শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

সুকান্ত পাল

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৮


উড়ান

তন্ময়, অভীক আর সুপ্রিয়। পেশা আলাদা আলাদা, তবে সবাই চাকরিজীবী। একজন রাজ্য সরকারি কর্মচারী, একজন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং একজন পূর্ব রেলের কর্মচারী। ছোটবেলা থেকে একই স্কুলে পড়াশুনো। কিন্তু খুব আশ্চর্যের বিষয় কাউকেই চাকরির জন্য নিজের এলাকা ছেড়ে বাইরে যেতে হয়নি। তাই বন্ধুত্বটা বেশ জোরালো ভিতের উপর দাঁড়িয়েছিল।

কোনোদিন একসাথে তিন বন্ধুর ফ্যামিলি নিয়ে বেড়াতে যাওয়া হয়নি। এবারের পূজোর ছুটিতে তিনজনেই ঠিক করেছে তাদের বৌদের নিয়ে তারা যাবে শিমুলতলায়। বেশ কয়েকদিন হাত পা ছড়িয়ে, ল্যাদ খেয়ে শিমুলতলাকে উপভোগ করবে। বাইরে না বেরোতে পারলে এক ফ্যমিলির সঙ্গে অন্য ফ্যামিলির বন্ধুত্বের বন্ধনটা শক্ত হয় না, ঘনিষ্টতাও বাড়ে না।

বিপুল আনন্দে তন্ময়ের স্ত্রী শাশ্বতী তো একথা শোনার পর থেকেই দিন গুনতে শুরু করেছে। অন্যদিকে সুপ্রিয়র বৌ মৌমিতা রীতিমতো সুটকেস গোছানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আর অভীকের বৌ অন্ততপক্ষে ইতিমধ্যে শ'দেড়েক ফোনে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধবীদের কাছে ফোন করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবুও ভেবে যায়, আর কে কে বাকি রইল! তাদেরও ফোন করে জানাতে না পারলে যে কিছুতেই পেটের ভাত হজম হতে চাইছে না!

পুরো এক সপ্তাহের শিমুলতলা ভ্রমণের শেষে বাড়ি ফিরে আসার পর অভীক, তন্ময় এবং সুপ্রিয়দের যে নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও বাড়িভাড়া খুঁজতে হবে, এটা ছিল কল্পনারও অতীত। অথচ এটাই করতে হচ্ছে। কিন্তু তাদের এই নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথা কেউ কাউকেই বলছে না। পুরোটাই তাদের নিজস্ব গোপন।

শিমুলতলা তাদের বৌদের চোখ খুলে দিয়েছে। প্রকৃতি যেন তাদের মনের দরজাগুলো খুলে দিয়েছে হাট করে। অভীক কতটা স্মার্ট আর আর কতটাই করিৎকর্মা সুপ্রিয়র থেকে তা চোখে আঙুল দিয়ে মৌমিতা বুঝিয়ে দিচ্ছে দিনের পর দিন। প্রায়ই বায়না করে সন্ধ্যাবেলায় অভীকদের সান্ধ্য চায়ের আড্ডায় তাদের বাড়িতে আসার জন্য। অভীকের বৌ প্রিয়াঙ্কা তো একদিন বলেই বসল, তন্ময়দাকে দেখে একটু তো শিখতে পারো! উনি শাস্বতীদির প্রতি কতটা কেয়ারী। সত্যি আমার ভাগ্যটাই খারাপ!

নিজেকে সামলাতে না পেরে অভীক বলল, তুমিও তো প্রিয়াঙ্কা বৌদির মতো একটু মর্ডান হতে পারো!

-- ছিঃ ছিঃ,পরের বৌকে এখন তোমার ভালো লাগছে দেখছি। বলতে এতোটুকুও লজ্জা করল না তোমার? একটা চরিত্রহীন মানুষ তুমি।

শাশ্বতী তন্ময়কে শিমুলতলা থেকে ফেরার পরদিনই বলল, তোমার এই বস্তাপচা আদ্যিকালের ধ্যান ধারণা নিয়ে সংসার করতে আর ভালো লাগে না। সুপ্রিয়দাকে দেখে বুঝতে পারো না দিনকাল পাল্টাচ্ছে! যুগ এখন অনেক এগিয়ে গেছে, হোম ডেলিভারির যুগে রান্নাঘরে সময় কাটানোর দিন শেষ।

তন্ময়, অভীক, সুপ্রিয় সবাই যার যার অফিসে ট্রান্সফারের জন্য যে আবেদন করেছে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন