![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৮ |
একটি অনস্বীকার্য হাতছানির ভুমিকা
বলা হয়ে থাকে অন্তরাল মহাবিশ্বের এক ক্রমবর্ধমান ছায়া, উপলব্ধির হরফে লেখা তার ভাষ্য… ধীরে ধীরে, অতি সন্তর্পণে গ্রাস করে চলেছে সেই বোধ যা জীবনানন্দে, তা তাঁরও, যেমন তিনি চাক্ষুষ করেছিলেন, এমনটাই জানা যায় বাগডুলিয়ার জংগল সংলগ্ন কালীমন্দিরের পুরোহিত শ্রীজাত আচার্য সম্পর্কে, যিনি এক প্রবল ঝড়বৃষ্টির রাতে বাড়ি ফেরার জন্য যখন বেছে নিয়েছিলেন জংগলের ভেতর দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবার এক অচেনা পথ, যদিও তিনি এক্ষেত্রে, “একটি অনস্বীকার্য হাতছানির ভুমিকা”, এই বাক্যবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন, এবং অকুণ্ঠ বিশ্বাস তাঁর গৃহদেবতার প্রতি… এদিকে ঝড়বৃষ্টি ক্রমশই ঊর্ধ্বমুখী, আকাশ ঘনীভূত মেঘে নিম্নমুখী, এবং প্রকৃতি যেন স্বয়ং সৃষ্টির জন্য কাতর… নিজেকে খুঁজে পেলেন দুটো নোনাধরা ইটের ক্ষত বিক্ষত স্তম্ভের সামনে…, যার প্রত্যেকটির মাথায় একটি করে শুঁড়-সেলাম হাতি বসে, এবং যার অতিক্রমে ততোধিক ক্ষত বিক্ষত এক অতীত স্থাপত্যের প্রাচীন গরিমা তার অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে মুক্তির জন্য তখনও অপেক্ষা করছিল, এবং স্তম্ভের মাথায় ঢালাই লোহার সেই গেটের ওপর থেকে ভগ্ন ঐতিহ্যকে নজরদারি করতে সেই হাতি দুটোর আত্মা বাধ্য হয়েছিল। উদ্বেগ, বৃষ্টি আর মেঘ চিরে ঘন ঘন বজ্রপাত… শ্রীজাত দ্রুত হাঁটছিলেন, যেন কোন বোধ… শ্রীজাতকে টেনে নিয়ে গেল পোড়ো বাড়ির দালানের সংক্ষিপ্ত কোণে সেই “একটি অনস্বীকার্য হাতছানির ভুমিকা”; অন্ধকারে ঘনত্বের তারতম্য ছিল, ঠাওর করতে পারেননি পুরোহিত, পায়ে পা লেগে যায়… একটি দেহের স্বাভাবিক অস্পষ্টতার সাথে। শ্রীজাত মোমবাতি ধরালেন, একজন নারী, শীর্ণ, তবু সময় অতীব অনুকূল বয়সের নিরিখে, অবিন্যস্ত পোশাক, বুকের কাপড় সরানো, যমজ বোঁটা যেন হৃৎপিণ্ডের চোখের মণি, কড়িবর্গার ছাদের দিকে স্থির, আর দুপাশে ছড়ানো হাত, এই দশায় মেঝেতে চিত হয়ে পড়েছিল। পাশে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত একটা বেতের ডালা, বিড়ে, মুখবাঁধা পাতলা বুননের আনাজের বস্তা। কিন্তু… হাঁটু পর্যন্ত মোড়া, ডান পা ছাড়িয়ে কোমরে উঠে আসা শাড়ি…, এই দৃশ্য! এমন তো থাকার কথা নয়! আচমকা শ্রীজাতর মনে হল, একটি দেহের যে অংশের সংস্পর্শে তাঁর পা একটি দেহবোধে বিস্মিত ও আতংকিত হয়, তিনি মোমবাতি জ্বালেন… কয়েকটি কাঠির অকৃতকার্যতার জন্য দায়ী ছিল তাঁর বার বার কেঁপে ওঠা হাত… সে অংশ ছিল গোড়ালি থেকে হাঁটুর মাঝে সটান, ‘মোমবাতির আলোয় অন্যত্র গভীর অবলোকনের সুযোগে গা ঢাকা দিয়েছিল’…, শ্রীজাত বিড়বিড় করলেন। বৃষ্টি ধরে আসছিল, মোমবাতি গলে পড়ছিল পুরোহিতের রক্তমাংসের হাতে; ডালপালা, পাতার সাথে বাতাসের সংঘর্ষজনিত কোলাহল ক্রমে ক্লান্ত হয়ে আসছিল…, নিভে যাওয়া মোমবাতি আবার জ্বলল, আবারও জ্বলল, নৈবেদ্য সাজানোর ভঙ্গিতে পুরোহিত উবু হয়ে বসলেন নাকি, উৎসর্গকৃত নৈবেদ্য পুনরায় উৎসর্গ করার জন্য আবারও মোমবাতি… জ্বালাবেন, এই প্রশ্নের উত্তর অলিখিত রয়ে গেল।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন