বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

শুভ্রনীল চক্রবর্তী

 

ঋষি অরবিন্দ: বিপ্লবী থেকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের রূপকার

 


(চতুর্থ পর্ব)  

আলিপুর বোমা মামলা, কারাবাস ও উত্তরপাড়া ভাষণ—যেখানে এক বিপ্লবীর জীবনে শুরু হল নতুন অধ্যায় (১৯০৮–১৯০৯)

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারের মুজাফ্ফরপুরে ব্রিটিশ বিচারক ডগলাস কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে বিপ্লবীরা বোমা নিক্ষেপ করেন। বিচারক প্রাণে বেঁচে গেলেও দুর্ঘটনাবশত দুই ইউরোপীয় মহিলা নিহত হন। এই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ কলকাতার মানিকতলার একটি গোপন আস্তানায় অভিযান চালায় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও নথিপত্র উদ্ধার করে। তদন্তের সূত্র ধরে ১৯০৮ সালের ২ মে অরবিন্দ ঘোষকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র এবং বিপ্লবী সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। ইতিহাসে এই বিচার আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত এবং এটি ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিচার হিসেবে বিবেচিত।

 

প্রায় একবছর অরবিন্দ আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ছিলেন। বিচারপর্বে মোট ৪৯ জন অভিযুক্ত, শতাধিক সাক্ষী এবং হাজার হাজার নথি আদালতে উপস্থাপিত হয়। এই মামলায় অরবিন্দের পক্ষে সওয়াল করেন ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাস। তাঁর সমাপনী যুক্তি ভারতীয় আইন-ইতিহাসে আজও স্মরণীয়। তিনি আদালতে বলেন যে, আজ যাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে বিচার করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে ইতিহাস তাঁকেই অন্য আলোয় মূল্যায়ন করবে। যদিও এই বক্তব্যের জনপ্রিয় বাংলা রূপ নানা জায়গায় উদ্ধৃত হয়, গবেষণার ক্ষেত্রে মূল ইংরেজি বক্তব্যকেই প্রামাণ্য ধরা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯০৯ সালের ৬ মে প্রমাণের অভাবে অরবিন্দ ঘোষ বেকসুর খালাস পান, যদিও তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষসহ কয়েকজন বিপ্লবী দণ্ডিত হন।

 

আলিপুর জেল শুধু একটি বিচারপর্ব ছিল না; অরবিন্দের নিজের ভাষায় এটি ছিল তাঁর জীবনের এক গভীর অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতার সময়। উত্তরপাড়া ভাষণ এবং পরে রচিত On Himself-এ তিনি লিখেছেন যে কারাবাসের সময় তিনি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক নয়, এর একটি গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও রয়েছে। এখানে একটি প্রচলিত ভুল ধারণার সংশোধন প্রয়োজন। সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই প্রচার করা হয় যে জেলের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিদিন তাঁর কাছে এসে শিক্ষা দিতেন। অরবিন্দ তাঁর স্মৃতিচারণে এক ধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করলেও, সেটিকে আধুনিক অর্থে প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ হিসেবে বর্ণনা করেননি। তাই ইতিহাসবিদরা এই অভিজ্ঞতাকে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে নয়।

 

কারামুক্তির কয়েক সপ্তাহ পর, ১৯০৯ সালের ৩০ মে, হুগলির উত্তরপাড়ায় ধর্মরক্ষিণী সভার আমন্ত্রণে অরবিন্দ তাঁর বিখ্যাত উত্তরপাড়া ভাষণ দেন। এই ভাষণ তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের এক নতুন ব্যাখ্যা তুলে ধরে। তিনি সেখানে বলেন, কারাগারে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে ভারতের স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী এবং এই জাতির পুনর্জাগরণ কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য নয়, মানবসভ্যতার বৃহত্তর কল্যাণের জন্য। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ভাষণে তিনি কোথাও সশস্ত্র সংগ্রাম বা জাতীয় আন্দোলনকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি জাতীয়তাবাদকে আরও গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান। তাই উত্তরপাড়া ভাষণকে "রাজনীতি ত্যাগের ঘোষণা" বলা ইতিহাসসম্মত নয়।

 

আলিপুর বোমা মামলা অরবিন্দ ঘোষের জীবনে একটি যুগান্তকারী মোড় এনে দেয়। গ্রেফতারের আগে তিনি ছিলেন প্রধানত বিপ্লবী সংগঠক, সম্পাদক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ; কারামুক্তির পর তাঁর লেখায় ও বক্তৃতায় আধ্যাত্মিকতার মাত্রা স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তাঁর জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বা ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশ্বাস একটুও ক্ষীণ হয়নি। বরং এই সময় থেকেই তিনি মনে করতে শুরু করেন যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম একটি বৃহত্তর মানবিক ও আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার অংশ। পরবর্তী বছর পন্ডিচেরিতে গমন সেই অভিযাত্রারই পরবর্তী ধাপ, কোনো পলায়ন নয়।

 

(চলবে)

 

এই পর্বে ব্যবহৃত প্রধান সূত্র

১. Sri Aurobindo – Uttarpara Speech (১৯০৯)

২. Sri Aurobindo – On Himself (Complete Works of Sri Aurobindo)

৩. A. B. Purani – The Life of Sri Aurobindo

৪. Peter Heehs – The Lives of Sri Aurobindo

৫. K. R. Srinivasa Iyengar – Sri Aurobindo: A Biography and a History

৬. Alipore Bomb Case Records (Government of India Judicial Proceedings, 1908–1909)ঋষি অরবিন্দ: বিপ্লবী থেকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের রূপকার

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন