আমি এবং শূন্যতা
সাধারণত শূন্যতা এমন এক মানসিক
অবস্থা, যা বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্বের অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয়। কিন্তু শূন্যতা শুধু
একাকিত্বের অনুভূতি নয়। এই গতানুগতিক ধারণার বাইরে শূন্যতার অতলে লুকিয়ে আছে গভীর তাৎপর্য
এবং অসীম সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে প্রাচীনকাল থেকে কাজ করছে জ্ঞানের
বিভিন্ন শাখা। তার মধ্যে দর্শনের শূন্যতা কোনোকিছুর অনুপস্থিতি বা অস্তিত্বহীনতাকে
বোঝায়। আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞান ধারণা করছে, শূন্য অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, শূন্যস্থান হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে ক্রমাগত কণা
তৈরি এবং ধ্বংস হতে থাকে। সনাতন ধর্মে শূন্যতা বলতে ব্রহ্মের স্বরূপকে বোঝায়। আর ইসলাম
ধর্ম এবং সুফিবাদ অনুযায়ী শূন্যতা মূলত স্রষ্টার একত্ববাদের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত,
যেখানে সুফি ফানার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে একাত্ম হয়ে পূর্ণতা লাভ করেন।
মূলত শূন্যতা থেকে তৈরি হয় নানারকম
ভাবনা। এই চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতির সমষ্টিই হলো মানসিক বা ধারণার জগত। দর্শনের বিভিন্ন
শাখা ধারণার জগতকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেছে, যেখানে প্লেটোর ধারণার জগত বা ফর্মের
তত্ত্ব একটি মৌলিক দর্শন। বাউল দর্শনে অন্তরের জগতকে প্রকাশ করা হয়েছে মনের মানুষ বা
অচিন পাখির মাধ্যমে। সুফিবাদে অন্তরের জগতকে দেখা হয় ঐশ্বরিক প্রেম হিসেবে।
ঐতিহাসিক কাল থেকে অদৃশ্য বা ধারণার জগত নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। সেসব তর্ক-বিতর্ককে এক পাশে রেখে, একটু গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, শূন্যতার দুটো দিক বিদ্যমান। জাহেরি দিক দৃশ্যমান জগত এবং বাতেনি দিক অদৃশ্য বা অন্তরের জগতকে স্পষ্ট করে। এসবের ভিত্তিতে বলা যায়, মানুষের মধ্যকার শূন্যতা সবকিছুর সমন্বিত এক বিশেষ রূপ, যেখানে ধর্মের শূন্যতা মানুষকে জাগতিক মোহমুক্তির মাধ্যমে, দর্শনের অস্তিত্বের শূন্যতাকে অনুসন্ধান করতে সাহায্য করে এবং এর ফলে উন্মুক্ত হয় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অগণিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র। কিন্তু অদৃশ্য জগত নিয়ে বহু তাত্ত্বিক আলোচনা থাকলেও, এ জগতের যে একটা ভাষা আছে, তা নিয়ে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা হয় না। অদৃশ্য জগতের ভাষাকে বলা হয় আধ্যাত্মিক (Spiritual Language) বা অন্তরের ভাষা। অন্তরের ভাষা এমন এক গুপ্ত ভাষা যা চেতনা বা চিন্তাধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে (তরঙ্গের মাধ্যমে) কোয়ান্টাম লেভেলে যুক্ত হয় এবং বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে। অদৃশ্য জগত বা কোয়ান্টাম লেভেল পরিবর্তনের ফলে যেহেতু দৃশ্যমান জগত পরিবর্তিত হয়, তাই কোয়ান্টাম জগতকে বলা যায় বাস্তবতার ভিত্তি। প্লেটো তাঁর ধারণার তত্ত্বে এই বিষয়টা তুলে ধরে বলেছেন, দৃশ্যমান জগত আদর্শ জগতের (প্রকৃত সত্য এবং মূল জ্ঞান) একটি প্রতিচ্ছবি।
মৌখিক ভাষার মাধ্যমে যেমন বাহ্যিক বা অপর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, তেমনি অন্তরের ভাষার সহায়তায় আত্ম এবং প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপন করা যায়। পাওলো কোয়েলহো তাঁর ‘দ্যা অ্যালকেমিস্ট’ বইয়ে অন্তরের ভাষাকে ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ বলে উল্লেখ করেছেন, যা সকল মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে বিরাজমান।
বিখ্যাত অতিন্দ্রিয়বাদী
(Transcendentalist) দার্শনিক রালফ ওয়ালডো এমারসন (Ralph Waldo Emerson) ‘আধ্যাত্মিক
ভাষা’কে স্রষ্টার সঙ্গে সরাসরি সংযোগের মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করতেন,
প্রকৃতির ভাষা জানলে অন্তরের গভীর সত্যকে উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু এই ভাষা রপ্ত করার
জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি না থাকলেও নীরবতা ও শূন্যতা চর্চার মাধ্যমে একে আয়ত্ত করা যায়।
এই আধ্যাত্মিক মৌলিক শর্তগুলো মানুষের মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়, যা অন্তরের
ভাষাকে স্পষ্ট করতে সাহায্য করে।
(২)
সোরেন কিয়ের্কেগার্ড (ডেনিশ দার্শনিক) তাঁর দর্শনে একাকিত্ব এবং অন্তরের শূন্যতাকে মানুষের অস্তিত্বের (Existentialism) একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, শূন্যতা মানুষকে স্রষ্টার দিকে আহ্বান করে, প্রকৃত সত্তার দিকে নিয়ে যায়। তিনি তাঁর ‘হয় এটি বা সেটি’ (Either/Or) এবং ‘ভয় ও কাঁপন’ (Fear and Trembling) গ্রন্থে এই অস্তিত্ববাদী ধারণাগুলো তুলে ধরেছেন। প্রথম গ্রন্থে তিনি মানুষের জীবনকে নান্দনিক (Aesthetic) এবং নৈতিক (Ethical) এই দুই ধারায় বিভক্ত করেছেন। নান্দনিক জীবনধারায় মানুষ তাৎক্ষণিক আনন্দ, সৌন্দর্য এবং নিজের ইচ্ছা পূরণের প্রতি গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে, নৈতিক জীবনধারায় মানুষ মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সমাজের প্রতি কর্তব্যের কথা চিন্তা করে। তিনি আধ্যাত্মিক চর্চার ক্ষেত্রে একাকিত্বের পাশাপাশি বিশ্বাসকেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিয়ের্কেগার্ড বিশ্বাস এবং যুক্তির
মধ্যকার সম্পর্ককে অনুসন্ধান করেছেন ‘ভয় ও কাঁপন’ গ্রন্থে, যেখানে আব্রাহামের নিজ পুত্রকে
কোরবানি দেওয়ার ঘটনাকে ধর্মীয় বিশ্বাস, একাকিত্ব এবং স্রষ্টার প্রতি তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্যের
দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্ত টেনে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃত বিশ্বাস স্থাপন করতে কখনো
কখনো স্রষ্টার অস্তিত্ব বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এই ধরনের
বিশ্বাসকে তিনি উল্লেখ করেছেন নাইট অফ ফেইথ (Knight of faith) হিসেবে।
(৩)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে শূন্যতার ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে, জীবনদর্শনকে দুভাগে ভাগ করা যায়। সচরাচর সাধারণ মানুষ বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণপূর্বক, আনন্দকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করে এবং শূন্যতা দূর করে বস্তু দিয়ে। অপরপক্ষে ভাববাদী মানুষরা মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে, শূন্যতাকে বিবেচনা করে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম হিসেবে। আমিও শূন্যতার ভুল ব্যাখ্যা করে একসময় বস্তুবাদী হয়ে উঠেছিলাম।
যেহেতু প্রথম জীবনে আচারভিত্তিক
ধর্মকর্ম বোধের জগত তৈরি করতে পারেনি, তাই আটত্রিশ বছর পর্যন্ত শূন্যতার বস্তুবাদী
দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে সংসার এবং আনন্দকে জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করেছি।
সংসার হয়ে উঠেছে একমাত্র ধর্ম। কিন্তু যাদের জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়েছি তাদের কারো
সাথেই নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তৈরি হয়েছে শূন্যতা। এ সময় অন্তর্জগত সম্পর্কে অবহিত
না থাকায়, শূন্যতার জাহেরি বা আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করে, আশ্রয় নিয়েছি বস্তুজগতে। আপাতদৃষ্টিতে
মনে হতে পারে, মানুষের মধ্যকার শূন্যতা বস্তু দিয়ে পূরণ করা যায়। কিন্তু যখনি বস্তু
দিয়ে শূন্যতা পূরণ করতে চেয়েছি, তখনি শূন্যতা চেপে বসেছে, ক্রমশ অস্থিরতাও বাড়ছিল।
বস্তুর প্রতি তৈরি হচ্ছিল তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষাই প্রমাণ করে, জাগতিক বস্তু
দিয়ে শূন্যতা দূর করা যায় না। মানুষ যেহেতু চিত্ত বা মন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তাই
অন্তরের শূন্যতা অদৃশ্য বস্তু দিয়ে পূরণ করতে
হয়। আমার ধারণা, যারা বস্তু দিয়ে শূন্যতা দূর করতে চায়, তাদের জীবনে দুঃখ-কষ্ট চক্রাকারে
আবির্ভূত হয়।
একমাত্র শূন্যতার বাতেনি বা গভীর
অর্থ অনুধাবন করলে বোঝা যায়, স্রষ্টার সাথে একাত্ম হওয়ার জন্যই মানুষের মধ্যে একাকিত্বের
সৃষ্টি হয়। এই বোধোদয়ের পর মনে হয়েছে, স্রষ্টা হয়তো আমাকে আধ্যাত্মিক পথে আহ্বান করার
জন্য বারবার শূন্যতার মধ্যে নিক্ষেপ করছেন। কিন্তু কীভাবে শূন্যতা যাপন করা যায়, সে-সম্পর্কে
জ্ঞান না থাকায়, বস্তুজগতের মধ্যে পুনঃপুন আশ্রয় খুঁজছিলাম। বস্তুজগতে মনের অস্থিরতা
দূর না হওয়ায়, সবসময় শূন্যতাকে সহজ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে বাধ্য হয়েছি। এই ধারাবাহিকতায়
একসময় প্রতিক্রিয়ামুক্ত হয়ে, জীবনের দুঃখ-কষ্ট এমনকি শারীরিক-মানসিক অসুখ-বিসুখকে পর্যন্ত
স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি। বিশ্বাসের সাথে আঁকড়ে ধরেছি আধ্যাত্মিকতার পথ।
মূলত মানুষের একাকিত্ব, শূন্যতা,
উদ্বেগ ইত্যাদি এক ধরনের ‘আধ্যাত্মিক অস্থিরতা’
(Existential Disquiet), যা মানুষকে জীবনের অর্থ খুঁজতে প্ররোচিত করে। একে দার্শনিকরা
‘অস্তিত্বের সংকট’ বলে অভিহিত করেছেন। অস্তিত্বগত
সংকট বলতে অন্তর্জগতের দ্বন্দ্বকে বোঝায়। এ নিয়ে সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা
হয়েছে : ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির
স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও’।
আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে
বলা যায়, আমাদের জীবনে দৃষ্টিভঙ্গির জন্য অনেক সমস্যার উদ্ভব হয়। তাই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে,
সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে না দেখে অস্তিত্বের সংকট বা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে,
জীবনে পরিবর্তন আসে। আমিও যখন শূন্যতাকে সমস্যা হিসেবে না দেখে, সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছি,
তখনি পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন