সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

অম্লান বোস

 

সমকালীন ছোটগল্প


দুঃস্বপ্নটা ভেঙ্গেই গেল

আর সহ‍্য হচ্ছে না। দিন দিন আরুষ বদলে যাচ্ছে। আজকাল আর অফিস যাবার সময় আদেখলের মত জড়িয়ে ধরে কাঁধে, গলায় নাক মুখ ঘষে না। বাথরুমে ঢুকে ইচ্ছে করে ফেলে যাওয়া তোয়ালের জন‍্যে হাত  বাড়িয়ে আমাকে ভেতরে টেনে নিয়ে কেলেঙ্কারী করার অভ‍্যেসটা বন্ধ। বেড টি নিয়ে গেলে হঠাৎ করে বুকে টেনে চুমায় চুমায় বিপর্যস্ত করা নেই। তার ওপর প্রায়ই অফিস থেকে দেরী করে ফিরছে, মুখে অ‍্যালকোহলের গন্ধ। বাড়িতে থাকলে সময়ে অসময়ে ফোন আসে, হাবভাব দেখলেই বোঝা যায় এসব অফিসের ব‍্যাপার নয়।

আমার সহিষ্ণুতা সীমা ছাড়াচ্ছে। কলেজে ব‍্যাডমিন্টন চ‍্যাম্পিয়ন, নাটক নৃত্যনাট‍্যে অবিসংবাদী নায়িকা আমি। সুন্দর চলছিল আমার, নাচ গান বন্ধুবান্ধব নিয়ে। মোড়টা ঘুরে গেল যেদিন হঠাৎই সোমদত্তা আমাকে মধুসূদন মঞ্চে একটা একক গানের অনুষ্ঠানে নিয়ে গেল। আরুষ চ‍্যাটার্ন, ওর পিসতুতো দাদা - অসাধারণ কন্ঠস্বর, সরগমের সিঁড়িতে অনায়াস ওঠানামা, অসামান‍্য দখল ব‍্যাকরণে, গলায় সোনার চেন, অনামিকার আংটিতে হীরে ঝলকাচ্ছে, ধুতি পাঞ্জাবিতে পুরোপুরি নায়ক।

অসংখ‍্য অনুরাগিনীদের জাল কাটিয়েই সোমদত্তা আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল গ্রীণরুমে। আমি ভেসে গেলাম। ঘনিয়ে এলো আমার সর্বনাশ।

“চলো, তোমার সঙ্গে একটু ভাল করে আলাপ করা যাক্!” দিন দশেকের মাথায়ই ফোনে বললো আয়ুষ, সে বলেই বলতে পারল - আত্মপ্রত‍্যয়ে ভরপূর। অমোঘ আকর্ষণ ছিল ওর অভিব‍্যক্তিতে। যে কথায় আমার জিভের ডগায় বিষ হিসিয়ে ওঠার কথা, সেই অপ্রীতিকর কথাটাতেই আমি চট্ করে রাজি হয়ে গেলাম। গঙ্গার পাড়ে ‘রিভারেট’ রেস্তোরাঁর দোতালায় জানলার পাশে বোনলেস ফ্রায়েড চিকেনের টুকরোটা র‍্যাঞ্চের বাটিতে ডুবিয়ে মোচড় দিয়ে মুখে তোলার আগে, পশ্চিমের সিঁদুরে আকাশের দিকে তাকিয়ে কথাটা হাল্কা করে ছুঁড়ে দিল -

“ঐ রঙটা তোমার কপালে দেখছি না তো?”

“আমার অস্ত যাবার সময় হয়েছে মনে হচ্ছে না কি আপনার?”

“শেষ না হলে নতুনের পালা তো শুরু হয় না পর্ণিকা ম‍্যাডাম। আমি তো ঐ শুরুর অপেক্ষাতেই থাকব।”

সেই শুরু। শেষপর্যন্ত গিয়ে ঠেকলো সাতপাকে। তারপর তিন বছরে অনেক দোলাচল পার করলাম। অতো সব রূপসুন্দরীদের মধ‍্যে থেকেও আমার মত সাধারণ নন্দিনীকে তুলে নেওয়াতে আমার প্রচ্ছন্ন নিরুত্তাপ অহঙ্কার … অন্ধকারে হারিয়ে গেল। অসংখ‍্য বেহায়া বান্ধবীদের সহ‍্য করেও আমি ওকে ভালবেসেছি - দুরন্ত আবেগে। যে বাড়িকে তিলে তিলে স্বপ্নমঞ্জিল করে তুলেছিলাম, আয়ুষের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের ঝোড়ো হাওয়া সেই বাড়ির খাঁচা ভেঙ্গে দিল, আমাকে বেরিয়ে আসতেই হল।

যে বিছানা শেয়ার করে আমি আয়ুষের পৌরুষের স্বাদ শুষে নিতাম, যে খাবার টেবিলে খুনসুটির অন্ত থাকতো না, যে খোলা টেরাসে আমরা ওয়াইনের গ্লাস হাতে অঝোর বৃষ্টির গান গেয়েছি, সে সবই এখন লিভ্-ইন পার্টনার এরিনার দখলে। আমার ছায়া একেবারেই মুছে গেছে। এখন আমি পেয়িংগেস্ট্ - যে কোন দিনই ডিভোর্সের কাগজ সাইন করতে হতে পারে।

খুন করবো ঐ এরিনাকে, এত সহজে হার মানবার পাত্রী আমি নই। ঠান্ডা মাথায় ফোন করলাম আয়ুষকে, ধরলো এরিনা।

“কেন বিরক্ত করো বলো তো? সোজা ব‍্যাপারটা বুঝতে পারছো না কেন, তোমার কোন অস্তিত্ব আমার বাড়িতে নেই, কোথাওই নেই। এখানে কোন দামও নেই তোমার, জানো না? আবার যদি আমাদের শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা করো - আমি পুলিশকে রিপোর্ট করব কিন্তু!”

‘আমার’, ‘আমাদের’ শব্দ দুটোতে অনাবশ‍্যক ঝাঁঝ।

একবার নয়, বারবার একই ভাবে আমাকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে অপদস্ত করছে আমাকে।

শেষ করবো ওকে - মাথায় রক্তের চাপ উর্ধ্বমুখী, বাড়ছে এ‍্যাড্রিনেলিনের দাপাদাপি। ওর স্টুডিওতে ফোন করেছিলাম, আয়ুষ কয়েকদিনের জন‍্যে মুম্বাই গেছে শুনলাম রেকর্ডিং-এর কাজে।

ঠান্ডা মাথায় সিল্কের দড়িটা নিয়ে নিলাম আর ক্লোরফর্মের ছোট্ট শিশিটা। হাতে রবার গ্লাভস্।

মোড়ের পানের দোকানটা পার হলাম, বাঁজা কৃষ্ণচূড়াটা একই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে হাল্কা হাওয়ায় ঝিরঝির করছে। সন্ধ‍্যের অন্ধকারে আমাদের বেডরুমের জানলা দিয়ে আমার পছন্দের আবছা নীল আলোয়, আমারই টানানো নরম সবুজ পর্দা আঁচল ওড়াচ্ছে।

সেই সিঁড়ি দিয়েই উঠছি আমি, ল‍্যান্ডিংএ গণপতি বাপ্পার সহাস‍্য মূর্তি, ডানদিকে দেওয়ালে সেই রংচটা প‍্যাচটা এক রকমই আছে। সিঁড়ির পাশে দেওয়ালে ধ‍্যাবড়ান গতবছরের হোলির হলুদ রং একটু মলিন, এমন কি - দরজার বাইরে নামের কাঠের ফলকটাও অবিকৃত। মনে হচ্ছে এবার ভেতরে ঢুকেই শপিং ব‍্যাগটা রেখে সোফাতে গা এলিয়ে শুয়ে পড়বো।

কলিংবেলে চাপ দিলাম - অনাবশ‍্যক দীর্ঘ সময় নিচ্ছে এরিনা, প্রবল উত্তেজনায় ফুটছি আমি, কপালের রগদুটো দপ দপ করছে। বুকের ভেতরের হাতুড়ি এখন গলার কাছে। ফ্ল‍্যাটের ভেতরে উদ্দাম বাজনার উদ্বেল ডেসিবল্ একটু যেন থমকে গেল। দরজাটা ঝটকা দিয়েই খুলে গেল।

চিলতে স্লিভলেস মেরুণ ব্লাউজের বোতাম খোলা, হাল্কা হলুদ শাড়ির আঁচল স্থানভ্রষ্ট হয়ে লম্বা হয়ে মার্বেলের মেজেতে লুটাচ্ছে, অন‍্যদিকটা অবশ হাতের মুঠোয় কোনরকমে আটকে ধরা, কপালের ধ‍্যাবড়ানো মেরুণ টিপ আর চোখের মাস্কারার কালো মাখামাখি - টলমল করছে নেশার ঘোরে এরিনা।

ওকে জাপটে ধরে সোজা দাঁড় করিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে বাড়ির পরিচারক মনোহর সিং।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন