ছোটবেলার থিয়েটার, আমি বৈকুণ্ঠ … ফিরে দেখা
প্রতি,
হে দর্শক...
শৌখিন অভিনেতা হিসেবে ছাত্র
ও অধ্যাপক জীবন থেকেই ইংরেজি ও বাংলা বহু নাটকে অভিনয় করেছিলেন শিশিরকুমার। মূলত
তখন ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলেই অভিনয় হত। ১৯১২ সালে এই হলে রবীন্দ্রনাথের
‘বৈকুন্ঠের খাতা’ নাটকে কেদারের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।
বৈকুণ্ঠের খাতা রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের লেখা একটি জনপ্রিয় প্রহসন বা হাস্যরসাত্মক নাটক। নাটকটি ১৮৯৭
সালে (১৩০৩ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হয় ।
নাটকের মূল বিষয়বস্তু, নাটকটির
প্রধান চরিত্র বৈকুণ্ঠ, যিনি একজন অত্যন্ত সহজ-সরল ও অমায়িক
মানুষ। তাঁর একমাত্র নেশা হলো লেখালেখি করা এবং সুযোগ পেলেই নিজের লেখা পুঁথি বা 'খাতা' অন্যকে পড়ে শোনানো। কিন্তু তাঁর এই দীর্ঘ ও
একঘেয়ে লেখা শোনার ধৈর্য কারও থাকে না। মানুষ তাঁকে এড়িয়ে চলে, কিন্তু বৈকুণ্ঠের সরলতা ও আতিথেয়তার সুযোগ নিয়ে অনেকে তাঁর ক্ষতি করার
চেষ্টাও করে ।
প্রধান চরিত্ররা বৈকুণ্ঠ, সহজ-সরল লেখক ও কেন্দ্রীয় চরিত্র। অবিনাশ বৈকুণ্ঠের ছোটভাই, যে সংসারের বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। তিনকড়ি, এক
ধূর্ত চরিত্র যে বৈকুণ্ঠের লেখা শোনার ভান করে তাঁর কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে।
এই নাটকে রবীন্দ্রনাথ ব্যঙ্গ
এবং হাস্যরসের মাধ্যমে মানুষের চারিত্রিক সরলতা এবং তার বিপরীতে সমাজের কুটিলতাকে
ফুটিয়ে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নিজের লেখা প্রহসন 'বৈকুণ্ঠের
খাতা'-য় কেদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
এই নাটক ও তাঁর অভিনয়
সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঠাকুরবাড়িতে এই নাটকের ঘরোয়া এবং মঞ্চায়িত উভয় ক্ষেত্রেই 'কেদার'
চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপরের স্মরণীয় ঘটনা
১৯১২ সালে কবিগুরুর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে যখন এই
নাটক মঞ্চস্থ হয়, তখন কেদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত
অভিনেতা শিশিরকুমার ভাদুড়ী। অবশ্য তিনি তখনও তত বিখ্যাত নন। তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "কেদার আমার ঈর্ষার পাত্র"। কবিগুরু প্রকাশ্যে
তাঁর প্রশংসা করেন, যার প্রমাণ হিসেবে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “কেদার
আমার ঈর্ষার পাত্র। একদিন এই ভূমিকায় খ্যাতি আমারই ছিল।” উল্লেখযোগ্য যে
রবীন্দ্রনাথ নিজে পূর্বে কেদার চরিত্রে
অভিনয় করেছিলেন; ফলে এই মন্তব্য কেবল সৌজন্যমূলক প্রশংসা নয়,
বরং একজন স্রষ্টার পক্ষ থেকে তাঁরই সৃষ্ট চরিত্রের এক নতুন
অভিনয়-ব্যাখ্যাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঐতিহাসিক দলিল। সেই সময়
হোক বা এই সময়ে বাংলা থিয়েটার প্রধানত স্টার-অভিনেতা নির্ভর।
এখনও তো স্টারের নামেই টিকিট বিক্কিরি হয়।
আবার ফেরা যাক সেই সময়ে, তখন
অতিনাটকীয় সংলাপপ্রবণ ও বাহ্যিক আবেগনির্ভর অভিনয়রীতির মধ্যে আবদ্ধ
ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে শিশির ভাদুড়ীর কেদার চরিত্রায়ণ অভিনয়ের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে
এক মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
রবীন্দ্রনাথের ‘বৈকুন্ঠের
খাতা’র বা অন্য
নাটক - রবীন্দ্রনাট্য এক
জটিল ব্যাপার-স্যাপার। সেসব পেশাদার মঞ্চে হবে কিনা, তাতে রবি ঠাকুরের
চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক সত্তা—আত্মসমালোচনামুখর, দ্বিধাগ্রস্ত এবং নৈতিক সংকটে
আবদ্ধ। শিশির ভাদুড়ী এই চরিত্রে অভিনয় করে সফল। তাঁর বাগ্মিতা
বা উচ্চকিত আবেগের পরিবর্তে সংযত শরীরী ভাষা, নীরবতা এবং
সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির, আলোচিত হয়। তাঁর অভিনয়ে ‘কেদার’ হয়ে ওঠে অন্তর্মুখী এক মানবচরিত্র, যে নিজের মধ্যেই নিজের বিচারক। এই সংযমী অভিনয়রীতি দর্শকের মনোযোগ
চরিত্রের অন্তর্লৌকিক দ্বন্দ্বের দিকে আকৃষ্ট করে, যা তৎকালীন বাণিজ্যিক মঞ্চে
বিরল ছিল। তবে ‘কেদার’ চরিত্রে শিশিরকুমার
ভাদুড়ীর অভিনয়ই নাট্যইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকে, আলোচনা করা হয়।
এরপর তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন যে, তুমি আমার নাটকগুলো কর।
কিন্তু, কেন
আজ এটা লিখলাম? হঠাৎ?
না রবীন্দ্রনাথের কোনও বিশেষ
দিন, না শিশিরকুমার ভাদুড়ির। তবে, লিখলাম, কারণ পড়ছিলাম। এর সঙ্গে একটা ফ্ল্যাশব্যাক উঠে আসে। তাই এই লেখা…
একবার আমাদের পাড়ায়
মা-কাকিমাদের এই নাটক করার দায়িত্ব আসে। আমাদের ছোটদের কি নাটক ছিল? কেন ‘পেটে ও পিঠে’, কেন ‘ডাকঘর’! আমি অমল কতবার যে হয়েছি! কেউ কেউ বলেন,
এই করে করে মাথাটা গেছে। অভিনয়ের অমল আমার মধ্যে আমূলভাবে ঢুকে গেছে। আর কে না
জানেন, পেটে খেলে পিঠে সয়!
সেবারও ছিল ওই একই। কিন্তু প্রতিবার ওই একই নাটক করার ইচ্ছে আমাদের ছিল না। আমরা পালিয়ে গেলাম কেউ কেউ। গিয়ে ঢুকলাম
বড়দের রিহার্সালে।
আমি অবশ্যই তখন বেশ বড়। ক্লাসফোর। আকারে ছোট হলেও, বড় বেশ। গোল গোল চোখ করে দেখতে দেখতে ভাবলাম, এই সংলাপগুলো বেশি ভালো আমাদের নাটকের চেয়ে। আমি সবাইকে জানালামও। সেই কারণেই নিজেদের রিহার্সাল ফেলে সবাই বড়দের রিহার্সাল দেখতে এসেছিলাম। হ্যাঁ, সেখানেও কেদার ছিল। আর কেদার করছিলেন আমার কাকা। তিনিই নাটকের নির্দেশক। তিনি পাড়া এবং নিজের অফিসের সব নাটকের নির্দেশনা করতেন। আর সামনে একটা রুলটানা পাতায় হাতেলেখা লাইনগুলো হুবহু বলতেন। কখনও বসে। কখনও দাঁড়িয়ে। কখনও আবার নড়েচড়ে আমাদের সাদারঙ দিয়ে খড়ি দিয়ে বসার ঘরে জায়গা মাপা থাকত। জায়গার মধ্যে ওঁরা ঘোরাঘুরি করতেন। আমাদের দেখে বড়রা তো রেগে গেছেন। বললেন, কী ব্যাপার?
আমরা বললাম, আমরা এই
নাটকটা করব।
তখন বড়দের মধ্যে থেকে প্রশ্ন
এল, তাহলে তোমাদের নাটক কে করবে?
আমিও বললাম, কেন তোমরা!
হাসির যেন ঝড় চলল। বুঝলাম না
কেন!
ফিরে দেখার থিয়েটার, ফ্ল্যাশব্যাকে
থিয়েটার পাঁচালি-র এই কথাগুলো সামান্য। এর কোনও ছবি নেই। অ্যালবামে যে ছবি
ছিল, সাদাকালো রঙিন, সব রঙ লেপটে একেবারে ধূসর। ওই পাতাটায় একটা টিকিট করে লেখা। অমল, ডাকঘর, সাল ১৯…। কিন্তু বৈকুণ্ঠ? এমনকি কাকুর ছবিও নেই কেদারের।
তবে, বিশ্বাস করি আজও, আমি বৈকুণ্ঠ করতেই পারি। এটুক-ই। পাঠকের ভাল লাগলে আমারও ভাল লাগবে।
ইতি
একুশ
শতকের এক ফ্ল্যাশব্যাক স্বত্বাধিকারী


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন