![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
উঁচুডাঙা
শক্তি গ্লাস ফ্যাক্টরিতে চাকরি পাকা ছিল সুভাষের। নিজে না নিয়ে সুভাষ চাকরিটা পটলাকে দিয়েছিল।
উনিশশো সত্তরে শ্রেণিশশত্রু হিসেবে
শক্তি গ্লাসের মালিক নকশালদের খতম তালিকায় নথিভুক্ত হয়েছিল। আগাম খবর দিয়ে সুভাষ খোদ
মালিককে বাঁচিয়েছিল — একবার নয়, তিন তিনবার।
সেই আগুন ঝরা সময়ে সুভাষের দুটি
ভূমিকা। সে একাধারে নকশাল আবার পুলিশের খোচর। এরিয়ার নকশালদের খবরাখবর সুভাষের কাছে
আগাম থাকত।
এভাবেই কয়েকটা অ্যাকশন ব্যর্থ।
শক্তি গ্লাসের মালিক তো তিনবার। গদ্দারির উৎস যে দলের ভিতরে — খবর এখান থেকেই, কে লিক
করছে বুঝতে সময় যেটুকু, সুভাষ ধরা পড়ে গেল।
গদাই মালির বাগান। সাবেক বেহালার পূবদিকে ষাট বিঘা জমির এই বাগান সত্তরের নকশালদের কাছে ঘন অরণ্যের মর্যাদা লাভ করেছিল। পেয়ারা, সবেদা আর আঁশফল গাছ এতটাই কাছাকাছি আর ঘন, কোন কোন জায়গায় আকাশ দেখা যেত না। হ্যাঁ, সত্যিই অনেক সবেদা আর অনেক আঁশফল গাছ পাশাপাশি, তাদের কান্ডের কাজ কারবার এমনই যে উপরি শাখা ভেদ করে আকাশ দেখা যেত না। এটা ছিল দু তিনটে অংশে আর সেরকমই দিনের আলো না ঢোকা প্রায়ান্ধকার একটা জায়গা নকশালদের কাছে সুভাষের বিচারের জন্য আদর্শ মনে হয়েছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল না, কারণ সুভাষ ধরা পড়েছিল হাতেনাতে।
সুভাষের কপালে পাইপগান। কাজ না
হওয়ায় অগত্যা ভোজালি — পাশ থেকে একজন — সুভাষের গলা লক্ষ্য করে আর গলা বাঁচাতে হাত,
তাতে প্রাণে বাঁচলেও বাঁ হাত থেকে সুভাষের কবজি আলাদা।
দৌড় ছাড়া বাঁচার বিকল্প কিছু ছিল
না। পিছনে নকশালদের হুংকার। তারাও দৌড়ে অনেকদূর। সুভাষ তখন বাঘের তাড়া খাওয়া হরিণশিশু।
শেষশপর্যন্ত একটা পেটো — সরাসরি তার পিঠে, কিন্ত না ফেটে গড়িয়ে কোথাও। নাগালের বাইরে গিয়েও একটানা অনেকক্ষণের দৌড়, যতক্ষণ না চোখে খোয়া বেছানো রাস্তা আর দৈবাৎ
সেই রাস্তায় পটলার সাইকেলের দেখা মিলেছিল।
পটলাকে থামিয়ে তার সাইকেলের রডে
সুভাষ। ফলত সুভাষের কাটা হাতের রক্তে মাখামাখি পটলার সাইকেল, পাজামা, এমনকী পটলার হাওয়াই
শার্ট। টালিগঞ্জের বাঙ্গুর হসপিটালে পটলার সাঁইসাঁই করে ছোটানো সাইকেল থেমেছিল।
এরমধ্যে জল ছিল। কতটা দুধ আর জল
কতটা — তা নিয়ে পরের দশবছর তো বটেই, প্রায় নব্বইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত, নানান কথাবার্তার
মধ্যে সুভাষের এই বীরগাথা উঁচুডাঙা কলোনির বিভিন্ন চায়ের ঠেকে, দরমা ঘেরা ক্লাবের তাস
বা ক্যারমের আড্ডায়, নতুন করে বৃদ্ধ হওয়াদের স্মৃতি হাতড়ানোর প্রতিযোগিতায় ভেসেছিল
অনেকদিন। ভাসতে ভাসতে বদলে গিয়েছিল মূল ঘটনা…
তার দিকে ছোঁড়া পেটো ডান হাতে লুফে সুভাষ ফেরত পাঠাতেই দুজন নকশাল উড়ে সবেদার ডালে। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। গল্প না হয় একটু উড়েছিল, কিন্তু উৎসাহে ভরপুর জনৈক প্রাচীন, সদ্য নবীন বৃদ্ধদের তুড়ি মেরে তার স্বচক্ষে দেখা ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছিল নিজেকে একজন নকশাল হিসেবে বর্ণনা করে। বোমাটা নাকি তিনিই ছুঁড়েছিলেন।
বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়ানো ফিল্ডার
যেভাবে ক্যাচ ধরে সেই ভঙ্গিতে তার দিকে ছোড়া বোমা ডান হাতে নিয়ে, রিটার্ন গিফট হিসেবে
ক্ষিপ্র গতিতে সুভাষ ছুঁড়তেই দুজন কমরেড তো সবেদা গাছের ডালে, একথাটা আগেই, কিন্তু
নতুন যা যোগ হয়েছিল তা হল, আরো একজন শূন্যে। গাছের কান্ড ডাল পাতা ভেদ করে শূন্যে নিক্ষিপ্ত
সেই কমরেড আকাশপানে। তাকে আর কেউ কোনদিন দেখেনি।
বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা আর পুলিশের হয়ে খোচড়ের কাজ করার জন্য সুভাষের প্রাণদন্ডের আদেশ দিয়েছিল বিশু পাল। সুতরাং বিশু পালের হক ছিল, পরবর্তীকালে সুভাষ ও বোম, সুভাষের ক্যাচ লুফে বোম ছোঁড়ার গল্পের মধ্যেকার দুধ আর জল আলাদা করার। তার মেজদা মেদিনীপুরে জেল ব্রেক করতে গিয়ে তিনজন কমরেডের সঙ্গে মারা পড়েছিল পুলিশের গুলিতে। মিথ্যে এনকাউন্টারের গল্প সাজিয়ে তার সেজদাকে পুলিশ গুলি করে মেরেছিল। এই দুই নকশালপন্থী দাদার ভাই হিসেবে বিশুর উপর যে দায়িত্ব চেপেছিল, অঞ্চলের নকশাল নেতা হিসেবে সে তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলেও পরবর্তীকালে সুভাষ ও তার কাটা হাত অথবা সুভাষের রিটার্ন বোম নিয়ে কথাটি বলেনি কখনও, যদিও তখন সে নবীন বৃদ্ধ, তার তখন পঁচাত্তর।
তালে বাকি রইল…
না, বাকি কেউ রইল না —
সুভাষকে নিয়ে হাসপাতালে পটলা। যেহেতু
সে খোচর, থানা থেকে সবরকমের সাহায্য। একমাসের বেশি সময় হাসপাতালে কাটিয়ে সুভাষ পটলার
বাড়িতে, পটলার মায়ের সেবায় ঠিক হতে হতে আরো দু মাস।
তার পরেপরেই সুভাষের ভেল্কি। নব
কংগ্রেসের তরুণ তুর্কি সুভাষ। বাঁ হাত নেই, ডান হাতে তার পাইপগান। তা ছেড়ে পিস্তল হাতে
উঠতে যেটুকু সময়, হাত কাটা সুভাষের নাম উঁচুডাঙা কলোনির মুখে মুখে।
তখনও নব কংগ্রেস। এশিয়ার মুক্তিসূর্যের
উদয় হবার সেই সন্ধিক্ষণে সুভাষের অন্যতম কীর্তি নকশাল ও সি পিএম নিধন।
সুভাষের সামনে ছিল খোলা মাঠ। তার
মাথায় শাসক ও প্রশাসকের হাত। ঠিক সেই সময়, শক্তি গ্লাস ফ্যাক্টরির মালিক সুভাষকে চাকরির
অফার দিতেই সুভাষ পত্রপাঠ তা পটলাকে দিয়ে দেয়। পটলা অবাক হয়নি। এমন কী এর মধ্যে সুভাষের
কোন মহত্ত্ব সে আবিষ্কার করেনি। তার কাছে এটা ছিল স্বাভাবিক। যে পজিশনে তখন সুভাষ,
বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায় তার নাম শুনলে, সেখান থেকে চাকরি! থুঃ থুঃ! হ্যাঁ, এভাবেই,
সুভাষ নয়, অন্যেরা — মানে উঁচুডাঙা কলোনির মানুষেরা, তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।
“অ করব চাকরি? হেই কয় ট্যাকার লিগা?
বলদ নাকি! মন্ত্রী, এম এল এ অরে
ডাকে, টাকা উড়তাসে, চাকরির হোগা মারে।”
১৯৭০ বা ৭৫, উদ্বাস্তু কলোনির বাসিন্দাদের
মনের কথা-বলার ভাষা ছিল এরকম। উঁচুডাঙা কলোনি সুভাষ সম্পর্কে এই রায় জানিয়ে অপেক্ষায়
ছিল, কারণ তারা জানত, সুভাষের এই আয়ু শেষ হল বলে।
এই ধারণার পিছনের অভিজ্ঞতা সমবেত
এবং তা থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের তৎপরতা। কলোনির আপামর মানুষেরা নিশ্চিতভাবেই জানত,
কী হতে চলেছে সুভাষের ভাগ্যে এবং সবাই নিজের নিজের মনের আয়নায় দেখতে পাচ্ছিল, কয়েকদিনের
মধ্যেই সুভাষের দাপট কমে যাবে।
তাই হয়েছিল। সুভাষের রাজত্বের তিন বছরের মাথায়, যখন সে রীতিমতো হাতে মাথা কাটছে, তার সামনে পেছনে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ফাঁকা মাঠ, খদ্দরের সাদা চোস্ত আর পাঞ্জাবি, ছোটখাটো বক্তৃতা দেওয়া নেতা, এমারজেন্সি লাগু হওয়ায় সাপের পাঁচ পা দেখার সেই পর্যায়ে তাকে দেখে সেলাম ঠোকা পুলিশ আর তার প্রাণাধিক প্রিয় সরকার, তাকে মিসা আইনে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
উচুডাঙা যদিও হতবাক, কিন্তু মনে
মনে — কী কইছিলাম না? হইল তো? — ভবিষ্যদবাণী মিলে যাওয়ার আনন্দে চাপা উত্তেজনা যেন
প্রকাশ না পায় সেই লক্ষ্যে নজর, একই সঙ্গে ব্যাপারটা ভালো হল, না মন্দ — বুঝতে না পারার
দিশাহারায় হাবুডুবু খেতে খেতে কয়েকমাস তো বটেই এমন কী বেশ কিছু বছর, অন্তত পুরো এমারজেন্সি
জুরে— যতদিন না সুভাষের ছায়া আবছা থেকে আরও আবছা — ততদিন লেগেছিল উঁচুডাঙার ধাতস্থ
হতে।
সুভাষ জেলে গিয়েছিল সমাজবিরোধী
ছাপ নিয়ে।
ওই সময়ের আশেপাশে উঁচুডাঙার চারজন
সি পি এম ক্যাডার, দু-জন নকশাল জেলে, তার সঙ্গে সুভাষও — বেশ জমকালো আর জমজমাট ব্যাপার
— চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে মাঠঘাট, রাস্তার গল্পে অনেকদিন। সেই গল্পগুলো বছর গড়ানোর
আগেই বদলে যাচ্ছিল, পরের বছরে পৌঁছে চেনা যাচ্ছিল না, তিন, পাঁচ বা দশবছর পরে সবটুকুই
অচেনা।
পাজামা পাঞ্জাবিই সুভাষের সর্বনাশের
কারণ — একথা যারা বলেছিল, তাদের কেউই প্রায় বেঁচে নেই। হাফ নেতা থেকে ফুল নেতা হয়ে ওঠার যাত্রাপথে বিছানো কাঁটার
মহিমা বোঝার আগেই সুভাষ পা পিছলে সুরুৎ করে
জেলে।
উঁচুডাঙা কলোনির ভূমিপুত্র সুভাষ। তার জেলযাত্রা এতদিন মনে মনে — সময়ের অপেক্ষা বা
যে কোন সময় ইত্যাদিতে ঘোরাফেরা করলেও উঁচুডাঙা হা হুতাশ কম করেনি। আমাগো সুভাষ— এই
বোধটাই একমাত্র, সে নকশাল, সিপিএম অথবা অ্যান্টিসোশ্যাল — তার জন্য উঁচুডাঙার আলাদা
আলাদা কামরার বন্দোবস্ত ছিল না — তার একটাই মাপকাঠি — উঁচুডাঙা কলোনির পোলা। অশান্ত সত্তরের শুরুর দিনগুলোর
ঘাড় মটকানো পিলে চমকানো হাড় হিমকরা প্রাত্যহিকতায় অভ্যস্ত উঁচুডাঙার কাছে, সুভাষের
সমাজবিরোধিতা আর আমাগো পোলা, এই দুটো পরিচয় আলাদা ছিল না। অনেক খুন, অনেক বোমাবাজির
মধ্যেও একটা নিশ্চয়তা ছিল — উঁচুডাঙার মানুষেরা
নিরাপদ ছিল। সুভাষ নিরাপত্তা দিয়েছিল।
উঁচুডাঙা ভাবত, এই অশান্ত জীবন সে সাধ করে গ্রহণ করেছিল। ইচ্ছে করলেই শক্তি গ্লাস ফ্যাক্টরির চাকরি পটলাকে না দিয়ে নিজে সুখী গৃহকোণে, আর দশজনের মতো, অথচ দ্যাখো, যে পটলা তার জীবন বাঁচাল, তাকে তার প্রাপ্যটুকু — নিজের পাওয়া চাকরি তাকে দিতে একবারের জন্য অন্য চিন্তা করেনি। সুভাষ আর যাই হোক, বেইমান নয়।
এমারজেন্সি উঠে গেলে এই রাজ্যের
সরকারে বামফ্রন্ট। তার আমলের শুরুতে বিপ্লবী বাম, অতি বিপ্লবী বাম, এমনকী কংগ্রেসের
অ্যান্টিসোশ্যালরা জেল থেকে ছাড়া পেলেও সুভাষ তাদের মধ্যে ছিল না। উঁচুডাঙার নকশাল
বা সিপিএমের বন্দীরা জেল থেকে ঘরে ফিরলেও সুভাষ ফেরেনি।
রাষ্ট্রের চোখে ভয়ানক, বিপজ্জনক
বিপ্লবীরা জেল থেকে যখন পটাপট ছাড়া পেয়ে গেল, অথচ সেই স্রোতে সুভাষ নেই — খুবই আতান্তরে
উঁচুডাঙা — মত ও মতান্তর, তারই মধ্যে নানাবিধ সম্ভাবনা ডানা লাগিয়ে উড়তে থাকল।
এ ব্যাপারে উঁচুডাঙার জেল ফেরত
কমরেডরা কিছুই বলতে পারেনি। তাদের এবং সুভাষের জেল আলাদা, কাজ আলাদা, রাজনীতি আলাদা,
শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গিতে মেরুসদৃশ তফাৎ — তাদের কাছে খবর থাকলেও, এসবই ফালতু ব্যাপার
জ্ঞানে তাদের যেখানে চুপ থাকাই রীতি — এমনই যখন উঁচুডাঙার ধারণা, সুভাষের জেলের বাইরে না আসার কারণ সম্পর্কিত ধারণাগুলো আরো
বড়ো— সংখ্যায় অনেক শাখা প্রশাখা নিয়ে অনেকটা
খোলা জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
একটা খবর নিশ্চিত যে ওই জেলে বন্দীমৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। জেলব্রেক — যা নকশালপন্থী বন্দীরা সেই সময়ে বিভিন্ন জেলে — না, সেসব ওই জেলে ওই সময়ে হয়নি। স্মৃতি, তথ্য সব যাচাই করে এই সিদ্ধান্তে উঁচুডাঙা। এমন কী রোগে বা অসুখে সুভাষের মৃত্যু — এ ব্যাপারে যে তথ্য, সেসবের কোনও সম্ভাবনা ছিল না। উঁচুডাঙায় সরকারি চাকুরে বেশ কয়েকজন, তারমধ্যে রাইটার্সের খোদ হোম ডিপার্টমেন্টে একজন — ঘোড়ার মুখের খবর, শেষ দশ বছরে জেলের মধ্যে নানান কারণে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে সুভাষের নাম নেই।
সুভাষকে আর দেখা গেল না, কিন্তু সে থেকে গেল উঁচুডাঙার গল্পে-গুজবে-কথায়-উপকথায়। কথার পর কথা, একটার সঙ্গে আর একটা জড়িয়ে বা একটা আরেকটাকে জড়িয়ে নতুন নতুন ছাঁচে যা তৈরি হল, সেখানে সুভাষের নামটুকু টিকে থাকল বছরের পর বছর।
মিসা ছাড়াও অন্য অনেক ধারায় সুভাষের জেল হতে পারত। তার হাতে যতগুলো খুন — তার জন্য যাবজ্জীবন, ফাঁসি — সবই আইন মাফিক হতে পারত। কিন্তু নকশাল বা সিপিএম খুন, সেই সময় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। এর বাইরে, প্রতিপত্তি রাখতে সে নিজের দলের দু এক পিস উচ্চাকাঙ্ক্ষিকে হাওয়া যে করেনি তা নয়, তবে তারা কেউ-ই উঁচুডাঙার মানুষ না হওয়ায় এতদিন আলোচনায় ছিল না। কিন্তু সুভাষের দেখা-না-পাওয়া উঁচুডাঙার কথায়, পারস্পরিক সংলাপে, ইশারায়— সেই দু-এক পিস খুচরো খুনের কারণেও — হতেই পারে জেল থেকে সুভাষ ছাড়া পায়নি — এই সম্ভাবনা যখন আলোচনায়, গায়ে গায়ে — সেই সময়ে নাড়ু না গাবা— কে মনে নেই, বিদ্যুৎও হতে পারে, সেটা বড়ো কথা নয়, কথা হল এদের কারুর আত্মীয় ওই সময়ের ওই থানার বড়োবাবু। তার মুখের খবর, ওই সময়কালে সুভাষের বিরুদ্ধে থানায় খুনের চার্জ ছিল না।
তবে?
তবে কী?
সুভাষ কোথায়?
বলা হয় আমি সুভাষকে মেরে ফেলার
হুকুম দিয়েছিলাম। এটা ভুল। ওর হাত কেটে নেওয়া হয়েছিল। গদ্দারির শাস্তি।
শিবু পাল। জেল থেকে বেরিয়ে সুভাষ
সম্পর্কে বলেছিল।
ওকে অকারণে বড় করে দেখানোর এই প্রক্রিয়া
চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয়।
কার চক্রান্ত? কেন চক্রান্ত?
প্রশ্নগুলো বিক্ষিপ্ত। উঁচুডাঙার
হাল-না-ছাড়া, শেষ-না-দেখে ছাড়ব না — এমন কিছু মানুষের প্রশ্ন ছিল। উত্তরের আশা না করে
এই প্রশ্ন।
উঁচুডাঙার কেউ সুভাষের হাতে খুন হয়নি। তাছাড়া সেই অশান্ত সময়ে কয়েকজন নকশাল বা সিপিএমের ক্যাডারের জেলে যাওয়া ছাড়া, বড়ো কিছু ঝামেলা, যেমন এই বোমাবাজি বা ভাঙচুর — না, সুভাষ বুক আগলে সেসব থেকে নিজের পাড়াকে রক্ষা করেছিল। সে কারণে সুভাষকে আশীর্বাদ, কেউ বা ধন্যবাদ — যার যা সামর্থ্য সেইমত — তার যা কাজ কারবার সবই ছিল এলাকার বাইরে।
এইসব আলোচনা শেষ হত সুভাষের আত্মত্যাগের
গল্প দিয়ে।
গল্প শব্দটায় প্রবল আপত্তি ছিল।
উঁচুডাঙা, সে যতই উদ্বাস্তু কলোনি হোক, ঝড় ঝঞ্ঝা আর প্রতিকূলতার
লড়াই তার জন্মলগ্ন থেকে, সে কারণেই মিথ্যা তার ঘোর
অপছন্দ। ওসব নকশালরা তো বলবেই। তাছাড়া ওদের গলার কাঁটা ছিল সুভাষ। তাই সে যে চাকরিটা পটলাকে দিয়েছিল — তাকে গালগল্প বললেই উঁচুডাঙা খেপে উঠত।
কিন্ত সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
কোথায়?
পটলার মধ্যে।
এ্যাঁ!
হ্যাঁ। এবার পটলাকে নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি।
যদিও সে ছিল আঘাঁটা। এত ঘটনার ঘনঘটা, তবু পটলা সব থেকে দূরে, অন্ধকারে। শেষ তাকে, কে
কবে দেখেছিল, ভাবতে বসলেও ঘন্টা কাবার, কিন্তু মনে করতে পারে না।
তবে পটলার মধ্যে কৃতজ্ঞতা নেই।
হ্যাঁ, কথায় কথায়, আড্ডায় বা আলোচনায় প্রায় বিস্মৃতির গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়া পটলা চলে
আসে সুভাষ প্রসঙ্গে, নতুন করে। এর দায় সুভাষের। যে বন্ধন তাদের বেঁধেছিল, সেই কবে,
সুভাষকে না পেয়ে, সুভাষের খোঁজে দিশাহারা উঁচুডাঙা দশ বছর পার করে পটলার দিকে নজর।
পটলা! পটলা? এত চুপচাপ?
ওকে তো দেখাই যায় না।
চাকরিটা নাকি নেই?
সে তো অনেকদিন।
চাকরির ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে পটলার
বিয়ে। সুভাষের বদান্যতায়। পটলা রাজি ছিল না। তবু সুভাষ, তখন সুভাষ, সেই সুভাষ — সে
যা বলবে তাই হবে — আর পটলার উপর যে তার প্রচুর ভালোবাসা — না বলার সুযোগ পায়নি পটলা।
শবিয়ে আর বিয়ের তিন বছরেই একটা
ছেলে, একটা মেয়ে। তার গা ঘেঁষাঘেঁষি সময়ে সুভাষ জেলে — ওদিকে এমারজেন্সি উঠে যাওয়ার
বছরে শক্তি গ্লাসে লালবাতি। চাকরি গিয়ে পটলার চোখে অন্ধকার, ভাত ডাল জোটানোর ক্ষমতা
নেই, তখন থেকেই পটলার মনে সুভাষের প্রতি চাগিয়ে ওঠা তীব্র আক্রোশের প্রথম ধাপ।
বিয়ে না করলে গুষ্ঠির এই ঝামেলা!
বাঁশ তুই ঝাড়ে, আয় আমার…, পটলা নিজের সঙ্গে কথা শুরু করত এই দিয়ে। তারপর একটানা সুভাষকে
খিস্তি। সুভাষের ইন্টারেস্ট তো ছিলই, অনেকে বলে তার বড়ো ছেলেটা দেখতে সুভাষের মতো,
সে কারণে বা চাকরি যাবার কারণে যাই হোক না কেন, পটলার কাছে একটা সময়ে বউ পেটানো
জলভাত হয়ে দাঁড়াতেই কিচাইন, তা বাড়তে বাড়তে সংসার বলে কিছু রইল না।
সংসার থাকুক পটলাও চাইছিল না। তার
লক্ষ্য একটাই, জেল থেকে পাড়ায় ঢুকলেই সুভাষের ডান হাতটাও এক কোপে নামিয়ে দেবে।
সাইকেলের রডে সুভাষকে সেদিন হাসপাতালে
পৌঁছে দেবার পর, যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সুভাষ পটলাকে ফের গদাইমালির বাগানে পাঠিয়েছিল
তার কাটা হাতের খোঁজে — যদি ডাক্তার জোড়া দিতে পারে এই ভরসায়।
সুভাষকে রেখে পটলা আবার গদাইমালির
বাগানে। চারপাশে যতদূর, কোথাও কব্জির কাটা টুকরো ছিল না, কিন্তু একটা ঝোপের গভীরে ঢুকতেই
সে পেয়ে গিয়েছিল একটা রক্তমাখা ভোজালি। লেগে থাকা তাজা রক্ত সুভাষের — এই ধারণায় হাতে
তুলে নিতেই দেহের কাঁপুনিতে মাটিতে ভোজালি — তবু ভয়ে আর দ্বিধায় কাঁপতে কাঁপতে ঘাসে
রক্ত মুছে অস্ত্রটা নিয়ে বাড়ি। তারপর হাসপাতাল। ভোজালির গল্প চেপে সুভাষের পরিচর্যায়
তখন পটলার মন।
অস্ত্রটা সেই থেকে পটলার হেফাজতে।
সংসারের ক্যাঁতায় আগুন দিয়ে পটলার বউ বাচ্চাগুলো নিয়ে একদিন কেটে পড়তেই, সেই শুনশান রাতে গোপন জায়গা থেকে ভোজালিটা বের করে তার ধার পরীক্ষা করতে গিয়ে পটলার লেজেগোবরে অবস্থা — ইতিমধ্যে ধার কিছুটা কমেছে — এই ধারণায় সে, সিমেন্টে বাঁধানো কুয়োতলায় ভোজালিটা শান দিয়েছিল সারারাত ধরে।
সুভাষকে নিয়ে আলোচনায় অবধারিতভাবেই
পটলা জুড়ে যেত। পটলার জন্য সুভাষের আত্মত্যাগের গল্প বারবার, ঘুরে-ফিরে। গল্প যতবার,
ভোজালিতে শান উপর্যুপরি — যা নিরবচ্ছিন্নভাবে আজও, সেই ঘটনার পঞ্চাশ বছর পার করেও।
শান দিতে দিতে পটলার নজরে থাকত
সুভাষ, আর তার সঙ্গে, বলা ভালো, এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা — সুভাষের ডান হাত না গলা
অথবা হাতে না মেরে ভাতে। না খেতে পেয়ে শুকিয়ে তিলতিল করে সুভাষ মরে যাচ্ছে — একথা ভেবে
সে কয়েক গ্রাস ভাত বেশি খেয়ে ফেলত। — শালাকে ভাতেই মারব। তার আগে ডান হাতটা নামিয়ে
দেব।
একথায় মন তোলপাড় হলেই, সারারাত
শান দিত পটলা।
হঠাৎই, হ্যাঁ প্রায় হঠাৎ, দু কিলোমিটার দূরের বিষ্টুপুর খাল পাড়ের নেতাজি কলোনিতে ভুস করে ভেসে উঠেছিল বাঁ হাত কাটা ভানু। সে কী তার দাপট! ওখানে এতদিনের বাদশা ট্যারা অজিতের ধর থেকে গলা নিঁখুত ভাবে নামিয়ে তার উত্থান। পেটোয় পেটোয় ছয়লাপ। ভানুর ডান হাতে পিস্তল, অব্যর্থ নিশানা। তাকে দেখতে নাকি অনেকটা সুভাষের মতো।
এই তাহলে সুভাষ! ছদ্মনামে, ছদ্মবেশে!
ভানু হিংস্র। সে প্রথমে টার্গেটকে
গুলি করে। তারপর গলা কেটে সেই মুন্ডু দিয়ে ফুটবল খেলে।
উঁচুডাঙা নজর রাখছিল। ফুটবল খেলাটা মিলছিল না। যদিও সুভাষ ভালো ফুটবল খেলত। ছোটবেলায়, আন্ডার হাইট টুর্নামেন্টে খুব নাম ফেটেছিল। স্ট্রাইকার। বল পেলেই গোল। দু-তিনজনকে হেলায় কাটিয়ে গোল।
কিন্তু এই লেভেলের হিংস্রতা! এত
পিশাচ সুভাষ কোনদিনই ছিল না।
তাছাড়া সুভাষ বিষ্টুপুরে কেন? কেনই
বা এত আড়াল আবডাল?
উঁচুডাঙার দূরবীনে এর দুটো সম্ভাবনা
ধরা পড়েছিল। সুভাষের জেল পূর্ব যা অ্যাক্টিভিটি, সে
তার দলের সম্পদ হবার দাবি রাখে।
ধমকিয়ে, চমকিয়ে, কাজ না হলে পিটিয়ে হাড়গোড় গুঁড়িয়ে, তাতেও কাজ না হলে হাত কেটে অথবা
পা কেটে, তাতেও কাজ না হলে গলা, অথবা পাইপগান। এখনকার মতো এত সমৃদ্ধময় মাস্তানি তখন
পাড়ায় পাড়ায় মিলত না। সে কারণে জেল গেট থেকে সুভাষকে অপহরণ করে ওখানকার কোন দাদা হয়তো
বিষ্টুপুরে নিয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা জেল ব্রেক। ওই
জেল থেকে নকশালরা দু-দুবার পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়েছিল। সুভাষের নকশাল ব্যাকগ্রাউন্ড
ছিল। জেল থেকে পালানোর অর্থ ছদ্মবেশে, ছদ্মনামে বাঁচা। বিষ্টুপুরে তাই ভানু নামে সুভাষের
রাজত্ব।
কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যেই হঠাৎ হাত কাটা পচার আবির্ভাব। তিন কিলোমিটার দূরে আজাদ হিন্দ কলোনি থেকে পচার কাহিনি ভেসে এল। তাকেও নাকি দেখতে সুভাষের মতন। কেউ দেখেনি পচাকে। তবু কাজেকম্মে সে নাকি ভানুকে তিন গোল দেবে। তার হিংস্রতার মা-বাপ নেই। পরিচিত অপরিচিত, বন্ধু শত্রু, তার কাছে কেউই নিরাপদ নয়।
ভানুকে একবার দেখে আসার জন্য উঁচুডাঙা
টিম গড়েছিল। পচার খবর পেয়ে সেটা তো ক্যানসেল করতেই হল, নতুন কিছু করার উৎসাহ হারিয়ে
ফেলল উঁচুডাঙা। উল্টে আলোচনার খাত অপ্রত্যাশিতভাবে পটলা-কেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়াল। এসবের
জন্য দায়ী পটলার বেইমানী। সে যে কত বড়ো অকৃতজ্ঞ, উঁচুডাঙা নতুন করে আবিষ্কার করল।
পটলাকে নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারেনি
উঁচুডাঙা, কারণ সময়। ধীরে ধীরে সময়ের গতিপথ অন্য বিষয়ের দিকে, আগের ঘটনাবলীকে আলোচনায়
অর্থবহ করে তোলার মানুষের সংখ্যা বয়সোচিত কারণে কমে আসছিল। তাছাড়া নতুন রাজনীতি, শহরের
নতুন বিস্তার এবং জমি কিনে চারতলা বা পাঁচতলা ফ্ল্যাট তৈরির কান্ডারীদের উদ্ভবে দশ
পনেরো বছরের মধ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকা কলোনির চরিত্র পালটাতে শুরু করেছিল।
উঁচুডাঙার মাত্র আধ কিলোমিটার দূরত্বে
ইষ্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস যা তখন সবে দু লেনের। চারলেন হবার আয়োজন, তার বন্দোবস্ত
প্রস্তুত। কিন্তু এর মাহাত্ম্য যখন উঁচুডাঙা বুঝতে পারল, উন্নয়নে সাড়া দিতে দেরি করেনি।
ততদিনে উঁচুডাঙার সত্তরের যুবকেরা
বৃদ্ধ। তখনকার কিশোর, বালকবৃন্দ প্রৌঢ়ত্ব থেকে বার্ধক্যের দিকে। দরমা ঘেরা টালির ছাউনির
বসত বাড়ি সুদূর অতীত। সব জমিতেই তিনতলা চারতলা ফ্ল্যাট। জমির মালিক হিসেবে মোট ফ্ল্যাটের
আধা আধি ভাগ। এদের নাতি নাতনিরা ইস্কুলের শেষ ক্লাসে পৌঁছানোর আগেই পুরনোরা পরলোকে।
এরই মধ্যে উঁচুডাঙা হাতকাটা দিলীপকে
পেয়ে গেছে। সে এই উন্নয়নের মূল হোতা। বেঁচে থাকা পুরনোরা আবিষ্কার করেছিল, দিলীপকে
দেখতে অনেকটা সুভাষের মতো। অতি বৃদ্ধ দু-একজন তাদের ক্ষীণদৃষ্টির সাহায্যে — অবিকল
সুভাষ, নিশ্চয়ই সুভাষের মতো দেখতে, ইত্যাদি বলায় হাতকাটা দিলীপের বড়ো বড়ো ইতরোচিত কাজকম্ম
মান্যতা পেয়ে গেল।
“আমাগো সুভাষের পোলা, না জানি সুভাষ
বাঁইচ্যা আছে কিনা, অর লগে প্যাঁচাল পাইরো না।”
এ ছিল সমবেত আর্তি। যার সিংহ ভাগ
মৃত মানুষদের, জীবিতরা সংখ্যায় অল্প, তবু জীবিত ও মৃতদের সম্মিলিত সেই আহ্বান দলীয় রাজনীতি, প্রশাসনকে সাহায্য
করেছিল হাত কাটা দিলীপের বিরোধিতা না করার মন্ত্রে স্থিত হতে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে টুকরো
টাকরা ভয় দেখিয়ে, চড় চাপটা বা চোখ লাল করে দিলীপ অনায়াসে কাজ হাসিল করছিল। মসৃণ গতিতে
সে এগোচ্ছিল।
এই এগিয়ে চলার পথে হিসাব ছিল, দেনা
পাওনার টানাপোড়েন ছিল আর ছিল আলো। ভোগের আলো, বস্তু বিলাসের আলো, লোভী মনের আলো। যেদিন
উঁচুডাঙা কলোনি থেকে বাইপাস পর্যম্ত কুড়ি ফুটের রাস্তা তৈরি করে দিল পি ডবলিউ ডি, উঁচুডাঙার
স্বর্গারোহণ বাস্তব হল।
ভিতরের রাস্তা সবই প্রায় দশ বারো
ফুটের। তিন বা চারতলার আবাসনের প্ল্যান পাওয়া সহজ, কিন্তু দু তিনটি ছ ফুটের রাস্তাও
ছিল। পুরো উঁচুডাঙায় কাবাব মে হাড্ডি হয়ে ওই রাস্তার দরমা ঘেরা বাড়িগুলো উন্নয়নে বাধার
প্রাচীর তৈরি করেছিল। হাতকাটা দিলীপের হাতযশে সেখানেও প্ল্যান পাশ হচ্ছিল, ফ্ল্যাট
তৈরি হচ্ছিল একটা একটা করে।
এরকম একটা বাড়ি পটলার। ছ ফুট রাস্তায়
তার ভেঙে পড়া টালির চালের সামনে পটল দাদুকে ফ্ল্যাটের প্রস্তাব দেয় দিলীপ। ছানি পড়া
দু চোখে পটলা কিছুই দেখেনি। শোনা কথায় সে নিশ্চিত, এই-ই সুভাষের ছেলে। পটলার অন্তরাত্মা
নেচে উঠেছিল।
“তোর সঙ্গে কী কথা? বাপকে ডেকে
আনবি, আজ রাত্তিরে। কথা তো তার সঙ্গে — “
সেদিন হাতকাটা দিলীপ চলে গেলে পটলা গোপন জায়গা থেকে মরচে ধরা ভোজালিটা বের করে সারাদিন ধরে কুয়োতলার ইঁট বের করা চাতালে ঘসে ঘসে শান দিয়েছিল।
কথামতো সুভাষ এসেছিল। কোন চান্স
না দিয়ে এক কোপে সুভাষের ডান কব্জি আলাদা, পরে পরেই ধর থেকে মুন্ডু। সেই কাটা মুন্ডু
নিয়ে কিছুক্ষণ লোফালুফি খেলার পরও পটলার রাগ যায়নি। সে মুন্ডহীন শরীরের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি
বের করে, কিন্তু টাল সামলাতে পারে না। নাড়িভুঁড়ির উপর হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়।
একটা শক্ত হাতের থাবা পটলার গলা চেপে ধরে। সুভাষের সদ্য কাটা কবজি তাকে ভয় দেখাতে চাইছে ভেবে সে হেসে ওঠে। হাসিমুখেই গলায় চেপে বসা আঙুল সরাতে সে কাঁধ ঝাকিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। ছটফট করতে করতে পটলার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়।
পরের দিন সকালে কুয়োতলার পাশের
গর্তে গোঁজা উপুর হওয়া শরীরটা সোজা করতেই উঁচুডাঙা দেখেছিল পটল দাদু হাসছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন