![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
খোকা ঘুমালো
খোকা ঘুমিয়েছে। এই ফাঁকে সে চুলে তেল দিতে বসল। দুহাতের আংগুলের ডগায় ঈষদুষ্ণ তরল। মাথার তালুতে বিলি কাটতে কাটতে যেন নিজেকেই নিজে আদর করছে। আহা, কতদিন কেউ মাথায় তেল দিয়ে দেয়নি!
এমন আফসোসের মুহূর্তগুলোতে তার মায়ের কথা মনে পড়ে না। বুবুর কথা মনে পড়ে। আম্মার তো সংসার আর ছোট ভাইটাকে সামলে সময় হত না৷ আর বুবুর এমন কিছু বয়স হয়নি তখন। তবু বুবু ছিল ওর আরেকটা মা৷
আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে চুল আটকে আসে। এমন জট হয়েছে মাথায়। ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে যায়। এখন তো বলতে গেলে রাণীর হালে আছে। তেল, সাবান,শ্যাম্পুর অভাব নেই। আগে কোন কোন মাসে একবারও শ্যাম্পু করা হত না। সাবানের ফেনায় ধোয়া চুলগুলো তাই ঝাড়ুর শলার মত রুক্ষ ছিল তখন। যেদিন দু টাকার সানসিল্ক মিনিপ্যাক এনে দিত আব্বা, হাতের তালুতে ভাগ করে নিয়ে মগভর্তি পানিতে দিয়ে সেই ফেনা চুলে মাখত।
শীতকালে গায়ের চামড়া যখন খড়ির মত হত, তখন লোশন টোশন নয়, অর্ধেক
গ্লিসারিন আর অর্ধেকটা পানি মিশিয়ে বোতল ভরে রাখা হত৷ সেটাই গায়ে মাখত দিনের পর
দিন। নয়ত নারকেল তেল।
বিছানায় খোকা নড়েচড়ে ওঠে। শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শোয়।
ভাবালুতা ভুলে দ্রুত চিড়নি চালায় খোকার মা। কেমন ঝিমুনির ভাব লাগছে। মনে মনে
অদৃশ্য কারো প্রতি অভিমান হয়। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত সময়টাও এত অল্প কেন!
এক বালতি কাপড় ভিজিয়েছিল সকাল সকাল। গোসলে ঢুকে সেগুলো আগে কাচতে বসল। এরই মধ্যে দরজার বাইরে উঁকি দিল কয়েকবার। খোকা শব্দ করে করে শ্বাস ফেলছে এখনো। এবার সে সুগন্ধী ফেনার বুদবুদে ডুবে যেতে যেতে শরীর ঘষে। তুমি মোর জীবনের ভাবনা, হৃদয়ে সুখের দোলা। গানের কথার মতোই আরামে চোখ বুজে আসে তার।
বিকালে এক বাটি দুধ সুজি খেয়ে খোকা অনেকক্ষণ খেলে। খেলা বলতে এটা ওটা মুখে নিয়ে মাড়ি দিয়ে চাবানো। উপুড় হয়ে শুয়ে বিছানায় নাক দিয়ে ঘষা। সিলিং ফ্যান, উড়তে থাকা জানালার পর্দা বা ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়ে কুটকুট করে হাসা। নিজের হাত পা চোখের সামনে এনে পরীক্ষা করা।
খোকার মা তখন ফ্লোরে পা ছড়িয়ে রুটি বেলতে বসে। এ বাসার সবাই রাতে রুটি খায়। গুণে গুণে নয়টা করতে হয় রোজ৷ রুটি সেঁকতে সেঁকতে জাউভাতটাও হয়ে আসে। শ্বশুর স্ট্রোক করার পর থেকে আজকাল ওর কাজ আরো বেড়েছে। ঘুমানোর আগে নিয়ম করে বেডসোরে মলম লাগানো, বিছানার নিচে প্যান খালি করে রাখা। তাছাড়া দেবরের পরীক্ষাও চলছে। রাত জেগে পড়াশুনা করে। খাওয়াদাওয়ার পাট চুকলে ছেলেটাকে ফ্লাক্সভর্তি চা করে দিয়ে তারপর ছুটি হয় ওর। এ সবই সে করে পা টিপে টিপে। বেড়ালের মত, প্রায় নিঃশব্দে। তখন, যখন খোকা আবার ঘুমে অচেতন।
খোকার বাবা ফেরে অনেক রাতে। বাবার খাবার গরম করে দিতে দিতে খোকার ক্ষিধে পায়। ওকে দুধ দেয় মা। খেতে খেতে আবার ঘুমায় খোকা। বড় বড় পাপড়িগুলোতে, ফোলা ফোলা ফর্সা গালে কী মায়া! বাপের গায়ের রঙ পেয়েছে ছেলে।
ছেলের কপালে সে আলতো চুমু খায়। ততক্ষণে খোকার বাবা এসে পিঠে ঘাড়ে মুখ ঘষতে থাকে। শেভিং ক্রিমের চেনা ঘ্রাণ আর ঠোঁটের গভীরের নিকোটিন ক্রমশ মুহূর্তগুলোকে নেশাতুর করে তোলে৷
তবু সে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকায়। আহা,অত নড়াচড়া করলে হয়? বাকি সময়টুকুতে শুধু ঘনঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। মৃদু আলোতে বাতাসের সাথে ধাক্কা খেতে থাকে সেই শব্দ।
মিনিট দশেক পর ঘরের দরজা নিঃশব্দে খুলে যায়। খালি বালতি দেখে সদ্য ভাল লাগার আবেশটুকু উবে গিয়ে বিতৃষ্ণায় গা গুলিয়ে ওঠে ওর। ভয়ে ভয়ে কায়দা করে কল ছাড়ে সে৷
এই ভাড়াবাসার একটাই সমস্যা। দিনে দুঘন্টাও পানি থাকে না। বড় বড় দুটো তিনটা ড্রামে পানি ভরে রাখতে হয় তাই। তবু বছর বছর ভাড়া বাড়ছেই। এতরাতে ড্রামের পানি টানাটানি করতে গেলে খোকা তো জাগবেই, খোকার বাপচাচারাও উঠে চলে আসবে।
কিন্তু কপাল ভাল আজ। মাঝরাতে সচল পানির ধারা দেখে বিস্ময় কাটে না ওর। ঝটপট গোসল সেরে নেয় সে। বালতিটা আবার কানায় কানায় ভরে রেখে ঘরে এসে ঢুকে। এবার খোকার বাবার পালা। খোকার মা সতর্ক ভংগিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে । যা ভাবে তাই হয়। সশব্দে দরজার পাল্লাটা বাড়ি খায় দেয়ালে। খোকা নড়ে ওঠে। ঠোঁট উল্টিয়ে ফোঁপায়। হতাশ ভঙ্গিতে মা আবার ওকে দুধ দেয়।
দুপুরের ঘুমটা বেশি লম্বা হয় বলে খোকা আজকাল রাতে দেরিতে ঘুমায়। ঘুমটাও পাতলা ওর। অল্পতেই এমন জেগে জেগে উঠবে। তবু দুপুরে ঘুম না পাড়ালেও নয়। মায়ের তখন মেশিনের মত হাতের কাজগুলো সারতে হয়।
মেশিনের মত কাজ সারত ওর মাও। ভাই ঘুমিয়ে গেলে পুকুর পাড়ে ছুটত বাসন নিয়ে। ফেরার সময় আনত কলস ভরে পানি। উঠান ঝাড়ু দিয়ে আবার ছুটত গোসলে।
পাশের ঘরে পাটি পেতে ঘুমাত ওরা দুই বোন। রোজ রাতে খোকা ভাইয়ের ঘুমের অপেক্ষায় থাকত আব্বাও। নিয়ম করে আছড়ে পড়ত মায়ের শরীরে। মাঝেমাঝে মায়ের চাপাকান্নার শব্দে ভয়ে কুঁকড়ে থাকত পাশের ঘরে সজাগ মেয়ে দুটো।
বুবুকে সজোরে ধাক্কা দিয়েও সাড়া পাওয়া যেত না তখন। চোখমুখ কুঁচকে মরার মত পড়ে থাকত মেয়েটা। আর সে দুহাতে কান চেপে ধরতে ধরতে কোন কোনদিন উঠোনে বেরিয়ে গিয়ে হাঁ করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিত। বেশিদিন এমন হয়নি। আব্বা মারা যাবার পর সব থেমে গেল। মামার বাড়িতে আরো ছোট একটা ঘরে নতুন ঠাঁই হল চারজনের।
মাঝেমাঝে খোকার বাবা পুরো সপ্তাহের জন্য অফিসের কাজে বাইরে থাকে। সে তখন বেলা থাকতেই সব রান্নাবান্না সেরে ঘরের দরজায় খিল তুলে দেয়।
নিশ্চুপ দুপুরবেলায়, মাঝরাতে খোকা ঘুমালে যেন পুরো পৃথিবীটা সরীসৃপের মতো এগিয়ে আসে ওর শরীরটার দিকে।দরজায় খুটখুট শব্দে সেই শরীরে কাঁটা দেয়। ওদের খোকাভাইটি ঘুমালে দরজায় এমন টোকা পড়ত। আম্মা রাতের বেলা দরজার ভেতরের কড়ায় তালা মারতে শুরু করল তখন থেকে। ওদের পায়খানায় যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ। ধমক দিয়ে বলত সকাল হলে যাবি। ছোট্ট মেয়েটা একবার তো কাপড়েই করে ফেলেছিল। বুবু সারারাত কেঁদেছে আর বলেছে আর থাকব না এখানে। তবু আম্মা দরজা খোলেনি।
ওর মনে পড়ে যায় সেইসব অদ্ভুত সময়ের কথা। বুবুর সাথে ঈদের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছিল সেদিন। মামার দেবর ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে। ওদের খোকাভাই বোধ হয় ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় তারস্বরে কাঁদছিল। ওর মনে আছে মায়ের সেই অগোছালো শাড়ি, লালচে মুখ, বিধ্বস্ত চেহারা।
পড়ন্ত দুপুরে সে খোকার পাশে শুয়ে শুয়ে এইসব স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করে। খোকার বাবা গতবছর একবার গায়ে হাত তুলেছিল। পরদিন অফিসের কাজে এক সপ্তাহের জন্য বাইরে যাবার কথা। ভোরবেলা প্রতিবারের মত সব গোছগাছ করে দেবার পর ওর হাতেপায়ে ধরে মাফ চাইল লোকটা। সে বাধ্য স্ত্রীর মত হাসিমুখে বিদায় দিল স্বামীকে। তারপর সারাদিন ঐ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। মোবাইল ফোনটা অনর্গল ব্যস্ত রইল। মনে হল যে সন্দেহের জন্য আগেরদিন ওর সঙ্গে এত অশান্তি হয়েছে হয়ত সেটাই সত্যি। আজকাল সে আর প্রশ্নই করে না এসব নিয়ে। কিছু জানতে চাওয়া মানেই আবার সেই অশান্তি, গায়ে হাত তোলা।
ওর খোকাভাই মাঝেমাঝে ওদের দেখতে আসে। সেদিন কী আনন্দ হয়! ভাইয়ের জন্য এটা ওটা রাঁধে সে। ভাগ্নের জন্য কিছু না কিছু আনে ছেলেটা। আজকাল ভাল একটা চাকরি করছে ভাইটি। তাই বোনের জন্যও আনে শাড়ি, চুড়ি। নিদেনপক্ষে ফুটপাত থেকে বরই,চালতার আচার কিংবা ঝালমুড়ির ঠোঙ্গা। সে অবাক হয়ে খোকাভাইয়ের মুখটা দেখে৷ হুবহু ওদের আম্মার আদল।
মাঝেমাঝে ওর একটা বিষয় খুব জানতে ইচ্ছা করে। খোকাভাইয়ের কি মনে আছে মায়ের মৃত্যুর দিনটির কথা? ভাইয়ের সামনেই তো সব ঘটেছিল! ঘুম ভেঙ্গে কেঁদে উঠল না কেন খোকাভাই? ঘুমটা তো ভীষণ পাতলা ছিল ওর। সেদিন সে জেগে উঠলে হয়ত আম্মা ওরকম একটা কাজ করতে পারত না।
বিকালে চা নাশতা খেয়ে খোকাভাই চলে যায়। মাসখানেক পর হঠাৎ কোন ছুটির দিনে আবার আসে। মাঝেমাঝে অফিস থেকে ফেরার পথেও দেখে যায় ভাগ্নেকে। ভাইকে সে কিছুতেই জিজ্ঞেস করতে পারে না সেদিনের কথা।
ভাইকে কিংবা বুবুকেও সে বলতে পারে না মাঝেমাঝে মায়ের মত তারও গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছা হয়। খোকা তখন বিছানায় ঘুমাচ্ছে, রোজ দুপুরে যেমন ঘুমায়। খোকার নিশ্চিন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে বুকটা ধক করে ওঠে। আত্মঘাতী ভাবনাটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে আলগোছে ছেলের পাশে শুয়ে পড়ে। ছোট্ট শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে সে প্রাণপণে চায় খোকা এবার জাগুক, জোরেসোরে কেঁদে উঠুক। ঘুমচোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে মাকে খুঁজুক খোকা। তারপর মা পাশেই আছে টের পেয়ে লাজুক ভঙ্গিতে হেসে উঠুক। লোভাতুর চোখে সে এমন মুহূর্তটার অপেক্ষায় থাকে৷

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন