বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

অচিন্ত্য দাস

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫২

 

 

সারমেয় সংবাদ

পেটে নিশ্চয় কিছু হয়েছে – এমনি কোনো লক্ষণ নেই, তবে আজকাল রাত্তিরে খুব স্বপ্ন দেখি। বেশির ভাগ স্বপ্নই ঘুম ভাঙতেই ফুস করে মিলিয়ে যায়। ঠিক স্মরণ হয় না। তবে কোনো কোনোদিন স্বপ্ন বেশ স্পষ্ট মনে থেকে যায়। যেমন এইটা।

যে কোনো পাড়ার মতই আমাদের পাড়াতেও গোটা ছ-সাত কুকুর স্থায়ীভাবে বাস করে। কালো, বাদামি, সাদা-বাদামি মেশা ইত্যাদি। এরা পাড়ার লোকেদের মন দিয়ে দেখে কিন্তু কিছু করে না। সব পাড়াতেই কিছু পশুপ্রেমিক থাকে, তারা এদের বিস্কুট বা অন্য কিছু খাওয়ায়।

আমি যখন আপিসে বেরোই তখন এরা মনে হয় আমকে সসম্মানে পথ ছেড়ে দেয়। তবে এই কদিন হলো এদের একজনের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক হয়েছে। স্বপ্নের সম্পর্ক। প্রায় আমি সাদা-বাদামিটাকে স্বপ্নে দেখছি। কুকুরটা কী করে যেন আমার অবচেতনে ঢুকে পড়েছে – স্বপ্ন শুনেছি অবচেতন থেকেই আসে!

হ্যাঁ, যা বলছিলাম। সেদিন শনিবার। পার্টি ছিল। দু-পাত্র পেটে পড়েছিল বলে বিছানায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমে তলিয়ে গেলাম। সে সারমেয়-সম্তান এল কাকভোরে। দেখলাম ব্যাটা পরিষ্কার বাংলা বলতে পারে।

“আরে, তুই কথা বলতে পারিস?”

“আমরা অনেক কিছু জানি, বুঝি – তোমরা তার খবর জানো না।”

“অ। তোর তো বেশ দেমাক! জানিস আমি আপিসে গিয়ে চেয়ারে বসে কাজ করি …”

“চেয়ারে? আমার তো চারটে পা আছে, চেয়ার লাগবে কেন! আমি দুপা গুটিয়ে দুপা সোজা করে কিংবা চারটে পা গুটিয়ে কিংবা দুটো পা সামনে ছড়িয়ে – কত রকমভাবে বসতে পারি। তুমি তোমার আপিসে এত রকম ভাবে আরামে বসতে পারো?”

আমি বোকা বনে গেলাম। অন্য তর্ক শুরু করলাম, “বৃষ্টিতে যা অবস্থা হয় তোদের! ভিজে ন্যাতা হয়ে যাস। ছাদ ছাতা কিছুই তো নেই…”

“বৃষ্টিতে ভিজতে বেশ লাগে – আমাদের তো শার্ট-প্যান্ট শুকোবার ব্যাপার নেই, গা ঝেড়ে নিলেই হলো। হ্যাঁ, জোরে বৃষ্টি নামলে গাড়ির নীচে চলে যাই। ছাদ ছাতা দুইই হয়”।

“অসুখ-বিসুখ হলে? ওষুধপত্রের তো কোনো জোগাড় নেই।”

“আছে। লতাপাতা-গাছগাছালির ভেতর কোথায় কী ওষুধ থাকে তা আমরা জানি। তোমরা তার জন্য নানামুনির নানা বিধান ইউটুবে শুনে তালগোল পাকিয়ে ফেল। তারপর ডাক্তার দেখাও।”

ফোন টুংটুং করায় ঘুম এবং স্বপ্ন দুই ভেঙে গেল। এই ভোর ছটায় বস বাণী পাঠিয়েছে। রবিবার হলেও নটায় এসে বসের প্রেজেনটেশনটা ঠিক করে দিতে হবে। কাল দিল্লীতে মিটিং। বিরক্তিতে গা রিরি করে উঠল। ইস, আজকেও আপিস!

সোয়া আটটায় বেরোলাম। নটার আগেই লোকটা ওৎ পেতে বসে থাকবে! বস না বকাসুর!

বেরিয়ে দেখি সাদা-বাদামি ফুটপাথে পা ছড়িয়ে বসেছে। চারিদিকে ফুটফুটে দিনের আলো। এখন স্বপ্ন বা অবচেতন-টেতনের সময় নয়। তবু রাতের স্বপ্নের খেই ধরে সাদা-বাদামি যেন বলল, “বলছিলে না আমাদের অনেক কিছু নেই, তোমাদের আছে। একটা যোগ করছি – তোমার বস মানে মালিক আছে, আমার নেই।”

শীতের মধুর রদ্দুরে গা এলিয়ে সে থাবা চাটতে লাগলো।

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন