| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫২ |
ভোর ফোটার আগে
ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। হালকা ঠাণ্ডা রয়ে গেছে। দূষণের ধোঁয়া আর কুয়াশার একটা অস্পষ্ট ধূসর পাঁচিল ঘিরে আছে। এখনও পাখি ডাকেনি। হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে সে। চুল উড়ছে উদভ্রান্ত হাওয়ায়। অনেকগুলো রাতের না ঘুমানোর চোখের তলায় রাত্রির মতো অন্ধকার হয়ে আছে। পিঠে একটা কালোব্যাগ। কাঁধে একটা ঝোলা। প্রায় ফাঁকা স্টেশনটায় এসে বসল। এই সেই স্টেশন। স্কুলব্যাগ পিঠে নিয়ে এই স্টেশন থেকে ট্রেন তাকে একটা একটা করে সিঁড়ি উঠতে সঙ্গে নিয়ে যেত। ছোটোবেলার সেই স্টেশন বদলেছে ঢের। ঝাড়বাতির মতো জ্বলজ্বল করতো রাতের জ্যোৎস্নায় গাছটা। প্ল্যাটফর্মের শেষে ঢালু বেয়ে নেমে। গাছটা। তবু একরাতে অন্ধকার হয়েছিল ওর ডলিপিসি গলায় ওড়না জড়িয়ে ঝুলছে। ভোরের প্রথম ট্রেন সেই খবর দিয়েছিল। কিভাবে যে উঠল অতো উঁচু ডালে, কিভাবে গলায় জড়াল! ওরা খুবই গরিব ছিল তাই সে নিয়ে প্রশ্ন তার মতো অনেকের মনে মনে মুখে মুখে হলেও তদন্ত কিছু হয়নি। রহস্য থেকে গেছে। এমন অনেক রহস্যই সমাধান দেখেনি সে জীবনে। কোনোদিন কোনো পাগলকে ট্রেন চাপা পড়তে দেখেনি সে। স্টেশনে দেখেছে অনেক পাগল। মৌরিপাগলা, লক্ষ্মীপাগলি আর গোঁফদাড়ি ঢাকা ছেঁড়া জামা আরো দুতিনজন। আশ্বিনের শেষ সিমেন্টের মেঝে শিশিরে ভিজে আছে। এই সময় আসবে ট্রেন তার। সেই কোন ছোটোবেলায় ক্লাসে হঠাত মাথা হারিয়ে জিওমেট্রি বক্সের কম্পাসের কাঁটা আর প্রটেক্টর বসিয়ে দিয়েছিল এলোপাথাড়ি রোহনের গলায় হাতে এখানে সেখানে। গিঁথে গিয়েছিল। কেন করেছিল। রোহন দুদিন দুরাত ফাইট করেছিল। তার সাথে নয়। মৃত্যুর সাথে। তারপর হেরে গেছে। কিন্তু কেন যে রোহনের বাবা কোনো অভিযোগ করেনি তার বিরুদ্ধে! তারপর একটা দীর্ঘ সময়। ওই ছোটো ঘরটায়। ওষুধের গন্ধ। বাইরের পৃথিবীর খবর শুধু দিয়েছে গাছের পাতা। এসাইলামের জানলায়। সবুজ আর সবুজ থেকে হলুদ হয়ে ঝরে শূন্য হয়ে যেত আবার ধীরে ধীরে সবুজ। দিন মাস বছরের গতানুগতিক হিসেব তারপর থেকে আর করা হয়নি। একসময় বাইরে এসে ওর সব অচেনা হয়ে গেল। ততদিনে পাল্টে গেছে সব। পুকুর নেই মাঠ নেই আলপথ নেই। বড় বড় ফ্ল্যাট। পার্টি অফিসে পতাকার রং পাল্টে গেছে। মুখের ভাষা সব চেঞ্জ হয়ে গেছিল। কেবল মায়ের ছবি হয়ে যাওয়া মুখটা চেনা। রোহনের বাড়ির কাছে একবার গেছিল। ওরা ওখানে আর থাকে না। তবে রোহনকে দেখে মাঝে মাঝেই রাস্তাঘাটে ভিড়ে মেট্রোর কামরায় রাতের গলির মুখে। একটা সাদা কুকুর শুয়ে আছে। ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। একটা কাক লাইটপোস্টে উড়ে এসে বসল। কালো ডানা ঝাপটে তাকালো। ছোটোবেলার সেই কাকটা।
এখন ট্রেনটা আসছে। এই ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গ্রাম আর কলকাতা শহর ছেড়ে দেশ আর এই প্রাচীন গ্রহটা ছেড়ে চলে যাবে। ডেস্টিনেশন ব্ল্যাকহোল। কাঁধের ব্যাগটা তুলে উঠে দাঁড়াল সে। এক পা চলন্ত এই আশ্চর্য ট্রেনটায় রেখে শেষবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল দূরে প্ল্যাটফর্ম থেকে হাত নাড়ছে রোহন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন