বড় পর্দায় হিন্দী ছবি নতুন ছবি
– ধুরন্ধর (২০২৫)
“এক
হাজার ক্ষতের মাধ্যমে ভারতের রক্তক্ষরণ ঘটাবো!” ১৯৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের হাতে
চরমভাবে পরাজিত হবার পর পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাধ্যক্ষ এবং পরে রাষ্ট্রপতি জিয়া-উল-হক-এর
এই উক্তি, যার পূরণ আমাদের পশ্চিমী প্রতিবেশী সেদিন থেকে আজ নিষ্করুণভাবে করে চলেছে।
ছবির
শুরুতেই দেখি কান্দাহারে ভারতীয় বিমান অপহরণের অপমানজনক উপসংহার। বিমানে বন্দী ভারতীয়দের
মুক্তির বিনিময়ে – তাও এক সদ্য-বিবাহিত যুবককে নির্মম হত্যার পর – ভারতে বন্দী একাধিক
সন্ত্রাসবাদীকে ছেড়ে দিতে রাজী হতে হয় দেশের সরকারকে। এরপরে, বিমানে উঠে ভারতের আমলা
অজয় সান্যাল (বাস্তবের অজয় দোভাল, অভিনয়ে আর মাধবন) অপহৃত যাত্রীদের দেশে ফেরার কথা
বলে আশ্বস্ত করে ডাক ছাড়েন, “ভারত মাতা কী”, কিন্তু যাত্রীরা কেউ “জয়!” বলে প্রত্যুত্তর
দেবার সাহস করে না – কারণ সান্যাল সাহেবের মাথার পেছন থেকে একজন অপহরণকারী পিস্তল তাক
করে রেখেছে তাদের দিকে!
তারপর
আমরা দেখি দিল্লীর সংসদ ভবনে আতঙ্কবাদী হামলা। এতে বিদেশমন্ত্রী (অভিনয়ে আকাশ খুরানা)
বাধ্য হন সান্যালের প্রস্তাবে রাজী হতে। ভারতের কারাগারে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত
এক অপরাধীকে মুক্ত করে ছদ্মবেশে পাকিস্তানে ঢোকানো হবে। এই ব্যক্তি নাম নেবে ‘হামজা
আলি মাজারি’ (অভিনয়ে রণবীর সিং), আপাতদৃষ্টিতে এক বালোচী। সে ধীরে ধীরে করাচীর মধ্যে
লিয়ারী অঞ্চলে পাকিস্তানী অপরাধ জগতের অন্যতম ‘ডন’ রেহমান ডাকাইত-এর (অক্ষয় খান্না)
বিশ্বাস-অর্জন করে তার দলে প্রবেশ করে ভেতর থেকে পাকিস্তানের কুকর্মের প্রতিকার করবে।
আফগানিস্থান
থেকে পাকিস্তানের লিয়ারীতে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে প্রথম বীভৎস ঘটনা। রাতে, নিজের
‘হ্যান্ডলার’ মহম্মদ আলমের (অভিনয়ে গৌরব গেরা) সঙ্গে কথাবার্তার পর আলমের দোকান থেকে
বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে হামজা মুখোমুখি হয় একদল বালোচী-বিরোধী গুণ্ডার। তাদের নেতা হামজার
পাজামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তার গোপনাঙ্গ নিয়ে কামক্রীড়া করার পর নিজের সোৎসাহে নিজের
হাতের গন্ধ শোঁকে। হামজা প্রত্যুত্তরে মারামারি শুরু করলে দলটি তাকে মাটিতে ফেলে তার
পাজামা টেনে নামিয়ে হামজাকে পায়ুধর্ষণে সচেষ্ট হয়। আমাদের সুরক্ষিত রাখার জন্য যারা
শত্রুদেশে যায়, আমরা সাধারণত তাদের জীবন এবং হাত-পায়ের ওপর আক্রমণ হওয়ার কথা ভাবি
– তারা যে ধর্ষিত হয়, সে সম্ভাবনা স্বপ্নেও আমাদের মনে আসে কি? সেই মুহূর্তে অকুস্থলে
একটি পুলিশ-ভ্যান এসে পড়ায় হামজা রক্ষা পায়, দলটি পালায়। তারা ধরা পড়লেও শাস্তি পেত
ধর্ষণের জন্য নয়, সমকামী যৌনকর্মের জন্য, যা এই সেদিন অবধি ভারতেও দণ্ডযোগ্য অপরাধ
ছিল, মৌলবাদী মুসলমান দেশে তো আরও তাই! সাম্প্রতিক গাজায় পুরুষ ইজরেলী পণবন্দীদের ধর্ষণ
করার পর হামাস কর্তৃপক্ষ ধর্ষকদের প্রাণদণ্ড দেয়, ধর্ষণের অপরাধে নয়, সমকামিতার ‘অপরাধে’।
যদি হামজা ধর্ষিতও হতো আর পুলিশ এসে ধর্ষকদের সঙ্গে হামজাকেও তুলে নিয়ে যেত, সম্ভবত
সমকামিতার ‘অপরাধে’ ধর্ষক এবং ধর্ষিত – শেষজন বালোচী হবার বাড়তি ‘অপরাধে’ সমানভাবে
দণ্ডিত হতো। পাঠকদের স্মরণ করাই, এই ধারাবাহিক লেখার সপ্তম পর্বে (‘ব্ল্যাক ও তার বিপরীতে কিছু ‘বাজে’ ছবি’) উল্লেখিত
বদ্রীনাথ কী দুলহানিয়া-র কথা। সেখানেও বিদেশের
মাটিতে রাতের বেলায় বরুণ ধাওয়ান অভিনীত নায়ক ও তার সঙ্গীরা একদল দুষ্কৃতির হাতে গণধর্ষিত
হতে যাচ্ছিল, এবং ছবির নির্মাতারা, ছবির নায়িকা (আলিয়া ভট্ট) ও তার সঙ্গিনীরা, এবং
প্রেক্ষাগৃহের দর্শকেরা এটিকে হাসির খোরাক হিসেবে নেন!
ছবিটি
এতদিক থেকে অসাধারণ যে তার সমস্ত গুণ নিয়ে লিখতে গেলে এক পর্বে হবে না। বরং বিভিন্ন
চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেতাদের কথা বলি। এখানে একজন নায়ক ও তার বিপরীতে একদল খলনায়ক।
রেহমান ডাকাইত-রূপী অক্ষয় খান্নার উল্লেখ আগেই করেছি। লিয়ারীর রাজনীতিবিদ জামিল জামালির
(বাস্তবে নবিল গাবোল) ভূমিকায় চমকে দিয়েছেন এতদিন মোটা দাগের ভাঁড়ামি-করা চরিত্রের
জন্য পরিচিত রাকেশ বেদী। একাধারে ক্রূরতা এবং হাস্যাস্পদতার অদ্ভুত সংমিশ্রণ তাঁর চরিত্রচিত্রণে।
জামালির কন্যা ইয়ালিনার চরিত্রে সারা অর্জুনের চেহারা, অভিব্যক্তি, স্বরক্ষেপ – সমস্ত
যথার্থ। ক্ষমতাবান নেতার কন্যা হিসেবে অধিকারবোধে আক্রান্ত, দিনরাত পার্টি করা আর শপিঙে
মগ্ন, এবং খোদাই-করা দেহবিশিষ্ট হামজাকে দেখে নির্বোধের মতো মুগ্ধ হওয়া কন্যার চরিত্র
সঠিকভাবে সারা ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রেমিকের কথায় পিতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ অফিসার
চৌধুরী আসলামের (সঞ্জয় দত্ত) গোপন কথোপকথন ফোনে ‘ভিডিও’ করে হামজার হাতে তুলে দিয়ে
ইয়ালিনা কাহিনির অগ্রগতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাকি
খলনায়কদের মধ্যে উপর্যুক্ত আসলাম চৌধুরী-রূপী সঞ্জয় দত্ত হিংস্র। আই এস আই-প্রধান মেজর
ইকবাল (অভিনয়ে অর্জুন রামপাল, বাস্তবে চরিত্রটির নাম ইলিয়াস কাশ্মিরী) ২৬/১১-র মুম্বাই
হামলার আগে আতংকবাদীদের ঠাণ্ডা গলায় বলেন যে, তাজ হোটেলে কোন ‘ফিরিঙ্গী’, বিশেষ করে
ইহুদী, যেন না বাঁচে, তারা সব ‘কাফের’। হামজার সামনে টিভির পর্দায় হত্যাযজ্ঞ দেখতে
দেখতে রেহমান, ইলিয়াস, সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ে। তাদের ধর্মীয় স্লোগান তোলার দৃশ্যও মানসিক
দিক দিয়ে হামজা এবং দর্শকের মনে অশান্তির সৃষ্টি করে।
পাকিস্তানের
গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব – বালোচী বনাম পাঠান – আর ব্যক্তিগত বিদ্বেষ (আসলামের স্ত্রীর সঙ্গে
পরকীয়া চালিয়েছিল আসলামেরই এক বালোচী সহকর্মী) কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। শেষে বালোচী
নেতা রেহমানকে নিকেশ করতে হামজার সঙ্গে হাত মেলায় আসলাম, যার ফলে আসে ছবির রক্তক্ষয়ী
শীর্ষবিন্দু।
এর
পরের পর্ব ‘প্রতিশোধ’ – আসবে ২০২৬-এর মার্চে। অধীর আগ্রহের সঙ্গে প্রতীক্ষায় রইলাম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন