সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

স্মৃতিকণা সামন্ত

 

রামনাম

 


সেদিন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বক্তব্য রাখলেন পন্ডিত নেহেরু; আমাদের শেষ আলোটি মিলিয়ে গেল... বলতে বলতে শুধরে নিলেন 'না না, শাশ্বত আলোটি অনির্বাণ হয়ে রইল ভারতবর্ষের হৃদয়ে।'

জানুয়ারির সন্ধ্যায় যমুনার জল ছুঁয়ে গেল আগুনের একটি শিখা। সে শিখা যজ্ঞের নাকি দাবানলের সে কথার উত্তর তক্ষুনি তক্ষুণি দিতে পারলেন না নেহেরু, প্যাটেল কিম্বা মাউন্টব্যাটেন কেউই। আজাদির অমৃতমহোৎসব পার করা অমৃতকুম্ভে হলাহলটুকু রেফ্রিজারেটেড হয়ে কোনো এক সোনার সুযোগের অপেক্ষায় প্রিজার্ভ করা থাকল কিনা কেই বা বলতে পারে?

এদেশের কপালে বুদ্ধ, চৈতন্য কিম্বা গান্ধী - আলাদা আলাদা সময়ের বলিরেখা, নাকি একই সরলরেখায় আঁকা তিনটি কালবিন্দু, সেকথা বলবে ইতিহাস। কিন্তু বেদ, উপনিষদ আর লোকজীবনের ক্রমাগত ককটেলে  মজে থাকা ভারতীয় হৃদয়ের চাবির সন্ধান পাওয়া যাবে এই তিনটি বিন্দু জুড়েই।

সি এফ এন্ড্রুজকে জিজ্ঞেস করুন, গান্ধীর মোস্ট রিমারকেবল কাজ কোনটা! চোখ বন্ধ করে, এক দুই তিন করে আঙুলের কর গুনে গুনে উনি বলবেন ছেচল্লিশের কলকাতা। অসহযোগ নয়, আইন অমান্য নয়, গোল টেবিল নয়, জাস্ট কলকাতা।

এক এই কলকাতাকে বুঝতে গেলেই ভারতবর্ষকে জানতে হবে তন্নতন্ন করে। তারজন্য হাঁটতে হবে হাজার হাজার মাইল, ঋষি কাশ্যপ থেকে কৌটিল্য হয়ে, হস্তিনাপুর থেকে কুরুক্ষেত্র ছুঁয়ে দিল্লি পৌঁছে ফিরে যেতে হবে পানিপথের মাঠে। বখতিয়ার খিলজী থেকে আওরঙ্গজেবের দক্কন ঘুরে ফিরে আসতে হবে ভবদেব ভট্ট'র দেশে। একফালি খদ্দর আর খালি পায়ের এই জার্নি প্রতিপদে পরীক্ষা নেবে আর সব শেষে এনে দাঁড় করিয়ে দেবে নোয়াখালির এক অখ্যাত গ্রামে!

সারাজীবন কী করেছেন মোহনদাস করমচাঁদ, সেই হিসেব নিকেশের খাতাখানি খুলে নতজানু হতে বসবেন শ্রীরামপুর গ্রামের কাছে। আধজ্বলা মাটির বাড়িটার হিন্দু মালিক নিখোঁজ। প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে, নাকি তার আগেই ধরা পড়ে গেছে তারই পড়শী ছোকরাদের হাতে, সে খবর কেউ জানে না সঠিক। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়াচ্ছেন গান্ধীজি, আর তাঁর পিছু পিছু ক্ষেত খামার থেকে উঠে এসে হাঁটছে মানুষ। এই মিছিলে  ক'জন হিন্দু ক'জন মুসলিম গুণে বলার দরকার নেই; হিন্দুর দাওয়ায়  বসে জল খাচ্ছেন, মুসলমানের উঠোনে বসে করছেন সন্ধ্যার প্রার্থনা।

এরপরেও বাংলার ফাজিল জল-কাদায় কাহিল হয়ে পড়লে উপসমের গ্যারান্টি দেওয়া কাদার পুলটিস চেপে ধরছেন মাথায় আর পেটে। কী খুঁজছেন গান্ধীজি? হারিয়ে যাওয়া মন্দিরের দেবতা, ঘরের বেড়া, লাউয়ের মাচা, তুলসী মঞ্চ নাকি এক অখন্ড ভারত?

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সুরাওয়ার্দি মোটেই ভালো চোখে দেখছেন না সেসব। মাঝে মাঝেই ধমক দিচ্ছেন, কেন গান্ধীজি নোয়াখালিতে সময় নষ্ট করছেন? কেন বিহারে যাচ্ছেন না? ঠিক তখনই গান্ধীজি তাঁর সেবাগ্রাম আশ্রমে চিঠি লিখছেন, "এখনই আমার নোয়াখালি ছেড়ে যাওয়া হচ্ছে না, আশ্রমে ফিরতে সময় লাগবে, কিম্বা হয়ত আর ফেরা হবে না কখনোই।"

দিল্লিতে তখন তুমুল হৈচৈ। কে রাজা হবে, কে মন্ত্রী, দেশ নামের কেকটা কোথায় কতটা টুকরো হবে এইসব হিসেব মেলাতে ব্যস্ত নেহেরু প্যাটেল কিম্বা আরও দূরে করাচিতে বসা জিন্নাহ গান্ধীজির এই বালখিল্য আচরণে বিরক্ত ছাড়া অন্য কিই বা হতে পারতেন?

অথচ কী এক জাদুছড়িতে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে নোয়াখালি, হিন্দুরা একে একে ফিরে আসছে ঘরে।  আর তাদের ঘরে ফেরার গ্যারেন্টার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে  মুসলিম পড়শীরা। ম্যাজিক তবে সত্যিই হয়? নাকি ম্যাজিক নামের ইল্যুশন দেখতে ভালোবাসে মানুষ? ম্যাজিক দেখতে চায় সাধারণ মানুষ আর রাজনীতি খোঁজে ম্যাজিক ফাঁকি দেওয়ার ছক।

যেদিন সত্যিই নোয়াখালি ছাড়লেন গান্ধীজি, সেদিন রাস্তায় তাঁকে থামিয়ে নিজের গাছের লেবু উপহার দিলেন  এক মুসলিম। ছলছল চোখে বললেন, 'আবার আসবেন কিন্তু'!

 ... নোয়াখালি থেকে বিহার হয়ে রাস্তা ঘুরে গেল কলকাতার দিকে। নাকি সেই রাস্তায় কলকাতাই ঘুরে গেল নির্বাণের দিকে?

হায়দারি মঞ্জিলের বাদুড়, আরশোলা কিম্বা চামচিকেরা সেদিন স্বপ্নেও ভাবেনি তারা একদিন কেউকেটা হয়ে উঠবে হঠাৎ। বেলেঘাটার এই নড়বড়ে বাড়িটার গায়ে যতটা ক্লেদ তার চেয়ে ঢের বেশি ক্লেদ ছড়িয়ে তখন কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়। রাস্তার দুধারে সার সার বন্ধ দোকান, আধপোড়া বাড়ি, টুকরো টুকরো মানুষ আর এক আকাশ শকুন নিয়ে কলকাতা তখন নরকনগরী। মানুষ নামের খাঁচার ভেতর বন্ধ রাখা অমানুষ হঠাৎ মুক্তির আনন্দে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথে। মেয়েরা বেহাত হচ্ছে, লোপাট হচ্ছে আর টুকরো টুকরো মানুষ গড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। গান্ধীজির গাড়ি ঘিরে থিকথিক করছে ভিড়, উন্মাদ চোখমুখ। 'গো ব্যাক!'

সময় এক আশ্চর্য ব্যাপারী। একই পাল্লায়  কখনো সোনা কখনো ধুলোর দরে ওজন হয় মানুষ। যে গান্ধীকে দেখার জন্য উপচে পড়ত ভিড়, যার এক ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ নেমে আসতো রাস্তায়, আজ সেই ভিড়ের কাছে ব্রাত্য গান্ধীর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কলকাতা। মৌন গান্ধী শুনলেন, লিখলেন, তারপর ধীরপায়ে চলে গেলেন হায়দারি ভবনের ভেতর, যেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষের বিষ্ঠা, শৌচালয় আর ব্লিচিংয়ের কড়া সঙ্গম, মেঝেতে ছড়ানো নর্দমার কাদা। তিন দশকের কাজের শেষে ভারতবর্ষ তাঁকে যা দিতে পেরেছে তার নাম হায়দারি মনজিল।

প্রথম যে ইঁটের টুকরোটা ঝনঝন করে ভেঙে ফেলল মঞ্জিলের জানলার কাঁচ, তাতে শিউরে ওঠেননি গান্ধী। যে ইঁটগুলো ছুটে আসছিল গান্ধীজির ছোট্ট শরীরকে টার্গেট করে, তাতেও চমকে ওঠেননি তিনি। মহাত্মা থেকে বাপু হয়ে ওঠার জার্নিতে এই চমকে না উঠতে পারাটা তাঁর সঞ্চয়। এরপর এক দুই তিন... ঢিলের পর ঢিল আর গান্ধীর আশ্রয়ে ভীতু কবুতরের মতো কাঁপতে থাকা সুরাবর্দি সাহেব।

ম্যাজিক না মিরাকল? কলকাতার ফোস্কাপড়া শরীরে অনশনের মলমপট্টিকে যেতে হবে এক ট্রায়ালের সুড়ঙ্গ ধরে। পনেরোই আগষ্ট যে জ্বর দেখে মনে হয়েছিল সেরে গেল বরাবরের মতো, সেই জ্বরই হু হু করে জানান দিয়ে ফিরল আগস্টের শেষে। নতুন করে কলকাতার আকাশে ফিরে এল শকুনের দল। একত্রিশ আগস্টের মাঝরাতে হায়দারি মঞ্জিল ঘেরাও করে, ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কাটার জন্য যারা ভিড় করে এল তারা কেউ খালি হাতে এলো না।

কী আশ্চর্য, গান্ধী বাইরে এলেন, কথা বললেন– ভিড়টা ফিরে গেল যেখানে থেকে এসেছিল। আর সন্ধ্যায় গান্ধী শুরু করলেন আমরণ অনশন।

একটা রিডিক্যুলাস স্ট্র্যাটেজি, নিজেকে বাজি রেখে অন্যকে বাঁচিয়ে দেওয়ার স্ট্র্যাটেজি আর শতাব্দীর সেরা মানুষ হয়ে ওঠার মরণপণ পরীক্ষা।

ব্রিটিশ মালিকানায় পাবলিশ হওয়া গান্ধীর ওপর বেজায় চটা স্টেটসম্যান পত্রিকা সেদিন লিখল "... Never in a long career has Mahatma Gandhi, in our eyes, fasted in a simpler, worthier cause than this, not one more calculated for immediate effective appeal to public conscience." আর সেপ্টেম্বরের চার তারিখে যেদিন কলকাতার ইউরোপিয়ান আর অ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ান, সমস্ত পুলিশ ফোর্স গান্ধীর অনারে একদিনের অনশনে রইল, সেদিন থেকে কলকাতা এক ম্যাজিকাল সিটি। ম্যাজিকম্যানের নাম মহাত্মা গান্ধী।

সেদিনই দুপুরে বেলেঘাটার হায়দারি মঞ্জিল দেখল সেইসব অপরাধের বেতাজ বাদশাদের যারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল কলকাতার রাস্তা, বস্তি আর গলি। গান্ধীর পায়ের কাছে একে একে তারা নামিয়ে রাখল অস্ত্রশস্ত্র অনুতাপ, আর চোখের জলে ধুয়ে মুছে ফেলতে চাইল সব পাপ। এরা কেউ হিন্দু কেউ মুসলিম। একজন মুসলিম গুণ্ডা ফুঁপিয়ে বলল, 'এবার তো কিছু খান!'

এরপরের গল্পটা রূপকথা। শহরের এইসব হুলিগানরা দায়িত্ব নিয়ে ঘুরতে লাগল পাড়ায় পাড়ায়, বস্তি, গলি  আর রাজপথে, শান্ত করতে থাকল যেখানে যত রাগ, আর সন্ধ্যায় চললো গান্ধীজির কাছে ডিটেইল আপডেট সারাদিনের কাজের। শহরটার আকাশ থেকে শকুনরা চলে গেল দূরে, নীল রংটা গাঢ় উজ্জ্বল হয়ে উঠল আবার।

মাউন্টব্যাটেন লিখলেন, " ln the Punjab we have 55 thousands soldiers and large scale rio-ting in our hands. In Bengal one force consists of one man, and there is no rio-ting."

বাংলা থেকে দিল্লি অবধি এ যেন এক নির্বাণের পথ আর সেই পথে টুকটুক করে লাঠি হাতে হেঁটে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধ, শতাব্দীর সেরা বৃদ্ধ এক মানুষ। মাদুরাই মীনাক্ষী মন্দির থেকে সুফি বখতিয়ারউদ্দিনের দরগা অবধি এক অনন্ত যাত্রা, দেশ নামের এক প্যানোরমিক আস্থা আর আস্থা এসে থামা বাপু নামের কেন্দ্রে। আধুনিক ভারতের একমাত্র অবতার খাটো ধুতি, খালি পা আর চশমার আড়ালে এক অখন্ড ভারতীয় দর্শন।

দিল্লির রাস্তায় যখন খাকি হাফপ্যান্ট আর কালো টুপির স্লোগান 'বুড়োটাকে মর-তে দাও' তখনই সদ্য স্বাধীন একটা দেশের তলে তলে ক্ষয়ে যাচ্ছে বেদ, বেদান্ত কিম্বা উপনিষদের শাশ্বত সব বাণী। বোধিবৃক্ষটি অসুস্থ বোধ করছে, আর যমুনা শুকিয়ে যাচ্ছে ভ-য়ে।

মদনমোহন পহওয়া'র হাত বোমাটা মিস হয়ে গেছিল, কিন্তু নাথুরামকে ঠেকাতে না পারা ছিল ভারতবর্ষের নিয়তি। চৈতন্য'র গুমখুনের বহু শতাব্দী পর ভারত আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে অন্ধকারের উৎস হতে আলো নয়, অন্ধকারই উৎসারিত হয়। একবার নয়, বারবার।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন