![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
কালো ছায়া
কলেজ স্ট্রিটের এই গলিটাকে যদি কোনও নারী হিসেবে কল্পনা করি তবে তাকে নিশ্চিতভাবেই অসূর্যম্পশ্যা বলা যেতে পারে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, বছরের কোনও সময়ই এই গলিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। এই গলিতে বিরাট বড় এক বাড়ি আছে যা সূর্যালোককে এখানে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। কলেজ স্ট্রিট পাড়ার পুরনো বাড়ি। গলির দু'ধারেই সব পুরনো বাড়ি। পুরু দেওয়ালের। রয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার অফিস, বাইন্ডিংয়ের দোকান, চায়ের দোকান, মা তারার মন্দির। এখানেই একটি প্রকাশনা সংস্থার স্টলের দায়িত্বে আছে নিখিলেশ। একতলায় একেবারে রাস্তা সংলগ্ন। প্রতিদিন দুপুর একটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত স্টল খোলা থাকে। নতুন নতুন যখন স্টলটির দায়িত্ব নিল, ও লক্ষ্য করল শাটার খুলে, স্লাইডিং ডোর খুলে স্টলে প্রবেশের সঙ্গে আরও একটা কিছু যেন ওঁর সঙ্গে প্রবেশ করছে। কিন্তু সেটা কী তা কিছুতেই ঠাহর করে উঠতে পারল না! প্রথমটা ভেবেছিল ইঁদুর। কিন্তু আঁতিপাতি করে খুঁজেও তার হদিশ মিলল না। তাহলে কি বিড়াল? বিড়াল যেমন নিঃশব্দে চলাচল করে, তা হলেও হতে পারে। ক্লিনিংয়ের যে লোকটা আসে -- মুন্না, তাকে দিয়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজায়। কিন্তু কোথায় কী? এ কি ভোজবাজি নাকি? অবশ্য কয়েকদিনের মধ্যেই রহস্যভেদ হয়। বইয়ের তাকে কয়েকটা বই সরাতেই নজরে পড়ে প্রায় হাতের পাঞ্জার সমান মাপের গাঢ় বাদামি রংয়ের একটা মথ। নিখিলেশ বুঝতে পারে এই মথটাই তাহলে ওঁর বিভ্রমের কারণ। কিন্তু ও স্টলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই মথটা কি ঢোকে? যদি এমনভাবে ঢুকে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ওঁর আসার প্রতীক্ষায় বাইরেই কোথাও বসে থাকে। আশ্চর্য ব্যাপার তো! সারা স্টলের আনাচেকানাচে, বইয়ের তাকে, বইয়ের উপরে নিখিলেশ যতক্ষণ থাকে ও-ও থাকে। কখনও কখনও নিখিলেশের টেবিলে রাখা ফাইলপত্তরের পাশে এসে বসে থাকে। দেবব্রত আসেন সপ্তাহে তিনদিন। তিনি নিখিলেশের সহকারী। দেবব্রতও ব্যাপারটা লক্ষ্য করেন, রসিকতা করে বলেন ---‘এ কী? এ কি আপনার সারা সপ্তাহের সঙ্গী নাকি? নিখিলেশ মনে মনে ভাবে -- তা বটে।
তবে কয়েকদিন যাওয়ার পর নিখিলেশ লক্ষ্য করল একটা নয়
--- দুটো মথ এখানে নিয়মিত প্রবেশ করে কিংবা থাকে। থাকার
কথাটা ভাবল এই কারণেই যে সে যখন স্টল বন্ধ করে সে সময় এদেরকে তো বের
হতে দেখে না! কিন্তু ঢোকার সময় তাহলে কিছু একটা ঢুকছে এই
অনুভূতিটা হয় কেন? কী সেই কালো ছায়া? ছোট স্টল। এমন কিছু জায়গা নেই যেখানে আত্মগোপন করে থাকবে। ইঁদুর যে
নেই সে তো মুন্না দেখেছেই, বিড়ালও অসম্ভব। এমতাবস্থায় নিখিলেশ স্থির করল স্টলে ঢুকবার আগে চারিপাশটা
তন্ন তন্ন করে দেখে নেবে, তারপর ঢুকবে। সেটাই করল
কয়েকদিন। কিন্তু সেই একই কাণ্ড! সেই কালো ছায়ার অনুভূতিটা থেকেই
যাচ্ছে। এটা কি ওর মনের ভুল? এই নিয়েই চরম অশান্তিতে পড়ে গেল। বাড়িতে
বউকে বলল ব্যাপারটা। ছেলেকেও। দুজনেই কোনও
গুরুত্ব দিল না। যাইহোক যে দুটো মথ ওর দোকানে ঢোকে ---
একটা গোদা সাইজের, যেটার কথা আগেই বলা হয়েছে, আর একটা ছোট, স্বাভাবিক আকারের, মথ যেমন হয়। দেবব্রত তো ইয়ার্কি মেরে বলেই দিল স্বামী-স্ত্রী
মথ। এটা
ওদের হানিমুন স্পট। নববিবাহিত দম্পতি তাই
নিরিবিলি জায়গা খুঁজছে।
শেষমেশ হাল ছেড়ে দিল নিখিলেশ।
ব্যাপারটি নিয়ে ভাবাই বন্ধ করে দিল। আর সত্যিই এটা নিয়ে ভাববারই বা কী আছে? এদিকে প্রকাশক মহাশয়,
মানে দীপ্তেন্দুদা বাড়ি থেকে ইলেকট্রিক কেটল, এক বাক্স ডিপ টি, চামচ, স্টিলের একটা
পাত্র, গার্বেজ প্যাকেট সব নিয়ে হাজির হলেন একদিন। এখানকার
চায়ের দোকানগুলি কোনওটাই সুবিধের নয়। চা খেয়ে
পোষায় না। অগত্যা এই ব্যবস্থা। শুধু একটা এক্সটেনশন কর্ড কিনে নিতে বললেন। সঙ্গে একটা কাঠের টুল। এই স্টলে বসেই তোফা চা
খাওয়ার বন্দোবস্ত আর কী। দীপ্তেন্দুদার
চা ছাড়া একদণ্ড চলে না, নিখিলেশ আর দেবব্রতরও চা খাওয়ার রাস্তাটা সুগম হয়ে গেল।
এদিকে কালীপুজো এসে গেছে। কলেজ
স্ট্রিট পাড়ায় কালীপুজো নিয়ে হইচই খুব। মধ্য ও উত্তর
কলকাতায় এটা হয় বেশি করে। নিখিলেশদের নতুন স্টলে বেশ বড় চাঁদার
বিল কেটে গেল দুটো ক্লাব থেকে। উদ্ধত তাদের ব্যবহার,
আঙুল উঁচিয়ে কথা বলার ধরন। বাড়িওয়ালা তরুণবাবু আগাম সতর্ক করেই দিয়েছিলেন। দীপ্তেন্দুদা
হাজার খানেক টাকা নিখিলেশের হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি মোকাবিলার্থে। সেই টাকা
দিয়ে যা হোক সামলে নেওয়া গিয়েছে পরিস্থিতি। কয়েকদিন
পরেই নিখিলেশের পুরী বেড়াতে যাওয়ার কথা। কালীপুজোর দিনটা পুরীতে কাটাবে। এই
প্রথম পুরীতে কালীপূজায় থাকা।
পুরীতে যাওয়ার পর এসব নিয়ে আর ভাবনা চিন্তা করাই হয়নি। মাথাতেও আসেনি। একটা অনুবাদের কাজ করছিল, প্রকাশক বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কাজ দ্রুত লয়ে করা সম্ভব হচ্ছিল না নানা কারণে। এমনিতে অনুবাদের কাজ একটু সময়সাপেক্ষ, তার উপরে তড়িঘড়ি করে করা। ধৌলি এক্সপ্রেসে চেয়ার কারে যাওয়ার সময়ও বসে বসে অনুবাদ করেছে। বাড়ি থেকে তৈরি খাবার তো নিয়ে গেছিলই, সঙ্গে ট্রেনে নানা খাবার ওঠে যেগুলোর আকর্ষণই আলাদা, সেসব খেতে খেতে যাওয়া। যে হোটেলে উঠেছিল সেখানেও অবসর সময়ে অনুবাদের কাজ চালিয়ে গেছে।
এবার পুরীতে গেলে হেরিটেজ ভিলেজ রঘুরাজপুর অবশ্যই যেতে হবে, এমন একটা পণ মনে মনে করে নিয়েছিল নিখিলেশ। ওড়িশার পটশিল্প ও গোটিপোয়া নৃত্যের আঁতুড়ঘর এই গ্রাম। কী নিবিষ্ট চিত্তে গোটা গ্রামের মানুষ হস্তশিল্পের চূড়ান্ত মার্গে পৌঁছে কাজ করে চলেছে দিনরাত তা দেখার মতো। গ্রামে ঢোকার মুখেই মূল শো রুম। সেখানে ইংরেজিতে লেখা আছে হেরিটেজ ভিলেজ রঘুরাজপুর -- মাস্টার ক্রাফ্টসম্যান পটচিত্র ওয়ার্কশপ। নানা অবিশ্বাস্য সব কাজ সেখানে দেখল নিখিলেশরা। নিখিলেশ পুত্র রীতেশ তো উত্তেজিত, ওর আবার এসবের দিকে খুব ঝোঁ। কিন্তু ভীষণ দাম এখানে। দেখাটাই সব, কেনাকাটা করতে গেলে ট্যাঁক ভারী না থাকলে মুশকিল। সাধ্যমতো কিছু কেনাকাটা করল ওরা। একটি আর্ট ওয়ার্ক কিনল যেটির দাম আড়াইশো টাকা। জগন্নাথ দেবের প্রতিকৃতি। কারিগরের মুখে এই ছবির বিশেষত্ব শুনল। সেটা এইরকম যে এই ছবি ঘরে থাকলে কোনও কালো অশুভ অদৃশ্য ছায়া কোনওদিন প্রবেশ করবে না ঘরে। বিশেষ কাগজের উপর জৈব রঙে রাঙা ছবিটি। পুরোটাই কালো সাদা রং। মাঝেমধ্যে ঈষৎ বাদামি রঙও আছে। নিখিলেশ ‘জয় জগন্নাথ’ বলে তড়িঘড়ি দুটো কিনে ফেলল, স্ত্রীকে বোঝালো একটা বাড়ির জন্য, অন্যটা বন্ধু অনিমেষকে উপহার দেবে। আদতে কারণটা যে অন্য এবং তা কী, সহজেই অনুমেয়

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন