরুরি।
কয়েক মাস পর দেবব্রত জানতে পারেন, সেই চুক্তির মাধ্যমেই তিনি কার্যত জলের দামে নিজের সব শেয়ার ছেড়ে দিয়েছেন।
রেনুআপা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
"আপনার কি মনে হয়, আপনার স্বামীকে ঠকানো হয়েছিল?"
সুলেখা দেবী এক মুহূর্তও দেরি না করে বললেন,"হ্যাঁ।"
"কেন এমন মনে হয়?"
দেখলাম ভদ্রমহিলার চোখ ভিজে উঠল।
"মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত দেবব্রত একটাই কথা বলেছিল, ওকে ঠকানো হয়েছে।"
বেরিয়ে আসছি। ঠিক সেই সময় সুলেখা দেবী আমাদের পেছন থেকে ডাকলেন।
ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর থেকে একটা পুরনো অ্যালবাম এনে পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন। তারপর একটা ছবি বের করে আমাদের হাতে দিলেন।
ছবিতে দেবব্রত, তাঁর স্ত্রী আর বছর দশ-এগারোর একটা ছেলে।
সুলেখা দেবী জানালেন, স্বামীর মৃত্যুর কিছুদিন পরই ছেলেটা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আজ প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেছে। আর কোনো খবর নেই। ছেলেটার নাম দীপায়ন।
নামটা শুনেই মামনিদির চোখ দুটো হঠাৎ চিকচিক করে উঠল। নতুন কোনো সূত্র পেলেই ওর চোখে এমন এক অদ্ভুত ঝিলিক দেখা যায়।
বিকেলে আবার আমরা চৌধুরী ভিলায় ফিরে গেলাম। এবার মামনিদি কথা বলতে শুরু করল পুরনো কর্মচারীদের সঙ্গে।
তাদের মধ্যে গোপাল সবচেয়ে পুরনো। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই বাড়িতে কাজ করছে। বয়সও ষাটের কাছাকাছি।
ওকে জিজ্ঞেস করতেই জানাল, একসময় দেবব্রত মুখার্জি এই বাড়িতে নিয়মিত আসতেন। তারপর হঠাৎ একদিন আসা বন্ধ হয়ে যায়।
মামনিদি জিজ্ঞেস করল,"কেন?"
গোপাল একটু ইতস্তত করে বলল,"জানি না।"
"বাড়িতে কোনো ঝগড়া হয়েছিল?"
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
"একবার শুনেছিলাম, দু'জনে খুব চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন।"
"কী নিয়ে?"
"টাকাপয়সা নিয়ে।"
রাতে ফেরার পথে আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। আমি সরাসরি মামনিদিকে জিজ্ঞেস করলাম, "তাহলে কি দেবব্রতের পরিবারের কেউ অমিয়েশবাবুকে খুন করেছে?"
মামনিদি জানলার বাইরে তাকিয়েই বলল,
"খুব সম্ভব।"
আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম।
"সত্যি?"
ও শান্ত গলায় বলল, "আবার খুব সম্ভব নয়ও।"
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,"এটা আবার কেমন উত্তর?"
মামনিদি হেসে ফেলল।
"গোয়েন্দার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সহজ ব্যাখ্যা।"
আমি আর কিছু বললাম না।
ও বলতে লাগল, "একজন ব্যবসায়ী তাঁর পার্টনারকে ঠকিয়েছে। পার্টনার আত্মহত্যা করেছে। বহু বছর পরে সেই ব্যবসায়ী খুন হয়েছে। খুনের পাশের দেয়ালে লেখা—'বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যু'। শুনতে দারুণ নাটকীয় লাগে। কিন্তু সমস্যা হলো, গল্প আর বাস্তব খুব কম সময়েই একই পথে হাঁটে।"
গাড়ির ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, মামনিদি এখনও কাউকেই সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেয়নি। কিন্তু একটা বিষয় এখন একেবারে পরিষ্কার—তিরিশ বছর আগের দেবব্রত মুখার্জির গল্পটাই ধীরে ধীরে এই খুনের তদন্তের কেন্দ্রে চলে আসছে।
আর সেই গল্পের মাঝখানে রয়েছে এক হারিয়ে যাওয়া ছেলে—দীপায়ন।
অথবা হয়তো বিষয়টা ঠিক উল্টো।
হয়তো কেউ খুব সচেতনভাবেই চাইছে আমরা যেন এ দিকেই তাকিয়ে থাকি।
কোনটা সত্যি, সেটা এখনও জানি না।
তার উত্তর সময়ই দেবে। আর আপাতত, আমাদের সেই সময়ের অপেক্ষাই করতে হবে।
(ক্রমশ)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন