সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

বিমল গঙ্গোপাধ্যায়

 

সমকালীন ছোটগল্প


আমি ও আমার স্বপ্নেরা

আমি টুয়েলভে পড়ি। আজ অব্দি কোন ক্লাসে ফেল করিনি। এর জন্য বাড়িতে আমার আলাদা কদর আছে। আমার দিদি ক্লাস এইটে পরপর দুবছর ফেল করল যখন, বাবা বলল, ওর আর পড়াশোনায় মন নেই। আমি বরং ওর জন্য পাত্র দেখি।

মা বলল, সে কী! সবে তো সতেরোয় পা দিয়েছে। এর মধ্যে বিয়ে? জানো না, মেয়েদের আঠার বছর বয়স না হলে,  বিয়ে দেওয়া যাবে না? সরকার নিয়ম করেছে।

বাবা বলল, দেখি, মানে দেখাদেখি শুরু করি। পাত্র তো আর কুমোরটুলির ঠাকুর নয় যে দেখলাম, পছন্দ হল আর সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে চলে এলাম। মনোমত পাত্র খুঁজে পেতে সময় লাগে। একটু চুপ করে থেকে বলল, তদ্দিন নাহয় সাধনাদির সেলাই স্কুলে ভর্তি হয়ে মেশিন চালানো, উলবোনা এগুলো শিখুক।

আমার বাবা একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করে। যা মাইনে পায়, তাতে আমাদের খেয়ে পরে দিন চলে যায়। আমরা যে বাড়িটিতে থাকি সেটি আমার ঠাকুর্দা তৈরী করেছিলেন। ভাড়াবাড়িতে থাকতে হলে, বাড়ি ভাড়া, সংসার চালানো, আমার পড়াশোনার খরচ, সব মিলিয়ে বাবাকে অসুবিধেয় পড়তে হত। আমাদের বাড়ির অনেক জায়গা ভেঙ্গেচুরে গেছে। একটানা বৃষ্টি হলে ছাদ চুঁইয়ে ঘরের মেঝেতে জল পড়ে। বাবা আজ পর্যন্ত মিস্ত্রি ডেকে মেরামতির কাজটুকু করাতে পারেনি।

দিদির বিয়ে হয়ে গেছে তিনবছর আগে। এখনও দিদির বিয়ের দেনা শোধ হয়নি। এদিকে আবার বাবা নাকি কথা দিয়েও আজ পর্যন্ত জামাইবাবুর বাইক কেনার টাকা দিতে পারেনি। সেই ক্ষোভে দিদির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দিদিকে আমাদের বাড়ি পাঠায় না। জামাইবাবুও আসে না। দিদিও কেমন পাল্টে গেছে। আগে মুখ ঢাকা খামে ভরে চিঠি পাঠাতো। বছরখানেক হল তাও বন্ধ।

আমার বোন রাখী প্রায়ই বলে, দিদিটা কেমন পাল্টে গেছে। তাই না, মা? মা বলে, বিয়ের পরে স্বামীর ঘরটাকেই নিজের ঘর বলে মনে করতে হয়। যারা এটা করে না, তাদের সংসারে নিত্য ঝগড়া অশান্তি। সেদিক দিয়ে তোর দিদিকে তো ভালই বলতে হবে।

-   তা বলে, বাবা মা ভাই বোনের খবর রাখবে না? বছরে এক আধবারও আসবে না? রাখী ক্ষোভের গলায় বলে।

-   তোরও বিয়ে হোক। মা রাখীকে বলে, তখন দেখব তুই বাপের বাড়ির জন্য কত কর্তব্যকর্ম করিস।

-   আচ্ছা দেখো। বলেই রাখী হেসে ফেলে, থুড়ি। আমি বিয়েই করবো না। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাব না।

মা আর রাখীর মধ্যে এইসব কথাবার্তা হয়, আমি আড়াল থেকে শুনি আর আপন মনেই হাসি।

কারণ একমাত্র আমিই জানি আমার স্কুলের বন্ধু সুবীর কেন প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসে। সুবীর পড়াশুনোয় ভাল। তার ওপর ওরা বেশ বড়লোক। অন্তত আমাদের তুলনায় ওদের অবস্থা একশ দুশো গুণ ভাল। আমি পড়াশুনোয় মাঝারি। সুবীর ফার্স্ট বেঞ্চে বসে। আমি বসি পিছনের আগের সারিতে। স্কুলে সুবীর অর্ণব প্রহাস এই তিনজনের একটা গ্রুপ আছে। সব সময় ওরা মুখ গম্ভীর করে থাকে। নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে। আমরা ওদের নাম দিয়েছি থ্রি মাস্কেটিয়ার্স।

সুবীর যেদিন প্রথম আমাদের বাড়িতে এসেছিল, আমার খুব আনন্দ হয়েছিল। আমি মা আর রাখীর সঙ্গে সুবীরের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ করে ওর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় ও কয়েকদিন স্কুল যেতে পারবে না, ছুটির দরখাস্তটি আমার হাতে দিয়ে বলেছিল, এটা হেডমাস্টারমশাইকে পৌঁছে দিলে খুব উপকার হবে।

আমি বলতে যাচ্ছিলাম, প্রহাস অর্ণব ওরা সব থাকতে আমাকে ... !

তার আগেই সুবীর বলল, অর্ণব বেড়াতে গেছে। প্রহাসের বাড়ির টেলিফোনটা নিশ্চয়ই খারাপ। রিং বেজে যাচ্ছে। কেউ ধরছে না।

সুবীরের বাড়ি আমার বাড়ি থেকে এমন কিছু দূরে নয়। ও সাইকেলে এসেছিল। তবু চলে যাবার জন্য তাড়াহুড়ো করছিল।

মা বলল, তাই কখনও হয়? তুমি খোকনের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ো। আজই প্রথম এলে আমাদের বাড়ি। একটু মিষ্টিমুখ করে যাও।

রাখী মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকল যখন, সুবীর কয়েক মুহূর্ত অপলক ওর মুখের দিকে চেয়ে বলল, তুমি, বিনোদিনী-তে পড়ো না?

রাখী আলতো করে ঘাড় দোলা্লো, হ্যাঁ।

-   কোন ক্লাসে?

-   নাইন।

-   পারমিতাকে চেনো? ও আমার পিসির মেয়ে। গত বছর মাধ্যমিকে জেলার মধ্যে হায়েস্ট মার্কস পেয়েছে।

-   মুখ চিনি। রাখী বলল, আলাপ নেই।

-   ও আচ্ছা।

সুবীর রাখীর কথা বিশ্বাস করল। আমি জানি রাখী নির্জলা মিথ্যে বলল। পারমিতা আর ও একই ক্লাসে পড়ত। ক্লাস  এইটে রাখী যে বছর বিশ্রাম নিল, পারমিতা ওকে ফেলে রেখে এগিয়ে গেল।

রাখীটা তো আচ্ছা বোকা! আমার ভীষণ রাগ হল। সুবীর তো ওর পিসতুতো বোনের কাছে রাখীর খবর নিলে সবই  জানতে পেরে যাবে। রাখীর সম্পর্কে ওর কি ধারণা হবে তখন? আমাদের বাড়ির সম্পর্কেই বা কি ভাববে?

কিন্তু আশ্চর্য, আমার সব ভয় আশঙ্কাকে অমূলক প্রমাণ করে দিয়ে সুবীর আবার একদিন আমাদের বাড়ি এল। বই না ক্লাসনোট কিসের খোঁজে যেন। তারপরেও আবার। এখন তো প্রায়ই আসে। এমনকি ছুটির দিনে যে সময়টায় আমি বাড়ি থাকি না, সেটা ও জানে। তখনও আসে। আমার মা সুবীরকে খুবই পছন্দ করে।

আমি কিন্তু মাকে বলি না যে সুবীর স্কুলে আমার সঙ্গে আগের মতোই ব্যবহার করে। দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আর সুবীরের প্রসঙ্গ উঠলে যে সবচেয়ে বেশি অন্যমনস্ক অবজ্ঞা এবং রাগের ভান করে, আমার বোন রাখী, তাকেও আমি বলি না যে, আমি সব জানি। তোরা আমাকে যতই বোকা ভাব না কেন, আমি সব বুঝতে পারি সুবীর সত্যি সত্যি কার খোঁজে এ বাড়িতে আসে। বাবা মা এমনকি আমার চেয়ে বয়সে ছোট রাখী তারও ধারণা চারপাশে প্রতিদিন যা ঘটছে, সব কিছু আমার নজরে পড়ে না। বা পড়লেও সেসব ঘটনার কারণ বৃত্তান্ত পরিণতি এসব নিয়ে আমার কোন ভাবনা চিন্তা নেই। ওরা ভাবে যেহেতু আমি এক ক্লাসে দুবার পড়িনি, সুতরাং খুব ভাল ছাত্রএ জাতীয় ছেলেরা যেমন হয়, চলতে ফিরতে উঠতে বসতে এমনকি ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে পড়া বলে, বই খাতা পেন কাঁটা কম্পাস এ সবের স্বপ্ন দেখে, আমিও ওই ক্যাটিগরির মধ্যেই পড়ি।

এতে সুবিধেও যেমন আছে, অসুবিধেও আছে। আমার উপস্থিতিতে কাউকে অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে না। মিথ্যে কথাকে বেশি সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে হচ্ছে না। আমার সুবিধে এই যে, আমি কারোর বিরক্তি বা ভয়ের কারণ হচ্ছি না। কেউ আমার সঙ্গে দাঁত পিষে কথা বলছে না বা টেরিয়ে বেঁকিয়ে প্রশ্ন করছে না। অসুবিধাটা হল, আমি সবই বুঝতে পারছি কিন্তু কাউকে বলতে পারছি না। ভর্তি পেটে দুচারটে ঢেঁকুর উঠলে স্বস্তি পাওয়া যায়। আমি সেই আরামটুকুও পাচ্ছি না।

যেমন শেখরকাকু, বাবার বন্ধু, প্রত্যেক শনিবার বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসে। হৈ হৈ করে কথা বলে। হা-হা করে  হাসে। তারপর চা খেয়ে দুই বন্ধুতে বেড়াতে বেরোয়। আমাদের বাড়ির সকলে শেখরকাকুকে পছন্দ করে। আমিও করি। মা বলে, শেখরঠাকুরপোকে দেখলেই তোর বাবার চোখমুখের চেহারাই পাল্টে যায়। ছেলেবেলার বন্ধু তো। সারা সপ্তাহ একটা মানুষ সময়ের পেছনে দৌড়োচ্ছে। বাড়ির কাজ। তার সঙ্গে অফিসের চাপ। ভেতরে ভেতরে হাঁফিয়ে ওঠে। দেখিসনি, তোদের বাবা বেড়িয়ে ফেরে যখন, কেমন হাসি মুখে সব কথার জবাব দেয়। গুনগুন করে গান গায়। একটু থেমে, আরে বাবা। মানুষ তো মেশিন নয়। বছরের ৩৬৫টা দিন যদি একইরকমভাবে কাটাতে হয়, যে কোন মানুষ পাগল হয়ে যাবে।

এমনভাবে এই কথাগুলি বলে মা, যেন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছে। আসলে আমরা, মানে আমি রাখী বা কাজের পিসি, মায়ের কথাগুলি শুনছি কিনা, এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হবার জন্যই হঠাৎ করে বলে ওঠে, কোথায় গেলি সব? হ্যাঁ হুঁ করছিস না?

রাখী জানে কিনা জানি না, কিন্তু আমি জানি, বাবা আর শেখরকাকু প্রত্যেক শনিবার বিকেলে ভদ্রেশ্বরে এক মহিলার  বাড়ি যায়। মহিলাটি বাল্যবিধবা। বিয়ের আগে ওই মহিলার সঙ্গে কাকুর প্রেম ভালবাসা ছিল। হয়ত সামাজিক কারণেই কাকু একজন বিধবাকে সাহস করে বিয়ে করতে পারেননি। কিন্তু দুজনের বন্ধন আজও অটুট। ভদ্রমহিলা একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। একা থাকেন।

আমার বিশ্বাস শেখরকাকুর বউ যেমন ব্যাপারটা জানে, আমার মায়েরও অজানা নয়। মা বাবাকে বাধা দেয় না হয়ত এই কারণে যে, বাধা দিলেও বাবা শুনবে না কিম্বা বাবার ওপর মায়ের অগাধ বিশ্বাস, বাবা নিজের স্ত্রী ছেলেমেয়েকে অগ্রাহ্য করে কখনোই বিপথগামী হবে না।

বাবার চশমা খুঁজে দিতে গিয়ে, জামার পকেট হাতড়ে একদিন হালকা গোলাপী রংয়ের ছোট একটা কাগজের টুকরো পেয়েছিলাম। তাতে উড পেন্সিলে কিছু নম্বর লেখা। সুবলের চায়ের দোকানের পাশের গলিতে কিছু লোককে দেখেছি ঠিক ওইরকম দেখতে কাগজের টুকরো হাতে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলে। আমি জানি হাল্কা গোলাপী কাগজের টুকরোটি সাট্টার স্লিপ। এটা এক ধরনের জুয়া। প্রতি ঘন্টায় খেলা হয়। অশিক্ষিত লোকেরা সাট্টা খেলে।  রিক্সাওয়ালা, মুটেওয়ালা এমনকি কজন ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবলকেও দেখেছি সাট্টার স্লিপ জামার পকেটে পুরতে। তা  বলে আমার বাবা!

সেই মুহূর্তে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল। ব্যাপারটা খুলে কাউকে বলতে পারলে স্বস্তি পেতাম। কিন্তু কাকে বলব? আর কে'ই বা আমার কথা বিশ্বাস করবে? নিজেকে বোঝালাম এইভাবে যে, দিদির বিয়ের দেনা বা জামাইবাবুর বাইক কেনার টাকা জোগাড় করার জন্যই হয়ত বাবা এই ধরনের গোপন পিচ্ছিল পথে হাঁটছে। উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেলে সরে  আসবে। আর খেলবে না। আমার বাবাকে আমি জানি। অর্থলোলুপ নয়। প্রয়োজনে অনেক সৎ আদর্শবান মানুষকেও তো অসৎ পথে হাঁটতে হয়। নীতিহীন আদর্শহীন কাজ করতে হয়। আমার বাবাকেও হয়ত সেইরকমই...!

যেমন আমি জানি আমার মা ভাল। সর্ব অর্থে ভাল। বিকাশমামা কেন মাঝে মধ্যেই চা খাবার নাম করে আমাদের বাড়ি আসে, আমি তা'ও জানি। বোনেদের বিয়ে দিয়ে, বেকার ভাইদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে করতে কোন ফাঁকে বিকাশমামার নিজের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে। লেট আওয়ার্সেও বিয়ে করতে পারত। হয়ত লোকে কী ভাববে, এই ভেবে আর বিয়ে করেনি। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ভায়ের বিয়ে দিয়েছে। ভাই আর তার বউয়ের সংসারে এখন আর বিকাশমামার কোন কদর নেই। রিটায়ারমেন্টের পর তো একরকম অবাঞ্ছিত ব্রাত্য হয়ে গেছেহালফ্যাসানের বাড়িতে সেকেলে আসবাবের মতো অবস্থা এখন।

আমাদের বাড়িতে চা খেতে আসে। চা খাওয়াটা গৌণ। আসলে আমার মায়ের সান্নিধ্য বিকাশমামাকে তৃপ্তি দেয়। রান্নাঘরের সামনে চেয়ারে বসে চা খায়। মায়ের সঙ্গে গল্প করে। আমার মায়ের চেহারায় এখনও বেশ লাবণ্য আছে। আমি অনেকদিন লক্ষ্য করেছি মা হয়ত মেঝেতে বসে সবজি কাটছে, সামনের দিকে একটু ঝুঁকে বসার দরুণ ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে মায়ের বুকের একটুখানি দেখা যাচ্ছে। বিকাশমামা নিষ্পলক সেদিকে চেয়ে আছে। মা মুখ তুলে তাকাতেই বিকাশমামা দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে অন্যপাশে চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক কোন কথা যেমন, 'পাঁজিতে লিখেছে এবছরে দারুণ বৃষ্টি  হবে' বা 'সিঙ্গুরের দই খেয়েছেন বৌদি?' এইরকম কিছু বলে অপ্রস্তুত অবস্থাটা সামাল দেবার চেষ্টা করে। আমি জানি মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। তা সত্ত্বেও মা কেন যে বিকাশমামার এ ধরনের অসভ্যতাকে মেনে নেয়!

মাকে তো জিজ্ঞেস করা যায় না। রাখীকেও বলা যায় না। ভাববে আমার মনেই পাপ বাসা বেঁধেছে।

তখন আবার নিজেকে বোঝাই, সব মেয়েই হয়ত আমার মায়ের মতো। কাউকেই কষ্ট দিতে চায় না। কী আছে বিকাশমামার জীবনে? পাওয়ার ঘর শূন্য। হয়ত এই অনুকম্পা থেকেই মা বিকাশমামার এই ছোটখাট দোষত্রুটিগুলো মেনে নেয়। দৃষ্টিতে তো আর সতীত্ব নষ্ট হয় না।

বিকাশমামার ওপর আর কোন রাগ থাকে না। বাবাকেও দোষী ভাবতে পারি না। যেমন শেখরকাকুর সম্পর্কে ঘৃণা বা বিদ্বেষের পরিবর্তে আমার এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ জন্মায়। মানুষটি চতুর পলাতক নয়। ভালবাসার মূল্য দিতে জানে।

 

(দুই)

বারো ক্লাস ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার পর হঠাৎ করে মনে হল স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে গেছি মানে, আমি বেশ বড় হয়ে গেছি। বড়রা যেমন আচরণ করে, এখন থেকে আমিও সেসব করতে পারি। বাড়ি থেকে বেরোনো এবং ফেরার সময় এগিয়ে পিছিয়ে দিলাম। দেখলাম বাবা মা কেউ কিছুই বলছে না।

রাখী একদিন আমার ঘামে ভেজা জামা রোদ্দুরে মেলে দিয়ে এসে বলল, দাদা, তোর জামায় বিচ্ছিরি গন্ধ। বিড়ি খাস কেন? সিগারেট খেতে পারিস না?

পাশের ঘরে মা। আমি রাখীকে ইশারায় চুপ করতে বললাম। রাখী 'বয়েই গেছে' না 'বেশ করেছি' কী যেন বলল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে মা বলে উঠল, ছাইপাঁশ যা খুশি খাও। বাড়ির বাইরে। ভেতরে নয়।

মায়ের গলার আওয়াজ স্বাভাবিক। রেগে গেছে বলে মনে হল না।

আমি যেন নিজের ওপর খানিকটা বাড়তি আত্মবিশ্বাস পেলাম। অমলদের বাড়িতে আগে কখনও সখনও যেতাম। এখন প্রায় রোজই যাই। ও আমার সহপাঠী। রেল স্টেশনের ওপারে নিচু জলামত জায়গায় ওদের বাড়ি। অমলদের অবস্থা ভাল নয়। দরমার দেওয়ালের মাথায় টালির ছাদ। ওদের মোট দেড়খানা ঘর। অমল শান্ত স্বভাবের রুগ্ন চেহারার ছেলে। ওর বোনের নাম রূপা। রূপা ক্লাস সেভেনে উঠে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। এখন বাড়ির কাজ করে। তার সঙ্গে রঙ্গিন কাগজের ফুলের মালা তৈরী করে। একহাত লম্বা একডজন মালা গাঁথার মজুরী বারো টাকা। এক হাতে কাগজ কাটা মালা গাঁথা বেশ পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু আশ্চর্য, রূপার চোখমুখে কখনোই ক্লান্তি বা বিষণ্ণতার ছাপ নেই। সব সময়েই হাসছে। ঐরকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দীনহীন অবস্থার মধ্যে থেকেও রূপার চেহারায় জৌলুস এল কোত্থেকে, কে জানে!

অমলদের বাড়ি থেকে বেরোতে একদিন একটু রাত হয়ে গেল। বাড়িতে ঢোকার সময়ে অল্পস্বল্প ভয় করতে লাগল দরজা খুলে দিয়ে মা বলল, কটা বাজে জানিস?

-   হ্যাঁ, মানে! আমি কিন্তু কিন্তু ভাব করে বললাম, অমলদের বাড়িতে গেছিলাম। ওর মা জোর করে রাতের খাবার খাইয়ে দিল। খিচুড়ি।

-   খিচুড়ি? খেয়েছিস? মা এমন থেমে থেমে বলল যে আমার বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ হতে লাগল। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলাম।

-   কী হল? অমন করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বলে মা আমার পিঠে আলতো করে হাত রাখল, দুচামচে অম্বলের ওষুধ খেয়ে নিস। খিছুড়ি বেশ ভারি। ফ্যানটা থেকে যায় কিনা!

কথা শেষ করে মা চলে গেল

তার মানে আমি যে যথেষ্ট বড় হয়ে গেছি, যখন তখন বাড়ি ঢুকতে পারি, আগাম জানান না দিয়ে রাতের খাওয়া বাইরে সারতে পারি, এটা মা মেনে নিয়েছে নিজেকে বেশ হাল্কা লাগছে সত্যি কথা বলার পরেও যখন তার কোন প্রতিবাদ নেই, জেরা নেই, নিষেধের আজ্ঞা নেই, তখন আমি কেন, কেন্নোর মতো যে কোন মানুষও দু কাঁধ ঝাঁকিয়ে শূন্যে ঢিসুম ঢিসুম করে ঘুঁসি চালাতে পারে।

রাতে মশারি গুঁজতে এসে রাখী বলল, অমলদার মায়ের রান্নাটা কেমন রে?

-   ওর মা রাঁধেনি। আমি বললাম, ওর বোন রূপা রেঁধেছে।

-   ! বলে একটু থেমে রাখী বলল, ওরা তো বাঙাল। রান্নায় মিষ্টি দেয় না।

-   তা হোক। খেতে ভালই হয়েছিল।

-   তা তো বলবিই। বলে রাখী ঘরের দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ করে ঘুরে দাঁড়াল, অমলদার বোনটা খুব অসভ্য। সবসময়ে হি-হি করে হাসছে। এইটুকু বলেই রাখী এমন দ্রুত পা ফেলে চলে গেল, যেন শেষের এই কথাটা বলার জন্যই এতক্ষণ অন্য কথার জাল বুনছিল।

রাখীর ওপর খুব রাগ হল। ও হঠাৎ করে কেন রূপার সম্বন্ধে এমন বিশ্রী একটা মন্তব্য করল, এটা বুঝতে অসুবিধে হল না। বাবা মা যেখানে অ্যাডমিট করে নিয়েছে যে আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি, আমার চলাফেরা কাজকর্মের বিরোধিতা করার আগে 'উচিত', 'অনুচিত' এ নিয়ে একটু চিন্তা ভাবনা করা দরকার, সেখানে রাখী, আমার বয়োকনিষ্ঠ আমাকে প্রচ্ছন্নে সাবধান করতে চায়!

রাগ বাড়লে আনুপাতিকহারে জেদও বাড়ে। যে কোন সুস্থ মানুষের এটিই স্বাস্থ্যসম্মত লক্ষণ। জেদের বশে মনে মনে আমি একটা ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম।

পরদিন রাতে যখন অমলদের বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, রূপা আমার পাশে পাশে হাঁটছে, ছোটমত একটা ঘাসের উঠোন পেরোচ্ছি দুজনে, আমি আচমকা সাইকেলে স্ট্যান্ড দিয়ে রূপার ডান হাতটা চেপে ধরলাম, রূপা, আমি তোমাকে খুব ভালবাসি। তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

রূপা এক ঝটকায় আমার হাতের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল, কী পাগলের মতো বকছেন? বলে পাকা পুলিশ অফিসার যেমন চোর জোচ্চরকে আগাপাশতলা খুঁটিয়ে দেখে, অবিকল সেইভাবে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বারকয়েক দেখে নিয়ে অল্প একটু হাসল, জানেন না, দীনুদার সঙ্গে আমার লাভ আছে?

-   দীনু মানে ... !  আমি জড়ানো গলায় বলার চেষ্টা করলাম, দীনুদা মানে ... ময়নাডাঙ্গার ... !

-   হ্যাঁ। হ্যাঁ। রূপা বেশ জোরেই বলল, ময়নাডাঙ্গার হাতকাটা দীনু মস্তান। আর কোনদিন যদি এরকম উল্টোপাল্টা বকেন, দীনুদাকে বলে দোব। রাতারাতি লোপাট হয়ে যাবেন। কাকপক্ষীতে টের পাবে না।

 

(তিন)

রূপাকে ভুলতে আমার সপ্তাদুয়েকের মতো কেটে গেল। হয়ত আরও অনেকদিন রূপার স্মৃতি আমাকে অসহ্য কষ্ট দিত।

ইতিমধ্যে 'সবুজ সংঘ'-এর সেক্রেটারী সুভাষদার সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা হল। পুজো স্যুভেনীর-এ লেখালিখি, প্রুফ দেখা এইসব সূত্রে। সুভাষদা আমায় চুপিচুপি বলল, আমার নামে সম্পাদকীয়টা তুমি লিখবে। কেউ যেন জানতে না পারে। আমি তোমায় হেল্প করব কীভাবে লিখতে হবে। কোন কোন পয়েন্টের ওপর জোর দেবে। আচ্ছা, 'নিষ্ঠা' বানানটা কী বল তো? 'ষ্ঠ' না 'স্ট'-এ?

আমি বললাম, 'ষ্ঠ'।

-   সিওর?

-   হ্যাঁ। আমি বেশ জোরের সঙ্গে বললাম।

-   আর সততা? 'ৎ', ঠিক তো ?

-   না। এবারও বেশ জোরের সঙ্গে বললাম, 'ৎ' থাকে না। দুটোই 'ত'।

-   হবে! সুভাষদা আমার কাঁধ চাপড়ে দিলেন, বানান সম্পর্কে তোমার বেশ নলেজ আছে। তুমি আমার বাড়ি চলে  আসবে। তবে হ্যাঁ, লেখালিখির ব্যাপারটা যেন কেউ জানতে না পারে। একটু চুপ করে থেকে বলল, সামনের বছর তোমায় কমিটিতে ঢুকিয়ে নেব।

এখন আমি প্রায়ই সুভাষদার বাড়ি যাই। একদিন দুদিন অন্তর। সকাল দুপুর সন্ধ্যে, যখন খুশি। সুভাষদার বউ নন্দিতা বৌদি আমায় চা দেয়। চায়ের সঙ্গে এটা ওটা দেয়। 'খাব না' বা 'পারছি না' বললে রীতিমত জোর করে, সবসময়ে না, না। ঠিক পারবে। কী এমন বয়স তোমার?

নন্দিতাবৌদি আস্তে আস্তে কথা বলে। ঠোঁট বন্ধ করে শব্দহীন হাসে। হাসলে গালে টোল পড়ে। তখন বৌদিকে হুবহু আমার দিদির মতো দেখতে লাগে। মন খারাপ হয়ে যায়। দিদি তো বেশ কয়েকবছর হয়ে গেল আমাদের বাড়ি আসে না। বিয়ের আগের একটা ছবি আছে দিদির। এখনও সেই ছবিটার মতোই দেখতে আছে দিদিক! নাকি আরও সুন্দর দেখতে হয়েছে! বাবার বাড়িতে আসতে না পারার দুঃখে দিদির মুখের চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ পড়েছে! মাথার চুল পাতলা হয়ে কপালটা চওড়া হয়ে গেছে! চোখের কোলে দুশ্চিন্তার কালো ছোপ পড়েছে! হাসলে দিদির গালে নন্দিতাবৌদির মতো টোল পড়ে এখনও?

এই সব ভাবনায় আমার মন খারাপ হয়ে গেল।

বললাম, বৌদি, আজ বাড়ি যাই।

-   এরমধ্যেই চলে যাবে? বৌদি আমার হাত টেনে ধরে সোফায় বসিয়ে দেয়, দেখা করবে বলে কাউকে কথা দেওয়া আছে?

আমি ঘাড় নেড়ে বলি, না।

-   তাহলে? আর একটু বসো না। তুমি এলে গল্প করে একটু রিলিফ পাই। তা না হলে! বৌদি খোলা জানলার কাছে এগিয়ে যায়। বাইরের পানে চেয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলে, একা একা হাঁফিয়ে উঠি। তোমার দাদাকে তো দেখেছো, দিনরাত কাজ আর কাজ। দুবছর হল বাপের বাড়ি যাইনি, জানো! এত দেখতে ইচ্ছে করে মা বাবা দাদা বোন ...! বৌদির গলা ধরে আসে।

আমি আর থাকতে পারি না, আমার দিদিরও আপনার মতো অবস্থা।

-   কেন? কেন? বৌদি ঘুরে দাঁড়ায়, ওমা, তাই নাকি! চোখ বড় বড় করে আমার দিদির কাহিনী শোনে আর তার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময় দুঃখ হতাশা প্রকাশ করে ছোট ছোট মন্তব্যে, জিজ্ঞাসায়। আমার কথা শেষ হলে বৌদি সোফায় আমার পাশে এসে বসে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, প্রত্যেক মানুষের কিছু কষ্ট আছে। মেয়েদের আরও বেশি। প্রতিবাদ করা তো দূরের ব্যাপার। মুখ ফুটে বলতেই পারে না। বলতে না পারার যা কষ্ট, তা তো আর বুক চিরে দেখানো যায় না। যদি দেখানো যেত...!

নন্দিতা বৌদির মধ্যে আমি আমার দিদিকে খুঁজে পেয়েছি।

সুভাষদার বাড়িতে আমার অবাধ যাতায়াত। আমি সুভাষদার অনেক ব্যক্তিগত কাজও করে দিই। টেলিফোন বিল জমা দেওয়া। অফিস সহকর্মীর বাড়ি দরকারি চিঠি পৌঁছে দিয়ে আসা। বৌদি আমাকে গোপনে কোন কাজের ভার দিলে আমি আরও খুশি হই। যতক্ষণ না সেই কাজটা করতে পারছি, স্বস্তি পাই না।

দিন কয়েক আগে একদিন সুভাষদার বাড়ি গেছি, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছে। বৌদি বলল, একটা কাজ করে দেবে খোকন? লন্ড্রী থেকে আমার এই শাড়িটা এনে দেবে? আমার হাতে একটি মেমো ধরিয়ে দিলেন, তোমার দাদাকে বলতে ভুলে গেছি। এখন বললে রাগারাগি করবে।

আমি বললাম, এত বলার কি আছে? আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।

লন্ড্রী থেকে ফিরলাম যখন তখন সন্ধ্যে নেমে গেছে। দাদা অফিস থেকে ফেরেনি। বৌদি বলল, বোস। আমি চা করছি। খেয়ে যাবে।

আমি টেবিলে রাখা একটি পুরনো ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম। হঠাৎ মাথা তুলে দেখি বৌদি চায়ের কাপ হাতে সামনে দাঁড়িয়ে। হাত বাড়িয়ে চা নিলাম। চা খেতে খেতে দুজনে কিছু গল্প করলাম। চায়ের ফাঁকা প্লেট তুলে নিয়ে বৌদি ভেতরে গেল। সামান্যক্ষণ পরেই ফিরে এল। বৌদির হাতে লন্ড্রী থেকে নিয়ে আসা শাড়িটি। আলনা থেকে একটি ব্লাউজ তুলে নিয়ে শাড়িটির গায়ে আলতো করে রাখলেন, দেখ তো, ব্লাউজের রংটা শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করছে কিনা?

আমি বললাম, হ্যাঁ। দারুণ ম্যাচ করেছে।

-   ভাল করে দেখে বল না! ছোট মেয়েদের মতো আদুরে গলায় বৌদি বলল, এবার? বলে ব্লাউজ সমেত শাড়িটিকে নিজের বুকের কাছে চেপে ধরলেন, এবার বলো? টো টো ম্যাচ করেছে?

আমি অবাক বিস্ময়ে বৌদির দিকে চেয়ে রয়েছি। আমার দিদিরও ঠিক ওই রংয়ের একটি শাড়ি ছিল। তবে বৌদির শাড়িটার মতো দামি নয়। দিদির সেই শাড়িটা এখনও আছে। সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ? হয়ত নেই। থাকলেও সময়ের ঝাপটায় রং ফিকে হয়ে গিয়ে অন্যরকম দেখতে হয়ে গেছে।

আমাকে অমন নিষ্পলক চেয়ে থাকতে দেখে বৌদি আমার কাছে এগিয়ে এল, কী দেখছ অমন করে?

আমি বললাম, আমার দিদিরও ঠিক এই রংয়ের একটা শাড়ি ছিল।

-   শাড়ির রং দেখছ? নাকি? বলে শাড়িটা বুকের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে আলতো হেসে বলল, অন্য কিছু?

-   না, না বৌদি, বিশ্বাস করুন। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।

-   কী হল? অমন চ্যাঁচাচ্ছ কেন? বৌদি এগিয়ে এসে আমার ঝুলেপড়া চিবুকটা তুলে ধরল, তুমি কি ভয় পেয়েছ? আমি কাউকে বলে দেব?

-   বিশ্বাস করুন বৌদি। কান্নায় আমার গলা বুজে আসছে, আমি আসলে আমার ...!

-   আঃ! বৌদির গলায় বিরক্তি, কী এক কথা তখন থেকে বলছ? মেয়েদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সোজা নয়। বুঝেছ? এ মা! তুমি কাঁদছ কেন? লজ্জা করছে? নাকি ভয়? বললাম তো আমি কাউকে বলব না। এখন বাড়ি যাও তো। দয়া করে চোখটা মোছ।

দুঃস্বপ্নগ্রস্ত রুগীর মতো আমি কোনরকমে দেওয়াল ধরে আস্তে আস্তে ওপর থেকে নিচে নামলাম। নিজের শরীরটা এমন ভারি লাগছে, মনে হচ্ছে যেন বিশ মণ ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আমার কাঁধে। আমি পা ফেলতে পারছি না। বড় করে শ্বাস নিতে পারছি না।

 

(চার)

বেশ কয়েকমাস হয়ে গেল আমি আর যখন তখন বাড়ি থেকে বেরোই না। বাড়ির মধ্যেই থাকি। বই পড়ি। গান শুনি। আর সারাটা দিন অপেক্ষা করে থাকি রাতের প্রতীক্ষায়।

রাতে আমার ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম হয়। আর সেই ঘুমের মধ্যে আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাতে গোণা দুটি স্বপ্ন দেখি। কোনদিন হয়ত প্রথম রাতে স্বপ্নে দেখলাম, আমি হাতকাটা দীনু মস্তানকে ধরে বেধড়ক পেটাচ্ছি। মারের চোটে ঠোঁটের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। চারপাশে ভিড় করে লোক দেখছে। আমি উল্টে পাল্টে চিৎ করে ফেলে দীনু মস্তানকে পেটাচ্ছি।

ঘুম ভেঙ্গে যায়। বিছানায় উঠে বসি। মশারি ফুঁড়ে বাইরে এসে জল খাই। জানলায় দাঁড়িয়ে নিজেকে সতেজ করি। পরের স্বপ্নটার জন্য হাঁ করে অতিরিক্ত অক্সিজেন ভরে নিই শরীরে।

মাঝরাতের স্বপ্নে নন্দিতা বৌদিকে দেখি। বৌদি হাপুস নয়নে কাঁদছে আমার পায়ের কাছে বসে। আর একই কথা বারবার বলছে, আমার ক্ষমা করে দাও খোকন। আমি তোমায় ভুল বুঝেছি।

সুভাষদা আমার কাঁধে হাত রেখে আকুতিভরা গলায় বলছে, ওকে মাফ করে দাও খোকন।

এর মধ্যে কয়েকদিন ভোররাতের স্বপ্নে শেখরকাকু আর বিকাশমামাকে দেখেছি। ওরা সব আগের মতোই আছে। স্বপ্নেও ওদের সঙ্গে আগের মতোই আচরণ করছি। যেমন হাসতাম, কথা বলতাম।

মাকে জিজ্ঞাসা করলে মা বলে, জলের স্বপ্ন দেখলে শরীর খারাপ করে। সাপের স্বপ্নে বংশবৃদ্ধি হয়। নৌকোর স্বপ্নে সংসারে দোলাচল সৃষ্টি হয়। অকারণে ঝগড়া, সন্দেহ, উটকো ঝামেলা এই সব।

আমি অধৈর্যের গলায় বলি, কী দেখলে, কী হয় জানতে চাইছি না।

-   তবে? মা আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে অবাক  বিস্ময়ে।

-   টাইম! টাইম! মানে! আমি ধীরে সুস্থে মাকে বোঝাবার চেষ্টা করি, প্রথম রাত না মাঝরাত, নাকি ভোররাত, কোন সময়ের স্বপ্ন বাস্তবে ঠিক ঠিক মিলে যায়?

-   ও, তাই বল! মা যেন স্বস্তি পায়। হেসে বলে, ভোরের স্বপ্ন ঠিক ঠিক মিলে যায়। একটু থেমে বলে, ওই জন্যে ভোরে কোন খারাপ স্বপ্ন দেখলে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই জলভর্তি চৌবাচ্চায় আঙ্গুল ডুবিয়ে জল কেটে দিতে হয়।

প্রথম এবং মাঝরাতে, আমি যে স্বপ্নগুলি প্রায়ই দেখি, অপেক্ষায় থাকি কোন না কোনদিন তারা সময় পেরিয়ে ভোররাতে এসে হাজির হবে। ভোরের প্রসূতি ওই সব স্বপ্নেরা যেদিন সত্যি আসবে ...!

 

 

 

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন