বাছাই করা গল্পের ভূতেরা
ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত, ঘুম ঘুম নিঃঝুম
দুপুর, কোনো থমথমে পোড়ো বাড়ি বা গা ছম্ছন করা শ্মশানভূমি- যেখানেই যাওয়া হোক না কেন,
ভূতকে জব্দ করার মন্ত্র আমাদের সকলেরই জানা। কোন ছোটবেলায় ছায়া-ছায়া অন্ধকারের দিকে
তাকিয়ে যখন ভয়ে বুক গুর গুর করতো, তখন বড়রা ভয়হীন হওয়ার জন্য শিখিয়ে দিয়েছিলেন:
'ভূত আমার পূত পেত্নী আমার ঝি রামলক্ষ্মণ
বুকে আছে ভয়টা আমার কি।'
কিন্তু ভূত দেখার অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা
যাঁর হয়েছে তিনি নিশ্চয় জানেন, নাছোড় ভূতেদের কাছে এসব দাম্ভিক উক্তি একেবারেই অর্থহীন।
'ভয়টা আমার কি' বলে ভূতেদের তুচ্ছ না করে বরং সমীহ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, মিথ্যাচারিতা
ভূতেরা একেবারেই পছন্দ করে না। রাম-লক্ষ্মণ দোহাই দিয়ে 'ভয়টা আমার কি'র আস্ফালন যে
একেবারেই নিরর্থক তা ভূত ও মানুষ উভয়েই সমানভাবে জানেন।
ঠিক কবে, কোথায়, কখন, কীভাবে ভূতেদের উৎপত্তি ও বিস্তার হয়েছে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত করা যায় না। [এই সংকলনে ড. রেবতীমোহন সরকার তাঁর প্রবন্ধে এ-বিষয়ে কিছুটা সন্ধান দিয়েছেন মাত্র-সম্পাদক।। তবে শিবের অনুচর হিসেবে ভূত-প্রেতের কথা আমাদের সকলেরই জানা। শ্মশানেশ্বরী কালীমাতা প্রেত-সহচর পছন্দ করেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে, বিশেষত মঙ্গলকাব্যে ভূতাসক্ত ভূতনাথ সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে কম দাপাদাপি করেননি। শিবের দক্ষযজ্ঞ ভঙ্গ থেকে বিবাহের বরযাত্রী পর্যন্ত-সর্বত্রই ভূতেদের সগৌরব উপস্থিতি। 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের রচয়িতা রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের বর্ণনায়: 'ভূতনাথ ভূতসাথ দক্ষযজ্ঞ নাশিছে।' এই ভূতেরা এতটাই শক্তিমান যে তারা ওঝাদেরও রীতিমতো মারধোর করেছে। অবশ্য এসব ভূতের দল দেবতাদের আশীর্বাদধন্য। তাদের সঙ্গে আমাদের গেছো ভূত, মামদো ভূত, ভালো ভূত, চালাক ভূত, পেত্নী ও শাঁকচুন্নিদের কত না তফাৎ!
'শিবায়নে' পেত্নী সম্বন্ধে বলা হয়েছে-'ভাগ্যবলে সন্ধ্যাকালে পেতি জ্বালে বাতি।' 'অন্নদামঙ্গলে' দুর্গার অনুচর হিসেবে ডাকিনী-যোগিনী ছাড়াও শাঁখিনী-পেতিনীর উল্লেখ আছে।
এই শাঁখিনী নিঃসন্দেহে শাঁকচুন্নি।
অথর্ববেদের চতুর্থ কাণ্ড অষ্টম অনুবাক্ অথবা অষ্টাদশ কাণ্ডের ২-৪ অনুবাকে প্রেত সম্বন্ধীয়
আলোচনা আছে। স্বামী অভেদানন্দের 'মরণের পরে' গ্রন্থে আত্মার ছবি পর্যন্ত আছে। কালীপুজোর
আগের দিন আমাদের কাছে যেমন ভূতচতুর্দশী নামে পরিচিত, তেমনি বিদেশে আছে 'Spirit
day'। সুতরাং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্রই নানা নামে, নানা মহিমায় ভূতেরা বিরাজমান।
মনুষ্যসমাজে যত রকমের জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় ও বৃত্তিধারী ব্যাক্তি আছে, ভূতেরাও আছে
সেই সেই মতো। সুতরাং, যোগ্যতা ও গুণধর্মে ভূত-প্রেতরা মনুষ্যাপেক্ষা কোনো অংশে কম নয়।
তফাৎ এই যে, তারা ছায়া আর অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। আর আমরা, কায়া বিশিষ্ট এবং আলোর
জগতেই আমাদের ঘোরাফেরা। অবশ্য মানুষ-ভূত ছাড়াও আছে পশু-ভূত। যেমন-গো-ভূত, ঘোড়া-ভূত,
কুকুর-ভূত, বিড়াল-ভূত। বাঘ ও সিংহ ভূতের কথা সম্ভবত শোনা যায় না। অর্থাৎ মরলেই সবাই
ভূত হবে এমন কোনো কথা নেই। যারা অতৃপ্তি বা অচরিতার্থতা নিয়ে মরে, তারাই নাকি ভূত হয়ে
ঘুরে বেড়ায়। আমাদের কর্মফলের ওপরই পরজন্ম ও প্রেতজন্ম নির্ভরশীল-এমন ব্যাখ্যাই সচরাচর
শোনা যায়। তাই আত্মা ও ভূত এক নয়। আত্মা অগণিত, অসংখ্য, কিন্তু ভূত সংখ্যাতীত নয়। এরা
প্রায় সকলেই লম্বা হাত-পা বিশিষ্ট। চেহারার দিক থেকে প্রস্থে তারা সামান্য হলেও দৈর্ঘ্যে
অসামান্য। এরা 'নাকি সুরে' কথা বলে ও নাচ-গান করতে ভালোবাসে। ভূতেরা সাধারণভাবে মৎস্যপ্রেমী।
তবে অথর্ববেদে উল্লিখিত পিশাচদের মাংস ছিল অতি প্রিয় খাদ্য।
ভূতদের অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা নিয়ে ছোটো বড় অনেক গল্পই লেখা হয়েছে। আমাদের মনের বিশ্বাস আর গল্পকারের প্রকাশগুণে সে সব গল্পের অবস্থান উপভোগ্যতার শীর্ষসীমায়। সুতরাং আমাদের ভূত-ভীতি ভূত-প্রীতিরই নামান্তর।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ছেলেবেলা' গ্রন্থে শৈশব স্মৃতি-চারণার সূত্রে যে মন্তব্য করেছেন তা এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য: 'রাত্রি ন'টা বাজলে ঘুমের ঘোরে ঢুলু ঢুলু চোখে ছুটি পেতুম। বাহিরমহল থেকে বাড়ির ভিতর যাবার সরু পথ ছিল খঙ্খড়ির আব্রু দেওয়া, উপর থেকে ঝুলত মিট্রিটে আলোর লণ্ঠন। চলতুম আর মন বলতো, কী জানি কিসে বুঝি পিছু ধরেছে। পিঠ উঠত শিউরে। তখন ভূত প্রেত ছিল গল্পে-গুজবে, ছিল মানুষের মনের আনাচে-কানাচে।.......... সে সময়টাতে হাওয়ায় হাওয়ায় আতঙ্ক এমনি জাল ফেলেছিল যে, টেবিলের নিচে পা রাখলে পা সুড়সুড় করে উঠত।'
রবীন্দ্রনাথ 'নাকি' সুরে কথা বলা শাঁকচুন্নি, মৎস্যলোভী বদমেজাজী মেয়ে ভূতের কথা বলেছেন, যা তাঁদের বাড়ির দাসীদের কল্পনা ও বিশ্বাসে গড়ে উঠেছিল। এছাড়া বাড়ির পশ্চিমকোণে ঘন পাতাওয়ালা বাদাম গাছের ডালে এক পা ও অন্য পা-টা তেতলার কার্নিসে তুলে দাঁড়িয়ে থাকতো এক ব্রহ্মদত্যি। এদের অদ্ভুত ক্রিয়াকাণ্ড নিয়ে এমন গল্প ছড়িয়ে ছিল যে, বিশ্বাস করে নিতেই অভ্যস্ত ছিল সে যুগের মানুষ।
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়েরও ভূতের গল্পের সংখ্যা কম নয়। নির্ভেজাল ভূতের গল্প রচনায় তিনি যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। একটি চাল টিপে ভাত সিদ্ধ হয়েছে কি-না দেখার মতো করে আমরা লেখকের একটিমাত্র গল্প বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ভূতের কার্যকলাপ বুঝে নিতে পারি।
তাঁর 'একটি ভৌতিক কাহিনী' গল্পের
ভূত ভয়ঙ্কর এবং অনিষ্টকারী। সে আবার জাত-ধর্ম বুঝে উপদ্রব করে। যেন-তেন-প্রকারেণ মানুষকে
ভয় দেখায় এবং আক্রমণ করে। ভতটি বয়সে কে সে ভয় পেয়েছে। তবে সে সাংঘাতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ
এবং কর্মনিষ্ঠ ভূত। সে একাগ্র প্রবীণ ও স্বভাবে গ্রাম্য। বৃদ্ধ বলেই সে সম্ভবত কম শক্তিধর।
তাই উপেন্দ্রনাথের 'রামকবচ'-চিত্ত ও স্থির লক্ষ্যের অধিকারী। আঠারো বছর আগে যার প্রতি
লক্ষ্য স্থির করে, আঠারো বছর পরেও তাকে ভোলে না। ভূত কায়াহীন হলেও সিদ্ধ পুরুষরা তাদের
কখনো-কখনো দেখাতে পান এবং এই দেখা অবশ্যই সিদ্ধপুরুষ কতখানি সিদ্ধ তার উপর নির্ভর করে।
'একটি ভৌতিক কাহিনী' গল্পে উপেন্দ্রের সঙ্গে ভাগ্যক্রমে সিদ্ধপুরুষ রমাপ্রসন্ন মজুমদারের
সাক্ষাৎ হয়েছিল।
তিনি উপেনকে জানিয়েছিলেন:
তুমি যখন সেদিন আসিয়া আমাকে প্রণাম করিলে, তখনই আমি দেখিলাম একটি প্রেতাত্মা তোমার পশ্চাতে বেডাইতেছে। কোনও কারণে সে তোমার উপর ভয়ানক
ক্রুদ্ধ হইয়াছে এবং তোমার প্রাণহানি কবিবার মানসেই তোমার সঙ্গ লইয়াছে। কেবল উপযুক্ত ক্ষণ পায় নাই বলিয়া সে এ-পর্যন্ত কৃতকার্য হইতে পারে নাই।
সত্যি কথা বলতে কি, ভূতেদের মধ্যে ক্ষতিকারক ও ক্রুদ্ধ ভূতের সংখ্যাই বেশি। তাদের অতৃপ্তির পাশাপাশি জীবিত মানুষের চরিতার্থ ও তৃপ্ত জীবন তাদের মানসিক সমস্যার কারণ হয়। সব ভূত তো আর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভূতের রাজার মতো মানবিক গুণসম্পন্ন নয়। তাই অপরের প্রাণরক্ষার পরিবর্তে প্রাণনাশের প্রবণতাই তাদের মধ্যে বেশি লক্ষ্য করা যায়। আলোচ্য গল্পের ভূতটি ভীষণ-দর্শন এক কঙ্কালসার বৃদ্ধ। তার মুখখানা যেন বহুদিনের রোগে শীর্ণ, গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে। মাথায় ছোট সাদা খাড়া খাড়া চুল, দুটি চোখে ক্রোধ, ঘৃণা ও বিদ্রুপের জ্বালা। তার বসার ভঙ্গিটা অনেকটা হিংস্র শিকারী পশুর মতো-'শয্যার উপর হাঁটু গাড়িয়া থাবা পাতিয়া বসিয়া আছে।' তাকে শুধু মানুষ নয়, পশুরাও দেখতে পায়-'হঠাৎ গরু দুইটা থামিয়া গেল, একটা ঝাঁকুনি দিয়া গাড়ি দুইটা দাঁড়াইয়া পড়িল।' তখন সেই শুষ্ক চর্মাবৃত কঙ্কাল গরুর গাড়ির জোয়ালের উপর দুটি জীর্ণ হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেই জ্বলন্ত চোখ দুটি থেকে ক্রোধানল বর্ষিত হচ্ছে। অর্থাৎ আঠারো বছর পরেও প্রতিহিংসার ক্রোধাগ্নি তার এতটুকু নির্বাপিত হয়নি। ভূতেরা সাধারণভাবে অমাবস্যার রাত্রিকেই তাদের মাহেন্দ্রক্ষণ বলে মনে করে। কিন্তু এই গল্পে জ্যোৎস্না রাত্রিতেও তার আবির্ভাব ঘটেছে।
আগেই বলেছি, ভূতেরা জাতিগত, ধর্মগত, আচরণগত, গুণগত, এমন কি পেশাগত দিক থেকেও ভিন্ন ভিন্ন হয়। 'সিপাহী বিদ্রোহ'-কে গল্পের পটভূমিতে রেখে দীনেন্দ্রকুমার রায়ের এক অসামান্য ভৌতিক কাহিনী: 'উৎপীড়িতের প্রতিহিংসা'।
অত্যাচারী ক্যাপ্তেন থরন্ট এক অদ্ভুত চিঠি পেলেন '১৮৫৮ সালের ১৭ই জুলাই আবদুল গফুর নিহত হইয়াছে। ১৮৫৯ সালের ১৭ই জুলাই কাপ্তেন থরন্টকে প্রাণত্যাগ করিতে হইবে। পাপের প্রায়শ্চিত্তের আর এক বৎসর মাত্র বিলম্ব।' এই চিঠির নিচে এক অতি অস্পষ্ট স্বাক্ষর। চিঠিটি যে পত্রবাহক নিয়ে এসেছিল তার কাছে সেটি পৌঁছে দিয়েছিল আবদুল গফুর নামে এক মুসলমান সিপাহী। কিন্তু সে বর্তমানে জীবিত নেই। প্রাণদণ্ডের পর তার মৃতদেহ পর্বতগুহায় নিক্ষিপ্ত হয়। থরন্টনের মতো ইংরেজ সরকারের সাহসী কাপ্তেনেরও
অজ্ঞাত ভয়ে হৃদয় কম্পিত হলো। কিন্তু
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই এই অপ্রীতিকর পত্রের কথা তিনি একপ্রকার ভুলেই গেলেন।
কিন্তু ১৭ অগস্ট সকালে আগ্রায় নিজের গৃহে পুনরায় ঐ পত্র পেলেন। সেই আগের মতোই নীল লেফাফায় আঁটা। শুধু পত্রের ভাষায় সামান্য পরিবর্তন- 'পাপের প্রায়শ্চিত্তের আর এগার মাস বিলম্ব।' পত্রটি সেই দিন সকালে তাঁর স্ত্রীর হাতে একজন দীর্ঘ দেহী মুসলমান দিয়ে গেছে। এই চিঠিটিকে সাহেব সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি বহু সিপাহীকে স্বহস্তে হত্যা করেছেন। এর জন্য কোনো পাপ বা অপরাধবোধ তাঁর নেই। তথাপি এই প্রথম ভয় তাড়াবার জন্য তাঁকে বোতলের পর বোতল হুইস্কি খেতে হলো। কিন্তু তাতেও তাঁর আতঙ্ক দূর হলো না। এরপর প্রতি মাসেই তিনি ঐ পত্র পেতে লাগলেন। ক্যালেন্ডারের তারিখের মতো তাঁর আয়ুষ্কাল থেকে এক মাস করে সময় খসে পড়ছে। থরন্টন যেখানেই যান না কেন, যত গোপনেই যান না কেন, পত্র যথাসময়ে পৌঁছে যায়।
এর কয়েকমাস পরে দেরাদুনের কাছে এক পার্বত্য অরণ্যে শিকার করতে গিয়ে আবদুল গফুরকে স্বচক্ষে দেখলেন তিনি। প্রথমে মনুষ্যমূর্তি বলে ভুল হলেও গফুরের অবজ্ঞাব্যঞ্জক রোষানলদীপ্ত দুই চক্ষু যখন অগ্নিগোলকের মতো জ্বলতে লাগলো, যখন কাপ্তেনের ছোঁড়া গুলির আঘাতেও সে অক্ষত দেহে অট্টহাস্যে ফেটে পড়লো তখন থরন্টন শঙ্কিত হলেন। গফুরের চোখে তিনি উৎপীড়িত, আহত, প্রতিহিংসালোলুপ পৈশাচিকতার পরিপূর্ণ দৃষ্টি দেখেছেন। মনে ভেবেছেন শব্দহীন, গতিহীনভাবে যে ছায়ামূর্তির সহসা উদয় ও অন্তর্ধান হলো সে 'ছায়া না কায়া'?
ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে রচিত এই গল্পে নিষ্ঠুর ও অন্যায়ভাবে মৃত সিপাহীর প্রেতাত্মা কর্তৃক অত্যাচারী সাহেব কাপ্তেন থরন্টনের জীবননাশের কাহিনী বর্ণিত। ভৌতিক আবহাওয়া এক মুহূর্তের জন্যও এখানে বিনষ্ট হয়নি। সারা গল্পে ছড়িয়ে আছে টান-টান উৎকণ্ঠা। বার-বার প্রেতাত্মার আবির্ভাব ও মৃত্যুর বার্তা সম্বলিত চিঠি পৌঁছে দেওয়ায় একটি সম্ভাব্য পরিণতি সম্বন্ধে পাঠকের ধারণা নিশ্চিত হয়ে যায়। ঘটনা বর্ণনায় কোথাও কোনো অতিরঞ্জন নেই। অতিরিক্ত একটি বাক্য বা শব্দও ব্যবহার করেননি লেখক। মৃত্যুর হুমকি দেওয়া পত্র বার বার পেতে পেতে প্রাপকের মানসিক উদ্ভ্রান্তি ঘটা অস্বাভাবিক নয়। সেই উদ্ভ্রান্তি হয়তো ডাক্তারের ভাষায়- 'ব্রেন ফিভার'। কিন্তু এর সঙ্গে অতিরিক্ত সংযোজন থরন্টনের আবদুল গফুরের প্রেতাত্মা দর্শন, যা তাঁর মতো সংস্কারমুক্ত মানুষকেও আতঙ্কিত করেছে।
এই গল্পে অশরীরী প্রেতাত্মা মানুষের মতো আচরণ করেছে। সে স্বাভাবিক কারণেই প্রতিহিংসাপরায়ণ। কিন্তু তার প্রতিহিংসায় ভূতের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায়নি। কারণ, এখানে অত্যাচারী প্রবল প্রতিপক্ষের অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ এক অর্থে বিদেশী শাসকের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর প্রতিবাদ। সুনির্দিষ্টভাবে স্থান ও সাল তারিখের উল্লেখ এবং ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে রচিত হওয়ায় এই গল্প শুধু ভৌতিক কাহিনী হয়ে থাকেনি, তা ভিন্ন ঐতিহাসিক তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হয়েছে। শত শত মৃত ও নিহত সিপাহীর হয়ে একজন সিপাহী-ভূত আবদুল গফুর, থরন্টন সাহেবের অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। এই গল্পে যা শুধু 'ভৌতিক রস' সৃষ্টিই করে না, পাঠককে এক প্রকার মানসিক তৃপ্তি দেয়। গল্পের ভূত বা ভূতের গল্পের প্রতি আমাদের আকর্ষণ অন্তহীন। জ্যান্ত ভূত সম্বন্ধে আমরা
যতটা মারমুখো ও আপোসহীন, গল্পের ভূত সম্বন্ধে একেবারেই তা নয়। কোনো গল্পে এমনও দেখা গেছে যে মানুষ ভূতের ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে না, বরং আটকে গেছে ভূতের মায়ায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনই এক গল্পের রূপকার। গল্পের নামকরণটিও যথার্থ- 'মায়া'। গ্রামবাংলার প্রকৃতির পটভূমিতে সহজ, সরল মানুষের পাশাপাশি ভূতকেও নামিয়ে এনেছেন তিনি। কিন্তু এই ভূত বা ভূতের দল বাতাসে সুগন্ধ ছড়ায়, খল খল করে হাসে, দোতলার বারান্দা দিয়ে জল গড়িয়ে ফেলে, লাঠি বাজিয়ে নৃত্য করে: বৌ-ভতটি আবার কচি ঝিঙেও তোলে। কিন্তু গ্রামবাংলার সজীবতায় পরম নিশ্চিন্তে দিন কাটে তাদের, বিদেশী অতিথির কোনো ক্ষতি তারা করে না। 'মায়া' গল্পটি এইভাবেই এক স্বতন্ত্র ভৌতিক গল্প হয়ে উঠেছে। জীবনের সহজ-সরল মাধুর্যের প্রতি অনুরাগী বিভূতিভূষণের গল্পের ভূতেরাও সহজভাবেই উপস্থিত হয়েছে এবং প্রাকৃতিক নির্জনতা অতিপ্রাকৃত রস পরিবেশনের পক্ষে যথেষ্ট অনুকূল হয়ে উঠেছে।
আমাদের আলোচনায় বাচ্চা ভূত, বৃদ্ধ ভূত, সিপাহী ভূত, এমনকি অধ্যাপক ভূত পর্যন্ত স্থান পেয়েছে। সংখ্যায় এরা লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি। আমরা খালি প্রতিনিধি স্থানীয় কয়েকজনকে বেছে নিয়েছি। এরপর পাছে লেখক ভূতের পাল্লায় পড়ি, তাই তাড়াতাড়ি এই আলোচনার উপসংহার টানা জরুরি মনে করছি।
এ-পর্যন্ত বিশ্লেষণে দেখেছি, ভূতেরা মোটেই সহজ সরল নয়, তারা মানুষের মতোই জটিল এবং ঘোড়েলও বটে। বিশেষত বায়বীয় হওয়ায় অনিষ্ট সাধনের বিশেষ সুযোগ তারা পেয়েই গেছে। আমাদের মতো তাদের মনও আছে, যে মন জীবনরস আকণ্ঠ পান করতে উন্মুখ। অথচ মাঝখানে দুস্তর ব্যবধান। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, ভূত কি সত্যিই আছে? বলাবাহুল্য, এর নিশ্চিত উত্তর কারো পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়। যা অতীত তা-ই যদি ভূত হয় তাহলে তা আছে বৈ কি। ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে এই জগৎ। যা ঘটে গেছে তাকে অস্বীকার করি কেমন করে? এই মুহূর্তে যা বর্তমান পরমুহূর্তেই তা অতীত বা ভূত। ভবিষ্যতের জন্য আমরা উৎসুক, কারণ তারই উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা। কিন্তু ভূতে প্রত্যাবর্তন সম্ভব নয় বলেই কি তার প্রতি আমাদের এত কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা? অতীতকে ছুঁয়ে দেখতে পারি না বলেই হয়তো ভূত নামে এক অদ্ভুত মায়ার ছায়া বিস্তার করে তার সঙ্গে আমরা দূরত্ব রচনা করি। আমাদের ভয় ও বিস্ময় মিশ্রিত কৌতূহলের সূত্র ধরে মনের অন্ধকার কুঠুরিতে তারা জাঁকিয়েয় বসে।
কিন্তু দিন বদলাচ্ছে। এখন ঘরে-বাইরে আলোর অভাব নেই। শহর বাড়ছে, গ্রামও আর সেই গ্রাম নেই। আমাদের বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভূতেদের বাড়িঘরের টানাটানি পড়ে গেছে। বিশ্বায়নের বিশ্বস্তরিতায় বিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয় নৃত্য করছে। ইন্টারনেটের দৌলতে ভূত-ম্যাগনেট এখন তাই পিছু হঠতে বাধ্য। তাদের অভাব পূরণের জন্য বিকল্পরূপে কল্পবিজ্ঞান অবশ্য ইতিমধ্যেই হাজির হয়েছে। ছোটোরা এখন আর 'জুজুবুড়ি কৈ ভয় করে না। বড়োরাও তাদের ভূতের গল্প শোনান না। কারণ এসব অহেতুক ভয় নাকি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। 'ছেলেবেলা'-য় কবি বলেছেন 'শেষকালে এল সেই পুকুরের কাল ঘনিয়ে, পড়ল তার মধ্যে গাড়ি গাড়ি রাবিশ। পুকুরটা বুঁজে যেতেই পাড়াগাঁয়ের সবুজ ছায়া-গড়া আয়নাটা যেন গেল সরে। সেই বাদাম গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অমন পা-ফাঁক করে দাঁড়াবার সুবিধে থাকতেও সেই ব্রহ্মদত্যির ঠিকানা আর পাওয়া যায় না।'
তবু আজও ভূতেদের কদর না থাকলেও আদর আছে। কিন্তু যাঁরা ভূতের গল্পের ভূতকে বাদ দিয়ে শুধু ভয়টুকু গ্রহণ করেন, ভূত তাদের কিছুটা উপেক্ষার চোখেই দেখে। এখন মানুষ ভূত বিশ্বাস করে না, ভূতও মানুষকে সমপরিমাণ অবিশ্বাস করে। তাই ভূতের রাজার দেখা পাওয়া এখন প্রায়-অসম্ভব। তবু যদি তিনি হঠাৎ আবির্ভূত হন, তাঁর কাছে সবিনয়ে প্রার্থনা করবো, মানুষ-ভূত এবং ভূত-মানুষের তফাৎটা বুঝতে পারার মতো শক্তিশালী বর তিনি যেন আমাদের অবশ্যই দেন। বর্তমান যুগে ঠিকভাবে বেঁচে থাকার পক্ষে আপাতত এই একটি বর-ই যথেষ্ট।

অসাধারণ লেখা ! খুব ভালো লাগলো l
উত্তরমুছুননীতা বিশ্বাস l