শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

বিমল গঙ্গোপাধ্যায়

 

সমকালীন ছোটগল্প


দরজার দুপারে

পরপর দুবার কলিং বেলের শব্দ শুনতে পেয়ে বিপাশা সাড়া দেয়, কে?

কোন জবাব না পেয়ে আবারও বলে, কে? নামটা বলুন।

-   নাম বললে চিনতে পারবেন না। মাঝারি আওয়াজে বলে আগন্তুক, শৈলেশবাবু আছেন? একবার ডেকে দেবেন প্লিজ?

-   উনি অসুস্থ। দেখা করা যাবে না। এই কথা বলেও বিপাশাকে চেয়ার ছেড়ে উঠতে হয়। তার রাগ হয়। বিরক্ত বোধ করে। সবেমাত্র 'প্রান্তিক'-র শারদ সংখ্যাটি নিয়ে বসেছিল পড়ার টেবিলে। গণেশ পাইনের আঁকা প্রচ্ছদটি দেখছিল একমনে। কোন কিছু ভাল লাগলে যেমনটা সে করে, অনেকক্ষণ ধরে একমনে ছবিটি দেখছিল। ভাল লাগার আপ্লুতায় তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেছিল। একটু আনমনাও ছিল। কলিং বেলের তীব্র শব্দে সব এলোমেলো হয়ে গেল। বিপাশাকে চেয়ার ছেড়ে উঠতে হলো। কারণ তার অভিজ্ঞতা বলছে, যে এসেছে 'দেখা করা যাবে না' শুনে সে ফিরে যাবে না। বিপাশাকে গিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ধৈর্য ধরে তার কথা শুনতে হবে। প্রয়োজনে বিপাশাকেও কিছু বলতে হবে। সেটা খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে নাও হতে পারে।

বিপাশা দরজা খুললো। দরজা খোলার শব্দ পেয়েই আগন্তুক দরজামুখো হয়ে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে। বিপাশা কিছু বলার আগেই দুহাত জড়ো করে নমস্কারের ভঙ্গিতে বলল, আমি অনুপম ভট্টাচার্য। রিষড়া থেকে আসছি। শৈলেশবাবুর সঙ্গে সামান্য দুচার কথা বলতাম।

বিপাশা বলল, আপনাকে তো বললাম, উনি অসুস্থ। দেখা করা যাবে না।

-   ! বলে অনুপম দুচোখ বন্ধ করে, কপালে আঙ্গুল ঠেকিয়ে কী যেন ভাবল একটু। কয়েক মুহূর্ত। তারপর বলল, হাতে গোনা দুটো কি তিনটে কথা বলতাম।

-   দেখা করতে না পারলে, কথা বলবেন কিভাবে?

-   তা ঠিক কথা। অনুপমকে চিন্তিত মনে হলো, অ্যাবসলুটলি ঠিক। তাহলে কী করা যায় বলুন তো ?

বিপাশা হেসে বলল, আপনি কী জন্য এসেছেন, কী করতে চান, আমি তো কিছুই জানি না। কী জবাব দেব বলুন তো !

-   এটাও ঠিক কথা। আমার আগেই এটা ভাবা উচিত ছিল। একটু চুপ করে থেকে বলল, যে ব্যাপারে সবাই শৈলেশবাবুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, ওইরকম আর কি...!

-   অনেকেই ওনার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। বিভিন্ন প্রয়োজনে। যেমন ধরুন ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান আসেন, মেডিক্যাল চেক আপের জন্য। বন্ধুস্থানীয় কয়েকজন আসেন গল্প করার জন্য। এল আই সি প্রিমিয়াম, ইলেকট্রিক বিল জমা করে দেয় যে ছেলেটি, সে আসে তার প্রয়োজনের কথাটা বলতে। পেনসনার অ্যাসোসিয়েসনের মৃগাঙ্কবাবু আসেন ডি.এ. বাড়লে সেই খবরটা দিতে। এর বাইরে আরও কিছু মানুষ ...।

-   বুঝেছি, বুঝেছি। অনুপম হাতের ইশারায় বিপাশাকে থামিয়ে দিল, তার মানে এবারেও আমি আমার আসার কারণটা একস্যাটলি বোঝাতে পারিনি। বলার ধরণে ভুল থেকে গেছে। বা আপনি হয়ত আন্দাজ করতে পারছেন কিন্তু বলছেন না।

-   মোটেও না। বিপাশা রাগত গলায় বলল, প্রশ্নের মধ্যে হেঁয়ালী থাকলে সেটা আপনার সমস্যা। আমার ব্যর্থতা নয়।

-   প্লীজ, রাগ করবেন না। এক গ্লাস জল খাওয়াবেন ? আসল কথাটা বলার আগেই গলা শুকিয়ে কাঠ।

-   বিপাশার বুকের মধ্যে হাসির ঢেউ খেলে গেল। কিন্তু সে তার চোখেমুখে তার কোন অভিব্যক্তি ফুটতে দিল না।

ঈষৎ গম্ভীর গলায় বলল, রাস্তায় দাঁড়িয়ে জলটা খাবেন না নিশ্চয়ই। দয়া করে ঘরের ভেতরে আসুন।

বিপাশা জলের বোতল হাতে ফিরে এল যখন, অনুপম ইতিমধ্যে চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকেছে। স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিপাশা জলের বোতলটি অনুপমের দিকে বাড়িয়ে ধরল এবং ইশারায় সোফাটিকে দেখিয়ে বলল, রোদ থেকে এসেছেন, একটু বসে ধীরে সুস্থে জল খান।

অনুপমকে একটু অপস্তুত মনে হলো। বিপাশার কথায় সমর্থনের ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে বলল, ঠিক বলেছেন। বেশ গরম লাগছে। স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসছি।

-   তাই তো বলছি ! বলে বিপাশা রেগুলেটর ঘুরিয়ে ফ্যানের গতি বাড়িয়ে দিল।

অনুপম সোফায় বসে 'আঃ' বলে শব্দ করল। আরামসূচক শব্দ। তারপর বিপাশার দিকে চেয়ে হেসে বলল, আপনার বেশ সব দিকেই নজর আছে।

-   মানে ! বিপাশা দ্রু ভ্রু কুঁচকে বলল, ঠিক বুঝলাম না!

-   ভেরি সিম্পল ! অনুপম বলল, রোদের মধ্যে থেকে এসে একটু জিরিয়ে নিয়ে জল খাওয়া। তারপর ধরুন, আমি বলার আগেই ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দেওয়া। সর্বোপরি জল খাওয়ার জন্য ঘরের ভেতরে আসতে বলা এবং বসতে বলা।

বিপাশা হেসে ফেলল, এর মধ্যে আপনি নতুনত্ব কী দেখলেন! আমার জায়গায় অন্য যে কেউ থাকলে, সেও এটাই করত।

-   তাই কি! অনুপম বলল, একজন অজানা অচেনা মানুষকে এতটা এন্ট্রি দিত?

-   এবার জলটা খান। তারপর আপনার আসার কারণটা বলুন।

-   ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ!  বলতে বলতে অনুপম হঠাৎ করে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়ল। হাতে ধরা বোতলটির ছিপি খুলে, দ্রুত সেটিকে তুলে ধরে গলায় জল ঢালতে গেল। সেই মুহূর্তে নিজের মুখটা যতটা উন্মুক্ত করার প্রয়োজন ছিল, তেমনটা না হওয়ার কারণে, গলায় জল গেল খুব অল্প পরিমাণে। পরনের জামাটা ভিজে গেল। বুক এবং তার আশপাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে।

অনুপমকে খুব অসহায়ের মতো দেখতে লাগল। আলতো চোখে বিপাশার দিকে চেয়ে বিস্মিত গলায় বলল, কী হলো বলুন তো?

বিপাশা হেসে ফেলল, তেমন কিছু হয়নি। আপনার তেষ্টা মিটল না। কিন্তু শরীরটা একটু জুড়োল। দাঁড়ান আমি একটা গ্লাস নিয়ে আসছি।

গ্লাসে জল ঢেলে বেশ কয়েকবারে অনুপম অনেকটা জল খেল। সোফায় বসার সময় যেমনটা করেছিল, তেমনই আরামসূচক শব্দ করল, 'আঃ'।

বিপাশার দিকে চেয়ে বলল, ভেতরে অনেকখানি তেষ্টা ছিল। জামার ভেজা অংশের ওপর হাত বুলিয়ে বলল, ঠিক বলেছেন। এতক্ষণে মনে হচ্ছে ভেতর বাইরে দুটোই জুড়োল।

বিপাশা অনুপমের থেকে সামান্য তফাতে মুখোমুখি একটি চেয়ারে বসল।

-   এবার বলুন। বিপাশা বলল।

-   কী বলব? অনুপমের প্রশ্নটা তার নিজের কানেই কেমন বোকা বোকা শোনাল।

-   বারে! ভুলে গেলেন? বিপাশার গলায় উষ্মা প্রকাশ পেল, হাতে গোণা দুটো তিনটে কথা, যা বলতে এসেছেন।

-   সেটা তো আপনাকে বলে কোন লাভ নেই। শৈলেশবাবুকে বলব।

-   এই মুহূর্তে সেটা তো সম্ভব নয়। তিনি অসুস্থ।

-   কারোর সঙ্গেই কোন কথা বলছেন না?

-   একদমই না। যার যা বলার, আমাকে বলছে। প্রয়োজন মনে করলে, কিছু কথা আমি তাঁকে জানাচ্ছি। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি।

-   তাহলে তো হয়েই গেল!  হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে অনুপম বলল।

-   মানে?

-   আমার কথাগুলো যদি আপনার অপ্রয়োজনীয় মনে হয়!

-   সেটা তো নির্ভর করছে, আপনার কথাগুলো কতটা দরকারি, তার ওপর।

-   আপনি শৈলেশবাবুর কে হন?

-   মেয়ে। কেন বলুন তো?

-   বাড়িতেই থাকেন? নাকি চাকরি বাকরি কিছু করেন?

-   স্কুলে পড়াই।

-   প্রাইমারী না হাইস্কুল? পার্মানেন্ট না প্যারাটিচার?

-   আপনি কিন্তু আমার ব্যক্তিগত স্পেসে ঢুকে পড়ছেন। বিপাশা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, অনধিকার চর্চা করছেন। আপনার পেশা কী? ঘটকালি না কী যেন বলে, ঐ জাতীয় কিছু?

অনুপম লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে জিভ কেটে ঘাড় দুলিয়ে বলল, না ম্যাডাম। এতটা আন্ডার এস্টিমেট করবেন না। মনে হয় আমার অ্যাপিয়ারেন্সেও তেমন কোন ছাপ নেই। আছে কি?

-   আপনার প্রশ্ন করার ধরণটা ঠিক নয়। বিপাশা বলল, সত্যি যদি কাজের কথা কিছু থাকে তো বলুন। আমার তাড়া আছে।

-   আমি তো কাজের কথা বলার জন্যই এসেছি। সু-দূ-র রিষড়া থেকে। 'সুদূর' শব্দটি অনুপম অনেকখানি শ্বাস নিয়ে লম্বা করে টেনে এমনভাবে উচ্চারণ করল যে, নিজের অজান্তেই বিপাশা শব্দ করে হেসে ফেলল।

-   আপনি হাসছেন?

-   হাসব না? আপনি এমনভাবে বললেন, 'সুদূর রিষড়া' যেন সেটা কোথায় না কোথায়। ম্যাপ হাঁতড়ে খুঁজতে হবে।

-   তাহলেও দূর আছে। চুঁচড়ো থেকে বিশ বাইশ কিলোমিটার তো অবশ্যই।

-   ঠিক আছে। এই প্রসঙ্গটা ছাড়ুন। বিপাশার গলায় বিরক্তি ফুটে উঠল, সত্যি যদি বলার মতো কোন কাজের কথা থাকে তো চটপট বলুন। আমি একটা জরুরী কাজ ছেড়ে উঠে এসেছি।

-   তাহলে বলেই ফেলি। যা হয় হোক। অনুপম বলল, আপনি যখন বলছেন শৈলেশবাবুর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা যাবে না, অগত্যা!

-   ইচ্ছে না হলে বলবেন না। বিপাশা রীতিমত রেগে গেল, বাবা সুস্থ হলে খবর নিয়ে জেনে আসবেন। তখন বলবেন।

-   প্লীজ রাগ করবেন না। যা বলার আজই বলব। আপনাকেই বলব।

কথা শেষ করে অনুপম কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগের চেন খুলল। তারপর মুখ খোলা ব্যাগের মধ্যে হুমড়ি ঘেয়ে পড়ে, এটা ওটা নাড়াচাড়া করে, পিন আঁটা হালকা হলুদ রংয়ের একটি খাম বার করে আনল।

খামটি হাতে ধরে যেন কোন ভুল করে ফেলেছে বা করতে চলেছে এমনি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইল মিনিট দুই বা আর একটু বেশী সময় ধরে।

অনুপমের এইভাবে বসে থাকাটা বিপাশার ভাল লাগছিল না। ব্যাপারটা কী হতে পারে, সেটা আন্দাজ করতে পেরেও, তার অসহ্য লাগছিল।

-   কী হলো? বিপাশা বলল, হঠাৎ মৌন হয়ে গেলেন?

-   ও, হ্যাঁ। অনুপম মাথা তুলে হাতে ধরা খামটি বিপাশার দিকে বাড়িয়ে ধরল, এটা কাইন্ডলি শৈলেশবাবুকে দেবেন। ইচ্ছে ছিল নিজে ওনার হাতে ...!

-   বিপাশা হাতের ইশারায় অনুপমকে থামিয়ে দিল। অনুপমের থেকে খামটি নিয়ে খুব ক্যাজুয়ালি সেটি পাশের ছোট টুলটার ওপর রেখে বলল, কী আছে?

-   'সূচনা'-র বইমেলা সংখ্যার জন্য লেখা। সংকুচিত গলায় বলল অনুপম।

-   সে তো বুঝতে পারছি। আমি জানতে চাইছি, গল্প, প্রবন্ধ নাকি কবিতা? রম্য রচনা, ভ্রমণ কাহিনী আমরা ছাপি না।

-   কবিতা আছে। চারটি। আমার লেখা। যদি একটাও পছন্দ হয়।

-   এখনও বইমেলার কাজ শুরু হয়নি। আপনিই প্রথম লেখা জমা দিলেন। অজস্র লেখা আসবে। মেলে, ডাকে। আবার আপনার মতো আরও দুচারজন নিজে হাতে পৌঁছে দিয়ে যাবেন। এই অব্দি বলে বিপাশা একটু চুপ করে রইল। তারপর অনুপমের মুখের দিকে চেয়ে বলল, আপনার ঠিকানা আর ফোন নম্বর লেখার শেষে উল্লেখ করা আছে তো? মনোনীত হলে আমি জানিয়ে দেব।

-   তার মানে পত্রিকার সঙ্গে আপনি নিজেও জড়িত আছেন, তাই তো?

-   আছি। বাবা অসুস্থ হওয়ার পরে আমার দায়িত্ব অনেকটা বেড়েছে।

-   সব লেখা আপনি নিজে পড়ে দেখেন?

-   না, না, তা কেন! দায়িত্ব ভাগ করা আছে। ঋতুদি, প্রলয়বাবু, সুকুমারদা এঁরাও আছেন। আমি মোসটলি কবিতা দেখি। মাঝে মধ্যে দুচারটে প্রবন্ধও দেখে দিতে হয়।

-   সত্যি! অনুপমের চোখমুখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল, তার মানে আমি নামি পত্রিকার কবিতা নির্বাচকের মুখোমুখি বসে রয়েছি! এটাকে কী বলা যায় বলুন তো?

-   মানে! বিপাশা বিস্মিত গলায় বলল, আপনার কি মনে হচ্ছে, আমি বাড়িয়ে কিছু বলছি?

-   ইস্‌!  এভাবে বলবেন না। বিশ্বাস করুন, আমার শরীরের মধ্যে অদ্ভুত থ্রিলিং হচ্ছে। কত নামি দামি কবির কবিতা আপনিই প্রথম পড়েন। শুধু পড়েন তা নয়। তার মধ্যে থেকে কোনটা প্রকাশযোগ্য, কোনটা নয়, সেই বিচারও করেন। যারা কবিতা লেখে তারা জানে বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা' পত্রিকার মতো, 'সূচনা'ও অনেক নতুন কবিকে আবিস্কার করেছে। আজ যাঁরা প্রতিষ্ঠিত কবি, তাঁদের অনেকেরই লেখার আঁতুর ঘর 'সূচনা'।

বিপাশা সাবধানে তাকায় অনুপমের মুখের দিকে। আবেগ উচ্ছ্বাস, আর তার সঙ্গে নিখাদ আনন্দ মিশে গেলে, যেমনটা হয়, অনুপমের চোখমুখের চেহারাটা ঠিক তেমন দেখাচ্ছে। যেন একটি ছায়া ঘনিয়েছে সারা মুখ জুড়ে।

বিপাশার মনে হলো, অনুপম যা বলছে, তার মধ্যে কোন মিথ্যাচার নেই। আর এই মনে হওয়া থেকেই নিজে অদ্ভুত তৃপ্তি বোধ করল। যেন জীবনে আজই প্রথম সে এমন একটি অনুভূতির আস্বাদ পেল।

কিন্তু তারপরেও সে নিজেকে যথাসম্ভব সংযমী এবং স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।

বলল, আর কিছু বলার আছে আপনার?

অনুপম ঘাড় নেড়ে বলল, না। আপনার বাবাকে এই কথাগুলোই মানে 'পড়ে দেখবেন' বা 'যদি একটি কবিতাও পছন্দ হয়' যা আপনাকে বললাম, এইগুলিই বলতে চেয়েছিলাম।

-   ঠিক আছে। হেসে বলল বিপাশা, আপনার মিশন সাকসেসফুল। নিশ্চিন্ত থাকুন। যথাসময়ে আপনার লেখা সম্পর্কে আমাদের মতামত জানিয়ে দেওয়া হবে।

অনুপম বলল, যদি আমি নিজে আর একবার আসি!

বিপাশা বলল, কেন? লেখা মনোনীত হলে আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হবে। ছাপা হলে আপনার ঠিকানায় পত্রিকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

অনুপম কুন্ঠিত গলায় বলল, না ঠিক সে কারণে নয়।

-   তাহলে?

-   আমি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আপনার মতামত জানতে চাইছিলাম। সে হ্যাঁ, না, যাই হোক না কেন।

-   সুদূর রিষড়া থেকে আবার আসবেন! বলে শব্দহীন হাসল বিপাশা।

-   প্লীজ, আমায় লজ্জা দেবেন না। আসলে তখনও তো আমি আপনার আসল পরিচয়টা জানতে পারিনি।

-   আমার পরিচয়! বলে হাসল বিপাশা, আসল নকল মিলিয়ে একটাই। বিপাশা সেনগুপ্ত। শৈলেশ সেনগুপ্তর মেয়ে। আবার বলছি, আপনার আসার প্রয়োজন নেই।

-   এটুকু অনুমতি দিন। কথা দিচ্ছি আমি আর বাড়ির ভেতরে ঢুকব না। প্রয়োজনে আপনি দরজা না খুলে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়েও আপনার মতামত জানিয়ে দিতে পাববেন।

-   সত্যি করে বলুন তো, আপনি আসার জন্য এমন জেদাজেদি করছেন কেন?

-   বলব! অনুপম বিপাশার মুখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে মাথাটা নামিয়ে নিল। তারপর স্বগতোক্তির মতো করে বলল, আপনার সঙ্গে আমার আলাপ হলো, মুখোমুখি বসে কথা বললাম, আপনার হাতে আমার লেখা তুলে দিলাম! একটু থেমে বলল, এতবড় ব্যাপারটার ছিটেফোঁটা আলোচনাও আমি কারোর সঙ্গে করতে পারব না। করলেও কেউ গুরুত্ব দেবে না। কারণ আমার চারপাশে যারা আছে, আমার বাড়ির মানুষজন, বন্ধুবান্ধব তারা কেউ সাহিত্যের একআনা খবরও রাখে না। আমি একটু আধটু লিখিটিখি বলে, আমাকে নিয়ে মজা করে। আমার খুব কষ্ট হয়। আর তাই ... !

-   হ্যাঁ, বলুন। অনুপমকে থামিয়ে দিয়ে বিপাশা হঠাৎই বলে উঠল, আর তাই কী!

-   আপনাকে মুখোমুখি আর একবার দেখতে পাব। লেখালিখির জন্য একটু মেন্টাল সাপোর্ট পাব। বিলিভ মি, এর বাইরে আপনার কাছে আসতে চাওয়ার আর অন্য কোন কারণ নেই।

বিপাশা অনুপমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য তফাতে। ঘরে তৃতীয় কোন ব্যক্তি নেই। অনুপমের কথা বলা শেষ হয়ে গেছে। ঘরে কোন শব্দ নেই। তিনটি জানলাই খোলা রয়েছে। দরজার একটি পাল্লাও খোলা। খোলা জানলা দিয়ে, দরজা দিয়ে আলো হাওয়া, দুই-ই ঢুকছে ঘরের মধ্যে। তারপরেও বিপাশার মনে হলো, সে সম্পূর্ণ অচেনা একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আকাশে মেঘ জমলে যেমনটা হয়, আলো নেই, আবছা ছায়া ছায়া ভাব, চারপাশটা ঠিক তেমনি। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাথার মধ্যেও কেমন যেন ঘোরলাগা অবস্থা। কে, কোথায়, কেন, আগে পিছু কিছুই মনে করতে পারছে না বিপাশা।

এই অবস্থায় বিপাশা হয়ত অল্প কিছুক্ষণ বা কয়েক মুহূর্ত ছিল। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চমকে ওঠার মতো যখন তার সব কিছু মনে পড়ে গেল এক লহমায়, সে দেখল ঘরের মধ্যে সে একা বসে রয়েছে একটি চেয়ারে। ঘরের দরজার দুটি পাল্লা হাট করে খোলা।

 

(দুই)

'সূচনা'-র বইমেলা সংখ্যার প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে গেছে। বিপাশা তার হোয়াটসঅ্যাপে সেই ঘোষণা করে দিয়েছে। শৈলেশবাবুর উপস্থিতিতে ঋতুদি, প্রলয়বাবু, সুকুমারবাবু এবং বিপাশা আসন্ন সংখ্যাটির রূপরেখা নিয়ে একটি আলোচনাও সেরে নিয়েছে। এই সংখ্যাটির সম্পাদনার জন্য বিপাশার নাম প্রপোজ করেছেন ঋতুদি। বাকিরা ঋতুদির প্রস্তাবকে জোরালো সমর্থন করেছেন।

বিপাশা খুশি হয়েছে। আবার মনে মনে শংকিত বোধ করছে। যদিও সে জানে প্রত্যেকের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে কাজ করবে। তারপরেও কোন রকম অসুবিধা হলে, ধোঁয়াশা তৈরী হলে, বাবা তো হাত বাড়ালেই পাশে আছে।

ইতিমধ্যেই মেল এবং ডাকে কয়েকটি লেখা দপ্তরে পৌঁছেছে। গতকাল একটি মেয়ে তার বাবার সঙ্গে এসেছিল। দুজনেই লেখা জমা দিয়ে গেছে। মেয়েটি একটি প্রবন্ধ লিখেছে। বাবা বিদেশী কবির কয়েকটি কবিতা অনুবাদ করেছেন।

রাতের বেলায় খাওয়া দাওয়ার পর বিপাশা জমা পড়া লেখাগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। তখনই হঠাৎ করে তার মনে পড়ল, অনুপমের কবিতাভরা খামটি খুলে দেখা হয়নি আজও।

মুখবন্ধ খামটির কথা তার ভীষণভাবে মনে আছে। কিন্তু যখনই খামটি খুলে কবিতাগুলি পড়ার কথা ভেবেছে একটা আশ্চর্য রকম 'কী হয়', 'কী হয়' ভয় তাকে জড়িয়ে ধরেছে। অজানা অচেনা মানুষের পাঠানো পার্সেল খুলতে যেমন ভয় পায় মানুষ, প্রায় সেইরকম বা তার চেয়েও বেশী একটু আশংকায় সে খামটিকে আলাদাভাবে একপাশে সরিয়ে রেখেছে।

নিজেকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। সাহস দিয়েছে এই ভাবনায় যে, আছে তো কয়েকটি নিরীহ কবিতা, কিন্তু তারপরেও যেমনটা ভেবেছে, তেমনটা করে উঠতে পারেনি। খামটি খোলা হয়নি।

গতকাল মেয়েটির প্রবন্ধ এবং তার বাবার অনুদিত বিদেশী কবিতাগুলি পড়ার পরে, বিপাশার মনে হলো আজ সে অনুপমের কবিতাগুলি পড়তে পারে। অনায়াসেই পড়তে পারে। কারণ অনুপমের কবিতা ডাকে বা মেলে আসেনি। বাবা মেয়ের মতো অনুপমও তার বাড়ি এসে নিজের লেখা পৌঁছে দিয়ে গেছে। মুখ বন্ধ খামটি বিপাশার হাতে তুলে দিয়ে গেছে।

বিপাশা অনুপমের চারটি কবিতাই পড়ল। একবার নয়। দুবার। তারপরেও আরও একবার চারটির একটিকেও খুব ভাল কবিতা বলা যায় না। আবার ছাপার অযোগ্য এমনটাও নয়। মাঝারি মানের।

বিপাশার মন খারাপ হয়ে গেল। এখন সে কী করবে? 'সূচনা'তে জায়গা পাওয়ার মতো কবিতা নয়। 'হ্যাঁ' অথবা 'না' এই দুয়ের যে কোন একটি শব্দ তার মুখ থেকে শোনার জন্য, একজন নবীন কবি, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে যে তার সৃষ্টিগুলিকে গড়ে তুলছে, বিশ বাইশ মাইল পথ ভেঙ্গে ছুটে আসবে! এই ভীষণরকম অস্বস্তিকর অবস্থাটাকে কীভাবে সামাল দেবে বিপাশা!

রাতে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত, নানাভাবে নানাদিক দিয়ে সমস্যাটির সমাধানের একটি রাস্তা হাতড়ে বেড়াল বিপাশা।

এখন যে কেউ এসে কলিংবেল বাজালে, বিপাশা এক বুক উৎকন্ঠা নিয়ে দৌড়ে যায় দরজা খোলার জন্য। তার আগে জানলা দিয়ে চুপিসারে দেখে নেয় আগন্তুককে। অনেক সময় জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়েই সে আগন্তুকের কথা শোনে। প্রয়োজনীয় কাজ মিটিয়ে নেয়।

কিন্তু যেদিন কলিং বেল বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে, কেন কে জানে, বিপাশা হঠাৎ করে বলে উঠল, কে? আর প্রত্যুত্তরে আগন্তুক জবাব দিল, হয়ত মনে নেই, আর তাই গলা শুনে চিনতে পারছেন না। মুহূর্তে বিপাশার গলার কাছে ড্যালার মতো কী যেন পাক দিয়ে উঠল। রীতিমত ঠেলা দিতে লাগল। বিপাশা বুঝতে পারল শারীরিক কষ্ট নয়, আনন্দের কান্না তার বুক ছেড়ে গলায় এসে ধাক্কা দিচ্ছে। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে গেছে দৃষ্টি। কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে গাল বেয়ে চিবুকে নেমে এসেছে।

বিপাশা রীতিমত দৌড়ে এসে ঘরের দরজার দুটি পাল্লা সজোরে দুহাতে ঠেলে সরিয়ে হাট করে খুলে দাঁড়াল। কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে, নমস্কারের ভঙ্গিতে দুহাত জড়ো করে অনুপম পথের ওপর দাঁড়িয়ে। শব্দহীন হাসি তার সারা মুখ জুড়ে।

বিপাশা বলল, ভেতরে আসুন।

-   না। অনুপম ঘাড় নেড়ে বলল, আপনার মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্যই আজ আমার হঠাৎ ছুটে আসা।

-   সত্যি ভেতরে আসবেন না? অভিমানী গলায় বলল বিপাশা।

-   আজ নয়, আজ শুধুই আপনার মুখোমুখি হওয়া আর সংক্ষিপ্ত একটা জবাব 'হ্যাঁ' অথবা 'না' শুনতে চাওয়া।

বিপাশা বুঝতে পারল, অনুপম আজ কোনমতেই ঘরের ভেতরে আসবে না। এখন এই মুহূর্তে বিপাশাও সেটা চাইছে না। সে চাইছে স্বপ্নটা বেঁচে থাকুক। অনুপম এবং তার। দুজনেরই। আর তাই খুব সহজ গলায় বলল, আপনার কবিতাগুলো এখনও পড়ে দেখা হয়নি।

অনুপমও কেমন সরল বিশ্বাসে তা মেনে নিল। আলতো হেসে বলল, সময় করে পড়ে দেখবেন, অন্য আর একদিন আসব।

দুজনে দুজনার মুখের দিকে চেয়ে রইল অপলক। কয়েক মুহূর্ত। মুখ ঘুরিয়ে অনুপম হাঁটতে শুরু করল। বিপাশা দাঁড়িয়ে রইল দরজা ধরে।

 

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন