![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
দেওয়াল লিখন
থমথমে দিন তখন, তখন চারিদিকে অনিশ্চয়তা। সাঁই সাঁই করে গুলি ছুটছে, ছুটছে বোমার স্প্লিন্টার, পথে কোনো মাংসল শরীর পেলে সেঁধিয়ে যেত তার মধ্যে। বাড়ি থেকে কেউ বেরোনো মাত্র দুশ্চিন্তার শুরু, ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বস্তি নেই। সীমা প্রাণপণ শক্তিতে টেনে ধরে রাখত অমলকে, বলত, "যাস নে দাদা, যাস নে"। একদিন সে ভুল করেছিল, আর সেই ভুলটুকুর সুযোগ নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল অমল। কে যেন টানছিল বাইরে। ভাগ্য নির্দিষ্ট হয়ে থাকা যে গুলিটা এতদিন ওত পেতে বসে ছিল, সে ছুটে এসে অমলের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে ঢুকে রক্তে ভিজতে লাগল। এটা সেই গুলিটা নয় যার কথা অমলের কবিতায় ছিল, "সেইটাই শেষ গুলি হোক / আমার বুকের ভিতরে যেই যাবে / অমনি মৌন হবে বাকিরা সকলে / সকল বন্দুক…”
চুপি চুপি শ্মশানে গিয়েছিলাম আমরা ক'জন। সীমাও ছিল। বিশ্বাস ছিল না, শ্মশানযাত্রীদের জন্য মৃত্যু মকুব করা ছিল কিনা। নিঃশব্দে জ্বলে উঠল চিতা। বেলা তখনো পড়ে আছে ঢের। যে যেখানে পারল ছায়ায় আশ্রয় নিল। সীমাকে ডেকে আনলাম, "আয়, ছায়ায় বসে জিরিয়ে নে কিছুক্ষণ! কতক্ষণ আর রোদে দাঁড়িয়ে থাকবি?" সীমা বলল, এ তো শুধু রোদ, দাদা তো দিব্যি আগুন সইছে!" বললাম , "ও যা পারে আমরা তা পারি না"। সীমা বলল, "না, চোখে চোখে রাখতে একদিন ভুল হয়েছিল বলে দেখলে তো কী কাণ্ডটা ঘটে গেল! আবার যদি কিছু হয়!" শক্ত করলাম নিজেকে, বললাম, "আর কিছু হওয়ার নেই, আয়"।
অনেক জোর করার পর সোমা এলো। নিয়ে বসালাম ছায়ায়, গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার পথে যেখানে বসার জায়গার মাথার উপরে কংক্রিটের ছাদ। হঠাৎ উল্টোদিকের দেওয়ালে কী যেন দেখে সে লাফিয়ে উঠে ছুটে গেল সেই দিকে। বলল, "দেখেছ তাপসদা, দাদার হাতের লেখা!" দেখলাম ভাল করে, আমারও তাই মনে হলো। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, "তোর ভুল হচ্ছে না তো?"
-- কী বলছ তুমি তাপসদা? আমি চিনব
না দাদার লেখা? আগে কেমন ছিল, পরে কেমন হলো সবটা আমি জানি। কত কথা বলেছি এ নিয়ে! নিজেও
কতবার চেষ্টা করেছি নকল করার। তাছাড়া ঐ তো নাম লেখা রয়েছে নিচে, অমল ম্যুৎসুদ্দি।
আবার দেখলাম। সত্যিই নাম লেখা আছে
নিচে। উপরে লেখা আছে, "সমীর তোকে ভুলছি না, ভুলব না"। নিচে নিজের নাম আর
তারিখ, বারোই ডিসেম্বর, উনিশ শো উনসত্তর। সীমা কোথা থেকে একটা ইটের টুকরো কুড়িয়ে এনে
সেই লেখার তলায় লিখতে শুরু করল শেষ হলে সেই
অক্ষরগুলোর উপর সেই ইটের টুকরো দিয়ে চেপে চেপে ঘষে ঘষে পুরু করল সেই অক্ষরগুলো।
"দাদা, তোকে কে মনে রাখবে?
কেবল আমিই? ভাল থাকিস।" নিচে নিজের নাম, সীমা ম্যুৎসুদ্দি।
বেশ কিছু পরে যখন গঙ্গায় অস্থি
বিসর্জন দেওয়ার জন্য সেই পথ দিয়ে আবার যাওয়া
হচ্ছিল, সীমা তাকিয়ে দেখল সেই দেওয়ালের দিকে। তার নিজের লেখার নিচে কারো আরেক জনের
লেখা। চোখ সরিয়ে নিয়ে যেমন চলছিল তেমন চলতে থাকল। গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে এসে ফেরার
পথে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাকিদের বলল এগিয়ে যেতে। বলল সে পিছনে পিছনেই আসছে। আমায় অবশ্য
চলে যেতে বলল না। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সেই লেখার দিকে। অতক্ষণ মোটেও লাগে না
ঐটুকু লেখা পড়তে, তবু তাকে তাকিয়ে থাকতেই দেখা গেল। লেখা ছিল, "আমি মনে রাখব অমলকে,
চিরদিন মনে রাখব"। তার তলায় লেখা, "অমল তোকে ভুলছি না, ভুলব না"। তার
নিচে নাম লেখা, তাপস মালাকার, সাতাশে এপ্রিল উনিশ শো সত্তর। সীমা আমার দিকে তাকাল।
জিজ্ঞেস করল, "সত্যিই মনে রাখবে? কথার মর্যাদা রাখতে হলে বেঁচে থাকতে হয়, যে করেই
হোক বেঁচে থাকতে হয়। থেকো কিন্তু! নিজেই ফুরিয়ে গেলে ঐ শপথের আর দাম কী?" বললাম, "থাকব বেঁচে, চল যাই"!

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন