![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
মহুলিসোলে মনসামঙ্গল
- বাঘভালুকের ব্যানার্জি বাবু আসি করি
ধলভুমগড়ের শান্তির পেছনে বাঁস করে দিল।
প্রাইমারি
স্কুলের মাস্টার শশধর মাইতি ব্যাংকে ঢুকেই উপস্থিত সকলকে উচ্চগ্রামে জানিয়ে দিল।
কিছুদিন
ধরে দেখছি এক সুদর্শন বছর পয়ঁতিরিশের দীর্ঘকায় ফর্সা ব্যক্তিকে। রঙিন স্টাইলিশ হাফশার্ট,
ঘিয়ে রঙের ফুলপ্যান্ট, আধুনিক জুতো বা নাগরাই,
মাথায় লাল ফেডোরা টুপি, রাজা-মহারাজ ধরনের
মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল আকৃতির পরিপাটি মোছ, ঠোঁটে ঝুলছে কেতাদুরস্ত তামাক পাইপ।
চেহারার মধ্যে বেশ একটা খানদানি ব্যাপার আছে যা একবার দেখলেই মনে থাকে। ইনিই ‘বাঘভালুকের ব্যানার্জি’।
ব্যানার্জির পিছনে ছায়াসঙ্গী বডিগার্ড মানিক, হাঁটু অবধি গোটানো লুঙ্গি অথবা ধুতি, গাঢ় কালো শরীরের উলঙ্গ উর্ধাংশ পেশীবহুল ও সুগঠিত, বাঁ হাতে বল্লম আর ডান হাতের ছাতা ব্যানার্জির মাথায় ছায়া দিচ্ছে। মানিকের গুরু গম্ভীর চালচলন দেখে মনে হয়, যেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা কে নিয়ে রাজপরিদর্শনে বেরিয়েছে।
সময়টা আশির দশকের গোড়ার দিকে, নিস্তরঙ্গ ছিল ধলভূমগড়। একটু আধটু তরঙ্গ ওই গ্র্যাভেল(মোরাম)-এর ধান্দা ঘিরে। গ্রাভেল আর তার খননের খাদানই ছিল সব আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু। রেল স্টেশন থেকে এন এইচ ৩৩, স্থানীয় ভাষায় ‘বোম্বে রোড’ নামে পরিচিত, এই এক কিলোমিটার রাস্তাটুকু ছিল ধলভূমগড়। ধলভূমগড় আর নরসিংগড়ের মাঝে শালবন ছাড়িয়ে বিস্তির্ন খাদান। সেখান থেকে ট্রাকে গ্রাভেল লোড হয়। আছে তিনটে জনপ্রিয় সমাগমস্থল, বোম্বে রোডের ধারে, শাল বনের ছায়ায়, চুলকাটা পাঞ্জাবি ‘গোগি’র ধাবা - যাকে সেই সময় লোকে লাইন হোটেল বলত, রেল স্টেশনের কাছে মণ্ডল হোটেল; আর এই দুইয়ের মাঝামাঝি সরকারি ব্যাঙ্ক। সকালের স্থানীয় খবর এই তিনটের একটায় বসলেই জানা যাবে।
এমন জায়গায় ব্যানার্জির মত একটা কেউ উদয় হলে জনসমষ্টি তথ্য সংগ্রহে তৎপর হয়। অতি কৌতুহলী নতুন লোকের পাশে কান খোলা রেখে হাঁটাচলা করে। একটু যারা স্মার্ট সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় - ‘আপনি কে? আপনার উদ্দেশ্য কি? ‘
স্কুল
মাস্টার মাইতি, প্রশ্ন করা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ। একদিন মণ্ডল হোটেলে চা খেতে ঢুকে
দেখি, একটা টেবিলে ব্যানার্জিকে ঘিরে তথ্য সংগ্রহে তৎপর মাইতি মাস্টার আর বিদ্যুৎ দফতরের
মহান্তি।
মাইতি
মাস্টারের প্রশ্ন - ‘ব্যানার্জি বাবু আপনারা ইখানে এখন কি কাজটা করছেন?’
ব্যানার্জি
উত্তর - ‘ইচ্ছেতো আছে একটা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি
করার। কাজও শুরু হয়ে গেছে।’
ওই
জটিল ইংরেজি শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে পরিষ্কার ছিল না। মাইতি মাস্টারের প্রশ্ন - ‘ওই স্যাঙ্গচি
না কি বললেন, সেখানে এখন কি বানাবেন?’
ব্যানার্জি
পাইপ টেনে ধোঁয়া ছেড়ে মৃদু হেসে উত্তর দিল - ‘ওয়াইল্ড লাইফ মানে জন্তু-জানোয়ারের স্যাংচুয়ারি।’
- মানে চিড়িয়াখানা ?
- তা বলতে পারেন। জন্তু-জানোয়ারের বিহেভিরাল
স্টাডি আর কি।
- জন্তু-জানোয়ার মানে বাঘ-ভালুক?
- হ্যাঁ, তা বলতে পারেন।
- বাঘের বিয়েভীয়ার বুঝবেন! তারপর কি করবেন?
- একটা স্নেক পিটের কাজ চলছে।
- স্নেক মানে সাপ! সাপ বেরিয়ে আসবে না?
- পিটের ওয়াল স্টিপ এন্ড স্লিপারি উইথ
প্রটেকশন থাকবে।
মাইতি
ওই ভয়ংকর তথ্য জানার পর সোজা ব্যাংকে পৌঁছে জানাল
- ‘শুনছেন গোস্বামীবাবু ?’
ব্যাঙ্কের
ম্যানেজার হারাধন গোস্বামী নিরুত্তাপ, লেজার থেকে চোখ না তুলে বলল - ‘শুনছি বলুন।’
- বলছে সাপের পিট বানাবে। পিটের দিয়ালটা
টুকু ত্যাঁড়া করে স্লিপ করে দিবে। দেয়াল যেমন ত্যাঁড়া করো কেন; স্লিপ করবেই—মা মনসার
জাত, বাহির হবেই! মনে আছে একটা চিতি সাপ আপনার ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মেরেছিল, আর আপনি
সস্ত্রীক ছোট ছানাটাকে ঘরে ছেড়ে যাত্রাপালার ওখানে হল্লা করে লোক ডাকতে ছুটে ছিলেন।
ইহার পর যেখানে সিখানে কেউটা, অহিরাল, ঘোড়াচিতি, ডোমনা চিতি ঘুরাঘুরি করবে। আরও কি
বলছে সুনুন।
- হ্যাঁ শুনছি।
- বলছে বাঘ আনে উহার বিহেভিয়ার বুঝবে। বাঘে এক ঝাপড়ে মুণ্ডটা
ধড় থেকে আলদা করে দিবে না? বাঘের সঙ্গে প্যাঁদ!
আমাদের গিধনি অধিবাসী মেসের রাঁধুনি শশাঙ্ক, সেও জেনে গেছে ব্যানার্জির গল্প। ভাত বাড়তে বাড়তে শশাঙ্ক আমায় উত্তেজিত হয়ে জানাল - ‘কোকপাড়া যাবার রাস্তায়, সাপ ধরে রাখবে তো তার একটা ইহা বানাচ্ছে। কি বিপদ বুঝছেন! হামদের গাঁয়ের দিকে একটা সাপ আছে, কামড়াবে তো গাছে উঠে বসে থাকবে, সাপেকাটা মানুষের লাস পোড়া দেখতে। ধুয়া দেখে গাছ থেকে নামবে। এখন কি হবে বলত!’
বাংলা যাত্রা পালার রসিক গোগি, ওর বুলেট মোটরবাইকে আমায় নিয়ে ঘাটশিলা, ঝাড়গ্রাম ও বহরাগোড়ায় মাঝেমাঝে যাত্রা পালা দেখতে যায়। করিতকর্মা গোগি, ধাবার কারবার ছাড়াও হাইওয়তে দুর্ঘটনা গ্রস্থ বাহনের মাল সরিয়ে ফেলার অন্য সাইড বিজনেস ও করে। গোগি নিজে খালাসি বা ড্রাইভারের সেবা শুশ্রূষা, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি সামলায়। গোগির ভাই কক্কে বাহনের মাল সরান ও বিলি বিতরণের ভার সামলায়। কিছু বিনিময় মূল্যে দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাহনের নিকটবর্তী গ্রামের লোক বিশ্বস্ত খবর গোগি’র কাছে পৌঁছে দেয়। সংলগ্ন থানা থেকে ও অকুণ্ঠ সহযোগিতার হাত সতত সম্প্রসারিত, সে হাত অবশ্যই খালি ফিরে যায় না। সর্ব সাধারণ থানা পুলিশের ঝামেলায় ফাঁসলে গোগী একমাত্র ভরসা। কক্কে ওই সরান মালের মাকেটিং ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে পরবর্তীকালে নিজের ট্রাক পরিবহন সংস্থা ‘খালসা রোডলাইন্স’ বাস্তবায়ন করে।
পাকেচক্রে এক সন্ধায় ব্যানার্জি’র সাথে আলাপ হয়ে গেল গোগি’র লাইন হোটেলে। ধাবার খাটিয়ায় বসে গোগী পরিচয় করিয়ে দিল ব্যানার্জির সাথে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভাবলেশহীন বলবান মানিক।
অত্যন্ত
অমায়িক ব্যানার্জি অনর্গল এক তরফা বাক্যালাপে জানিয়ে দিল সে কতবার আমেরিকা আর ইউরোপ গেছে, ওর জটিল ইংরিজি নামের থিসিস পড়ে এডিনবার্গ-এর
বাঘাবাঘা বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা কি পরিমাণ মুগ্ধ হয়েছিল, ক্যালিফোর্নিয়ায় অবিশাস্য
দামে কোন পরিধান কিনেছিল। প্রথম আলাপেই আর্থিক স্বাচ্ছন্দের অফুরন্ত ফিরিস্তি শুনে
সন্দেহ হয়, মতলবটা কি!
গোগি
লম্বা চায়ের গ্লাসে লাইন হোটেলের দুধের চা আমার হাতে দিয়ে নিচু গলায় বলে - ‘বহুত ডিঙ
(মিথ্যে) হাঁকতা হ্যায়, সম্ভালকে পিজিয়েগা।’
কথায় কথায় ব্যানার্জি প্রস্তাব দিল - চলুন একদিন আমার মহুলিসোলের আস্তানায়। সাপের কালেকশন দেখে আসবেন। ওই সুযোগে কুটু বাবুর সাথে পরিচয় করে আসব।
ঝন্টুচরণ শ্যামল, কুটু বাবু নামেই জনপ্রিয়, মহুলিসোলের পুরোনো জমিদার বংশোদ্ভব অধুনা পয়সাওয়ালা কংগ্রেসই নেতা। তার বাংলা সাহিত্যের সংগ্রহ থেকে বই ধার করে আনতে প্রায়ই সন্ধ্যায় তার বাড়িতে আমার আনাগোনা হয়। কুটু বাবুকে সাহিত্য আলোচনার সুযোগ করে দেওয়ায় আমি তার প্রিয় পাত্র।
ব্যানার্জির
দুঃসাহসিক সাপখোপ ধরার গল্প মাঝে মাঝে কানে আসে।
ব্যানার্জি আর মানিক, দুটি চরিত্রই আমার কাছে ব্যতিক্রমী ও বিচিত্র।
অফিস
ছুটি হওয়ার পরে রোজ সন্ধ্যায় ধলভূমগড় রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে বসে সিগারেট খাওয়ার নিত্য
অভ্যেসআমার। একদিন মানিক একা হাজির আমার সামনে - ‘সাহেব বলেছেন আপনাকে ঘরে নিয়ে যেতে।’
আমার
কোনো আপত্তি নেই। তবে মানিককে একা পাওয়ায় আজ কৌতূহল নিরসন করার সুযোগ ছাড়লাম না।
- সিগারেট শেষ করে যাব।
উন্মুক্ত
আকাশের নিচে প্লাটফর্মের সিমেন্টের চেয়ার এড়িয়ে
মাটিতে এক পাশে মানিক, হাঁটু মুড়ে উবু হয়ে
বসলো।
- তোমার বাড়ি কোথায় মানিক।
- মহুলিসোল আজ্ঞা।
- ব্যানার্জির সাথে পরিচয় কি করে হলো?
- হামি তো দিনে গরুছাগল চরাতি আর রাতের
গাড়িতে চালকলের মালিক শঙ্করলাল আগরওয়ালের মাল উঠাতি আর নামাতি। একদিন ওই হামদের সাহেবের
মাল পঁহুচাই দিলাম তো উনি হামায় পসন্দ করে রেখে নিলেন।
কথা
শেষ করে মানিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
- একা ইন্দুবাবুর দশটা খাদান সামাল দিতাম।
হামাকে সবাই ডরাতো। কপালটা হামার খারাপ। খাদানে ঝামেলা হলো। অপোজিট পার্টির লোক মাইরলেন
হামার অজায়গায়। ইন্দুবাবুকে ভগবান মাইনতম। তিনি তো থানায় হামাকে চিহিনতে লারলেন। ঝন্টু
বাবুর কৃপায় রেল হাসপিটালে চিকিচ্ছা হল। এক বছর বিছনা নিলি। শরীলটা বাঁচলো কিন্তু অকাজের
হয়ে গেলো। শরীলটায় দমে কমজোরি।
বাবুদের
দল মানিক কে দিয়ে কাজ গুছিয়ে নিয়ে ওকে ছি্বড়ে
করে ফেলে দিয়েছে। পেশীবহুল ঈর্ষণীয় স্বাস্থ্যের মানিক এখন শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছে!
- ঘরে আর কে আছে?
- একটা বোন। উহার মরদটা ছাইড়ে গেল। পালালো
না মাইরলো, কে জানছে!
- পালালো না মারলো মানে?
- কেঁড়ুকোছার স্টোন ক্রাশারে মঙ্গল, হামদের
জামাই, কাম কইরতো। একদিন গায়েব হয়ে গেলো। দুমাস বাদে হামি কেঁড়ুকোছা গেলি। উহাদের মালিক
বইললো তিন মাস আগে মঙ্গল পগার(মজুরি) নিয়ে পালাইছে। উহার এক বতসর বাদে কোকপাড়ার বাগুন
মার্ডির জামাইটা বৈললো, মঙ্গল পাথর চাপা পড়ে মরেছে।কোনটা সত্যি, কে বইলবে বলো? বোনটা
হামার ঘরে থাকে।
সাহেব
আসে হামাকে বাঁচালেন। হামার আর বোনের কাম মিললো সাহেবের কাছে।
মানিকের সাথে পৌঁছলাম ব্যানার্জির ডেরায়। ইলেকট্রিক গ্রিডের কর্মচারীদের একটা সাবলেট করা কোয়াটারে ব্যানার্জির বাস।
- আসুন স্যার। কি সৌভাগ্য আমার। এই আমার
স্পার্টান মিনিমালিস্ট হোমস্টেড। প্লেইন লিভিং হাই থিংকিং।
ঘরে
একটি তক্তপোশ, একটা ছোট ফ্রিজ ও দুটি VIP সু্টকেস। দেওয়ালে চার-পাঁচটা পেরেক ঠুকে হ্যাঙ্গারে
ঝোলানো জামা প্যান্ট। জানতে পারলাম তক্তপোশ আর ফ্রিজ সাবলেট করা কোয়াটারের সাথেই এসেছে।
পাশের রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। রান্নার সুগন্ধ আসছে।
ব্যানার্জি
মৃদু হেসে হাঁক দেয় - ‘গুরু শোন।’
দরজার
আড়াল থেকে বেরিয়ে এল বছর বাইশ তেইশের কৃষ্ণকায় সুঠাম চেহারার একটি মেয়ে।
মানিক
জানিয়ে দিল - ‘হামার বহীন - গুরুবারি।’ বুঝলাম সুস্বাস্থ্য মানিকের পারিবারিক সম্পদ।
- এনাকে চিনিস? ব্যাংকের সাহেব।
সাঁওতালি
স্বভাব সুলভ অপ্রতিভতায় গুরুবারি মাথা নাড়ল, যার অর্থ হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে।
মানিক
জানাল - ‘এই বাবুই গুরুর রেশম লোন করার কাগজটায় টিপ ছাপ করালেন। ‘
সে সময় এই অঞ্চলে উপজাতীয় সম্প্রদায়দের সেরিকালচার বা রেশম পোকা চাষের জন্য গন ঋণ বিতরণ বাস্তাবায়ন করতে রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক গুলোর উপরে সরকারি চাপ ছিল। আমি সেই ঋণের ডকুমেন্টেশন করাতাম। ডকুমেন্টেশন মানে, মাথা নিচু করে এক গুচ্ছ কাগজে একে একে কয়েকশো মহিলা ও পুরুষের বুড়ো আঙুলের টিপ ছাপ নেওয়া। কারুর মুখের দিকে চেয়ে দেখার সময় থাকতো না। মিস করে গেছি গুরুবারির মতো সুশ্রী দেহাবয়ব। আফসোস হলো। ব্যাচেলর আমি কেন এতদিন এরকম একটা কাজের মেয়ে জোগাড় করার কথা ভাবিনি।
ব্যানার্জি
মাদুর পেতে বললো - ‘আজ রাতে খাওয়ার লোক একজন বাড়লো। কয়েকটা বেশি রুটি বানাবি। দুটো
গ্লাস নিয়ে আয়।‘
এক
লহমায় গুরুবারি দুটো কাচের গেলাস আর একটা প্লেটে বাদাম চানাচুর এনে রেখে দিল।
- কি চলে স্যার? হুইস্কি না রাম?
আমি কোনোদিন এসব নিজের টাকায় কিনে খাইনি। তবে পরের পয়সায় অত্যন্ত উদার, তরলের প্রকার বাছবিচার করি না। তিন পেগ পর্যন্ত গলাধঃকরণ করে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে বমি করি।
ব্যানার্জির
কথা অফুরন্ত। পকেট থেকে একটা পেন বার করে বললো - ‘ওয়াশিংটন থেকে এই পেনটা একটা বিড
প্রাইস এ ওয়ান থাউসেন্ড ডলারে কিনে ফেললাম। এতো কলেক্টর্স আইটেম, দাম দেখা চলে না।
‘
সে
সময় হাওড়া স্টেশনের গেটে হকাররা ওই পেন চোখের সামনে ঠেলে দিয়ে, নিত্য অভ্যাসে পরিণত
হকারসুলভ বাক শৈলীতে হাঁক দিত ‘চায়না উইনসাং পেন’। ব্যানার্জির দুঃসাহসী চালিয়াতি
শুনে আমার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল - ‘বাঃ! চমৎকার।’
- আজকের আসল অতিথির সাথে তো আপনার দেখা
করানো হয়নি। গুরু আজকের ধরা টা নিয়ে আয়।
গুরুবারি একটা দইয়ের হাঁড়ি নিয়ে এল। হাঁড়ির মুখে বাঁধা লাল কাপড়টা এক টানে খুলে ফেললো। ব্যানার্জি একটা চার ব্যাটারির টর্চের লাইট মেরে হাঁড়ির ভিতরটা আলোকিত করে বলে - ‘চেনেন এটিকে’?
আমি
হাঁড়ির ভিতর উঁকি মেরে দেখি গায়ে বাদামের মত ছাপছাপ দাগকাটা একটা দশাসই সাপ কুণ্ডলি
পাকিয়ে শুয়ে আছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হলো নিরীহ। একদিক প্রশ্ন চিহ্নের মত বাঁকানো একটা
সিক দিয়ে ব্যানার্জি হাঁড়িটা ঠক করে টোকা মারতেই হাড় কাঁপান তীব্র হিস শব্দ হাঁড়ির
থেকে বেরোতে থাকলো। সিক দিয়ে সাপের শরীর স্পর্শ করতেই স্প্রিং ছেঁড়া ক্ষিপ্রতায় সরীসৃপ হাঁড়ির থেকে মাথা
বার করে ছোবল মারল শূন্যে। ঘটনার আকস্মিকতায় দুর্বলচিত্ত আমি ছিটকে পড়ে যাচ্ছিলাম।
গুরুবারি চেপে ধরে সামাল দিল। সাপ আবার তার কুণ্ডলীতে গুটিয়ে গেছে।
মানিক
ভাবলেস হীন মুখে বলে - ‘ভয়ের কিছু নাই।‘
গুরুবারি
সাপের হাড়ির মুখ লাল কাপড়ে বন্ধ করে ফেলেছে। ব্যানার্জির মুখে দি্গবিজয়ী বীরের হাসি।
বলে
- ‘ইন্ডিয়ান ওফিওলজির পিতৃপুরুষ প্যাট্রিক
রাসেল স্কটল্যান্ড থেকে ইন্ডিয়ায় এসে এই সাপ
আবিষ্কার করেন। তাই এর নাম রাসেল’স ভাইপার।
বাংলায় চন্দ্রবোড়া। এই সাপের হেমোটক্সিক ভেনম ইz কন্সিডার্ড ওয়ান অফ দ্য টপ ডেডলি থ্রি
অন আর্থ। যদিও টাইপান আর ব্লাকমাম্বা বোধহয় আরো ভেনোমাস, তবে সে সব ইন্ডিয়ায় দেখা যায়
না। তাই রাসেল সাহেবের ভাইপার ইন্ডিয়ায় সবচেয়ে
বিষাক্ত। এখানকার লোকে সব সাপকে চিতি সাপ বলে। রাসেল’স ভাইপার ও ওদের চিতি।’
আমি ভিত হয়ে বলি -’গুরুবারি হাঁড়িটা ভিতরে নিয়ে যা।‘
গুরুবারি
হাঁড়িটা তুলে নিয়ে বলে -’কিছু নাই। এই হাঁড়িগুলা পাশে রেখে হামি ঘুমাই।’
বলে
কি ? ঘুমায় কি করে! ওই চন্দ্রবোড়ার ছোবল আমি দুঃস্বপ্নে দেখে উঠে বসবো।
- আসুন আজ আপনার সম্মানে ওল্ডমংক আর মাংস-রুটি।
ব্যানার্জির
অফুরন্ত গল্প। হিউইট সাহেবের সাথে পাপুয়া নিউগিনিতে লোকাল ট্রাইব্যাল ওঝা কে নিয়ে টাইপেন
সাপ ধরার এডভেঞ্চার। পেরুর মাদ্রে-দি-দিওস নদির অববাহিকায় পুমা আর জাগুয়ার দর্শন করতে
গিয়ে কীভাবে বিপদে পড়েছিল।
আমার
ভৌগোলিক জ্ঞান টাটানগর থেকে ধলভূমগড়। আট বছর বয়সে মা-বাবার সাথে কলকাতার চিড়িয়াখানা
দর্শন করতে গিয়ে বাঁদর কে ভেজা ছোলা দিয়ে ছিলাম, যা সে আমার মুখে ছুঁড়ে মেরে ছিল। তাই
আজও মনে আছে।
এছাড়া বন্যপ্রাণীর জ্ঞান বলতে ছোটোবেলায় রোমান সার্কাসে দেখা বাঘ, সিংহ । ঠিক কখন ব্যানার্জির গল্প সত্যি অতিক্রম
করে মিথ্যের জাল বুনছে সেটা ধরতে পারা আমার অসাধ্য।
মানিক
আর গুরুবারি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে শোনে আর আমার দিকে তাকায়, ভাবখানা - ‘বোঝো, কি জিনিস
আমাদের সাহেব!’
সেই
রাত্রে মানিককে নিয়ে টালমাটাল হয়ে বাড়িফেরার পর ব্যানার্জি চরিত্র নিয়ে মাথায় অনেক
ভাবনা চিন্তা পাক খেয়েছে। লোকটা বন্যপ্রাণী
শাস্ত্রে জ্ঞানের ভান্ডার। সে জ্ঞানের ব্যাপক ব্যাবহারিক প্রয়োগে মানুষটা অন্য মাত্রায়
পৌঁছে গেছে। চরিত্রের ওই অপ্রয়োজনীয় মিথ্যে বাগাড়ম্বর, বাকি গুনের সাথে মেলেনা। হতে
পারে চার্লস শোভরাজের মত প্রতিভাবান দুষ্কৃতী।
কিন্তু এখানে কি দুষ্কর্ম সে করতে পারে?
ব্যানার্জির অনুরোধে একদিন ওকে নিয়ে কুটু বাবুর বাড়ি উপস্থিত হলাম।
সর্বদা
সাদা ধুতি আর লম্বা হাঁটু অবধি শার্ট, ঝন্টুচরণ শ্যামল বাড়িতে শিক্ষিত লোকজনের আনাগোনা
ভালবাসে। আচার রীতি রেওয়াজে সেই পুরোনো বনেদি আপ্যায়নের সুযোগ পেলে খুব খুশি। আপাত
অমায়িক ঝন্টুচরণ এলাকায় কুটুবাবু নামেই পরিচিত। লোকে বলে স্বার্থক নামা কুটুবাবু, কূটবুদ্ধি
দিয়ে গ্রামের ঝগড়া ঝামেলা সালিসি করে আখের গোছানোয় নাকি সিদ্ধ হস্ত।
মাথায়
লাল টুপি, ঠোঁটে পাইপ ঝোলানো সুদর্শন ব্যানার্জি, পিছনে ছাতা আর বল্লম হাতে মানিক,
সঙ্গে ব্যাংকের বাবু, সবমিলিয়ে মহুলিসোলবাসীকে দেখানোর জন্য ঝন্টুচরণের আদর্শ অতিথি।
অমায়িক
ঝন্টুচরণের শকুনি চোখ, শিয়ালের ধূর্ততায় আপাত নিরীহ কিছু বিনয়ী প্রশ্ন করলো, যা আমার
মাথায় কোনো দিন আসেনি। সে সব প্রশ্নের জবাবে একাধিক স্ববিরোধ বেরিয়ে এল।
- তোমার মত কৃতী মানুষ এই প্রথম এখানে
পা ফেলেছে। এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। তোমার কাছে জানতে ইচ্ছে করে একটা বড় মানুষ হয়ে
উঠতে কতটা সাধনা করতে হয়। শুনেছি তুমি বিদেশে পড়াশোনা করেছ। আমার ইচ্ছে বড়টাকে বিদেশে
পাঠানোর। তুমি কীভাবে গেছিলে?
- আরিজোনা থেকে বড় জেঠু প্রায় জোর করে
ধরে নিয়ে গেল রিসার্চ স্কলারশিপ করাতে।
এভাবেই বিভিন্ন কথার ফাঁকে ঝন্টুচরণ তার সুপরিকল্পিত প্রশ্নবাণ ঘাগু ডিপ্লোম্যাটের মত অতি মার্জিত বাক্য বিন্যাসে ছুড়তে থাকে।
- এটা কোন সালের ব্যাপার ? তখন কি বিদেশ
যাওয়া এতটা কঠিন ছিল?
- কর্মজীবন কোথায় কবে শুরু করলে?
- ভাবা যায় না এই বয়সে তুমি এত সব করে
ফেলেছো!
- বিদেশ যেতে কোন ভালো কলেজের ডিগ্রী দরকার
হয়, তাই না?
এই
প্রশ্নমালা ক্রমাগত নয়, কথা প্রসঙ্গে কিছু কথার ফাঁকে ফাঁকে পেশ করা হল। বেশি কথা বলার
অভ্যেসে প্রতিটার জবাবে ব্যানার্জির দীর্ঘ বিবরণ। আর সে বিবরণ শেষ হলেই মুখখানা অভিভূত
করে ঝন্টুচরণ পরের জিজ্ঞাস্য মেলে ধরে।
ব্যানার্জির
‘ডিং’ হাঁকা জবাব - ‘আমি তো প্রেসিডেন্সি কলেজ
থেকে ফার্স্ট ক্লাস গ্রাজুয়েট ছিলাম। সেটা
তো একটা ফ্যাক্টর ছিলই। ‘
এরকম নির্বোধ গাঁইয়া শ্রোতাদের মুগ্ধ করতে ব্যানার্জির ‘ডিং’ লাগাম ছাড়ায়। আরিজোনার জ্যেঠু কখনো ক্যালিফোর্নিয়ার হয়ে যায়। বিভিন্ন সাল-তারিখ, ব্যক্তি বিশেষের ভৌগোলিক অবস্থানের স্ববিরোধ ঝন্টু চরণ মনে মনে টুকতে থাকে। কিন্তু সর্বক্ষণ মুখখানা হাঁ, যেন বিস্ময়ে হতবাক আর মন্তব্য - ‘ভাবা যায়! এ তো অসাধ্য সাধন!’
প্রগলভ
ব্যানার্জি আরো তোল্লা পেয়ে পরিমিতি ভুলে যায়।
অবশেষে ব্যানার্জির আসার আসল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যান শুরু হয়। মানিকের ঘরের পেছনে শাল বনের
ধার ঘেঁষে ঝন্টুচরণের জমিটা ব্যানার্জি তার অভয়ারণ্যের কাজে ব্যবহার করতে চায়। তাই
বছর খানেকের লিজ বা খাজনা ব্যবস্থার অনুরোধ।
রাজনীতি করা ঘোর বিষয়ী, ঘোড়েল ঝন্টু চরণ এক লহমায় হিসেবে করে নেয়। জমিটা রেলের, যদি ও লোকে জানে ঝন্টুচরণের মালিকানায়। মোটা টাকা প্রথমে জমা নিয়ে নিলে ব্যাটা পালিয়ে গেলেও অসুবিধে হবেনা। পাঁচ হাজার টাকায় এক বছরের কড়ার। কোন কাগজপত্রের দরকার নেই। ঝন্টুচরণ নিশ্চিত, উল্টোপাল্টা কিছু হলে অনায়াসে ব্যানার্জিকে উৎখাত করে দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে।
একটা
চেক লিখে দিয়ে ব্যানার্জি মানিক কে নিয়ে মহানন্দে রওনা দিলো। আজ রাতে ও মানিকের ঘরেই
থেকে যাবে। কাল থেকেই কাজ শুরু।
ব্যানার্জি
নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর ঝন্টু চরণ আমায় জানিয়ে দিল - ‘লোক খুব সোজা নয়। কোন টাকা পয়সা
ধার দিয়ো না। ওর সাথে একটু বুঝেশুনে চলবে।’
অল্প সময়ে ব্যানার্জি ওই শালবনের পাশের জমিতে মাটি আর সিমেন্ট দিয়ে একটা চারভাগে ভাগ করা চৌবাচ্চা বানিয়ে সাপখোপ রাখা শুরু করল। এক রবিবার ব্যানার্জি আমায় সদ্য নির্মিত আস্তানায়, সরীসৃপ সংগ্রহ দর্শনে নিয়ে এল। মানিকের ঘরের গা ঘেঁষে একটা এসবেসটাসের ছাদ ঢাকা চার ফিট উঁচু প্রকোষ্ঠে বিচিত্র ধরনের বিশাল আকৃতির একাধিক গিরগিটি, কোনোটার গায়ের রং সবুজ, পায়ের পাতা থাবার মত মাটিতে ছড়িয়ে গেছে। কোনটা বিশাল লোমশ কিম্ভুত।
- এই সবুজ লিজার্ড-টাকে ক্যালটেস গ্রান্ডিস্কোআমিষ
বলে। আর এই থিক বুশি টেইল লিজার্ড, নাম ‘সারা হার্ডউইকি’, এরা শীতকালে ঝোপঝাড়ে মাটির
নিচেই থাকবে, তাই ওই মাটির ঢিবি। স্প্রিং সিজিনে বেরিয়ে আসে। বড়ো পাখি আর জড়িবুটি-ওয়ালাদের
আক্রমণে এই সব স্পিসিস এণ্ডেনজার্ড।
এধরনের সরীসৃপ ফুটপাথে ‘সানডে কা তেল’ বিক্রেতাদের কাছে দেখা, ঠাকুমার কাছে জেনেছি
ওকে কাকলাস বলে। ব্যানার্জি এবার সাপের পিট পরিদর্শনে নিয়ে এল।
তারের
জালে ঢাকা চারটে প্রকোষ্ঠে বিভক্ত চৌবাচ্চায় রকমারি সাপ, কোনোটা গোল গুটিয়ে কুঁকড়ে
আছে, কোনোটা সরীসৃপের গতিতে কিলবিল করছে।
- খুব হিসেবে করে রাখতে হয়। নতুবা খাওয়া-খায়ি
করে একটা আরেকটাকে শেষ করে দেবে।
- এই সব কে, কি খাওয়ান?
- লিজার্ডদের জন্য আসে ঘাসপাতা, শিকড়,
ফড়িং, পোকামাকড়। আর স্নেক দের বরাদ্দ ব্যাং, গেঁড়ি-গুগলি, ইঁদুর,গিরগিটি। গুরুবারি
লোকাল সাপ্লাই চেন তৈরি করে ফেলেছে। আমাকে মাথা ঘামাতে হয় না।
- এসব পুষে এবার কি করবেন?
জানলাম
প্রাণী বিদ্যার এই বিষয়টিকে নাকি হারপাটোলজি বলে। ব্যানার্জি সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর
আচরণ গবেষণা নিয়ে এক দীর্ঘ ব্যাখ্যান দিল। সব শোনার পর ব্যানার্জির ওপর আমার সম্ভ্রম
বেড়ে গেল। আমার দেখা জ্ঞান যজ্ঞে নিমগ্ন মানুষ অযথা মিথ্যে কথা বলে না। তাই ব্যানার্জি
চরিত্রের ধন্দ আরও গভীর হল।
দিন পনেরো পার হতেই এসে পড়লো মনসা পুজো। প্রতিবছর আমি এদিনে ঝন্টু চরণের নিমন্ত্রিত। সে দিন মহুলিসোলের হাট প্রাঙ্গণে পেশাদার ও শৌখিন সাপুড়ের দল সাপের ভেলকি দেখাতে জড়ো হয়। ছোটবেলায় জানতাম, সাপুড়েরা সাপের বিষদাঁত ভেঙে দেয়। কথাটা যে পুরোপুরি সত্যি নয় মহুলিসোলের মনসা পুজোর মেলায় হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি। সাপের ভেলকি দেখাতে প্রতি বছর সাপের কামড়ে এক আধটা সাপুড়ের প্রাণ সংশয় হয়। মৃত্যুও হয়। তাই মাহালিশোলর মনসা পুজোয় সাপ মেলা ঘিরে মানুষের এত উত্তেজনা।
আজ
ও মেলায় জমায়েত ভালোই হয়েছে। সাপুড়েরা একটা জলচৌকিতে পরপর চার পাঁচটা সাপকে মাটির হাঁড়ির
থেকে বার করে টোকা মেরে তাতিয়ে দেয়। আর উদ্যত
ফণার সামনে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি গুটিয়ে খোল করতাল
সহযোগে উদ্দাম নৃত্য ও গান।
ওমা মা মনসা শিব কন্যা
তুমি মাগো কমলে কামিনী
চাঁদ সওদাগর মইল্লো কবেই
আমরা তোমার ভক্ত মাগো
ওমা জয়ও বিষহরি
নৃত্যদলে লাল টুপি মাথায়, হাফ প্যান্ট পরা মুখে পাইপ নিয়ে ব্যানার্জি ও তালি বাজিয়ে নাচছে। একবারে ইস্ট-ওয়েস্ট ফুউশন।
ছোটোবেলায় দেখেছি মাথায় পাগড়িওয়ালা সাপুড়ে বেতের চওড়া ঝুড়ি থেকে সাপ বার করে বিন বাজায়, আর বিষধর উর্ধ্বমুখী পেন্ডুলামের মত ফণা নাড়ায়। তখন মনে হতো একটা বিন থাকলে আমি ও সাপ পুষতে পারতাম।
ব্যানার্জি
বেলা পর্যন্ত সাপ খেলা দেখিয়ে সন্ধ্যায় মানিক কে
বলল ঝন্টু চরণের বাসায় আমায় পৌঁছে দিতে।
ঝন্টু
চরণের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে তখন মানভূমী গানে মনসামঙ্গল পালা চলেছে।
ভক্ত
পুরুষ শিল্পী মহিলার সাজ পোশাকে নিবেদন করে -
ওমা
কতো সাস্তি পালো
সাজা
পালো চাঁদসদাগরে
সাত
পুত্র হারালো মা
তুমার
পূজা না কইরে
উপাস
করে আছি মাগো
আমি
তোমার চরণ তলে
ই
বছর নাই পারি জুটাতে কিছু মাগো
পূজা
কইরবো আমি ফুলে জলে
অভিনয় ও গানে সব শিল্পী পুরুষ। মহিলার সাজে ক্রুদ্ধ পুরুষ মা মনসা চাঁদসওদাগর কে ভয় দেখায় -
তোর
সাত ছিলাকে মাইরে দিলাম
মইরবে
লখিনদর
অভিভূত ঝন্টু চরণ বলে - ‘নিবারণ ওই গানটা আবার বল।‘
আমি
ঝন্টু চরণের পাশে বসে সেই গান আর জলযোগের বিশেষ ব্যবস্থা উপভোগ করছিলাম। মানিক যথা
রীতি মাটিতে উবু হয়ে বসে আছে। ঝন্টু চরণের কৃপায় এই দিন মুড়ি আলুর চপ আর পালা গান শেষ
হলে বেগুন ভাজা ও খিচুড়ি বরাদ্দ। এভাবে কয়েক
ঘন্টা কাটানোর পর হঠাৎ খালি গায়ে দুতিন জন গ্রামবাসী হাপাঁতে হাপাঁতে মানিকের কাছে
হাজির হল। তাদের চোখে মুখে উত্তেজনা। মানিকের কাছে এসে তারা ফিসফিস করে বলল
- জলদি আসবি মানকে। সাহেব ঝামেলা করে পালাচ্ছে।
- পালাচ্ছে? কি বলছিস তুই?
মানিক
আমায় টেনে নিয়ে বলে - ‘কিছু বিপদ হলো বুঝাচ্ছে। আপনি টুকু চলেন।’
স্রেফ
কৌতূহলেই আমি ওদের পিছনে দ্রুত পায়ে অনুসরণ করলাম। ঝন্টু চরণের চোখ কিছুই এড়ায় না,
একটা ঝুট ঝামেলা আন্দাজ করে সে দলের অনুগামী হলো। হয়ত তার কাছে আগেই খবর ছিল।
মহুলিসোলের
মেলা চত্বর খাঁখাঁ করছে। মেলা প্রাঙ্গণের এক কোণে, শালবনের অন্ধকার ঘেঁষে বোম্বে রোডগামী
একটা ট্রাকে কিছু কাঠের মরচে ধরা খাঁচা আর বস্তা তোলার তদারকি করছিল গোগি আর কক্কে।
মানিকের বাসার সামনে অন্য এক ঝড় উঠেছে। গুরুবারি রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করে ব্যানার্জির
উদ্দেশ্যে চিৎকার করছে। ওদের সংলাপ আমি না বুঝলেও মানিক বুঝেছে। ব্যানার্জির ডান হাতে
একটা বিষাক্ত সাপ আর বাঁ হাতে চটের বস্তা। মানিক ক্ষিপ্ত হুংকার দিয়ে বল্লম নিয়ে তেড়ে
গেল ব্যানার্জির দিকে।
- আজ তোকে মরাই দিবো।
গুরুবারি
চিৎকার করে - ‘ই মরলে হামার পেটের ছানাটার কি হবে?’
গুরুবারি ব্যানার্জিকে দুহাত দিয়ে আগলে আছে। ব্যানার্জির হাতে ঝুলে থাকা বিষধর, ফণা মেলে হিসহিস করে। এ যেন দক্ষযজ্ঞ পালায় হর-পার্বতি।
মানিক
এক ঝটকায় গুরুবারিকে সরিয়ে ব্যানার্জিকে মারতে যায় । ব্যানার্জি মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে
যায়। হাতের সাপ ওর বুকে চড়ে ফণা তুলেছে। ব্যানার্জি বাঁহাত দিয়ে সাপটাকে এক ঝটকায় ছুড়ে
ফেলে দিয়ে অস্ফুট ‘উহু’ শব্দ করে। বাঁ হাতের আঙুলে বিষধর ছোবল দিয়ে গেছে।
মানিক
বল্লম ফেলে মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে।
নেতিয়ে
পড়ে থাকা ব্যানার্জি আমার উদ্বিগ্ন মুখের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে অভয় দেয় -’চিন্তা করবেন
না। লিথাল ডোজ দিতে পারেনি। ব্যানার্জি এরকম আগেও সামলেছে।’
ভীত কাক্কে আর গোগি ব্যানার্জির সংগ্রহের সরীসৃপের বস্তা আর খাঁচা গুলোর পাশে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিচক্ষণ ঝন্টুচরণ জানে ওই সরীসৃপের লটবহর এখানে পড়ে থাকলে পরিস্থিতি আর ও জটিল হবে। গোগি কে নির্দেশ দেয় - ‘যেখানে যাচ্ছিস মাল নিয়ে কেটে পড়। এখানে দাড়াস না।’
গুরুবারি এক লহমায় কোথা থেকে একটা ক্রেপ ব্যাণ্ডেজ নিয়ে এসে ব্যানার্জির হাতের আঙ্গুলের ক্ষতটার নিচ থেকে কনুই পর্যন্ত জড়িয়ে ফেললো।
ঝন্টুচরণ কখন নিতাই পণ্ডিতকে ধরে এনেছে দেখিনি। নিতাই কে দিয়ে নেতিয়ে পড়া ব্যানার্জির দক্ষিণ অঙ্গুষ্ঠ একটা সিঁদুর কৌটোয় ডুবিয়ে হতবাক গুরুবারির সিঁথিতে টেনে দিল।
নিতাই
পণ্ডিত বিয়ের মন্ত্র পড়া শুরু করলে ঝন্টুচরণ থামিয়ে দেয়।
- থাক, আর মন্ত্র পড়তে হবে না।
আদিবাসীর বিয়ের মন্ত্র তুই জানিস?
ঝন্টুচরণ এটা কি করল! ব্যানার্জি বেঁচে গেলে যে কোন দিন সরে পড়তে পারে। এরকম বিয়ের অর্থ কি?
বিচক্ষণ
ঝন্টুচরণ মুখ দেখেই বুঝে গেছে আমার প্রতিক্রিয়া।
- এ ব্যাটা কেটে পড়লেও মেয়েটাকে
এখানেই থাকতে হবে। ছোটোলোক গুলো মেয়েটাকে বেজন্মার মা বলতে পারবে না।
এদিকে
বিধস্ত মানিক দুহাতে মাথাটা চেপে ধরে বসে আছে। যে লোকটাকে ঈশ্বর ভেবেছিল সে রাতারাতি
মানিককে না বলে মাল নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। অভয়ারণ্য একটা ভাঁওতা।
একসময়
ইন্দুবাবুকে ভগবান জ্ঞান করে খাদান সামলাতে মন প্রাণ নিঙড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু যেদিন
ঝামেলা হলো, ইন্দুবাবু থানায় পয়সা খাইয়ে নিজের গা বাঁচালো। মানিককে চিনতেও পারেনি।
সেই পুরোনো অজায়গার ব্যাথা আজ আবার কোন অন্য কোথাও মোক্ষম আঘাত দিয়ে মানিকের শরীর ও
মন অবশ করে দিয়েছে। শরীরে আর ও কত অরক্ষিত অজায়গা আছে কে জানে। চক্রবালে মানিকের অনির্দিষ্ট
দৃষ্টি, বলে মানিক হার মেনেছে। বিড়বিড় করে বলে - ‘হামি আর পাইরবো নাই। ‘
ব্যানার্জির বুকে হাত রেখে গুরুবারির অসহায় দৃষ্টি চারিদিক দেখছে। তার মঙ্গল হারিয়ে গেছে পাথর চাপা পড়ে। আজ গুরুবারি যেন আদিবাসী বেহুলা, নিথর লখিনদর কে নিয়ে অনির্দিষ্ট অনন্ত সাগরে ভেলায় ভেসে যায়। দক্ষযজ্ঞ পালা এক লহমায় ঝন্টুচরণের মজলিসের লাইভ বেহুলা-লক্ষিন্দরের মনসামঙ্গল পালায় বদলে গেছে।
ঝিঁঝিঁ
পোকার শব্দ ছাপিয়ে দূরে
ঝন্টুচরণের বাড়ির আংগিনা থেকে মায়াবী
মনসা বন্দনা ভেসে আসছে।
হেই দেখ রে লক্ষ্মীন্দর ছটফট কইরে মরে
কালনাগিনী দংশিলো তার সোনার অঙ্গ জুড়ে
কাঁদিস নাই তুই বাসর ঘরে বেহুলা সুন্দরী
মরা সোয়ামী কোলে লয়্যা তুঁই চলিলি ভাসি
রাত্রির নিস্তব্ধতা খানখান করে খড়গপুর লোকালের তীব্র হুইসল
শালবন চিরে কোকপাড়ার দিকে মিলিয়ে গেল। মনে
শুধু একটাই প্রশ্ন - ‘ব্যানার্জি কি বাঁচবে?’








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন