সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

শৌভিক দে

 

সমকালীন ছোটগল্প


রামবাবুর একদিন, প্রতিদিন

(এটি একটি পরমাণু গল্প। আলাদা করে যেমন ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রনের অস্তিত্ব জানা যায়, আবার একত্রে তারা একটি পরমাণু, তেমনি ১, ২, ৩ করে প্রতিটি পরিচ্ছেদই স্বয়ংসম্পূর্ণ গল্প। আবার সব মিলিয়েও একটা গল্প দাঁড়ায়।)

(এক)

কাল মাঝরাতে একটা গল্পের কাঠামো মাথায় এসেছিল রামবাবুর। সারারাত স্বপ্নের মধ্যে সেজে উঠেছে সে। ডায়েরিতে নামালেই হল। অবসরের পর - আজকাল কিছু কিছু ভুলে যাচ্ছেন তিনি। তাই তাড়াতাড়ি প্রাত্যহিকতা সেরে লেখার টেবিলে বসতে যাচ্ছিলেন - কিন্তু তাঁর গল্প লেখার সবুজ ডায়ারিটা দেখতে পেলেন  না। পাশে বিশৃঙ্খল বইয়ের জটলা, না সেখানেও নেই। ড্রয়ার - না। নিচে পড়ে যায়নি তো? কৈ - ফাঁকা মেঝে। এটা কার দরকার পড়ল যে সকাল সকাল সরাতে হল? ভীষণ রেগে 'শুনছো' বলে চিৎকার করতে গেলেন রামবাবু, কিন্তু 'শু' বলেই থেমে গেলেন। শুভমিতা তো নেই! তার একচল্লিশ বছরের সহযাত্রী গত বছর চলে গিয়েছেন। কিন্তু অভ্যাস! অভ্যাসটা ফেলে গেছেন পিছনে।

 

(দুই)

ভোর সকালে, রামবাবুর ঘুমের মধ্যেই, কাজের লোক চিরতার জল, ফ্লাস্কে চা আর দুটি বিস্কুট রেখে যায় টেবিলে। না, দৈনন্দিন ধারাবাহিকতায় কোনো ফাঁক নেই। কিন্তু...! চিরতার জল আরো তেতো লাগলো। কোনোরকমে গিলে চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় এলেন রামবাবু। সামনে গাছের চুড়ায় লাল হলুদের বাউল ধড়া। এটা কি বসন্তকাল? যখন তিনি কবিতা লিখতেন তখন এসব মনে থাকত। গদ্যের রাজ্যে বাসা বদলের পর আর খেয়াল থাকে না। তিনি প্রেমের গল্প লেখেনও না। সম্পর্কের আলো অন্ধকার তাঁর প্রিয় বিষয়। তাছাড়া মাঝে মাঝে শ্রেণী সংগ্রাম, সমাজবাদ দিয়ে মুখ বদল করেন। বিশ্বাস করেন গদ্যের কড়া হাতুড়িকে। প্যানপ্যানে প্রেমে তাঁর অম্বল হয়। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন রামবাবু। কলোনি পত্তনের সময় পরিকল্পনা মাফিক কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া গাছ পর পর লাগানো হয়েছিল। আজ সেখানে ঝাঁপিয়ে ফুল এসেছে। পাখিগুলো  অকারণেই উড়ে বসছে এই ডাল থেকে ওই ডালে। কিচির মিচির। লাল হলুদ। ঠাণ্ডা হাওয়া। রামবাবু কি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন? এই লাল হলুদের সমবায় তাঁর প্রয়াতা স্ত্রীর খুব পছন্দ ছিল।

 

(তিন)

আদর্শ স্ত্রী হিসেবে শুভমিতা একশোয় আটানব্বই পাবে। বাইরে সবাই ধন্য ধন্য করত তাদের জুড়িগাড়ি দেখলে। কিন্তু কেউ জানে না, শুভমিতা চলে যাবার পর রামবাবুর একটা মুক্তির উল্লাস হয়েছিল। সারাজীবন - বিশেষত অবসরের পর তিনি... বলা যায়... রাজবন্দী হয়ে অন্তরীন ছিলেন। শুভমিতা টারান্টুলার মত তাকে গ্রাস করে ফেলেছিলেন। তিনি কোথায় যাবেন, কখন যাবেন, কী খাবেন, কতটা খাবেন, কী পরবেন - এমন কী - কী বলবেন ছেলেমেয়েকে সেটাও যেন চিত্রনাট্যের মত সাজিয়ে দেওয়া ছিল শুভমিতার কাজ। অবশ্য  সব প্রয়োজনীয় পেতেন হাতের নাগালে। সেবা পরিপাটি। কিন্তু রামবাবু - কোথাও একটা - ভালো ছিলেন না। শুভমিতা হঠাত যাবার পর, প্রাথমিক হতভম্বভাব কেটে গেলে, তিনি যেন স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলেন বহুদিন পরে। স্বাধীন! স্বেচ্ছাধীন! ছেড়ে দেওয়া সিগারেট ফিরিয়ে আনতে পারেন। আচ্ছা অতটা থাক! কিন্তু সকালে হাঁটা ছেড়ে দিলেন। ব্যস্ত ছেলে-বৌমা দু একবার গাঁইগুই করে চুপ করে গেল। বিকেলের আড্ডায় কিছুদিন নিয়মিত দেখা গেল তাঁকে। সভা সমিতিতে যেতে শুভমিতা বারণ করেনি কখনো। কিন্তু এখন যাবার সময় ইস্ত্রি করা জামা কাপড় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মাস ছয়েক কেটে গেলে স্বাধীনতা আর তেমন স্পৃহণীয় থাকল না। রামবাবু কি সত্যিই এই স্বাধীনতা চেয়েছিলেন?

 

(চার)

কাজের লোক তাড়া লাগাল, প্রাতরাশ তৈরি। খাবার পরে তাঁর নিয়মিত ওষুধ খাবার কথাও সে মনে করাতে ভুলল না। পরিপাটি আয়োজন। দুটি টোস্ট নুন-মরিচ ছড়ানো, অল্প মাখন, একটা কলা, চিনি ছাড়া লাল চা। দশটায় পাবেন কিছু সময়োচিত ফল। এখনও সংসারে শুভমিতার প্রশিক্ষণের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। অন্যমনস্ক ভাবেই খাওয়া শুরু করলেন রামবাবু। একটা টোস্ট শেষ করার পর খেয়াল করলেন টেবিলে তিনি একাই বসে আছেন। তাই হবার কথা। ছেলে-বৌমা দুজনেই দুরকম চাকুরীজীবী। সকালের খাবার সময় আলাদা আলাদা। রাতে অবশ্য সবাই এক সঙ্গেই বসে। দুজনেই রামবাবুর সারাদিনের খোঁজ খবর নেয়। বাইরের পৃথিবীতে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটলে মধ্যলয়ে মত বিনিময় করেন, চ্যাঁচামেচি হয় না। এখন আর সময়ের বিধিনিষেধ নেই, শুভমিতা থাকলে তাড়া লাগাতেন। ইদানীং আড্ডা এমন কি মধ্যরাতও ছুঁয়ে ফেলে। ওরা চায় তাঁর মন ভালো থাকুক, তাই নিজে থেকে উঠতে চায় না কখনো। কোনো ফাঁক নেই, অভিযোগের স্থান নেই, সব যথাযথ। তবু আজ বাঁদিকের খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলেন রামবাবু, 'এত তাড়া কিসের ছিল, অ্যাঁ!’

 

(পাঁচ)

সকালের খাওয়া শেষ করে রামবাবু দুই বছরের নাতনির ঘরে গেলেন তার তত্বতালাশ করতে। ঘরে ঢুকেই তিনি চিত্রার্পিত। কিম্বা ভাব সমাহিত। কিম্বা ...। নাতনী একা একা বসে তাঁর হারিয়ে যাওয়া গল্পের খাতা থেকে এক একটা পাতা ছিঁড়ে উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়।  আর খিলখিলে হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। একটা প্রচণ্ড রাগ অসহায়তার নালি দিয়ে নেমে পালিয়ে গেল। এই তাঁর একমাত্র নাতনী। জন্মরুগ্ন। হাসে কদাচিৎ। অধিকাংশ সময় - তার না বোঝাতে পারা কান্না ঘুরে বেড়ায় ঘরের কোণে কোণে। ক্ষত বিক্ষত করে পরিবারের সবাইকে। আজকের এই খুশিতে গড়াগড়ির ছবি কোনোদিন দেখেননি রামবাবু। নাতনী হঠাৎ তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। তার বড় বড় চোখের দিকে তাকিয়ে রামবাবু চোখ নামিয়ে নিলেন। ভাবলেন - কী জন্যে তার লেখালেখি? কাউকে আনন্দ দিতে, চিন্তার খোরাক যোগাতে, সার্থকতার  জন্যে? আজ যে আনন্দ পাচ্ছে এই শিশু , তাকে কোনদিন এত খুশি দেখেনি কেউ। রামবাবু বসে পড়লেন মেঝেতে।  একটা ছেঁড়া পাতা হাওয়ায় উড়িয়ে হেসে উঠলেন হো হো করে। খিলখিল হাসিতে ফিরল নাতনিও। একটু হাসলেন গিন্নীও -  দেওয়ালে টাঙ্গানো ছবি থেকে। ছেলে বৌমা দৌড়ে এসে হতবাক। তারা দেখল -  মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে দুই প্রজন্মের চিন্তাহীন সার্থকতা।

 

 

 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন