ধারাবাহিক উপন্যাস
স্বর্গ এসেছে নেমে
(২৭)
মনস্বিনী সাধারণত সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফেরে কিন্তু রাস্তায় যদি এক বিশাল জ্যামে আটকে যায় গাড়ি তবে সে কি করতে পারে। ওদিকে মেয়ের দেরী দেখে কুন্তলা খবর পাঠায় অনঙ্গবাবুকে। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন অনঙ্গবাবু। এদিকে রুদ্রাক্ষ তার সাগরেদদের নিয়ে তৈরী মনস্বিনীকে বেপাত্তা করে দেবে বলে। দু’টো বাইক এমন ভাবে দাঁড় করিয়ে দিল রাস্তার উপর যে, যে কোন বাহনকেই থমকে দাঁড়াতে হবে। সার্চ লাইটে বাইক দুটোকে দেখেই মনস্বিনীর বুঝতে বাকী রইল না এ কম্মটি কার। বৈশ্বানরের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোডে কল করলো এক মুহূর্ত দেরী না করে। গাড়িটাকে এগিয়ে এনে দাঁড় করালো বাইক দুটোর সামনে। অ্যাকশনে নেমে পড়ল রুদ্রাক্ষের দল। মুখোশের আড়ালে মুখগুলো কিন্তু তারা যখন মনস্বিনীকে নেমে আসতে আদেশ করলো তাদের একজনের হাতের আঙ্গুলে ইংরেজি আর চিহ্নিত একটি আংটি চিনিয়ে দিল মুখোশ আঁটা ঐ আংটির মালিকটি কে। কি করতে চায় রুদ্রাক্ষের দল? ওদের উদ্দেশ্য আন্দাজ করতে পারে মনস্বিনী। সময় নিচ্ছে মনস্বিনী। যতক্ষণ না বৈশ্বানরের দিক থেকে কোন সাড়া আসে ততক্ষণ আটকে রাখতে হবে ওদের। দেখা গেল, কেউ একজন ভারী কিছু নিয়ে এগিয়ে আসছে শাটারের কাচ ভেঙে দেবে বলে। ঠিক এ সময়ে পুলিশ জীপের সার্চ লাইটের আলোয় চমকে উঠলো দুর্বৃত্তের দল। পালানোর চেষ্টা করল কিন্তু সফল হল না। বিপরীত দিক থেকে এসে দাঁড়ালো অনঙ্গবাবু’র গাড়ি। থানার বড়বাবুর আদেশে দু’জন কনেস্টবল একে একে গ্রেফতার করল যে ক’জন এসেছিল হামলা করতে। থানায় যেতে হল মনস্বিনীকে। অনঙ্গবাবুও গেলেন সাথে। খবর পেতেই হাজির স্থানীয় নেতা। বড়বাবু ছেড়ে দেবেন কিন্তু একটি শর্তে। মুচলেকা দিতে হবে যে এ ধরনের কাজ ভবিষ্যতে আর কখনো করবে না রুদ্রাক্ষ।
ছাড়া পেয়ে গেল সব ক’জন দুর্বৃত্ত। মনস্বিনীর সজাগ চোখে কিন্তু আবার ধরা পড়ে গেল দলের পান্ডা রুদ্রাক্ষ। সেই প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠলো আরও একবার রুদ্রাক্ষর চোখে। মনস্বিনীর মন বলল, এপিসোড অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। সতর্ক থাকতে হবে।
ঠিক তাই হল যা ভেবেছিল মনস্বিনী। কিন্তু এমন ভাবে যে তার ভাবনা সত্য হয়ে উঠবে কল্পনাও করতে পারেনি সে। একবার যাকে আটকে রেখে মৃদুলার মনে ভয়ের সঞ্চার করতে চেয়েছিল রুদ্রাক্ষ, এবারও সেই শঙ্খমালাকেই টার্গেট করল ওরা।
শঙ্খমালা পিতৃহীন। মাকেও সে হারিয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে। বাবা রেখে যেতে পারেননি তেমন কিছু। এখন শঙ্খমালার বেঁচে থাকার জন্য ছাত্র পড়ানোই ভরসা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়ানো। ফিরতে ফিরতে কখনো সন্ধ্যে কখনো সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। এই সুযোগ ছাড়ার পাত্র নয় রুদ্রাক্ষ। হঠাৎই একদিন খবর চাউড় হয়ে গেল শঙ্খমালা নিরুদ্দেশ। পূর্ব ঘটনাপঞ্জী মিলিয়ে দেখা গেল এ কর্মের মাস্টার মাইন্ড রুদ্রাক্ষ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। সন্দেহভাজনের তালিকা ধরে দলবল সহ রুদ্রাক্ষকে ডাকা হল থানায়। এবার যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ মনস্বিনী। আর বাড়তে দেওয়া যাবে না রুদ্রাক্ষকে। খবর পেয়ে মৃদুলাও এসে হাজির তার সঙ্গীদের নিয়ে। নিজের দায়িত্বে রুদ্রাক্ষ’র বিরুদ্ধে ডাইরি লেখালো মনস্বিনী। খবর পাঠালো রুদ্রাক্ষ নেতা দাদার কাছে। উনি জানিয়ে দিলেন, বারবার রুদ্রাক্ষ’র এই নির্বুদ্ধিতার দায় নিতে পারবেন না তিনি। ডাঙার কইয়ের মত অবস্থা তখন রুদ্রাক্ষ’র। কতক্ষণে থানা থেকে বাইরে বেরোবে তা ভেবে ছটফট করছে সে। অবশেষে আবার হার। এবারও গুপ্তস্থান থেকে শঙ্খমালাকে এনে থানায় হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হল রুদ্রাক্ষকে। কিছুক্ষণের মধ্যে শঙ্খমালাকে নিয়ে থানায় হাজির হল রুদ্রাক্ষ’র এক সাগরেদ। বিধ্বস্ত শঙ্খমালা। মনস্বিনীর প্রশ্নের জবাবে কোন রকমে বলতে পারল, রুদ্রাক্ষ ওর সর্বনাশ করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সফল হয়নি। মনস্বিনী বুঝতে পারল, ঠিক সময়ে ধরপা্কড় না করলে শঙ্খমালাকে ফিরে পাওয়া যেত না। মামলা দায়ের হল রুদ্রাক্ষর নামে। শঙ্খমালার পক্ষে উকিল মনস্বিনী নিজে। সাক্ষী জোটানো থেকে শুরু করে যা যা করণীয় সব কিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল সে। অনঙ্গবাবু সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে রাখলেন মেয়েকে। রুদ্রাক্ষ’র দৃঢ় বিশ্বাস ছিল নেতা দাদা তার জামিনের ব্যবস্থা করবেন কিন্তু তিনি বলে পাঠালেন রুদ্রাক্ষকে দল থেকে কোন রকম সাহায্য তো দেওয়াই হবে না, প্রয়োজনে তার সদস্য পদ বাতিল করা হবে। রুদ্রাক্ষর বাবা অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারী কর্মচারী। অপদার্থ ভাইয়ের জন্য এক পয়সাও খরচ করতে রাজী নয় দাদা। উকিল পেল না রুদ্রাক্ষ তার পক্ষে সওয়াল করার জন্য। এক তরফা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হল রুদ্রাক্ষ। কয়েক বছরের জন্য সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হল সে। তার সঙ্গীদের সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হল। এত সহজে রুদ্রাক্ষ পর্বের সমাপ্তি নেমে আসবে ভাবতে পারেনি মনস্বিনী। মনে তিরতির করে একটা আনন্দ শিহরণ খেলে গেলো।
এদিকে শঙ্খমালার নির্যাতনকারী শাস্তি পেল বটে, নির্যাতিতা শঙ্খমালার জীবনে এই নির্যাতনের খবর ঘোরতর দুর্যোগের সূচনা করল। সমাজদেহের শিরায় শিরায় যে অন্ধত্বের জীবাণু ছড়িয়ে আছে তার আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া কি এতই সহজ! কয়েকটি দিন সময় নিল শঙ্খমালা ধাতস্থ হতে তারপর পড়ানোর কাজ আবার শুরু করবে এই ভেবে ফোনে যোগাযোগ করে নেবে বলে একএক করে প্রতিটি ছাত্রের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলল। প্রত্যেকেরই একই সমস্যা, কেউই আর চাইছে না নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া কোন মেয়ে শিক্ষকের কাছে তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষালাভ করুক। মানুষের কল্পনার উপর তো কারও হাত নেই। ভাল কিছু ভাবনায় না আসুক হাজারটা মন্দ ভাবনা কেমন করে যে মাথায় চলে আসে! কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করল, দু’দিন নিরুদ্দেশ ছিল, কে বলতে পারে এর মধ্যে কি না কি হয়ে গেছে। শঙ্খমালা যতই বলুক সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছে, মানুষের সে কথা বিশ্বাস করতে বয়েই গেছে! ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে শঙ্খমালার কাছে এখন দুটি পথ খোলা, হয় মর নয় ভিক্ষে কর।
মনস্বিনী একদিন নিজে থেকে দেখা করল বৈশ্বানরের সঙ্গে শঙ্খমালার বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোচনার জন্য। অনঙ্গবাবু’র চেম্বারেই বসার ব্যবস্থা হল। দীর্ঘ আলোচনার পর স্থির হল, শঙ্খমালার দায়িত্ব আর কেউ নয়, বৈশ্বানর আর মনস্বিনীই নেবে। বৈশ্বানর একটি আর্জি পেশ করল অনঙ্গবাবুর কাছে। অনঙ্গবাবুর গ্রামের বাড়িটিকে করে তোলা হবে শঙ্খমালার মত মেয়েদের আশ্রয়স্থল। যারা মিথ্যে অপবাদের কারণে সমাজের কাছে পরিত্যক্ত এবং যারা প্রকৃত পক্ষেই নির্যাতনের শিকার তারাই হবে ঐ আবাসের বাসিন্দা। তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে তাদের। যে সমাজ তাদের পরিত্যাগ করেছে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে সমাজ ব্যবস্থাই তাদের দুর্দশার মূল কারণ। দোষীদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব থাকবে বৈশ্বানরের উপর আর তাদের দোষী সাব্যস্ত করে দন্ড দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে মনস্বিনীর। অনঙ্গবাবু নির্দ্বিধায় এ প্রস্তাবে রাজী হলেন তবে এতে যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে একথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন বৈশ্বানর মনস্বিনীকে। বৈশ্বানরকে গাঁয়ের ছেলেরা অতি মানবের দৃষ্টিতে দেখে। মনস্বিনীও তাদের চোখে দেবীর মত। অনঙ্গবাবু তো পুরো গ্রামের অভিভাবক। এই তিন ব্যক্তিত্বের সম্মিলিত প্রয়াসে যা গড়ে উঠবে তাকে সর্ব শক্তি দিয়ে রক্ষা করবে গ্রামের ছেলেরা এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই একটি রূপরেখা তৈরী করা হল। শঙ্খমালাকে রাখা হল বৈশ্বানরের মায়ের হেপাজতে। তাকে বলা হল নন কলেজিয়েট পরীক্ষার্থী হিসাবে সে পরীক্ষায় বসবে এবং তার পড়াশোনা খাওয়া পরা থাকা সব কিছু ব্যবস্থা করবেন অনঙ্গবাবু। এখন প্রয়োজন শঙ্খমালার সম্মতি। সে কি রাজী হবে শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে একা জীবন কাটাতে? শঙ্খমালাকে সব কিছু খুলে বলা হল। বলা হল, তার উপর কেউ জোর খাটাচ্ছে না, সে ভেবে বলুক তার পক্ষে প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য কিনা। শঙ্খমালা দরিদ্র, অসহায় কিন্তু বুদ্ধিমতী। বাস্তববুদ্ধিতেও কম যায় না সে। প্রস্তাবটির যাথার্থ বিবেচনা করে সে কথা দিল, সে রাজী।
(২৮)
বৈশ্বানরের মা শঙ্খমালাকে পেয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। লেখাপড়া না জানুক বৈশ্বানরের মা তো সে! শঙ্খমালাও যেন নতুন করে মা পেল একটি। মেয়ের পড়ার যাতে কোন রকম ব্যাঘাত না ঘটে সে ব্যাপারে মায়ের যত্নের শেষ নেই। শঙ্খমালার মন এখন মনস্বিনী, বৈশ্বানর আর অনঙ্গবাবু’র প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত। গ্রামের ছেলেরা জোট বেঁধে এসে বলে গেল, ‘তোমার কোন চিন্তা নাই দিদি, আমরা আছি’। শঙ্খমালার মনে হল, সেও তো কিছু করতে পারে গ্রামের জন্য! মনস্বিনীকে সে জানালো সে যদি গ্রামের মেয়ে বৌউরা যারা লেখা পড়ার সুযোগ পায়নি কখনো তাদের অক্ষর পরিচয় করানোর চেষ্টা করে তবে কেমন হয়। এতে তার কিছুটা সময়ও কেটে যাবে ওদিকে কিছু মানুষ শিক্ষার আলো পাবে। এটাই তো চেয়েছিল মনস্বিনী। শঙ্খমালার মধ্যে জন্ম নিক নিজে থেকে কিছু করার বাসনা। দ্বিরুক্তি না করে মনস্বিনী পৌঁছে গেল গ্রামে। শঙ্খমালাকে নিয়ে প্রতিটি ঘরে গিয়ে বোঝালো তাদের পরিকল্পনার তাৎপর্য। বোঝালো, মায়েরা শিক্ষিত হলে সন্তানেরাও শিক্ষায় উৎসাহী হয়। তাদের তো স্কুলে যেতে হচ্ছে না। বিকেলে যেমন তারা সব কাজ সেরে গল্পগুজব করে তেমনি গল্প করতে করতেই তারা একটু একটু করে লিখতে পড়তে শিখে যাবে। না, শুরুতে বিরাট কোন সাড়া পাওয়া গেল না তবে পাঁচ ছয় জন খুব আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে এল। জানতে চাইল কবে থেকে শুরু হবে তাদের ক্লাস। মনস্বিনী শঙ্খমালা দু’জনই খুশি। আরম্ভে এই সংখ্যাটি আগামী দিনের উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিত যেন।
অনঙ্গবাবু, কিছুক্ষণের জন্য বৈশ্বানর এবং স্থানীয় বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন সেই আরম্ভের দিনে। বৈশ্বানর শুরুতেই জানাল, সংস্থাটির নাম ‘উজ্জীবন’, তার এবং মনস্বিনীর মিলিত ভাবনার ফল এই সংস্থাটি। যে সকল নির্যাতিতা নারী সমাজে অবহেলা ও উপেক্ষার পাত্রী হিসাবে পরিত্যক্তা তাদের মনে নতুন আশার অঙ্কুর জাগিয়ে তোলাই এই ‘উজ্জীবন’ সংস্থাটির মূল লক্ষ্য। এখানে তারা কেবল আশ্রয়ই পাবে না, পাবে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান। বিধায়ক সুকোমল আচার্য আশ্বাস দিয়ে গেলেন, মহৎ উদ্দেশ্যে গঠিত এই সংস্থাটির জন্য যত রকমের সাহায্য প্রয়োজন তার ব্যবস্থা তিনি করবেন।
শঙ্খমালার মত একজন দরদী শিক্ষক পেয়ে ছাত্রীরা তো বেজায় খুশী। দু’দিন যেতে না যেতেই দেখা গেল কয়েকটি নতুন মুখ। মাত্র সাতদিন সময়ের মধ্যেই স্বরবর্ণের পাঠ শেষ। নতুনদের জন্য একটু বেশী সময় দিয়ে তাদেরও একই সাথে এগিয়ে নিয়ে চলল শঙ্খমালা। পড়ার সাথে সাথে শঙ্খমালা গল্পও শোনায় ছাত্রীদের। রামায়ন মহাভারতের গল্প, মহাপুরুষদের জীবনী। এর সাথ সাথে অবশ্য নিজের পড়াও চালিয়ে যাচ্ছে সে। প্রয়োজনে তার নতুন মাকেও সাহায্য করতে এগিয়ে যায়। মায়ের কিন্তু তাতে একটুও সমর্থন নেই। সে চায়, মেয়ে মন দিয়ে পড়ে বিশু আর মণি মেয়ের মত কিছু হয়ে উঠুক।
মাস খানেকের মধ্যে উজ্জীবন-এ যুক্ত হল আরও দুজ’ন। তারা স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেনি এখনো। এর মধ্যেই দুর্যোগ নেমে এসেছে তাদের জীবনে। এ দু’জনের অভিভাবকত্ব ন্যস্ত হল শঙ্খমালার উপর। ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকল ছাত্রী সংখ্যা। যে সব নির্যাতিতা আশ্রয় পেল উজ্জীবন-এ তাদের মধ্যে যারা স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া তাদেরও দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হল শঙ্খমালাকে। শঙ্খমালার মধ্যে নেতৃসুলভ কিছু গুণের সন্ধান কলেজে থাকাকালীন সময়েই পেয়েছিল মনস্বিনী। শঙ্খমালা বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করল এ দায়িত্ব। যে সব মেয়েরা এখানে আশ্রয় পেল, তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্যোগের স্মৃতি তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মনস্বিনী আর বৈশ্বানর পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিল, একজন মনোচিকিৎসকের ব্যবস্থা করবে তারা যাদের কাজ হবে এইসব মেয়েদের মানসিক পরিবর্তন ঘটানো। আত্মরক্ষার প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার নয়। ব্যবস্থা হল ক্যারাটে শিক্ষার। তারপর রয়েছে আত্মনির্ভরতার জন্য তাদের কিছু বুনিয়াদি শিক্ষা দান। এত কিছু আয়োজনের ব্যয়ভার বহন করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। অনঙ্গবাবু আশ্বাস দিয়েছেন উজ্জীবনের আবাসিকদের খাওয়া পরা ও পড়ানোর সমস্ত খরচ যোগাবেন তিনি। এর বাইরে যা, তার জন্য রয়েছে মনস্বিনী ও বৈশ্বানরের মিলিত উদ্যোগ। স্থানীয় বিধায়ক যিনি সরকারী সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন তাঁকে রাজনৈতিক ভাবে সহযোগ দেওয়া হবে এই শর্তে তার মাধ্যমে বাড়তি অর্থের ব্যবস্থাও করে ফেলল বৈশ্বানর মনস্বিনী।
সাধারনতঃ হোম সম্বন্ধে মানুষের ধারণা খুব একটা স্বচ্ছ নয়। হোমের মেয়েদের দিয়ে কর্তৃপক্ষের অসামাজিক কাজ করানো প্রায় প্রতিদিনের খবর এখন। বৈশ্বানর আর মনস্বিনী সংকল্পবদ্ধ যে কখনই তারা উজ্জীবনকে তথাকথিত হোম হয়ে উঠতে দেবে না। এখানে যে সব মেয়েরা আশ্রয় পাবে তাদের প্রত্যেককে গড়ে তোলা হবে স্বনির্ভর স্বাবলম্বী করে। এই সব মেয়েরা হবে নিবেদিত প্রাণ। অবশ্য এর মধ্যে যারা বিয়ে করে ঘর বাঁধতে চাইবে তাদের ইচ্ছা পূরণের দায়ও নেবে উজ্জীবন কর্তৃপক্ষ। একটি কমিটি গঠন করা হল যাতে পরিচালন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে। শীর্ষে রইলেন অনঙ্গবাবু স্বয়ং উপদেষ্টা হিসেবে। পেছনে সক্রিয় থাকবে বৈশ্বানর মনস্বিনীর সম্মিলিত প্রয়াস। যাতে বাইরের কোন অপচেষ্টা উজ্জীবন-এর চলার পথে বিঘ্ন সৃষ্টি না করতে পারে সে জন্য সদাজাগ্রত প্রহরীর মত গ্রামের ছেলেদের নিয়ে গড়ে তোলা হল একটি গ্রুপ এবং তার নামও রাখা হল ‘প্রহরী’। প্রহরী গ্রুপের ছেলেদের জন্য মাসহারার ব্যবস্থাও করা হল।
উজ্জীবন এগিয়ে চলেছে। ছড়িয়ে পড়ছে তার নাম। এ খবরে যতটা খুশী অনঙ্গ বাবু, বৈশ্বানর আর মনস্বিনী, ততটাই বিরূপ কুন্তলা। তার একটিই ভাবনা, এইরকম চলতে থাকলে মেয়েকে সে সর্বনাশের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না কিছুতেই। তাই অনঙ্গ বাবুকে সে সতর্ক করে দিল এই বলে যে মেয়েকে সুপাত্র দেখে বিয়ে না দিলে সে আত্মহত্যা করবে। কুন্তলা জেদি। এত দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও যখন বাবা মেয়ের কাছ থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া এল না তখন এই মোক্ষম চালটি না দিয়ে পারল না সে। স্বভাবতই ভীতির সঞ্চার হল অনঙ্গবাবু আর মনস্বিনীর মনে।
অনঙ্গবাবু জানেন, মনস্বিনী বৈশ্বানর ছাড়া আর কোন পুরুষের অধিকার স্বীকার করবে না তার জীবনে। মনস্বিনী অবশ্য কোন দিন মন খুলে বলেওনি সেকথা। বৈশ্বানর মনস্বিনীকে নিয়ে কি ভাবছে সে কথাও জানার সুযোগ হয়নি তার। তবে তিনি মন থেকে স্বীকার করেন বৈশ্বানর মনস্বিনী আদর্শ জুটি। এমন অবস্থায় অনঙ্গবাবুও দিশাহারা। যদি এরা দু’জন নিজেদের মধ্যে কোন বোঝাপড়া করে নিয়ে থাকে সেটা তিনি মেনে নেবেন পরমোল্লাসে কিন্তু সে সংবাদে কুন্তলার তরফে যে প্রতিক্রিয়া হবে তা কল্পনা করে শিউরে উঠলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সময়ের উপরই সব কিছু ছেড়ে দিয়ে প্রতীক্ষার কাল গোনা শুরু হল তার।
(ক্রমশ)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন