বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

অর্ঘ্য দত্ত বক্সী

 

এক রাজকুমারী ও তার বারো জোড়া সোনার জুতো

লেখিকাঃ ড.মারী লুই ফন ফ্রানৎস মূলগ্রন্থঃ Archetypal Patterns in Fairy Tales (রূপকথায় পুরাবিন্যাসের ধাঁচেরা)

 


অসংখ্য রূপকথায় নায়কের পশু বা জাদুকরী শক্তি থেকে প্রাপ্ত টুপি বা আলখাল্লা থাকে যার মাধ্যমে সে অলক্ষ্যে চলাচল করতে পারে। গল্পের প্রসঙ্গটি মনে থাকলে সহজেই বুঝতে পারা যাবে যে, রাজকুমারীর কীর্তিকলাপ জানতে গেলে তাকে তাদের নজর এড়িয়েই সবরকম গতিবিধির বিষয়ে অবহিত হতে হত।

আমাদের নায়ক আরো একটি উপহার পেয়েছিল এবং সেই বলটিকে আত্মনের প্রতীক বলা যায়। কিন্তু এখানে একটি বিষয়ে আমি বিশেষভাবে জোর দিতে চাই। বেশিরভাগ রূপকথাতেই আত্মনের অগণিত প্রতীকসমূহ দেখা যায়। গুপ্তধন আত্মনের প্রতীক, অধরামাধুরী ধনরাশিও আত্মনেরই প্রতীক। রূপান্তরণ বা উদ্ধারে সক্ষম এমন অসংখ্য জাদুবস্তুরাও (যেমন জাদুদণ্ড প্রভৃতি) আত্মনেরই প্রতীক। কোনও দুর্গ বা নগরী যার আকৃতি মণ্ডলাকার তারাও আত্মনের প্রতীক। আমাদের গল্পের হিরে, সোনা ও রূপার বনগুলিকেও আত্মনের প্রতীক হিসাবে ভাবা যেতে পারে যা আমরা পরে দেখব। আগে সেই জ্ঞানী বৃদ্ধকেও আমরা আত্মনের প্রতীক হিসাবে ভেবেছি। তাই এজাতীয় সবকিছুকেই আত্মনের প্রতীক হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার যে অভ্যাস শিক্ষানবিশদের থাকে তাতে বাধা দিয়ে বলা উচিত ‘ ঠিকই বলছ, কিন্তু কোন বিশেষ দিকটিতে জোর দেওয়া হয়েছে?’

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, আংটি, সম্পর্কের একটি বিশেষ রূপ, বন্ধন অথবা ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে জড়িয়ে পরার দিকটিকেই বিশেষভাবে জোর দেয়। বল নিয়ে শিশু ও উন্নত জন্তুদের এত আগ্রহ থাকার কারণ এটির গঠনের মধ্যেই (সমগ্র গোলকের মাত্র অতি ক্ষুদ্রাংশই মাটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে) মাধ্যাকর্ষণ ও ঘর্ষণবলকে অতিক্রম করার আসীম শক্তি রয়েছে। বিলিয়ার্ড না খেলতে পারলেও সেখানে ওস্তাদের বল চালাচালি দেখার মধ্যেও দারুণ আনন্দ রয়েছে। দেওয়ালে মারলে যে জিনিষ তৎক্ষণাৎ হাতে ফিরে আসে তা একমাত্র বল। সুতরাং বল আত্মনের প্রতীক হিসাবে স্বয়ংক্রিয় চলশক্তি হওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব আরোপ করে। অন্য যে কোন বস্তুর থেকে এটি অনেক বেশি মাত্রায় স্বয়ংক্রিয় চলশক্তিসম্পন্ন হয় বলেই একে আধ্যাত্মিক বা জাদুশক্তির অধিকারী বলে ধরা হয়।

বল অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের গঠনরূপেরও প্রতীক। বেশিরভাগ প্রাচীন বিশ্ব সম্পর্কিত ধারণায়, ব্রহ্মাণ্ড বিভিন্ন স্তরে স্তরীভূত একটি বৃহদাকায় গোলক। এটি ঐতিহাসিকভাবে আত্মারও প্রতীক, কণাবিদ ডেমোক্রিটাসের সময় থেকে বিশ্বাস করা হয়েছে যে আত্মা গোলকসদৃশ অগ্নিময় কণা দ্বারা গঠিত। আর সেই গোলকগুলি এত ক্ষুদ্র ও কোণহীন যে তা যে কোনো পদার্থের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। এরকম গঠনের হওয়ার জন্যই আত্মা সারা দেহে ছড়িয়ে পরতে পারে।

এরইসঙ্গে গোলক ঈশ্বরত্বেরও প্রতীক। “ঈশ্বর এক অসীম গোলকরূপে বিরাজমান, যার কেন্দ্র সর্বত্র কিন্তু তার পরিধির কোথাও কোনো সীমা নেই”। প্লোটিনুসের সময় থেকে প্রচলিত এই গভীরতাসম্পন্ন বাণীটির উল্লেখ প্রায় সকল পাশ্চাত্য দার্শনিকরাই যে করেছেন, তা ইয়ুং প্রায়শই বলতেন। এটি সেই চিত্তাকর্ষক প্রতিমাগুলির একটি যা ঈশ্বরকে বর্ণিত করতে ব্যবহৃত হয়, আর কখনও কখনও মানবাত্মার অন্তরতম কেন্দ্রকে বোঝানোর জন্যও।

আমাদের রূপকথায় আমাদের এই বিষয়ের উপরেই মনোনিবেশ করা ভালো যে, এখানে বলটি নিজে থেকেই চলতে আরম্ভ করেনি। এখানেও বলের দিগনির্দেশকারী ক্রিয়াটি বিদ্যমানঃ সেটি নায়ককে সেই নগরে নিয়ে যায় যেখানে সে তার জন্য বরাদ্দ কাজটি পায়। কিন্তু তা সত্বেও এখানে বল সম্পর্কিত আলাদা একটি বিশেষত্ব পাওয়া যায় যা অন্য কোথাও পাইনি। গড়িয়ে চলা বল রূপকথায় খুব প্রচলিত একটি উদ্দেশ্যবহনকারী বস্তু, এবং নায়ক বা নায়িকারা প্রায়ই তা বনের জ্ঞানবৃদ্ধ বা বৃদ্ধাদের থেকে প্রাপ্ত হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সুতির বা উলের বল হয় যা নিজে থেকেই গড়াতে শুরু করে আর তার প্রান্তটি ধরে সুতো বরাবর পিছন পিছন এগিয়ে চলা হয়। ইউরোপীয় রূপকথায় প্রায় সবসময় নায়কের হাতে পরামাত্র বল নিজে থেকেই গড়াতে শুরু করে।

কিন্তু আমাদের গল্পে বলটিকে হালকা ধাক্কা দিতে হয়, তার অর্থ আত্মনের স্বয়ংক্রিয় কার্যশীলতা বা ব্যক্তিরূপায়ন প্রক্রিয়া প্রাথমিক চেষ্টা ছাড়া শুরু হয় না।

এখন বোঝা যাচ্ছে যে কেন ব্যক্তিদের এটা করা উচিত। ব্যক্তিরূপায়ন প্রক্রিয়া নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলার জন্য শুধু স্বপ্নের ডায়েরি লেখার থেকেও বেশি উপযোগী হয় সক্রিয় কল্পনা। কিন্তু তাকে শুরু করতে ও ধরে রাখতে হয় নিজের প্রচেষ্টার দ্বারাই। সক্রিয় কল্পনা নিজে থেকে শুরু না করলে বলও গড়াতে শুরু করবে না। আর এই প্রক্রিয়া একবার শুরু হয়ে গেলে তখন ব্যক্তি ইচ্ছা করলেও তার সুফল থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারে না।

আর সেই কারণেই এত মানুষ কখনও সক্রিয় বা সদর্থক কল্পনা শুরুই করতে পারে না, বিশেষ করে যখন অচেতন থেকে প্রবল বাধা আসে কারণ একবার তা শুরু হয়ে গেলে তাকে থামানোর উপায় নেই। তুমি এটাকে ছেড়ে থাকতে পারো যখন এটা তোমাকে ছেড়ে চলে যায় কিন্তু কখনও এটা সম্পূর্ণভাবে থেমে যায় না। প্রচুর ব্যস্ততায় কিছুদিন এর থেকে দূরে থাকলে তারপর ফিরে এসে দেখা যায় এ সেই একইস্থানে নিথর রয়ে গেছে। তখন আবার প্রথম থেকে শুরু করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

আমাদের গল্পের নায়কের কাছে ফিরে এসে দেখা যায়, তাকে কিছুতেই অহং বলা যায় না, বরং সে একটি প্রক্রিয়া এবং যেহেতু পুরো ঘটনাটা ঘটছে একটি রূপকথায়, তাই সব যৌথ অবচেতন স্তরে ঘটছে। যৌথ অবচেতনকে তড়িত-চৌম্বকীয় ক্ষেত্র হিসাবে ভাবা যাক। তখন বলা যেতে পারে যে সেই ক্ষেত্রতে কিছু উচ্চআধানযুক্ত বিন্দু রয়েছে যেখানে ক্ষেত্রের শক্তির অনেকটাই পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে। এগুলিকেই পুরাবিন্যাস বলা যেতে পারে। আর এখানে, সেই ক্ষেত্রের এক প্রান্তবিন্দুতে একটি তীব্র তরঙ্গ তৈরি হল, সেই আমাদের নায়ক। সে অবচেতনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে প্রবল জীবনীশক্তির ঢেউ উপচে পড়েছে। সেই শক্তির সঙ্গে অবচেতনের কিছু পরম্পরাগত প্রজ্ঞা সংযুক্ত হয়ে তাকে একটি দিকনির্দেশ দিতে শুরু করল। প্রাথমিকভাবে অবচেতনে যেন শক্তির তীব্র তরঙ্গ উত্থিত হল আর ধীরে ধীরে তা অবচেতনের অন্যান্য শক্তির সঙ্গে মিশে বরফের গোলকের মতো বাড়তে বাড়তে চেতনের দিকে অগ্রসর হতে লাগল।

ইয়ুং মনে করতেন যে, যে উচ্চতর চেতনা মানব প্রজাতিতে প্রকাশিত ও অন্যান্য উচ্চতর স্তন্যপায়ীদের মধ্যে যার সামান্য আভাস দেখা যায় তার উৎস প্রাণশক্তির উপচে পড়া প্রাচুর্যতায় যা শুধুমাত্র জীবনধারণ করতেই শেষ হয়ে যায়নি।

চিড়িয়াখানার পশুদের দেখলে এরকমই বোধ হয়। যেহেতু তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় আহার ও শত্রুদের থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করতে হয় না, তাই প্রাণশক্তির অতিরিক্ততায় তারা বন্য পশুদের থেকে অনেক বেশি খেলে আর অনেক ঘন ঘন খেলে, যা শুধু বন্য জন্তুরা শিশু অবস্থাতেই খানিকটা করে থাকে। পরিণত জন্তুরা বাস্তবিকভাবে খেলেই না। তারা শুধু জীবনসংগ্রাম নিয়েই চিন্তিত থাকে।

ক্রীড়া অবশ্যই সকল আধ্যাত্মিক ও সভ্যতা বিকাশের চেতনাশক্তির আদিম শুরু। এটি ইয়ুঙ্গের নয়, বরং আমার ধারণা, যে গুহাচিত্রেরও আগেকার প্রাগৈতিহাসিক জ্যামিতিক রেখা ও আঁক কাটাগুলি আমরা দেখি সেগুলি সম্ভবত খেলাচ্ছলেই রেখার ছন্দোবদ্ধ গতি বা ছোট ছোট শব্দ করে গুহার গাত্রে আঘাত। এর অর্থ সেই গুহাবাসীরা বাইরের জন্তুদের থেকে গুহায় নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছিল আর রাত্রে শিকার করে এসে কিছু প্রাণশক্তি অতিরিক্ত থেকে গেলে আগুন জ্বালিয়ে একসাথে তারা গুহার গায়ে এই রেখাগুলি এঁকে বা ছন্দোবদ্ধ কাটাকুটি করে খেলত। তারপর আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে খোদাই করার আনন্দ সঞ্চারিত হল এবং শেষপর্যন্ত তাই পরিণতি পেয়ে বিখ্যাত প্যালিওলিথিক গুহাচিত্রের আকারে নিজেকে প্রকাশ করল। সুতরাং বলা যায় সেই গুহাগাত্রের আঁকগুলি ধারাবাহিক ও নিরবিচ্ছিন্নভাবে চৈতন্যের বিকাশকে চিহ্নিত করে।

শিশুদের ক্ষেত্রেও বিকাশের এই ধারাই দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে শিশুর হাতে কিছু দিলেই সে তাকে ছন্দোবদ্ধভাবে উপর নীচে উপর নীচে বা ডাইনে বাঁয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা করতে থাকে। এক বা দুই বছরের শিশুকে পেন্সিল দিলে পরমানন্দে সে সেরকম ছন্দোবদ্ধভাবেই আঁক কেটে চলে। এভাবেই শিশুর সঙ্গে যদি একবার কোনো ছন্দের গতিবেগের খেলা খেলতে আরম্ভ করা হয় (শিশুকে উপরে তুলে ধরা – অ) তাহলে সে অন্তত পঁচিশ ত্রিশবার খেলে তবে থামে। শিশুর ব্যক্তিগত বিকাশের স্তরগুলির মধ্যে তাই মানবপ্রজাতিরূপে বিকাশের স্তরগুলির সাদৃশ্য পাওয়া যায়। যে চিড়িয়াখানার পশুগুলির খেলা নিয়ে আমরা কথা বলছিলাম তাদের মধ্যেও এমনকি এই ছন্দের খেলা ক্রমাগত খেলে যাওয়া দেখা যায়।

আমাদের গল্পের নায়কের অতিরিক্ত প্রাণশক্তির কোনো বাস্তবিক লক্ষ্য ছিল না। তারপর সেই শক্তি বরফের গোলার মতো জ্ঞানীবৃদ্ধের প্রজ্ঞা, ছড়ি ও বলকে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত করে নিলো। এটি নিজেকে অবচেতনের স্তরে ক্রমশ বাড়িয়ে নিয়ে শেষপর্যন্ত জীবনের উদ্দেশ্যের একটি প্রতিমূর্তি হয়ে উঠল যাকে এখন গল্পের সমস্যার একেবারে কেন্দ্রে উপনীত হতে হল।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে যৌথ অবচেতনের উপশমকারী প্রক্রিয়া তারই কিছু নিয়ন্ত্রক শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়ে চেতনের মূলগত দ্বন্দ্বের স্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ঠিক যেভাবে চরম দ্বান্দ্বিক সমস্যাযুক্ত ব্যক্তির অবচেতনে কোথাও নতুন জীবনীশক্তির উন্মেষ ঘটে যার সঙ্গে তার সমস্যার সরাসরি কোন যোগসূত্র থাকে না। স্বপ্ন আমাদের যেভাবে বার্তা দেয় সেই প্রসঙ্গে যে ব্যাপারে জোর দিয়েছিলাম যে, এক ব্যক্তি হয়ত সমীক্ষণে এসে তার বৈবাহিক জীবনের অসীম সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন কিন্তু তার স্বপ্ন হয়ত অন্য কথা বলছে। ধীরে ধীরে সেই বক্তব্য নিজেকে শক্তিশালী করে আর শেষপর্যন্ত চেতনের মূল সমস্যার উপর নিজের উপশম ক্রিয়া শুরু করে। তখন বোঝা যায় যে স্বপ্ন যে কথাগুলোর দিকে আলোকপাত করছিল তা আসলে অবচেতনের প্রস্তুতিমূলক ক্রিয়া যা কীনা চেতনের মূল সমস্যা সমাধানের ভিত্তিস্বরূপ ছিল।

আমাদের গল্পের নায়কেরও সেই অবস্থা। সে যৌথ চেতনের জগতে প্রবেশ করল ( আমাদের গল্পের রাজত্ব) এবং সেখাঙ্কার সমস্যাগুলির সমাধানের দায়িত্ব নিল। রাজত্বটির রাজার একমাত্র কন্যা, রাজকুমারী, যার বিবাহের উপর রাজ্যের সমৃদ্ধি নির্ভর করছে, সে প্রতি রাতে উধাও হয়ে যায় আর কীভাবে যে রোজ বারো জোড়া সোনার জুতো ছিঁড়ে ফেলে তা কেউ বুঝতে পারে না। এই সমস্যা নিয়ে বৃদ্ধ রাজা খুবই চিন্তিত, তাই তিনি ঘোষণা করেছেন যে—যে এই রহস্য উদ্‌ঘাটন করবে তাকে তিনি তার কন্যাকে দান করবেন, কিন্তু চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে তাকে হত্যা করা হবে।

বেশিরভাগ রূপকথায় এই ধরণের পরিস্থিতিতে দেখা যায় যে রাজা নিজেই আসলে শয়তান। তার আচরণ খুবই সন্দেহজনক। গোপনে গোপনে তিনি চান না যে তার কন্যার কারও সঙ্গে বিবাহ হোক কারণ তাহলে তাকে মুকুট ছাড়তে হবে। তাই তিনি যাতে তার কন্যার বিবাহ হতেই না পারে তার জন্য গুপ্ত সব চক্রান্ত বানাতেন এবং পাণিপ্রার্থীদের হত্যা করে খুবই আনন্দ পেতেন কারণ এর ফলে তার রাজা হিসাবে থেকে যাওয়া সহজ হত।

কিন্তু আমাদের গল্পে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। এখানে রাজা তার কন্যার এই নোংরা খেলা বন্ধ করতে না পেরে ভয়ঙ্করভাবে দুঃখিত। তিনি এমনিতে খুবই হৃদয়বান এক ব্যক্তি কারণ যখনই তার মনে হয় যে তাকে পাণিপ্রার্থীকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে তখন তিনি যারপরনাই দুঃখবোধ করেন। তিনি হয়ত এরকম করতে বাধ্য হচ্ছেন, কিন্তু এমন সাজা দিতে তিনি একেবারেই ভালবাসেন না।

বরং রাজকন্যাই খল। আর তারপরেই আমরা দেখতে পাই যে, সে নিজে থেকে এমন শয়তানি আচরণ করে না, বরং সে জাদুগ্রস্ত। সে চায় যে তার সব পাণিপ্রার্থীদের যাতে মৃত্যু হয় এবং তার কাজকর্মের হদিশ যেন কেউ না পায়। দৈত্যের জাদুতেই তার মধ্যে এই শয়তানি সত্তার জন্ম হয়েছে। কিন্তু রাজার এতে কোনো ভূমিকা নেই। তাকে বাধ্য হয়ে রাজকন্যার উপর নজরদারির ব্যাপারটাকে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নের মতো গুরুত্বে আরোপিত করে তুলতে হয়।

এটা তাকে করতে হয় যাতে পাণিপ্রার্থীরা সফল হওয়ার জন্য প্রবলভাবে উৎসাহী হয়ে ওঠে। তাদের তিনি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নের মতো মারাত্মক চাপে ফেলে দিতে চান যাতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে, তা না হলে এর সমাধান বেরোনো যেন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তিনি নিজেও পাহাড়প্রমাণ চাপে আছেন, তিনিও প্রবলভাবেই মরিয়া আর কে না জানে যে মরিয়া মানুষেরা সবকিছু করতে পারে। তারা বিপদজনক।

এখন একে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দেখলে বলা যায় যে সকল সাধারণ স্নায়ুরোগ বিষয়ক তত্ত্বেই ‘ভোগান্তির বোঝা’র কথা বলা হয়েছে। এই কায়ক্লেশের চাপ যার থাকে না সে সমীক্ষণে এলে বিশেষ কিছু হয় না। ‘আমি কিছুটা ইয়ুং পড়েছি আর সে বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জন করতে সমীক্ষণে এলাম’… ইত্যাদি বলে শুরু করার পর তিন ঘণ্টার মাথায় সেই ব্যক্তি স্বীকার করে যে সে প্রবল মানসিক চাপে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে, শুধু সে তা প্রকাশ করতে চায়নি।

আবার যাদের সত্যিই সেই চাপ নেই তাদের সমীক্ষণ করে প্রায় কিছুই বেরিয়ে আসে না। তারা ক্রমেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে আর কয়েক সপ্তাহ বাদে হয়ত আর আসেই না; তারপর হঠাৎ একদিন তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে আর তারা তখন সমীক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে।

এগুলি এটাই প্রমাণ করে যে আমরা মূলগতভাবে আলসে। যেমন জীবন চলছে সেই গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে চলাই সবধরণের প্রকৃতির মানুষের সহজাত প্রবণতা। আলস্যের আর তার সংরক্ষণশীলতার শক্তিও প্রবল, সে শুধু স্থিতাবস্থা বজায় রেখে চলতে চায় যাতে ব্যক্তির বিকাশের জন্য উপলক্ষ হয়ে মারাত্মক এক মানসিক যন্ত্রণা আসে। হয়ত যে কিছু কিছু প্রজাতির মাছ ডাঙায় কোনোরকমে চলাফেরা করতে পারে তারা তা পারত না যদি না তাদের উপর প্রবলতম চাপ না থাকতো। লোরেন আইজেলি তার বিবর্তন বিষয়ক গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন যে সবধরনের জিনগত পরিবর্তন ও আকস্মিক বদল যা বিবর্তনে লক্ষ্য করা গেছে তার উৎস ছিল এমন সব সংকটময় চরম পরিস্থিতি যেখানে অবস্থা ছিল ‘হয় বদলাও নয় পৃথিবী থেকে বিদায় নাও’। এবং এক একটি দেশ-জাতি বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, এমনকি ব্যক্তির জীবনেও এই একই দশা আসে।

একদা ইয়ুং বলেছিলেন যে মানুষের মধ্যে সবথেকে গভীর আসক্তির জায়গা উপাদেয় খাদ্য, যৌনতা বা ক্ষমতা নয়, তারা অবশ্যই খুবই শক্তিশালী, কিন্তু সবচেয়ে বড় আসক্তি হল আলস্য। আর যত আমি মানবপ্রজাতিকে পর্যবেক্ষণ করছি, এমনকি যখন নিজের ক্ষেত্রেও দেখছি, ততই এই বক্তব্যে বিশ্বাসী হয়ে উঠছি। আর তাই প্রথমে রাজাকে যতটা নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল আদতে তা নয়। তিনি স্থির করেছিলেন যে এই রহস্যের হেস্তনেস্ত করতে গেলে সহজ বন্ধুত্বমূলক আচরণ আর করা যাবে না। এমন একজন ব্যক্তিকে চাই যে এই কুৎসিত রহস্যের গোড়ায় গিয়ে একে নির্মূল করবে।

সমীক্ষণের সময় অন্যতম বড় সমস্যা আসে যখন ব্যক্তি তার সমস্যা নিয়ে আলস্যেই চক্রবৃত্ত ঘুরতে থাকে আর সমীক্ষক বুঝতে পারে যে খুব বড় বিপদ আসতে চলেছে যদি না ব্যক্তি এখনও সচেতন হয়। তাদের মানসিক আঘাত (শক ট্রিটমেন্ট) দেওয়াটাই কাম্য। আর তখন এ প্রশ্নও উঠে আসে যে তাদের কি সেই আঘাত দেওয়া উচিত হবে না তা ভাগ্যের হাতেই ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে?

ইয়ুঙের সঙ্গে প্রায়ই এ বিষয়ে আমার কথা হত। তিনি বলতেন মাঝে মাঝে এই আঘাত দেওয়া ভালো, কারণ কতটা আঘাত করতে হবে তার নিয়ন্ত্রণ সমীক্ষকের হাতে থাকে আর যখন ঈশ্বর মানুষের মনস্তত্ত্বজাতীয় এইসব ব্যাপার বিশেষ বোঝেনও না। তিনি (একে প্রকৃতি বা অবচেতন যাই বলা হোক না কেন) মাঝে মাঝে আঘাতের মাত্রাটা খুব বেশি করে ফেলেন আর তারপর ব্যক্তির মানসে নেমে আসে বিরাট বিপর্যয়। তাই কিছু কিছু আঘাত যেমন দুর্ব্যবহার বা চীৎকার করা বা হুমকি দেওয়া যেঃ নিজেকে না বদলালে তুমি এবার মারা যাবে… ইত্যাদি। কিন্তু তাতে বেশি লাভ হয় না শুধু শত্রু বাড়ানো ছাড়া! শেষপর্যন্ত যা ভাগ্য নির্দিষ্ট করে রাখে তাই হয় আর খবর জানা যায় যে ব্যক্তি হয়তো ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে চলে গেছেন বা অন্যকিছু আরো খারাপ; যেগুলো সমীক্ষক পাঁচ ছয় বছর আগে থেকেই জানতেন।

আমাদের গল্পের রাজার সিদ্ধান্তের সঙ্গে দৈত্যের পাশবিক আদিমতার বিশেষ একধরণের সংযোগ রয়েছে। এই পাশবিক বর্বর আদিমতা যখনই অবচেতন থেকে উগ্রভাবে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে, তা সে একটি জাতির মধ্যে বা একজন ব্যক্তির মধ্যে, তখনই তার সঙ্গে চেতনের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার প্রয়োজন হয়ে পরেছে। ইতিহাসই সাক্ষ্য যে যখনই একটি জাতি সহজ আদিমতা থেকে উচ্চতর দশায় যাত্রা শুরু করেছে, যাকে ঐতিহাসিকরা বলবেন উচ্চস্তরের সভ্যতার সূচনা, তাদের আচার আচরণ ও তাদের সামরিক শক্তির মধ্যে অসম্ভব পর্যায়ের নিয়মানুবর্তিতা লক্ষ্য করা গেছে। এর খুব ভালো উদাহরণ হল মধ্যযুগের জাপানে সামুরাইদের সভ্যতা যেখানে চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠোর ও নিয়মনিষ্ঠ আচরণবিধি মেনে চলা হত। জাপানি চলচ্চিত্রে প্রায়ই বিস্ফারিত করে দেয় এমন পশুসুলভ বর্বর আদিমতার শক্তির সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাহসিকতাময় নিয়মনিষ্ঠ সামুরাইদের সংঘর্ষের কাহিনী দেখা যায়। মধ্যযুগের ইউরোপেও নাইটদের আচরণে আমরা এর সাদৃশ্য পাই। সেই চরম বিশ্বস্ততা, সেই চরম আনুগত্য, সেই নিয়মানুবর্তিতা আর সব চরম আচরণবিধি; আর তা লঙ্ঘিত করা মানেই বিতাড়ন।

যেখানেই বেশিমাত্রায় আদিমতা বিরাজ করে সেখানে এইজাতীয় কঠোরতা সবসময়ই আবশ্যক। আধুনিক জাতিতাত্ত্বিকরা আদিম জনগোষ্ঠীদের বিচারব্যবস্থা দেখে মানসিকভাবে খুব আহত হন; তারা হয়ত সামান্য চুরির শাস্তিস্বরূপ হাত কেটে নেয় ইত্যাদি। কিন্তু তাদের একে সেই প্রাসঙ্গিকতা বা অনুষঙ্গ দিয়ে বোঝা দরকার। এগুলি প্রতীকী ক্রিয়া যা এই সত্যকে প্রকাশ করে যে অবচেতনের পাশবিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে চরম পর্যায়ের সমান নিষ্ঠুর কাঠিন্য আবশ্যক।

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন