![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
আইডেন্টিটি কার্ড ৫৯
(১)
প্রতিদিনের মত আলোয় আলো ধরে পথ চলা। রাস্তাটা টার্ন নিয়ে ডানে হেলে এসে মিশেছে ছাগলের মাংসের দোকানের সামনে। একটু আগেই দুটো ছাগল কেটে নাড়ি ভুরি, চামড়া, রক্ত আলাদা করে থরে থরে শিকের পেটের ভেতর আটকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বেশ দূর থেকে রক্ত আর কাঁচা মাংসের গন্ধ নাকে ভেসে আসে। আর ঠিক পাশেই ফুলের দোকান। বাহারী ফুল... এই শীতের ডিসেম্বরের রোদটা গায়ে বেশ লাগছে। ইয়েটেসের ওয়াইল্ড সোয়ান্স অ্যান্ট ফুল কবিতার মতো।
কী কেনা যায়? মাংস! নাকি একমুঠো
ফ্রেশ ফুল! গাঁদা, সূর্যমুখী, ডালিয়া, পিটুনিয়া, ডেইজি, কসমস নাকি গ্লাডিওলাস। এতোসব
চিন্তা করার মাঝেই অন্যরকম একটা জিনিস চোখে ধরে গেলো। সুন্দর, আকর্ষণীয় কিন্তু বিষাদভরা
দুটো চোখ। আর সেই বিষাদ ছেয়ে গেল শরীরের কোণায় কোণায়। কোথায় দেখেছি? কোথায়?
মাংসের দোকানদার পরিচিত। দু সপ্তাহ
পর পর এখানে আসা হয়। সে যত্ন আত্তি করে ছাগলের মাংস দেয়। পিছনের রানের জায়গা, একটু
কলিজা, কিছুটা চর্বি, পাঁজরের কিছু অংশ। কষা মাংস, সাথে রেড ওয়াইন সামনে শীতল রাত আর
জয়েসের প্রেমিকাকে লেখা চিঠি। কিন্তু আজ কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে সব।
(২)
:কতোটুকু নেবেন?
:দেখছি তার আগে বলো তো ঐ যে বিষাদভরা
চোখের মেয়েটিকে তুমি কি চেনো?
:না।
:কেউ কি চেনে?
:তাতো জানি না। তবে আগে কখনো দেখেছি
বলে মনে পড়ছে না।
দূর থেকে দেখছি। কোথায় দেখেছি?
শালা কোথায়? ইদানীং মেমরিটা বড্ড পাল্টি খাচ্ছে। ফুলের দোকানের সামনে যেতেই রাতুল নামে
ছেলেটি বললো, স্যার কোন ফুল নেবেন?
:দেখছি। তার আগে বল তো, ঐ যে বিষাদভরা
মেয়েটা তাকে কি কখনো দেখেছিস?
মাথা নাড়ায় বাবুল। তার মানে বাবুল
চেনে না।
এবার তার কাছে যাওয়া। চুপচাপ আকাশের
দিকে তাকিয়ে বসে আছে, কী নাম তোমার?
:অন্বেষা।
:অন্বেষা কী?
:না, কিছু নেই।
:এখানে এই যে চুপচাপ বসে আছো -
মাথা না মন, কোনটা খারাপ?
:মন খারাপ।
:তার মানে কাউকে ভালোবাসো। কাকে?
সে মাথা নাড়ায়
একটা ব্যাগের ভেতর থেকে একটা ফটো
বের করে। বেশ ধূলো জমেছে। ওড়না দিয়ে মুছে তারপর দেখায়।
:আরে আশ্চর্য! এতো আমি! রনজিৎ দাশ!
তুমি কি আমায় ভালোবাসো?
:না।
:তাহলে?
:খিদে লেগেছে খুব।
(৩)
এবার হাঁটতে থাকে রনজিৎ। চোখে জল টলমল অন্বেষার, কিন্তু গড়িয়ে পড়ছে না। কোথায় দেখেছে শালা মনে করতে পারছে না। মেমোরিটা ঠিক মতো কাজ করো না। বনরুটি একটা ওয়ান টাইম গেলাসে কড়া লিকার আর বেশি করে চিনি দিয়ে দুধ চা নিয়ে আসে। অন্বেষার হাতে দিতেই নিমেষেই খেয়ে নেয়। আর আসার সময় জলের যে বোতলটা নিয়ে আসে, সেটা হাতে দেয়। জলের কিছু অংশ গলায় ঢালতে থাকে।
সোফিয়া লরেন গ্রেগরি পিকের সাথে
ভিক্টর সিকা। তখনি বলে, যাকে ভালোবাসি তার নাম তাপস। আর আপনার নামটা জানি রনজিৎ।
:ঠিক।
কিন্তু দুজন মানুষ তো একরকম। এবার
মিষ্টি কোমল কিন্তু মুখের বিষণ্ণ রঙয়ের ভেতর দিয়ে এক পলক তাকাল। তারপর বললো, আজ ডিসেম্বরের
দশ তারিখ। ঠিক বিশ দিন পর খুব ভোরে এখানে আসবেন। তার আগে প্রতিদিন একটা করে আঙুল কাটতে
হবে নিমগাছের নিচে বসে।
:আঙুল?
:হ্যাঁ।
:নিমগাছের নিচে বসে প্রতিদিন একটা
করে আঙুল... প্রথমে বাম হাত। তারপর বাম পায়ের। তারপর ডান পায়ের। একদম শেষে ডান হাতের।
(৪)
৩১ ডিসেম্বর খুব ভোরে সূর্যের আলো তখনও মাটিতে নামেনি। আবছা কুয়াশায় দেখা যায় বোকা চেহারার জল টলমল বিষণ্ণ মেয়েটি বসে আছে। অন্বেষা কি বলবে? এই বিশ দিনে তো রনজিৎ বুকের মধ্যে অন্য কিছু অনুভব করছে। মুন্নি বদনাম সেই গানও বেশ কয়েকবার দেখেছে, আবার হেমন্তের ফুলেশ্বরী ফুলেশ্বরী তোমার নাম গানটা কয়েকবার শুনেছে।
কাছে যেতেই অন্বেষা একটু একটু করে
অদৃশ্য হতে থাকে। ঠিক এক বছর পর আবার দেখা হবে। তার আগে রনজিৎ দাশ আপনার প্রতিটি পাঁজরের
হাড় চাই। রহস্যময়ী সোফিয়া লরেন সানফ্লাওয়ার ছবির মতো ফুলের গন্ধ ভেসে আসে সাথে মাংসের
ঘ্রাণ। অদৃশ্য কুয়াশার ছোঁয়া। প্রশস্ত হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরতে গেলে ধাতব শব্দে বিষণ্ণতা
ভেঙে ভেঙে খান খান হতে লাগলো।
আর তখনই দেখা গেল চারটি চকমকি পাথর।
ক্রমাগত মাদকের নেশায় ডুবে যাওয়ার মতো আত্মা টেনে টেনে নিয়ে চলেছে। আর পরিচয় পত্রের
নম্বর কিন্তু ৫৯।
:কয়টা পাঁজরের হাড়?
দূরে দেখা গেল অন্ধলোক ছড়িতে আঙুল
দিয়ে কী যেন পরখ করছে...
(৫)
ব্যাভিচার নেই, পরকীয়া নেই, সমকামিতা নেই ভদ্দরনোকের সমাজ। ঠিক পিছনে কালো পোশাক পরা আটজন লোক ধীরে ধীরে লাইন তৈরি করে। একটি রিকশা, চেক পয়েন্টের ব্যারিকেড, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাহিনী সাথে পুড়ে যাওয়া ছায়ানটের অংশ। আলো আর শরীরের ঘ্রাণ বাজনা বাজাচ্ছে কেউ।
আলিঙ্গন শিস দেওয়ার সময় শালা সব
বেলুনের মতো চুপসে যায়। গিন্সবার্গ আর বুকোওস্কির মদের বোতলের মতো পেইন্টিংয়ের গন্ধ।
ফুলের গন্ধ আর মাংসের গন্ধ নাকে আসে। অন্বেষা আর সেই অন্ধ লোকটিকে দেখা যায়। অন্বেষা
কাছে এসে কিছু না বলেই রনজিৎকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে যায়। তারপর ঠোঁটে গভীর চুমু। অন্ধ
মানুষ কি যেন বলতে চায়। বুকের গভীর থেকে একটা কিছু বের করে। তার আগে পাঁজরের হাড় গুনে
নেয়।
কি লেখা আছে কার্ডে। কার্ডটার সাথে
কিছু ফুল, দুই টুকরো কষানো খাসির মাংস আর একটা চিরকুট। তারপর অন্ধ লোকটাকে ছড়ি ঘোরাতে
ঘোরাতে অন্বেষাকে টেনে টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
রনজিৎ প্রথমে চিরকুটটা পড়ে, তাতে লেখা তোমাকে খুব ভালোবাসি। তারপর কার্ডটা বের করে তাতে লেখা রনজিৎ দাশ, লাশ নম্বর ৫৯। ডোন্ট স্টপ ইটস ফাইন ডার্লিং।
কষানো খাসির মাংসের টেস্টটা মন্দ
নয়!

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন