বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

২০২৬ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ী অ্যান কার্সনের কবিতা

 

প্রতিবেশী সাহিত্য

২০২৬ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ী অ্যান কার্সনের কবিতা  

(ভূমিকা ও ভাষান্তর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত)

 


কবি পরিচিতিঃ অ্যান কার্সন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কানাডীয় এই কবি, গবেষক, অনুবাদক, ধ্রুবসাহিত্যপন্থি ও অধ্যাপক ( জন্ম : ২১ জুন ১৯৫০) প্রজ্ঞা ও প্রকরণ-বিমুখতার জন্য সমধিক পরিচিত। তাঁর রচনায় তিনি একাধিক জনরার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তিনি স্বল্পোক্তিপ্রবণ এবং তাঁর কবিতায় প্রাতিস্বিকতার সার্বিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। 'Plainwater Essays and Poetry' (1995) গ্রন্থের শেষে নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করেন : 'Anne Carson was born in Canada and teaches Greek for a living.' তিনি স্কুল ও কলেজে ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষার অনুশীলন অব্যাহত রাখেন। গ্রিক ভাষাকে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর বিবেচনায় ল্যাটিন ভাষায় রয়েছে চিন্তার আঙ্কিক প্রবাহ এবং গ্রিক ভাষায় শিল্পের সুষমা। Eros বা যৌন কামনার প্রকৃতি নিয়ে তিনি যে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচনা করেন তার প্রতিফলন প্রথম গ্রন্থ 'Eros the Bittersweet'(1986)। প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফো Eros-কে Glukupikron বলে চিহ্নিত করেন। এ শব্দটির সমার্থশব্দ হিসেবে অ্যান কার্সন Bittersweet ব্যবহার করেন। স্যাফোর অনুচিন্তনের বিষয় এ গবেষণাপত্রে প্রাধান্য পেয়েছে। স্যাফোর কাছে Eros আনন্দ ও বেদনার অভিজ্ঞতা বলে প্রতিভাত। অ্যান কার্সনের প্রবন্ধ ও কবিতা প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের হিরণ্ময় উপকরণে বিভাসিত। ঈস্কিলাসের মতো গ্রিক লেখকগণের রূপক-চেতনায় অ্যান কার্সন প্রভাবিত। তাঁর গদ্যকবিতা অভিনব—এ সৃষ্টির ভেতর পুরাণকাল ও সমকাল অবলীলায় স্বরময় হয়ে ওঠে। কার্সন বাক্যের প্রবল শক্তিতে আস্থাশীল ; তিনি অনুভব করেন হিমবাহের মতো বাক্য তাঁকে অন্ধকারে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তিনি ২০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সাহিত্য কৃতির জন্য তিনি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন; Guggenheim, Lannan Literary Award, Griffin Poetry Prizes (দুবার), T.S. Eliot Prize, Princess of Asturias Award, Governor General's Award for English-language Poetry সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। অনূদিত কবিতা দুটির উৎস কার্সনের সর্বশেষ গ্রন্থ Wrong Norma (২০২৪)।

 

সমগ্রতা সম্পর্কে কী বলা যায়

সমগ্রতা সম্পর্কে কী বলা যায়? সমগ্রতাকে ক্ষুদ্রতর হতে হবে। এতটাই ক্ষুদ্র, যাতে সে সম্পর্কে কিছু বলা যায়। মানুষ? তুমি যে লোকটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলে ঝুলিয়ে রেখেছ, তার বুকের ভেতরেই যদি আগে থেকে ব্যথানারসের এক ক্ষুরমারি ঘুরে বেড়ায়, তাহলে? তুমি কি সেটাকে তার নিজের দোষ বলে গণ্য করো? সত্যিই কি এটিকে নিকৃষ্টতর করে তোলার দরকার আছে তোমার? তুমি কি নিজেকে একটা প্রস্রবণ বলে ভাবো? অবশ্যই, এগুলো স্বতন্ত্র প্রশ্ন। মৃত স্যামন মাছ ও তাম্রখনির বর্জ্যের মতো আলাদা। তাহলে এ পৃথকীকরণ, অবেদন—এসব আমাদের একটু তলিয়ে দেখা উচিত। মানুষ। তুমি কী নিয়ন্ত্রণ করতে পারো? ভুলভাল প্রশ্ন। সময়ের বাস্তবতা না হারিয়েই তুমি কি সবকিছুকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে পারো—সেই সময়কে, যা হাস্যাশ্রুর অবিরাম ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে? কোথা থেকে শুরু করবে? মাঝখান থেকে শুরু করো (কেন, সেটাও ভাবো), যাতে শেষ পর্যন্ত আবার সেখানেই গিয়ে থাকতে না হয়—যেখানে, উদাহরণস্বরূপ, এত বছরের পরিশ্রমের পর নির্যাতন বিষয়ক প্রতিবেদনটি গিয়ে ঠেকেছিল। তুমি কী চাও তা জানতে হবে; কী ভাবো তা জানতে হবে; কোথায় যেতে হবে তা জানতে হবে। আসলে নিউ ইয়র্ক শহর। আমরা এখানে এসে গেছি। পাশ দিয়ে ট্রাকগুলো ধাক্কা খেতে খেতে ছুটে যায়। বৃষ্টির মধ্যে ট্রাকের শব্দ আরও জোরালো, নাকি ওটা ছিল দেবতাদের দড়াম করে বন্ধ করা আরেক সারি দরজার শব্দ? দেবতারা ভিজে একাকার; নিজেদের সিংহাসনে বসে তাঁরা পায়ের আঙুলগুলো গুটিয়ে তুলেছেন, যেন তারা জানেনই না কেন এসব ঘটছে। আহা, বেচারা বুড়ো ফুলবাবুরা।

 

সামান্য কোলাহল

রবিবার সন্ধ্যা, ধূসরের ওপর ধূসর। সারাটা দিন ঝড় ওঠেনি ঠিক। মেঘেরা ঘনীভূত হল, গোমড়া মুখে থাকল ও থুতু ফেলল। আমরা সাঁতার স্থগিত রাখলাম। চেয়ারগুলো তুলে রাখলাম। অবশেষে (প্রায় সাতটার দিকে) আকাশের অনেক ওপর থেকে ভেসে এল গুরুগুরু গর্জন। এক ঝাপটা হাওয়া গাছগুলোকে ঝাঁকিয়ে গেল, প্রতিটি গাছকে একবার করে দুলিয়ে, নিচের দিকে নামিয়ে দিল শীতল বাতাসের ছোটো ধারা এবং এ হাওয়া, হাওয়ার বুকেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে, টুকরোগুলো দুলতে দুলতে, নেমে আসতে আসতে, উঠোনের এদিক-ওদিক ধাক্কা খেতে খেতে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল। তখনও ঠিক বৃষ্টি নয়—যতক্ষণ না হঠাৎ একটি মাত্র ঝংকার ছাদের ওপর দিয়ে, বারান্দার ওপর দিয়ে, ভিজিয়ে দিয়ে ছুটে গেল, তারপর—থেমে গেল। আমরা শ্বাস নিলাম। হয়তো এ পর্যন্তই। হয়তো সব শেষ, আজকাল আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতা প্রায়ই ভুল বলেন। আমরা এখনও সাঁতার কাটতে যেতে পারি (এক ঝলক রোদ কি দেখা গেল?)। ঠিক তখনই হঠাৎ জলকপাট খুলে গেল, জমাট বাঁধা একটা গিঁট ছিঁড়ে গেল, আর আকাশটা দুমড়ে-মুচড়ে চুরমার হয়ে পড়ল; আর তা পড়তেই থাকল, এখনও পড়ছে, যখন অন্ধকার নেমে আসছে এবং কিংবদন্তির সেই রাত্রি তার কেশর সামলাতে ব্যস্ত এবং পাখিদের সামান্য কোলাহল থেকে আমি শুনতে পাচ্ছি, পাখিরা পবিত্র উন্মাদের মতো ওপর-নিচে জ্বলে পুড়ছে এর ভেতরে কোথাও, দূরে গভীর অন্তঃস্থলে, যেখানে তারা শিকারটিকে ধরে রাখে—প্রলিপ্ত, দুর্গন্ধময়; তাই এ আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন, তাই এ কর্কশ চিৎকার, বারবার বোলো না যে তুমিও তা শুনতে পাচ্ছ না।

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন