ধারাবাহিক
উপন্যাস
স্বর্গ এসেছে নেমে
(১৯)
সময় গড়িয়ে যায় তার স্বভাব অনুযায়ী। মানুষকে কাজ করে যেতে হয়। কেউ পারে তার তালে তাল মিলিয়ে চলতে, কেউ বা ব্যর্থ হয়। অনঙ্গ সান্যাল, তাঁর সুযোগ্যা কন্যা মনস্বিনী এবং বৈশ্বানর, এই তিনের কেউই সময়কে জিততে দিতে রাজী নয়। পুরস্কার বিষয়ক ঘটনা এই তিনজনের কাছে এখন ইতিহাস মাত্র। অনঙ্গ সান্যাল তাঁর কাজে ডুবে গেলেন আবার। মনস্বিনী ব্যস্ত তার পরীক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে আর বৈশ্বানর শুরু করে দিল মুসৌরির ট্রেনিংয়ে যাবার তোড়জোড়। এদিকে কুন্তলার কিন্তু সেই এক চিন্তা, আপদ বিদায় হবে কবে। সময়ের সাথে সাথে অনেক ঘটনা তার গুরুত্ব হারায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় তাও থিতিয়ে যায় দিনে দিনে। খাবারে বিষ মেশানোর ঘটনা আন্না মাসীর গমনাগমনে ছেদ টেনে দিয়েছিল। ভয়ে ভয়ে ছিল সে, কখন ডাক পড়ে থানায় কিন্তু কিছুই হল না যখন তখন মূর্খের মত নিজেকে বঞ্চিত করা কেন। বলে কয়ে নয়, হঠাত্ করেই একদিন এসে হাজির হল আন্নামাসী। যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বললো মনস্বিনীকে, ‘কেমন আছিস মনি? কতদিন দেখিনি তোকে, মনটা বড় আনচান করছিল তাই চলেই এলাম আজ। একটু হাসির ঝিলিক দেখা দিল মনস্বিনীর ঠোঁটে। একটু বাঁকা করেই বললো সে, ‘মনিকে দেখতে এলে, না তোমার দিদিকে আর একটা ঝামেলায় জড়াতে এলে?’ একটু থতমত খেয়ে গেল আন্নামাসী, জবাব দিতে গিয়ে যেন জড়িয়ে গেল জিভটা। কোনরকমে বলতে পারল, ‘কি যে বলিস মনি, আমি বলে কোন সাতে পাঁচে নেই, আমি আবার কি ঝামেলা বাঁধাবো? বল, আমাকে তোর পছন্দ নয়, যদি বলিস তবে আসবো না আর’! হেসেই বলল মনস্বিনী, ‘আমাকে আর কি বোঝাবে বল, বাবার জন্মদিনের পরদিন থেকে তোমার গা ঢাকা দেওয়াটাই সব বলে দিয়েছে আমাকে’। কৃত্রিম বিস্ময়ে বলল আন্না, ‘গা ঢাকা দেওয়া? কি সব উল্টোপাল্টা বলছিস মনি! কেন কি হয়েছে?’ মনস্বিনী দেখলো আন্নামাসী আদালতে মিথ্যে সাক্ষী দেবার মত ধুরন্ধর মহিলা, এমন মানুষের মুখ থেকে সত্যি কথা বের করা যে সে কম্ম নয়। বেশ একটু কৌতুক বোধ করল মনস্বিনী। দেখতে চাইলো পুলিশের ভয় দেখালে কি প্রতিক্রিয়া হয় আন্নামাসির। বলল মনস্বিনী, ‘কি হয়েছে সে যখন তুমি আমি কেউ জানি না তখন তো পুলিশ ডাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না’। মনস্বিনী আড়চোখে দেখলো কিন্তু তেমন কোন পরিবর্তন দেখা গেল না মুখের রেখায়। কুন্তলা এগিয়ে এসে বললো, ‘ছাড় তো মনির কথা, মেয়ের মাথায় এখন উকিল হবার ভাবনা’। আন্নামাসী যেন এ কথা শোনেনি কখনো, এমন ভান করে বলল, ‘সে কিরে! মেয়ে কোথায় বিয়ে করে সংসারী হবে, তা নয় উকিল হয়ে ঢ্যাং ঢ্যাং করে হাজারটা লোকের সামনে দাঁড়িয়ে সওয়াল করবে’! ‘হবে না’! ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল কুন্তলা, ‘মনি’র মাথা চিবানোর লোকের অভাব আছে নাকি’! মনস্বিনী বেশ বুঝতে পারলো মা কাকে বোঝাতে চাইছে। প্রতিবাদ করলো না, বললো, ‘তোমাদের কথা বলা শেষ হয়ে থাকলে বল আমি পড়া শুরু করবো’। আন্নামাসী বলে উঠল, ‘সেই ভাল, চল দিদি, তোর সঙ্গে আমার কিছু জরুরী কথা আছে’। মনস্বিনী বুঝলো, আন্নামাসী আবার কিছু ছক কষে এসেছে, মাকে ঠকিয়ে আবার কিছু টাকা হাতানোর চেষ্টা। মায়ের সবচাইতে নরম জায়গাটা জানে মনস্বিনী। বৈশ্বানর ঘটিত কিছু কুপরামর্শ দিলেই মায়ের আঁচলের খুঁট খুলে যাবে আর কিছু টাকা গিয়ে বাঁধা পড়বে আন্নামাসীর খুঁটে। থাক, যা পারে করুক ওরা। বৈশ্বানর তো চলে যাচ্ছে মা মাসীর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ওর নিজেরও এগিয়ে আসছে ফোর্থ সেমেস্টারের পরীক্ষা। আর মাথা ঘামাবে না মনস্বিনী এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে।
(২০)
মুসৌরির ট্রেনিং অ্যাকাডেমির উদ্দেশে যাত্রা করার আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল বৈশ্বানর। মায়ের সেই এক কথা, অত দূরে গিয়ে পড়াশুনো না করলেই নয়! যে বিদ্যে হয়েছে তাতে কি শহরে একটা চাকরী জোটানো যায় না। মাকে নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে বৈশ্বানর কিন্তু মা যে অত কিছু বুঝতে চায় না। এবার মায়ের মনের নরম জায়গাটিতে নাড়া দিল বৈশ্বানর। বলল, ‘তুমি চাও না মা, সারা শহরের লোক দেখুক, তোমার ছেলে দশজনের মধ্যে একজন হয়েছে? বাবাও তো তাই চেয়েছিলেন মা’! বাবার কথা বলতেই ভেঙে পড়ল বৈশ্বানরের মা। বৈশ্বানরের গায়ে মাথায় বুলিয়ে দিল মমতাস্নিগ্ধ হাতখানি তারপর ধরা গলায় বলল, ‘আর তোকে মানা করবো না বিশু, তুই তোর বাপের ইচ্ছাটাই পূরণ কর বাবা’।
অনঙ্গবাবু প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলেন, রাস্তায় খরচের জন্য কিছু
টাকা হতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘জয়ী হয়ে ফিরে এসো বৈশ্বানর, আমি কিন্তু দিন গুনতে থাকবো,
কবে আমার স্বপ্ন সফল হবে, আমার গ্রামের ছেলে পুলিশ অফিসার হয়ে এসে সারা জেলার শান্তি
শৃঙ্খলা রক্ষার ভার নেবে। মনস্বিনী বলল একেবারে অন্যরকম কথা। বলল সে অতি অনাড়ম্বর ভাষায়,
‘ফিরে আসুন বৈশ্বানর, এর মধ্যে তৈরী হয়ে যাবো আমিও। কাজ করবো দুজন হাতে হাত ধরে’। বৈশ্বানর
তাকালো মনস্বিনীর দিকে। না, আর কোন ভাষা নেই তো তার দুই চোখে লেখা। ধীমান বৈশ্বানর
পড়ে নিতে পারল, সেখানে লেখা শুধু দৃঢ় শপথ আর প্রত্যয়ের বাণী।
একের পর এক দুষ্কর ট্রেনিং। শরীর মন সব দিক থেকে সবল সক্রিয়
করে তোলবার জন্য এই ব্যবস্থা। যে কোন পরিস্থিতিতে যে কোন চ্যালেঞ্জের মুকাবলা করার
মত শারীরিক ও মানসিকভাবে এক একজন হবু পুলিশ অফিসারকে তৈরী করে তোলাই এই কষ্টসাধ্য ট্রেনিং-এর
উদ্দেশ্য। এই সময়ে বৈশ্বানরকে কেবল তার উদ্দেশ্য সাধনের প্রতিই মনোযোগী থাকতে হবে।
অন্য কোন রকম ভাবনায় তাকে বিব্রত করা চলবে না।
মুসৌরিতে পৌঁছে অনঙ্গবাবু আর মনস্বিনীকে ফোনে জানিয়ে দিয়েছিল
বৈশ্বানর তার নিরাপদে পৌঁছানোর সংবাদ। এমনই কথা ছিল, ফোন করে কেউ তাকে বিরক্ত করবে
না, প্রয়োজনে সে-ই ফোন করবে। মনস্বিনীর মন কিন্তু মাঝে মাঝেই বৈশ্বানরের খবর পাবার
জন্য চঞ্চল হয়ে ওঠে। পড়তে পড়তে আনমনা হয়ে যায়
কখনো কখনো। এমন হয় কেন? দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে মন থেকেও তার নির্বাসন ঘটে এমনই তো
অর্থ হয় ইংরেজী প্রবাদ বাক্যটির। তবে? বৈশ্বানর তো এখন প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে
মুসৌরির ট্রেনিং সেন্টারে। কেন তবু ভাবনায় বার বার চলে আসে বৈশ্বানর!
সেক্সপিয়র খুব প্রিয় কবি মনস্বিনীর। সনেট পড়তে পড়তে একদিন হঠাৎই
নজর আটকে গেল প্রেম নিয়ে লেখা সেক্সপিয়রের একটি সনেটের উপর। লিখেছেন কবি, সত্যিকারের
প্রেম অক্ষয় অমর, কোন বাধা বিপত্তিই সে প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না বা প্রেমের
চরিত্রকে পরিবর্তন করতে পারে না। প্রেম ব্যাপারটাই তো পুরোপুরি রোম্যান্টিক, এর আবার
বাস্তব অস্তিত্ব আছে নাকি? অনেক ভেবে দেখেছে মনস্বিনী এ ব্যাপারটা নিয়ে, কূল কিনারা
পায়নি কিছু। নাঃ! এসব নিয়ে ভেবে পরীক্ষার ক্ষতি হয়ে গেলে বাবা বা বৈশ্বানর কারও কাছেই
মুখ দেখাতে পারবে না সে। বৈশ্বানর ফিরে আসতে আসতে তাকেও যে উকিলের পোশাক পরে নিতে হবে!
(ক্রমশ)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন