ধারাবাহিক উপন্যাস
দ্য ক্লাউড
(২২)
রাতটা অস্বাভাবিক শান্ত। উৎপল চিত্রকর ঘুমোতে পারেনি। ডেটা ডায়েরিটা টেবিলের উপর বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। তবু মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে— ভিতর থেকে কেউ যেন ধীরে ধীরে শব্দ করছে। যন্ত্রের শব্দ নয়। মনে হচ্ছে কাগজ উল্টানোর শব্দ। কিন্তু ওটা তো কাগজ নয় ! উৎপল উঠে বসে। ঘরের জানালার বাইরে একটা অদ্ভুত আলো ভাসছে। কোনো বাতি নয়— আকাশের দিক থেকে আসছে। হালকা নীল। উৎপল ডায়েরিটা খুলে দেখতে থাকে।
স্ক্রিনে নতুন লেখা।
ডেটা-ডায়েরি (স্বয়ংক্রিয় এন্ট্রি)
লেখক: অজ্ঞাত।
সময়: অনির্ধারিত।
নোট:
যখন মৃতেরা নিজেরা কথা বলতে শুরু
করে, তখন ইতিহাস লেখা বন্ধ হয়ে যায়।
উৎপল থেমে যায়। সে তো এই লাইন লেখেনি। তাহলে কে লিখলো? স্ক্রিনে আবার শব্দ ওঠে।
নতুন ফাইল খোলা হচ্ছে।
নাম: বাবলু।
অবস্থা: অনির্দিষ্ট।
উৎপলের বুক ধক্ করে ওঠে। বাবলুকে
সে শেষ দেখেছিল কবরখানার পাশে। মনিরত্না ভরদ্বাজের সঙ্গে তার সেই অদ্ভুত কথোপকথনের
রাতে। তারপর বাবলু উধাও। আজ হঠাৎ ফাইল খুলছে। স্ক্রিনে একটা ছবি ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে।
মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছে বাবলু।
কিন্তু ওর ছবিটা অদ্ভুত। কারণ তার পায়ের নিচে কোনো ছায়া নেই।
উৎপল ধীরে বলে—
বাবলু?
স্ক্রিনে লেখা ওঠে – বাবলু।
— আমি তো আছি চিত্রকর। তুমি-ই দেরি করছ।
উৎপল অবাক হয়ে যায়।
— তুমি কোথায়?
উত্তর আসে —
যেখান থেকে সবাইকে দেখা যায়।
উৎপল বুঝতে পারে না। বাবলু আবার
লেখে— তোমার খাতা খুলে দেখো।
উৎপল স্ক্রিন স্ক্রল করে। একটার
পর একটা ফাইল। মৃত মানুষ। হারিয়ে যাওয়া নাম। অসমাপ্ত খবর।
আর একটা অদ্ভুত জিনিস—
অনেক ফাইলের জায়গায় শুধু ফাঁকা। উৎপল ফিসফিস করে—
— এরা কারা?
বাবলু উত্তর দেয়—
নাগরিক।
— কিন্তু নাম নেই কেন?
— কারণ রাষ্ট্র মনে রাখেনি।
উৎপলের মাথার ভেতর হঠাৎ একটা শব্দ ওঠে। নিমচাঁদ দাগার কণ্ঠ।
— বলেছিলাম না, চিত্রকর? কাপড় থেকে ফাইলে এসেছি
আমরা।
উৎপল বুঝতে পারে—
ডেটা-ডায়েরির ভেতর এখন দুটো কণ্ঠ। দাগা। বাবলু। আর মনিরত্না? সে খুঁজতে শুরু করে মনিরত্নাকে।
মনিরত্না ভরদ্বাজের ফাইল খুলে দেখে, স্ক্রিনে প্রথমে কিছুই নেই। তারপর খুব ধীরে একটা
বাক্য ভেসে ওঠে।
মনিরত্না ভরদ্বাজ
— মৃতেরা কখনও হারায় না। ওদের শুধু জায়গা বদলায়।
উৎপলের শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
সে বুঝতে পারে—
এই ডেটা-ডায়েরি আর তার যন্ত্র নেই। এটা একটা জায়গা। যেখানে মৃত নাগরিকেরা জমা হচ্ছে।
সে ধীরে জিজ্ঞেস করে—
— এই জায়গাটা কী?
স্ক্রিন কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দ।
তারপর একসঙ্গে তিনটি নাম ওঠে।
দাগা
বাবলু
মনিরত্না
তারপর একটি শব্দ।
উত্তর: ক্লাউড।
উৎপল দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে ওখানে
-- যেখানে ক্লাউড। ক্লাউড মানে ধুলোয় মিশে যাওয়া জলীয় বাষ্পের ঘন আস্তরণ। ওখানে রাষ্ট্র
ডেটা জমা রাখে। কিন্তু এখানে জমা হচ্ছে অন্য কিছু। যাদের রাষ্ট্র মুছে দিয়েছে।
হঠাৎ নতুন একটা সতর্কতা ওঠে। সিস্টেম
সতর্কতা। নতুন ফাইল তৈরি হচ্ছে।
নাম: উৎপল চিত্রকর
অবস্থা: প্রক্রিয়াধীন
উৎপলের হাত কেঁপে ওঠে। সে তো বেঁচে
আছে। তাহলে তার ফাইল কেন তৈরি হচ্ছে? স্ক্রিনে বাবলুর উত্তর।
— কারণ তুমি দেখেছ।
উৎপল ধীরে বলে—
কী দেখেছি?
বাবলু লেখে—
যে রাষ্ট্র মৃতদের সৎকার করে না। রাষ্ট্র তাদের ডেটা বানায়।
ঘরের বাইরে তখন আকাশে নীল আলো আরও
ঘন। উৎপল হঠাৎ মনে করে— পতাকাটা। স্কুলের মাঠে যে পতাকায় দাগা ঝুলে ছিল।
হয়তো সেটাও এখন খালি। কারণ আত্মারা সবাই এখানে এসেছে। ডেটা-ডায়েরির শেষ লাইন ওঠে। ক্লাউড
আপডেট। নাগরিক সংখ্যা: বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উৎপল জানালার দিকে তাকায়। আকাশটা অদ্ভুত। মনে হয়— অগণিত অদৃশ্য ফাইল সেখানে ভাসছে। মানুষের নাম। মানুষের মৃত্যু। মানুষের প্রশ্ন। সব জমা হচ্ছে। এই প্রথম সে বুঝতে পারে— ক্লাউড কোনো প্রযুক্তি নয়। ক্লাউড হলো স্মৃতিহীন রাষ্ট্রের কবরখানা।
(ক্রমশঃ)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন