![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
বাদল মেঘের ছায়া ঘনায় সে আসে
বন্ধুরা সুযোগ পেলেই ওর পেছনে লাগে। খেপায় ওকে। বলে তোর দ্বারা কিস্যু হবে না ঋতম! আমাদের গ্রুপে আর রাখতে পারছি না তোকে! ঋতম মুখটিপে হাসে ওদের লম্ফঝম্ফ দেখে। বলে, ঠিক আছে আমি বেরিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তোরা থাকতে পারবি তো আমায় ছেড়ে? আমিও কি পারবো? সবাই গুটিয়ে যায়। আসলে দলটা ওদের সাতজনের। একসাথে এক অফিসে কাজ করতে করতে কখন যেন একসাথে হয়ে গেছে ওরা। মনের বাঁধনে। বিপ্লব দীপ্ত সৌম্য সায়ন্তনী স্বাতীলেখা তীর্থা… পঁচিশ ছাব্বিসের তাজা প্রাণেরা কীভাবে যে একটা সুতোয় গিঁঠেগিঁঠে জড়িয়ে গেছে! তাদের মধ্যে সপ্তমজন ঋতম। ওদের সাথে যুক্ত হয়ে এই শান্ত ছেলেটার কী যে সুখ! ওই ভয়াল মহামারীর লকডাউনের সময়কার বিভীষিকার সময়ে এরা না থাকলে কী যে করতো ঋতম! আসলে ঋতমই একমাত্র যে অন্য শহর থেকে ডাইরেক্ট এসেছে কলকাতায় চাকরি নিয়ে। বাঙালি হয়েও তেমনভাবে কলকাতার টাচে থাকা হয়নি ওর। অবশ্য মুম্বাইয়ের প্রবাসী বাঙালিদের ঘিরেই ওর বেড়ে ওঠা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, গান, কবিতা, ভালোবেসে ওর অর্জন প্রথমে ওর ক্যালকেসিয়ান মায়ের কাছ থেকেই। এরপর যত বড় হয়েছে, এই ভালোবাসা বিস্তৃত হয়েছে আরও নতুনতরতে, আরও এগিয়ে আসা আধুনিক সৃষ্টির সাম্রাজ্যে। নিজের মতো করে। প্রবাসী বাঙালিরা যেখানেই যাক, ঠিক নিজেদের একটা কম্যুনিটি, ক্লাব, দূর্গামন্ডপ তৈরি করে নিয়ে জাঁকিয়ে বসবেই। আর সেসব ঘিরে নাটক নাচ গান রবীন্দ্রচর্চা, শান্তিনিকেতন তাদের মজ্জাগত অভ্যাস। সেই সার্কেলে মায়ের সাথে ঋতমও জড়িয়ে পড়েছিল ছোট বয়েস থেকেই! এভাবেই বাংলা ওর মজ্জায়। গান ভালোবেসে বাংলা গানের সঙ্গে আত্মীয়তা। বাকী ছ’জন বন্ধু কিন্তু পিওর কলকাতার! ডিগ্রীটাও ওদের কলকাতা ইউনিভারসিটি থেকেই অর্জন করা। সেদিক থেকে ঋতম ওদের দলে বহিরাগত। কোলকাতায় আজকাল ‘বহিরাগত’ শব্দটা বেশ চলছে। মুম্বাই শহরের ছেলে কিভাবে যে মিশে গেলাম ওদের সাথে ভাবতে বসে ঋতম বুঝতে পেরেছিল আসলে মনের বাঁধনের সুতোটার ক্যারিশ্মাই ওদের এক সাথে বেঁধে নিয়েছে। নিজেকে এখন আর একটুও বহিরাগত মনে হয় না ওর। ওরাও ঋতমকে আপন করে নিয়েছে কয়েক মাসের মধ্যেই। তারপর তো বেশ কয়েক বছর হল এদের সান্নিধ্যে! প্রত্যেক উইকএণ্ডের ছুটির দুটো দিন ওদের অবধারিত আড্ডার দিন। তবে আড্ডাটি ওদের বড় ক্রিয়েটিভ আড্ডা। কলকাতার আশেপাশে প্রকৃতির বুকের ভেতর কোনও লজ অপেক্ষা করে থাকে ওদের জন্য। টানা পাঁচদিনের একঘেয়ে কাজের হাবিজাবির মধ্যে থেকেও নিজেদের লেখা কবিতা, গান, গানের সুর, ক্যানভাসের আর্ট সেদিন সারাদুপুর উপুড়করে উপভোগ করা ওদের অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। আবার সকলের শিল্পকর্মের রীতিমত টেবিল চাপড়ানো আলোচনাও চলে। তখন কে বলবে ওরা শুধুমাত্রই একেকজন প্রযুক্তিবিদ! আসলে এই আড্ডাগুলো ওদের আগামী সপ্তাহের হাড়ভাঙা কাজের ফুয়েল। এইভাবে সংস্কৃতির শহর কলকাতার বুকের ভিতরকে চিনতে পারা। কত যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে গ্রাম দিয়ে ঘেরা কলকাতা শহরের শিরায় শিরায়! এতদিন এই শহরে থেকেও যা ওদের তেমনভাবে জানা হয়নি! বাংলার এই শহরকে মনের মতো করে আবিষ্কারের নেশা ওদের গ্রুপের সকলের রক্তে। এইসব আনন্দপ্রহর যাপন থেকে বাদ পড়লে ঋতমের আর থাকলো কী! ওদের মনের একতারায় যে নতুন সৃষ্টির তরঙ্গ বাজে, তাই নিয়েই তো ওদের সাতজনের সুর ‘সুর বনে হামারা’— হয়ে যায়!
ঋতম বলে, দে আমায় ডিলিট করে! সৌম্য
গম্ভীর হয়ে বলে, তবে আমাদের কথা শোন, করবো না ডিলিট। আমাদের মধ্যে তুই শুধু একলা। আমাদের
সহ্য হচ্ছে না বস্। কেন একলা কেন, ঋতম বলে, তোরা আছিস না? আমায় কি কাব্য করে তোদের
জানাতে হবে, ‘আমি তোমাদেরই লোক!’ আর ফিঁয়াসের কথা বলছিস! প্রেমিকা কি এরকম ধরে বেঁধে
টেনে হেঁচড়ে গেঁথে পাওয়া যায়! এই ব্যাপারে তোদের সকলের বুঝি টানা-হেঁচড়ানোর এক্সপিরিয়েন্স
আছে? উলটো প্যাঁচে পড়ে কোরাসে হাসি বেজে ওঠে লজের ঘরে। কোরাস শান্ত হলে ঋতম মিষ্টি
হেসে বলে, লগ্ন। বুঝতে পেরেছিস! একটা পারফেক্ট লগ্ন চাই বন্ধুগণ! যে পরম লগ্নে মনে
মনে গ্রন্থি বাঁধে দুটো মন, মানে বাঁধে নয়, আপনিই গোপনে গিঁঠ বেঁধে যায়, সেই লগ্ন এলেই
প্রেম প্রেমিক প্রেমিকা সব। অজান্তেই। আগে আসুক সে লগ্ন! আসতে দে তাকে! এই লগ্নটাই
আসল! সবুর কর। সৌম্য ওর মাথায় চাঁটি মেরে বলে, খুব পাকা পাকা কথা শিখেছো তো হে বালক!
হাল্কা হেসে ঋতম বলে, আরে বাঃ! এ কেমন কন্ট্রাডিক্টারি কথাবার্তা তোদের! এদিকে আমাকে
বালক বলছিস, আবার প্রেম প্রেমিকা লাভএ্যাফেয়ার্স নিয়ে সেই বালককে হেনস্তা করে গ্রুপ
থেকে ইররেজ করার হুমকি দিয়ে, যা তা করছিস!!
সৌম্য বলে, তা কোন ফ্র্যাকশন অফ মোমেণ্টে এই লগ্নটি আসবে তোমার বস্! আরও কতদিনের
অপেক্ষা! যতদিন সে না আসে— ঝাড়াঝাপ্টা উত্তর ঋতমের।
গলায় গাম্ভীর্য এনে বিপ্লব বলে,
আমাদের বান্ধবীদের মধ্যে কতজন তোর গুণগ্রাহী আছে জানিস! সো, বি কুইক ঋতম! না’হলে কবে
কার প্রেমিকা কখন পিছলে তোর হয়ে যাবে ভেবে আমরা ভয়ে ভয়ে থাকি, তুই জানিস না। মনের ঘর
এত পিছল তোদের? ঋতমের প্রশ্নে ঠেকা খেয়ে হাঁসির তুফানে ভেসে যায় লজের একটিমাত্র ঘরের
আসন্ন সন্ধ্যার মায়াবী মুহূর্তগুলো। সারাদিন ওই একটা ঘরেই আড্ডা জমে ওদের।
-আমার গুণগ্রাহী মানে? ঋতমের দ্বিতীয়
প্রশ্ন। ঋতমের প্রশ্নচিহ্নে ঝাঁপিয়ে পড়ে দীপ্ত বলে, মানে বোঝোনি চাঁদু! বার বার শুনতে
চাচ্ছ নিজের গুনপণা? তারপর কাব্য করে বলে, তোর শিল্পীত অঙ্গণ যে তোকে ঘিরে আলো আলো
হয়ে থাকে সবসময়! খবর কি রাখিস না! তোর লেখা, আঁকা, গানে সুর দেওয়া, গীটারে তোর হাতের
যাদু! বিপ্লব বলে, আরও আছে, বলছি না সব। তীর্থা ঋতমের কুন্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে
বলে, সত্যি ঋতম, এতকিছু একসাথে সামলাস কী করে রে? ছেলেদের পক্ষে আবার হৈ হৈ। সৌম্য
নাটকীয় স্বরে বলে, তোমার লাগেজ সামলাও বিপ্লব! বিপ্লব তীর্থার দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে,
সইতে পারবো না রে তীর্থা! প্লিজ! দয়া কর, বলে হাঁটু গেড়ে বসে তীর্থার সামনে। ওদের ড্রামাবাজী
দেখে ঋতম বলে, আচ্ছা, বেশ! বলছি। সামলাই কি দিয়ে জিগ্যেস করছিস তো? এতকিছু সামলাই শুধু
ভালোবাসা দিয়ে। এগুলোই আমার ভালোবাসা রে! এবার বিপ্লব প্রায় বিপ্লবী হয়ে ওঠে। বলে,
না না এ্যাবসট্রাক্ট নয়, মূর্তিমতি ভালোবাসার কথা বলছি। উহু! মূর্তি টুর্তি নয়, সচল—ফোড়ন
কাটে সৌম্য। ধুত! কী বললাম এতক্ষণ! প্রেম ধরে বেঁধে টেনে গেঁথে বেঁধে বুঁধে হয় না।
বলেছি না লগ্ন চাই! পারফেক্ট লগ্ন। যে লগ্নে মুহূর্তে মনে মনে গোপনে গ্রন্থি বেঁধে
ফেলে দুটো মন! আরে আসুক সেই লগ্ন! তাকে আসতে দে! সবুর কর! গলা চড়ায় ঋতম। তো তোমার সেই
গ্রন্থিলগ্ন কবে কোন মোমেন্টে আসবে? আরে! সে কি বলে কয়ে আসে! গহন বনের ছায়া ঘনায় সে
আসে, আমি বসে আছি তারি আশে… গুন গুন করে ওঠে ঋতম। সকলের চোখ ছানাবড়া! সায়ন্তন লাফিয়ে
ওঠে, ওরে ফাদার! চোরি চোরি চুপকে চুপকে! হঠাতই ভরা গলায় ঋতম গেয়ে ওঠে, “আমার এ ঘর বহু
যতন করে / ধুতে হবে মুছতে হবে এরে / আমারে যে জাগতে হবে কি জানি সে আসবে কবে / এই নিরালায়,…”
স্তব্ধ স্বাতীলেখা এতদিনের শোনা গানকে নতুন করে শোনে ঋতমের গলায়। শোনে অপার্থিব এই
শব্দসুর, জোড়া দেয়। তন্ময় হয়ে রয়। আর সেই মুহূর্তেই স্বাতীর চোখজোড়ায় জ্যোস্নাধোয়া
বিমূর্ত একটা মন্দির দেখতে পেয়ে যায় ঋতম। সেখান থেকে ধুপের গন্ধ, জুঁইফুলের সুবাস।
সম্মোহিত করে দেয় ঋতমকে। ঋতম হারিয়ে যায় কোন এক মগ্ন চৈতন্যে।
* * *
বেশ কিছুদিন ধরে এরকমই হচ্ছিল ঋতমের। যেন ওর আঁকার নিসর্গপ্রকৃতি স্বাতীলেখার চোখের আয়নায় দেখতে পাচ্ছিল ও। অনন্যসাধারণ হয়ে উঠছিল ওর ক্যানভাসচিত্র। দেখার ওপারে এক অন্য দেখা। গানের ল্যিরিকে লাগছিল অপার্থিব সুরের মেলোডি! ওর সকল কাজের প্রহর রেঙে উঠছিল মায়াবী আলোয়। কেউ কি লক্ষ্য করেছে তার এই পরিবর্তন! মনের গভীরে কম্পন জাগে ঋতমের। কম্পনেরা জানায় কিছু একটা গড়ে উঠছে ওর মনে মনে, গানে গানে, লেখায় ভাষায় আর সর্বাঙ্গে। কাজে-অকাজে সেই কম্পন কড়া নাড়ে। ফোন খুলতেই ওর শেষ কথার রেশ ধরে এ.আই জেমিনি সরাসরি ওকে প্রশ্ন করে, কেমন আছ ঋতম? আনমনা তোমায় পেয়ে বসেছে কি! ঋতম অবাক হয়ে ভাবে যন্ত্রও কি তবে এসব বোঝে! যন্ত্র থটরিডিংও জানে!
ওদের এবছরের লঙ ট্যুরটা হতে যাচ্ছে
ইউ.পি’র লখনৌ ইলাহাবাদ। এই ট্যুরগুলো ওদের একটা শখ কাম আবিষ্কারের নেশা। একটু একটু
করে সারা ভারতকে আবিষ্কার। লম্বা ছুটিতো খুব একটা জোটে না এই পেশায়। হয়তো শনি-রবির
লাগোয়া আর একটা-দুটো ছুটি কপালজোরে লেগে গেলে সাথে আর দুটো দিন ছুটি জুড়ে নিয়ে এই অণ্বেষণ।
সে দেশের সঙ্গীত শিল্প সাহিত্য নৃত্যকলা নাটক ফোককালচার যতটা পারে দেখে, আত্মস্থ করে
ওদের আনন্দ। এইখানে এই সাতটি মনের তার ও তরঙ্গ এক টিউনে বাঁধা।
চোস্ত গাইডের গল্পে মুগ্ধ হয়ে আছে ওরা। আজ এসেছে লখনৌ শহরের বড়া ইমামবাড়া দেখতে। বড়া ইমামবাড়ার ওপরের তলায় বানানো এক জটিল ও রহস্যময় গোলকধাঁধা ‘ভুলভুলাইয়া’ দেখার গোপন রোমাঞ্চ ওদের চোখে-মুখে। এই ভুলভুলাইয়া ঘিরে কত যে অ্যানেকডোট গাইডের ঝুলিতে! ১৭৮৪ সাল, মানে প্রায় আড়াইশতকের কাছাকাছি পুরনো এই নির্মাণ। ইতিহাস বলছে, ওই সালে এক ভয়াবহ দূর্ভিক্ষের সময় নবাব আসফউদ্দৌলা সাধারণ মানুষকে টাকা উপার্জনের সু্যোগ করে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রায় একদশক ধরে চলেছিল এই নির্মাণ। বিশাল কর্মকান্ডের মধ্যে একটি রহস্যময় নির্মাণ এই ভুলভুলাইয়া। মানুষ হারিয়ে যেতে এত ভালোবাসে! সেই সময়কার এক কর্মব্যস্ত নবাব হয়েও! ঋতম ভাবে, এই দুনিয়াদারীর শতেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাঁপিয়ে পড়ে হয়তো নিজেকে নিয়ে মাঝে মাঝে হারিয়ে যেতে চাইতেন নবাব! গাইড বলছে হারিয়ে যাওয়ার গলিতে নাকি প্রেমিকাদের সাথে নবাব লুকোচুরি খেলেতেন! রোমান্টিক, নো ডাউট! কী আশ্চর্য রোমান্টিক চিন্তা-ভাবনা সেকালের নবাবদের!
ভ্রমণে বেরোবার আগের সপ্তাহের গেট-টুগেদারে নবাবদের প্রেম নিয়ে কথাপ্রসঙ্গে সায়ন্তনী চোখ মিচকে বলেছিল, পঁচিশ পেরিয়েও একটা প্রেম করতে পারলি না ঋতম, তুই আবার নবাবী প্রেমের কী বুঝবি রে! ভোঁদু একটা! তোর কিস্যু হবে না। স্বাতী তখন দার্শনিকের মতো বলেছিল, প্রেম করতে হয় না রে, প্রেম হয়ে যায়। কখন কেমন করে যে হয়ে যায়। সায়ন্তনী লাফ দিয়ে ওঠে, ক্যায়সে? তেড়ে এসে সৌম্য চোখের মুদ্রায় বলেছিল— এ্যায়সে। মুহূর্তে ওদের বার্ষিক ট্যুরপ্রোগ্রামের রুটম্যাপের আলোচনাসন্ধ্যা ‘শাম ই গজল’ হয়ে উঠেছিল সেদিন। শায়রী উড়ছে। প্রেমের বিরহের বিচ্ছেদের। স্বাতীলেখা গালিবের গজল ধরে। সেখান থেকে ফেরে গুলজারে। ভাবের ঘোরে গেয়ে যায়। দীপ্তদের ক্লাবের সেক্রেটারি দেবদত্তদার ছোট্ট ঘরটা স্বাতীর অসামান্য গায়কীর লহরে লহরে ভেসে যায়। গান শেষ হলে স্তব্ধ ঘর। শুধু কালখন্ডকে চিরে চিরে এগিয়ে নিয়ে চলা ঘড়ির কাঁটা জানিয়ে দেয় চুড়ান্ত স্তব্ধতা বলে কিছু নেই। এ জীবন দোয়েলের ফড়িঙের নয়, এ জীবন অশেষ প্রবাহ। জীবনের এই সুরপ্রবাহে ভাসতে ভাসতে যে যার বাইকে স্কুটিতে অনিচ্ছায় স্টার্ট দিয়েছিল সেদিন।
একটা বড় প্রোজেক্ট শেষ করে ওরা
শনি রবি মিলিয়ে দিন পাঁচেকের ছুটি জোগাড় করতে পেরেছে। কাজেই পাখা বেরিয়েছে ওদের। এবার
ওদের উড়ান লখনৌ নগরী। নবাবদের লাজবাব সৌধনির্মাণ
আর শেরো-শায়রীর জন্নত।
* * *
ফিরে আসা রাতের ফ্লাইটে আকাশ ছিল জ্যোতস্নায় ধোয়া। এরকম ভাবেই কি ধুতে চাইছিল ঋতম নিজেকে! আকাশে প্লেনভরা ঘুম, রাত্রি নিঝুম। আকাশের দিকে চেয়ে সারারাত ঠায় বসেছিল ঋতম। কত বিস্ময় যে সেখানে লেখা! ঋতম দেখেছে টুকরো মেঘের আড়ালে চলে যাওয়া চাঁদকে পাগলের মতো খুঁজছে আকাশ! ঠিক যেমন সারা দুপুর ধরে ভুলভুলাইয়ায় হারিয়ে যাওয়া স্বাতীলেখাকে খুঁজে ফিরেছে ঋতম নিজে। সেদিন ওদের স্বপ্নের পয়েন্ট বড়া ইমামবাড়ার বিস্ময়গলি ভুলভুলাইয়ায় ঢোকবার আগে চোস্ত গাইড বলে চলেছে এর ইতিহাস। সে ইতিহাসে নবাবদের কত মায়া, কত কর্তব্যবোধ, কত যে রোমান্সের কথা এসে মিশেছে একের পর এক গাইডের মুখে মুখে ফেরা অ্যানেকডোট ঘিরে! সারা দুপুর ওরা সবাই কি আশ্চর্য সেই গলিতে গলিতে ঘুরে মনে মনে হারাতে চেয়েছিল! ঋতমের মনে হয়, মাঝে মাঝে নিজের কাছে হারিয়ে যেতে বোধহয় সবাই চায়। কোনো এক অলৌকিক স্বপ্নের জগতে ভেসে যেতে যেতে নিজেকে ফিরে দেখতে চায়। হয়তো বাস্তব জীবনের আবরিত কিছু মুহূর্ত, যা বুকের কোটরে যত্নে লুকোনো ছিল, খুলে দেখেতে চায়! গোপনে! রোদভরা দুপুর গলিতে আলো ফেলেছে যথেষ্ট। যতক্ষণ আলো থাকে, আলোর মহিমা বোঝে না কেউ। অন্ধকারের কথা মনেই পড়ে না তখন। সময়ের সাথে সূর্য কখন সরে সরে যাচ্ছে ওদের খেয়ালই ছিল না। একটু একটু করে কখন যে আলো সরে গিয়ে আবছা হচ্ছে গলিপথ। সন্ধ্যের মুখে অনেকেই বেরিয়ে এসেছে। ঝুপ করে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে, স্বাতী তো ফেরেনি! ভয়ে ধক করে উঠেছে ঋতমের বুক। আশঙ্কার প্রহর এক মুহূর্তেই মানুষের বয়স বাড়িয়ে দেয়। আসন্ন অনেককিছু ভয়ঙ্করকে পড়তে শিখিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে গলিপথে ঢুকে পড়েছে ঋতম। ফিস ফিস করে দেওয়ালে মুখ ঠেকিয়ে বলছে ফিরে এসো স্বাতী! স্বাতীনক্ষত্র আমার। গাইড খুব রসিয়ে বলেছিল এই প্রেমের গলিতে ইনটারনেট ইজ আনঅ্যাভেলেবল্, গাইইইইজ। এই কথা মনে পড়ে ভয়ে হিম হয়েছে ঋতম। প্রাণপণে স্বাতীকে ডাকছিল যখন, স্বাতী সেই শব্দ ছুঁয়ে গলির পর গলি অন্ধকার ভেঙে কোথায় চলেছিল! যেন মরিচিকা। খুঁজতে খুঁজতে যখন প্রায় ভেঙে পড়েছে ঋতম, মনে হল দেওয়াল কথা কয়ে উঠলো। শত শত প্রেমিক প্রেমিকার জোড়া জোড়া নাম লেখা সেই অলিগলির দেওয়াল স্পষ্ট বলছে, আমি হারিয়ে গেছি ঋতম! তোমাকে ভালোবেসে আমি হারিয়ে গেছি। যদি এই ধাঁধা থেকে আর বেরতে হতে না পারি আমাকে ভুলে যেও। হাতুড়ির বাড়ি পড়েছে ঋতমের বুকে! ঘোরের মধ্যে ঋতম বলে উঠেছে, তোমাকে হারিয়ে যেতে দেবো না স্বাতীনক্ষত্র আমার! তুমি আমার মনের আঙিনায় এমন করে গালচে পেতেছ, সেখানে সবসময় তোমার গাওয়া গজলে আমি তোমার স্পর্শ পাচ্ছি। হারিয়ে তুমি যাবে কোথায়! তবু স্বাতীলেখাকে হারাবার ভয় ওকে জড়িয়ে ধরেছিল! ভয় পাচ্ছিল ঋতম, অন্ধকার সেই ঐতিহাসিক গলি কি ওদের সদ্য শিশিরমাখা ভালোবাসায় বিচ্ছিন্নতার তালা ঝুলিয়ে দেবে চিরদিনের মতো! সন্দেহে সংশয়ে আর ভাবতে পারেনি ঋতম। আর কিছু মনে নেই ঋতমের। শুধু খোঁজ আর খোঁজ। গেট বন্ধ হওয়ার সময় এগিয়ে আসছে। উত্তেজনায় বাকি বন্ধুদের মনেই পড়েনি অফিসে রিসেপশনে গিয়ে এই খবর জানানোর কথা। গাইডটি তার মনমাতানো বক্তৃতা শেষ করে, হাসতে হাসতে বলেছিল, আভি আপলোগ খো যাইয়ে ইস প্রেম কি গলিওঁ মে। দ্য গ্রেট ভুলভুলাইয়া ইজ এ্যাওয়েটিং ইউ। এবং সেই রসিক গাইড ছেলেটি অন্য ট্যুরিস্ট দলকে ধরতে উধাও হয়েছিল। সে এসে উদ্ধার করে হারিয়ে যাওয়া স্বাতী আর খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া ঋতমকে। বিস্মিত ঋতম ভাবে, ওর আর স্বাতীর কথপোকথন কি সত্যি ছিল, না কি সবটাই কল্পনা! ইল্যিউসন! যদি তুখোড় গাইডটিকে সেদিন না পাওয়া যেত! ভাবছিল, এই অমলিন এক চঞ্চলতাই কি প্রেম, যা আজ রাতের ফ্লাইট জুড়ে ওর সত্বাকে হিন্দোলিত করে চলেছে! কী করে ওর এই নিভৃত প্রেমের কথা জানাবে স্বাতীলেখাকে! সে অপেক্ষা করবে আজীবন, স্বাতীর জন্য! কিন্তু স্বাতীও কি? অনুচ্চারিত অপেক্ষা কি ভালোবাসাকে আরও সবুজ করে তোলে! আরও গাঢ! ফ্লাইট ভরা ঘুমের মধ্যে শুধু ঋতম আর স্বাতীর চোখ আর মন জেগে ছিল। দুজনেই সারারাত নিঃশব্দে মনে মনে কথা বলেছে। নতুন করে চিনছে দুজনে কি দুজনকে!
* * *
রাতের ফ্লাইট সকালে যখন ওদের সকলকে বাস্তব দুনিয়ায় নামিয়ে দিলো, যে দুনিয়া তখন লোভের আগ্রাসনে যুদ্ধে যুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা সভ্যতা। একটা প্রায় আড়াই শতকের সভ্যতা যখন ভালোবাসাকে ভালোবাসতে শেখাচ্ছে! নিজের মনের গভীর থেকে ঋতম শুনতে পাচ্ছে এক আশ্চর্য ভালোবাসার মেসেজ! মেসেজ বলছে, এই পৃথিবীকে ভালোবাসলে তবেই মানুষকে ভালোবাসা সার্থক হয়। জড়িয়ে পড়লো ঋতম পৃথিবী নামের তিন অক্ষরের বিশাল ‘ক্যারেকটারের’ সাথে। তাকে ভালো রাখতে আয়ুধ হিসাবে তুলে নিলো প্রতিবাদের গান। মানুষের সুবুদ্ধির প্রার্থনা। স্পর্শকাতর ওর মন একটার পর একটা শান্তির আর্তিমাখা গান লিখে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনে সেই গান পৌঁছে যাচ্ছে স্বাতীলেখার ফোনে। কোন ব্যক্তিগত প্রেমের মেসেজ দেবার কথা দুজনের কারুরই একবারও মনে পড়েনি। স্বাতী সেই গানে সুর দিয়ে চলেছে। ওদের বাকি সব বন্ধু-বান্ধবী সেই প্রতিবাদী স্বর আর শান্তির আর্তিমাখা উজ্জীবনী সুর আর কথা জনমানসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। না, কোনও প্রেক্ষাগৃহে বা মঞ্চের বদ্ধতায় নয়, খোলা চত্বরে রাস্তায় মাঠে ঘাটে। হাজার মানুষের মনে যখন সেই যুদ্ধবিরোধী সঙ্গীত আর শান্তির ভাষ্য লহর তুলছে ঠিক সেই সময়েই ওদিকে সর্বগ্রাসী টেকনোলজি গলাটিপে ধরেছে খেটে খাওয়া হাজার হাজার যুবকদের। টেকনো-শ্রমিক, যারা নিজেদের নাওয়া খাওয়া সামাজিক জীবন ভুলে দিনরাত এক করে কোম্পানির ঘরে লাভের হিসেব দুহাতে তুলে দিচ্ছে, তাদেরই নিঃশব্দ হাহাকান্নায় কত দেশের বাতাস ভরে উঠেছে। ইতিমধ্যে ঋতমসহ ওদের বিরাট সংখ্যার বন্ধু-বান্ধবী সার্কেলের অনেক আই.টি কর্মীর কাছে মেইলে পৌঁছে গেছে ‘ইয়োর সার্ভিস ইজ নো লঙ্গার রিকোয়ার্ড’ এর শলাকা। ঋতম বুঝতে পারলো, যুদ্ধ থামাবার প্রতিবাদী সুর সে বুনতে পারে কিন্তু মানুষের মেধাকে অপমান করার বিরূদ্ধে প্রতিবাদের কোনও সুর ভাষা আর ভাষ্য তার কাছে নেই। এই বেসুরো মনের এক দুঃসহ নির্জন দুপুরে ঋতমের মোবাইলে প্রথম মেসেজটা এলো স্বাতীলেখার। “আই লাভ ইউ ঋতম! ভালোবাসি তোমায়! আমাদের ভালোবাসা এই উপার্জনহীন সময়ের সাথে সংগ্রামে সংগ্রামে বেড়ে উঠুক আমাদের আগামী সন্তানের মতো। শুভেচ্ছা”।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন