রাঢ়বাংলার গাজন
ঋতু আর প্রাদেশিক সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে
ভরা আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। মানুষে মানুষেও কম বৈচিত্র্য নেই এখানে। নানা ধর্মের নানা
জাতির সংমিশ্রণে সেই কোন প্রাচীনকাল থেকেই বিশাল এই ভারতের তুলনা মেলা ভার। চোখ বুজে
বলা যেতে পারে ধর্মের নামে এত আয়োজন, নিষ্ঠা, আচার ও নানা ধরনের সংস্কার পৃথিবীর আর
কোনো দেশেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই দেশের একটি ক্ষুদ্র প্রদেশ এই বঙ্গভূমি। ধর্মকে
কেন্দ্র করে নানা প্রথা, সংস্কার আর সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে পিছিয়ে নেই বারো মাসে তেরো
পার্বণের এই বাংলাও। এই তো শুরু হয়ে গেছে বাংলা বছরের অন্তিম চৈত্র মাস। কিছুদিন আগেই হয়ে গেছে শিবরাত্রি।
একটু বেলা বাড়তেই এখন গ্রামবাংলার
গৃহস্থ উঠোনে মাঝে মাঝেই ভেসে উঠবে চিরপরিচিত সেই ধ্বনি— "বাবা ভোলানাথের চরণের
সেবা লাগে–এ–এ–এ, মহাদেব"।
মহাদেব, ভোলানাথ, শিবশম্ভু— সবই সেই একেশ্বরের নাম। যিনি সৃষ্টির কর্তা আবার ধ্বংসের কারণ। বাংলার আনাচে কানাচে শিব মন্দির নেই বা শিবপুজো হয় না এমন গ্রাম বা অঞ্চল খুঁজে একটিও পাওয়া যাবে না— এটা নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে। শুধু বাংলায় নয়, গোটা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের দিকে চোখ রাখলে হয়তো দু-একটি জায়গা ছাড়া এমন দৃশ্য প্রায় একই রকম সর্বত্র। গ্রামের দেবতা বা অধিষ্ঠিত ঈশ্বর বলে গ্রামের বা প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে 'নাথ' বা 'ঈশ্বর' যুক্ত হয়ে যাওয়ার ইতিহাস তো বহু পুরোনো। যেমন— শিবতলা, বুড়ো শিবতলা, ভোলাশ্বর গ্রাম জলেশ্বর গ্রাম (শিবের আর-এক নাম জলেশ্বর) ইত্যাদি।
গবেষকদের মতে শিবপূজার উৎপত্তি
হয়েছিল প্রাক-বৈদিক বা প্রাগৈতিহাসিক যুগে। সনাতন ধর্মের কিছু কিছু প্রাজ্ঞজন এক সময়
এই মত পোষণ করতেন যে, শিব মোটেও আর্য দেবতা নন। তিনি অনার্য দেবতা। যদিও পরে আধ্যাত্মিক
গবেষকরা আবার বলেছেন— না, শিবশম্ভু মোটেও অনার্য দেবতা নন। তাহলে আর মুনি-ঋষিরা ত্রিদেবতার
নামের সঙ্গে তাঁকে জুড়ে দিতেন না। তাঁদের মতে শিব সর্বংসহা। সকলের জন্যই তাঁর হৃদয়
কেঁদে ওঠে। হতে পারে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় একশ্রেণির নিপীড়িত বঞ্চিত সম্প্রদায়ের
প্রতি তাঁর অপার করুণা একটু বেশি মাত্রায় বর্ষিত হয়েছিল। সে যাই হোক, আদি শিব সম্পর্কে
ঐতিহাসিক গবেষণার ভিত্তিতে দেখা গেছে সিন্ধুসভ্যতার নিদর্শনে কিছু পোড়ামাটির বস্তুকে
মার্শাল সাহেব লিঙ্গপ্রতীক বলে অনুমান করেছেন। বারাণসীতে প্রাপ্ত বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে
হরপ্পায় প্রাপ্ত যোগীমূর্তির যথেষ্ট মিল দেখা যায়। এই যোগীমূর্তির পায়ের দিকে দুটি
হরিণের প্রতিচ্ছবি খোদিত আছে। জন মার্শাল এই মূর্তিটিকে 'আদি শিব' নামে অভিহিত করেছেন।
বৈদিক আর্যগণ পৌরাণিক শিবের মধ্যে বৈদিক রুদ্রদেবের উগ্র প্রকাশ দেখতে পেতেন। এই ভাবে
আর্য ও আর্যেতর— উভয় জাতি গোষ্ঠীর দ্বারা পূজিত হয়ে শিব এক সময় মিশ্র দেবতায় পরিণত
হয়েছেন। আসলে শিব হলেন অনাদিলিঙ্গ। শিবের মহিমার কোনো তল পাওয়া যায় না। ব্রাহ্মণ
পুরোহিতের সাহায্য ছাড়াও মহিলারা মাটির তৈরি শিবের মাথায় বেলপাতা ও গঙ্গাজলে পুজো
করে আপন করে নিয়েছে। বাংলার আদি কাব্য ‘মঙ্গল কাব্য’-এ শিবকে কৃষকরূপে দেখা যায়।
তার প্রমাণ রাঢ় বাংলার গোপজাতির সঙ্গে শৈবধর্মের সুসম্পর্ক দীর্ঘ কাল ধরেই চলে আসছে।
আজও সেই প্রণতি অব্যাহত।
সদাশিব এই মহাদেবের সঙ্গেই সম্পৃক্ত
হয়ে আছে ‘গাজন উৎসব’। যেটি এই নিবন্ধের মূল বিষয়। যতদূর জানা যায়, ‘গাজন’ কথাটি
এসেছে ‘গর্জন’ শব্দ থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কীসের গর্জন? না এ কোনো পশুচারী, ভৌতিক
অথবা অধিভৌতিক গর্জন নয়। মূলত চৈত্র মাসে ব্রত পালনকারী সন্ন্যাসীদের কণ্ঠে স্বউৎসারিত
'জয় শিব শম্ভু মহাদেব' বা 'বাবা ভোলানাথের চরণের সেবা লাগে মহাদেব' বলে উচ্চৈস্বরে
ডাক দেওয়াই হল গর্জন। যা ‘গাজন’ শব্দের উৎস। আবার এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে
আছে বাংলার চিরপরিচিত ‘চড়ক’ অনুষ্ঠান। যদিও গাজনের সঙ্গে চড়ক পূজার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান
হলেও আচার বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য দুটি ক্ষেত্রেই ভিন্ন প্রকৃতির। চড়কের প্রধান দেবতার
নাম হল কালার্ক রুদ্রদেব— এই দেবতার রূপ অতি ভয়ানক। কোটি সূর্যের মতো এর দীপ্তি। পুরাণ
অনুসারে চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি কালার্ক রুদ্রের তিনটি নেত্র। এই দেবতার অনুসারী দেবী
হলেন নীলচণ্ডিকা বা নীলপরমেশ্বরী। নীলা বা নীলাবতী নামে সাধারণের কাছে ইনি পূজিতা।
চড়কের আগের দিন নীলাবতী ও রুদ্রদেবের বিবাহ অনুষ্ঠান কল্পনা করে নীলপূজা করা হয় এবং
বিবাহিতা স্ত্রীলোকেরা নীলের ঘরে দীপ বা মোমবাতি জ্বালায়।
আর-একটি মতে, শৈবধর্মের মধ্যে এদেশের
একটি প্রাগৈতিহাসিক ধারা প্রবেশ করেছে— সেটিই গাজন নামে পরিচিত। এর সঙ্গে গোঁড়া হিন্দু
ধর্মের আচার-আচরণের সম্পর্ক নেই; জনসাধারণের মধ্যে তা শিবের গাজন বা আদ্যের গাজন বলে
পরিচিত। আদ্য হচ্ছে শিবের আর এক নাম। কোন কোন অঞ্চলে তাকে নীলের গাজন বা নীলপূজা বলে।
সম্ভবত নীল বলতে নীলকণ্ঠ বোঝায়। সংস্কৃতে একে 'কালার্ক রুদ্র' বলে উল্লেখ করা হয়।
এর অর্থ হল ‘কাল’ সদৃশ ভীষণ অর্ক বা সূর্যের পূজা। কোনো কোনো জায়গায় হিন্দুরা এই
নামেই তাঁকে জানে এবং তাঁর পুজো করে।
শিবের গাজনের বেশির ভাগ অনুষ্ঠান
শুরু হয় চৈত্র মাসের দ্বিতীয় পক্ষে এবং চৈত্র সংক্রান্তির দিন— যেদিন সূর্য দ্বাদশ
রাশির পথ পরিভ্রমণ করে, এই অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয়। জাতিধর্ম নির্বিশেষে গ্রামাঞ্চলের
মানুষ এক এক বছর এক বা একাধিক সংখ্যার গাজনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে বলে আগে থেকেই
দেবতার কাছে মানত করে রাখে। এইভাবে মানত করে যারা গাজনে অংশগ্রহণ করে তাদের ভক্তা বা গাজুনে সন্ন্যাসী বলে। এক একটি গাজন দলে
একজন মূল সন্ন্যাসী থাকে। তাকে বলা হয় পাটভক্তা। এই কাজে তারা নিজেদের শুদ্ধ বা পবিত্র
করার জন্য পয়লা চৈত্রর চারদিন আগে থেকে কতকগুলি
আচার পালন করে। তারপর মাথা নেড়া করে, গেরিমাটির পরে পাট্টা ধারণ ও শিবগোত্র ধারণ করে
তার পরের দিনগুলিতে মহাহবিষ্যি করে থাকে। অবশেষে আসে চড়ক অনুষ্ঠান। চড়কের পর ১লা
বৈশাখে পাট্টা খুলে সকলে নিজের গোত্রে ফিরে যায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, পাট্টা কী? নতুন
কাপড়ের একদিকের লম্বা এক টুকরো কাপড় পাঁকিয়ে গলায় ধারণ করাকে পাট্টাধারণ বলে। সন্ন্যাসীরা
নিজের নিজের গ্রামের মহাদেবের প্রতিভূরূপে একটা ছোট শিবলিঙ্গকে নানারকম অলঙ্কার ও ফুলমালায়
সাজিয়ে একটা পালকি করে তিনদিন সেই গ্রামে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের নির্দিষ্ট কিছু
স্থানে পুজো করে। নীলের দিন সন্ন্যাসীরা নিজের গ্রামের মন্দিরের গাজনে শিবকে আনার পর
পুরোহিত পুজো করেন।
গ্রামবাংলার গাজন সাধারণত শিবের
ও ধর্মরাজের একটি বাৎসরিক পূজার অনুষ্ঠান হলেও বাংলার বিভিন্ন
জেলায় একই সঙ্গে ধর্মরাজ ও অন্যান্য
দেবদেবীরও পূজা হয়ে থাকে।
ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া বাবা
পিরাবনীনাথ মণি মহাদেব, বাবা এক্তেশ্বরনাথ মণি মহাদেব— এই ডাকের ব্যাপকতা ক্রমেই কমে
যাচ্ছে যুগের হাওয়ায়। গ্রামবাংলার হওয়ায় এখন নেট দুনিয়ার বহুল প্রবেশে গাজন উৎসবও
ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসছে। তবুও রাঢ়বাংলার বহু জায়গায় এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব আজও সাড়ম্বরে
পালিত হয়ে চলেছে।
ফিরে আসা যাক মূল বিষয়ে। দেখা
যায়, রাঢ়বাংলার বিভিন্ন জেলার গাজন পুজো বা উৎসবের রীতিগুলি যেমন। রীতি অনুযায়ী গাজনেরও রকমভেদ রয়েছে। যেমন— শিবের গাজন, ধর্মের
গাজন, চণ্ডীর গাজন। যদিও এর মধ্যে শিবের গাজনের প্রাধান্যই বেশি।
বাঁকুড়া জেলা
বাঁকুড়া জেলার অধিকাংশ গ্রামে শিবলিঙ্গমূর্তি পূজার রীতিই দেখতে পাওয়া যায়। আবার এক্ষেত্রেও স্থানভেদে ভোলানাথ শিব এক-এক এলাকায় এক-এক নামে পূজিত হন। যেমন — এক্তেশ্বরে একেশ্বরবাবা, সোনামুখীতে সিদ্ধেশ্বরবাবা, পাত্রসায়ের-এ কালঞ্জয় শিবনাথ, মোলবনায় নীলাম্বর, দধি মুখায়ে গঙ্গাধর, জগন্নাথপুরের রত্নেশ্বরবাবা। চৈত্র মাসে মোট ৩০টি শিবের গাজন হয়, এবং বৈশাখ মাসে ১২০টি শিবের গাজন একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। বাঁকুড়ার উল্লেখযোগ্য শিবতীর্থ হল এক্তেশ্বরবাবার গাজন। গোটা বাংলায় এখানেই পাটভক্তার সংখ্যা সবথেকে বেশি হয় বলে জানা যায়। এইসব পাটভক্তারা সকলেই বেত্রধারী। বাংলা তথা রাঢ়বাংলার গাজন পুজোর ইতিহাসে এত বেশি সংখ্যক বেত্রধারী পাটভক্তা দেখতে পাওয়া যায় না। এই জেলারই দধিমুখো গ্রামে বাবা গঙ্গাধর শিবের গাজন মেলায় ভক্তাদের অলৌকিক কাজকর্ম আজও দেখার মতো। এখানে বলে রাখা ভালো গাজন ব্রতে সব পাটভক্তাই কিন্তু বেত্র ধারনের অধিকারী হতে পারে না। এর জন্য বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। যেটি অর্জন করতে গেলে যে ধরনের কৃচ্ছতাসাধন করতে হয়, সেটা সব পাটভক্তার পক্ষে সম্ভব হয় না।
এছাড়াও কেশিয়াড়ার গাজন, কালঞ্জয়ী
শিবের গাজন। মৌলেশ্বর শিবের গাজন, ছান্দাবের শিবগাজন, বেলিয়াতোড়ের চন্দ্রশেখর গাজন
এখানকার উল্লেখযোগ্য গাজন উৎসব বা পুজো হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে।
যাগযজ্ঞ, পূজা পাঠ, ভক্তা সন্ন্যাসীদে
নানাবিধ তাক লাগানো কষ্টকর খেলার মাধ্যমে গাজন পুজোর দ্বিতীয় দিনে হয় নীলকণ্ঠের পুজো,
নীলহোম ও রাত-গাজন। চলে নানাপ্রকার বাণ ফোঁড়া।
মানকানালির গন্ধেশ্বরী নদীর ধারে শ্মশানকালী মাতাকে কেন্দ্র করে হয় শিবের গাজন
সোনারেখ গ্রামে। রাঢ়বাংলার প্রায় প্রতিটি গাজন পুজোকে কেন্দ্র করে যে উৎসব হয়ে থাকে,
তার একটি বড় অঙ্গ মেলা। আমার যাকে গাজনের মেলা হিসাবে বর্ণনা করে থাকি। শহুরে মানুষের
কাছে যদিও এই মেলার আকর্ষণ খুব একটা পরিচিত না হলেও আষাঢ় মাসে জগন্নাথের রথযাত্রাকে
কেন্দ্র করে রথের মেলার আগে চৈত্র মাসে এই গাজনের মেলা গ্রামবাংলার মানুষের দিনগত পাপক্ষয়ের
জীবনে এক অন্য মাত্রা এনে দেয়।
পূর্ব বর্ধমান জেলা
পূর্ব বর্ধমান জেলায় আবার কিছু অপ্রচলিত দেবতার সঙ্গে কিছু পরিচিত দেবীর নামেও বিশেষ কিছু রীতিতে গাজন পুজো হয়। যেমন— জামালপুর থানার বুড়োরাজ, বড় বলরাম গ্রামের বলরাম, কালনা থানার আনুখাল গ্রামের দেবী জয় দুর্গা, গলসি থানার দেবী ভগবতী, গলসি থানার কুরকুবা গ্রামে কমলা মাতার গাজনও হয়। এছাড়া কয়েকটি থানা এলাকায় মনসাদেবীর বাৎসরিক পূজাতে গাজন অনুষ্ঠিত হয়। যদিও গাজন শিব ও ধর্মের বাৎসরিক পূজার একটি অঙ্গ ও অনুষ্ঠান।
এক সময় রাঢ়বঙ্গে টোটেম সংস্কৃতির
ধারক ও বাহক বহু জনগোষ্ঠীর বাস ছিল। এইসব জাতির উপর আর্য সংস্কৃতির কোনো প্রত্যক্ষ
প্রভাব বা সংযোগ ঘটেনি। যদিও তাদের উপর এই সংস্কৃতি বা ধর্মাচারণ প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলা উচিত ছিল। কিন্তু এদের
জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের কারণে সম্ভবত সেটা ঘটেনি। কিন্তু একটা মিশ্র ধর্ম সংস্কৃতি এদের
মধ্যে গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধ, জৈন এবং হিন্দু ধর্মের নানা ধর্মাচার ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে
রাঢ় দেশে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নেন ধর্ম দেবতা। যা কালক্রমে এই জনগোষ্ঠীর গ্রাম দেবতায় রূপান্তরিত
হয়েছেন।
রাঢ়ে শিব, বিষ্ণু, সূর্য, শক্তি
ও গণপতি— এই পঞ্চদেবতার মধ্যে শিব, সূর্য ও শক্তি ক্রমে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে লৌকিক
দেবদেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। বিষ্ণু ও সূর্য পূজার সমন্বয়ে লৌকিক রূপের প্রকাশ প্রত্যক্ষ করা যায় ধর্মপূজায়। ধর্মদেবতা
আদিতে অনার্য দেবতা হলেও ক্রমে তিনি বৈদিক দেবতা বরুণ, অশ্ববাহিত সূর্য, পৌরাণিক কূর্মাবতার
প্রভৃতির সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে বর্তমানে ধর্ম দেবতায় রূপান্তরিত হয়েছেন। লক্ষ করার
বিষয় এই যে, ব্রাহ্মণ পুরোহিতরাই ধীরে ধীরে গাজনকে শৈব উৎসবে পরিণত করেছেন। শিব ক্রমে
গ্রাম্যদেবতা হয়েছেন বলে প্রাচীন ধর্মের গাজন সহজেই শিবের গাজনে পরিণত হয়েছে। ধর্মের
গাজনে পূর্বের অনার্য আচার-অনুষ্ঠান যেমন— নরমুন্ড নিয়ে নৃত্য করা, কলসী ভর্তি মদ
নিয়ে 'ভাণ্ডনৃত্য' বা 'ভাড়াল নাচ' এখনও রয়ে গেছে।
মেমারির সোমেশ্বর এবং কুড়মুন গ্রামের
ঈশানেশ্বর গাজন পুজোর জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধ। ঈশানেশ্বর সারা বছর গ্রামদেবী ইন্দ্রানীর
সঙ্গে থাকেন খুব সাধারণ একটি মন্দিরে। ঈশানেশ্বরের আকৃতি বেশ মোটা, চ্যাপ্টা, অসমতল,
অনেকটা বাটনা বাটা রুক্ষ শিলের মতো। উপরের দিকটা ঢেউ খেলানো, দু-পাশটা উঁচু— মনে হয় যেন দুটি কান। আনুমানিক ১১০০ বঙ্গাব্দে
গ্রামের সন্তোষ মণ্ডল স্বপ্নাদেশ পান যে, খড়ি নদীর কলমি সাগরের দহে ডুবে আছেন দেবী
ইন্দ্রাণী। তাঁকে দেবী বলেন, সেই মূর্তি তুলে এনে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে। সন্তোষ
সেই মতো কলমি দহ থেকে দেবীকে নিয়ে এসে ইন্দ্রাণী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ধমানের মহারাজার দেওয়া দেবীর
সেবাপুজোর জন্য বর্তমানে প্রায় ২৫ বিঘা জমি আছে। ১৩ই চৈত্র থেকে গাজনের সূচনা হয়।
ঈশানেশ্বকে ওইদিন ইন্দ্রানী মন্দির থেকে গ্রামের মাঝখানে বড় শিবমন্দিরে নিয়ে আসা হয়। বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন গ্রাম পরিক্রমা
ও পূজা হবার পর ২৫ থেকে ২৮শে চৈত্র অথবা ২৬
থেকে ২৯ চৈত্র শিব মন্দিরে গাজন উৎসব হয়।
এখানে গাজনকে কেন্দ্র করে এক অদ্ভুত
আচারের প্রথা চালু আছে। যা রাঢ়বঙ্গ তো বটেই বাংলার আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না।
অন্ত্যজশ্রেণির এই বিশেষ উৎসবের মধ্যে একটা লৌকিক গন্ধ থাকলেও এর বীভৎসতার বাহ্যিক
অনুভব সাধারণের কাছে অনেকটাই বিসদৃশ্য বলে মনে হয়। ২৮শে অথবা ২৯শে চৈত্র এই বিচিত্র
অনুষ্ঠানটি হয়ে থাকে। প্রথমটি হয় ভোর রাতে নরমুণ্ড নিয়ে নৃত্য। শ্মশান সন্ন্যাসীরাই
এই নরমুণ্ড নিয়ে নৃত্য করার অধিকারী। এর জন্য গ্রামের মন্ডলদের সামান্য দক্ষিণা দিতে
হয়। এই মুণ্ড সংগ্রহেরও একটি পদ্ধতি আছে। শ্মশান সন্ন্যাসীরা গ্রামের শ্মশান থেকে
বেওয়ারিশ মরদেহের নরমুণ্ড সংগ্রহ করে মাটির তলায় লুকিয়ে পুঁতে রাখে। মাঝে মাঝে তারা
সেই জায়গাটি দেখে আসে। আবার কেউ কেউ পাহারাও দেয়— একে 'শ্মশান জাগান' বলে। ইতিমধ্যে
সেই নরমুণ্ডগুলিতে পচন ধরতে শুরু করে। ২৮শে অথবা ২৯ শে চৈত্র ভোরবেলায় সন্ন্যাসীরা নিজের নিজের সংগৃহীত নরমুণ্ডগুলি
এক ধরনের লতায় পাতায় জড়িয়ে বাঁ-হাতে ঝুলিয়ে ধরে ডান হাতে তীক্ষ্ণধার লম্বা ছোড়া
বা রামদা নিয়ে ধুনোর কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার মধ্যে ঢাকের তালে তালে উদ্দাম নৃত্য করতে
করতে শিবমন্দিরের দিকে এগিয়ে যায়। মরার মাথাগুলো থেকে এতই দুর্গন্ধ ছড়ায় যে ধূপধুনোর
গন্ধও তা ঢাকতে পারে না। ভোররাতে এই দৃশ্য সত্যি বীভৎস ও ভয়াবহ মনে হয়।
এরপর দুটি দলের সন্ন্যাসীদের মধ্যে
বাদ্যযন্ত্র সহকারে শুরু হয় উদ্দাম নৃত্য। এই দুটি দলের একদল সাধারণ সন্ন্যাসী ও আর
একদল ওই শ্মশান সন্ন্যাসী। সাধারণ সন্ন্যাসীকে ফুল-সন্ন্যাসী বা ফুলভক্ত-সন্ন্যাসীও
বলা হয়। এরা সাদা দুটি পরে থাকে। শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে একটি গামছা, গলায় উত্তরীয় এবং
হাতে থাকে বেত্রদণ্ড।
অন্যদিকে, শ্মশান সন্ন্যাসীরা রঙিন
কাপড় খুব খাটো করে আঁটো-সাঁটো করে পরে। এদের ঊর্ধ্বাঙ্গ থাকে অনাবৃত, গলায় উত্তরীয়
ও লম্বা কাগজের মালা কয়েক পাক দিয়ে পরে পিঠ ও বুকের দিকে ঝোলানো থাকে। আগে শ্মশান
সন্ন্যাসীরা মুখে মুখোশ পরে থাকলেও বর্তমানে তার পরিবর্তে নানা রঙে মুখকে রঞ্জিত করে
নেয়। এদের সাজসজ্জা ও চলা-ফেরা শিবের নৃত্যসঙ্গী নন্দী-ভৃঙ্গী ও শ্মশানচারী পিশাচের
মতো। সাধারণত অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের লোকেরাই শ্মশান সন্ন্যাসী হয়।
ঢাক, ঢোল, কাশির বাজানো তালে তালে
বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নাচ দেখে সত্যিই ভূত-প্রেতের মতোই লাগে। ফুল-সন্ন্যাসীরা গাজনের
শিবকে নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘোরে আর শ্মশান সন্ন্যাসীরা ভূতপ্রেতের মতোই নৃত্য নৃত্য
করতে করতে এদের পেছনে চলতে থাকে।
এদিন গ্রামের বিভিন্ন পাড়া থেকে
'থাকা' নামের একটি বস্তু শিবতলায় আসে। 'থাকা' অর্থে বাঁশের তৈরি গ্যালারি। উপর থেকে
নীচে সাজিয়ে রাখা হয়। এক সময় এই ‘থাকা’ আসার আগের পর্বে বিভিন্ন পাড়ায় 'খেস্যা'
নামের একরকম গান হত। এটাকে ঠিক গান ভুল হবে; গানের মতো করে কবির লড়াই। বিষয়টি হল—
এক পাড়ার লোক অন্য পাড়ায় গিয়ে 'খেস্যা' গান করবার পর সেই পাড়ার লোক আর-একদিন গানের
মধ্যে দিয়ে প্রশ্ন রেখে যাওয়া পাড়ায় এসে গানের মাধ্যমে তার উত্তর দিয়ে যেত। কিন্তু
সংস্কৃতিটি আজ অবলুপ্তির পথে।
কুড়মুনের উগ্রক্ষত্রিয়, গোপ প্রভৃতিরা
শৈবতাণ্ত্রিক ছিলেন। হাঁড়ি, বাগদী, দুলে প্রভৃতি নিরঞ্জন ধর্মপন্থীদের উৎসবের সঙ্গে
শৈবতান্ত্রিক উৎসবের মিলনে ঈশানেশ্বর শিবের গাজন হয়ে থাকে। একই সঙ্গে হয় ধর্মরাজ
বা ধর্ম ঠাকুরের গাজন।
লোকসংস্কৃতি বলতে আমরা যা বুঝি,
তার বেশির ভাগ বিষয়সমূহ অতি সাধারণ নিম্ন বর্ণের জনগোষ্ঠীর মধ্যেই তৈরি হয় এবং সেখানেই
লালিত-পালিত হয়। বঙ্গ লোকসংস্কৃতির ধারায় লৌকিক বিষয়ের সঙ্গে লোকধর্মের একটি বিশেষ
ভূমিকা আছে।
লৌকিক ও লোকধর্ম সংস্কৃতি গড়ে
উঠেছে লৌকিক দেবদেবীদের পূজা ও বিভিন্ন লোকাচার
নিয়ে। এই দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলেন শিব ও ধর্ম। নগেন্দ্র চন্দ্র বিদ্যানিধির
মতে শিবের গাজনের প্রধান বিষয় হল হর-কালীর বিবাহ। সেই বিয়েতে সন্ন্যাসী হন বরযাত্রী।
আর ধর্মের গাজনে মুক্তির সঙ্গে ধর্মের বিবাহ হয়। দুই বিবাহই প্রচ্ছন্ন। অন্যদিকে,
আশুতোষ ভট্টাচার্য লিখেছেন— সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিবাহ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য।
চৈত্র মাস থেকে বর্ষার আরম্ভ পর্যন্ত সূর্য যখন প্রচণ্ড অগ্নিময় রূপ ধারণ করে তখন
সূর্যের তেজ প্রশমন ও বৃষ্টিপাতের আশায় কৃষিজীবী
সমাজ এক সময় এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করেছিল। শিব ও ধর্মের কাছে নিজেকে নিবেদন করে কৃচ্ছসাধন
করাই হল গাজনের তাৎপর্য। শিব ও ধর্মের তুষ্টির জন্য বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাময়িকভাবে
সন্ন্যাসব্রত ধারণ, উপবাস, হবিষ্যান্ন ও ফলাহার
গ্রহণ, বেত্রদণ্ড ধারণ, ব্রহ্মচর্য, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, পাটভাঙা, বাণ ফোঁড়া, আগুন
খেলা, ওপর থেকে কাঁটার উপর ঝাঁপ দেওয়া ইত্যাদি কৃচ্ছসাধন হল গাজন অনুষ্ঠানের প্রধান
অঙ্গ।
কৃচ্ছসাধনের অন্যতম অঙ্গ হল ঝাঁপ
দেওয়া, অনেক উঁচু মাচা থেকে মূল সন্ন্যাসী নীচে কাঁটা বা আগুনের উপর ঝাঁপ দেয়, তারপর
তাকে অন্যান্য সন্ন্যাসীরা সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলে। শেষে একে অপরকে আলিঙ্গন
করে বিদায় নেয়। পয়লা বৈশাখ মূল সন্ন্যাসী একটা জীবন্ত শোল মাছ পুড়িয়ে ভূতের রান্না
করে। সেই ভাত ও শোল মাছ পোড়া মন্দিরের উত্তরদিকে ভূত অর্থাৎ অশুভ আত্মাদের খেতে দেওয়া
হয়। তারপর মূল সন্ন্যাসী ফতুরি ও বিগত এক মাস ধরে ধারণ করা কাপড়ের পাট্টা খুলে আবার
স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।
গাজনে ব্রতধারী বা ভক্ত হওয়ার
অধিকার সকলের আছে। ব্রাহ্মণ থেকে হাঁড়ি, মুচি, চন্ডাল, ডোম, বাগদি, বাউরি— সকলেই সন্ন্যাসী
হওয়ার অধিকারী।
এখানে উল্লেখ্য, শিবের গাজন কেবলমাত্র
চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে হয়, কিন্তু ধর্মের গাজন বৈশাখী পূর্ণিমাতে হলেও গ্রামের সুযোগ-সুবিধা
অনুযায়ী বছরের যে-কোনো সময়ই হতে পারে। শিবের গাজনে বলিদানের নিয়ম নেই, কিন্তু ধর্মের
গাজনে বলিদানের বিধান আছে। এই উৎসবের কোনো শাস্ত্রীয় বাধা নেই তাই মূল উৎসবে কোনো
পার্থক্য না থাকলেও বিভিন্ন জায়গায় লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানের পার্থক্য দেখা যায়। আগেই
বলা হয়েছে, গ্রাম প্রদক্ষিণ করা গাজনের অন্যতম অঙ্গ— চতুর্দোলা, ঝুড়ি বা অন্য কোনো
ব্যবস্থায় ধর্মশিলা বা অন্য যে-কোনো প্রতীক
মাথায় নিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করা হয়।
(ক্রমশ)






কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন