![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৮ |
এঞ্জেলিকার ঘুমঘর
খবরটা জানার পর লোকটা যেন পাগল হয়ে গেল। শূন্য ঘরের ভিতর পায়চারি করতে করতে নিজের মনেই বলতে লাগল, নাহ্ এটা কখনোই হতে পারে না! এঞ্জেলিকার অনন্ত শান্তির ঘুমে বিঘ্ন ঘটতে পারে না কিছুতেই। বেচারা এঞ্জেলিকা। এ অনর্থ হতে দেব না আমি। পুরনো কবর খুঁড়ে ফেললে, প্রিয়তমা আমার, তুমি যে নিরাশ্রয় হয়ে পড়বে!
সালটা ১৭৯৬। কলকাতার একটা পাঁচমিশেলি গন্ধ ছিল! ফরাসী পর্তুগিজ আর্মেনীয় ইংরেজ। সকলেই যে যার মত করে বসবাস ও বাণিজ্য করত। এভাবে ভাগ্যের সন্ধানেই ভেনেশীয় মানুষটি এসে পৌঁছেছিলেন কলকাতায়। পেশায় স্থপতি। কোম্পানিতে কাজ জুটে গেল। ততদিনে বয়েস প্রায় ছাপান্ন। এদোয়ার্দো তিরেত্তা এযাবৎ অসংখ্য প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। অজস্র কেলেঙ্কারি ও কলঙ্ক পেরিয়ে জীবনের মধ্যাহ্নে এসে বিয়ে করলেন, চন্দন নগরের এক ফরাসি মেয়েকে। নাম এঞ্জেলিক। এঞ্জেলিকের বয়স তখন মাত্র চোদ্দ কি পনের। পিতৃমাতৃহীন অনাথ। তিরেত্তার মতই ক্যাথোলিক ধর্মের অনুসারী। পরনে সাদা গাউন। মাথায় দীর্ঘ ভেল। হাতে পুস্পগুচ্ছ। তার সারাটা শরীর জুড়ে যেন লাতিন দেশের আলো! অন্যদিকে প্রৌঢ় তিরেত্তা! পোড়খাওয়া মানুষ। জীবনে তার বহু সমুদ্রযাত্রা, কতশত হারানো শহর, কত না অভিজ্ঞতার রেখা মুখে খোদাই করা। পরনে কোট, রূপালি চুল। কাঁচা পথের ধুলো পেরিয়ে, সোনালি সকালবেলায় এসে পৌঁছলেন গীর্জার দ্বারে।আইভরি রঙের কোটে, রুপোর বোতামে সূর্যের ঝিলিক, চোখে এমন এক উজ্জ্বলতা যেন আজ তিনি শুধু এক অভিজাত নন এক প্রেমিকও। তারপর তিনটি বছরের নাতিদীর্ঘ দাম্পত্য।
মাত্র তিনটি দিন আগেই তো সবকিছু অন্যরকম ছিল। বহু আড়ম্বরে পালিত হয়েছিল কাউন্ট তিরেত্তা ও এঞ্জেলিকার তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকী। এঞ্জেলিক তখন ভরা মাসের অন্তঃসত্বা। সন্ততির জন্ম দিয়েই পৃথিবীর মায়া কাটালেন। তাকে চির-শয়ন দেওয়া হল পার্কস্ট্রীট সেমেট্রিতে।
মাত্র কয়েকদিন বাদেই তিরেত্তা জানতে
পারলেন সেখানে নবীনতর মৃতদেরকে স্থান দেবার জন্যে পুরনো কবর নষ্ট করে ফেলা হয়। খবরটা
জানার পর মানুষটা আর কিছুতেই শান্তিতে থাকতে পারলেন না। বহু চেষ্টায় খানিকটা দূরে দেড়কাঠা
জমি কিনলেন এবং স্ত্রীর কবর তুলে এনে পুনঃস্থাপন করলেন। তাঁকে দিলেন চিরশান্তির আশ্রয়।
সে যেন এঞ্জেলিকার চিরকালীন ঘুমঘর।
খোলা শার্সির বাইরে পান্ডুর বিকেল, তাকিয়ে ছিল অতৃপ্ত মেয়েটির খেলা-ভাঙা সংসারের দিকে। ঘরের এদিকে ওদিকে অনেক দাস দাসী। তাদের না তলব করলে তারা সামনে আসে না। শিশুটি চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, হয়ত মশা বা পিঁপড়ে কামড়েছে অথবা গর্ভের সেই চেনা ওমটুকু না পাওয়ার জন্যে অসহিষ্ণু।
তিরেত্তা আর এই দেশে থাকতে চান না। তাঁর মন উড়ে গেছে এখান থেকে। তিনি তাঁর স্বদেশ ইতালিতে ফিরে যেতে চান। যেমন ভাবনা তেমনই কাজ, তিনি কন্যা জয়শেফিনকে সঙ্গে নোএ ফিরতি পথের জাহাজ ধরলেন...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন