সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দীপক সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

সে এক গোলমেলে গবেষণার গল্প

এই ফ্ল্যাটটার নির্মাণ কৌশল এবং নম্বর বন্টন অদ্ভুত রকম। যাতে ফ্লাট নাম্বার ৪০২ আর ৪০৩ মুখোমুখি আর ৪০২ আর ৪০৪ পাশাপাশি। ঐ ৪০২ আর ৪০৪ নাম্বার ফ্ল্যটের সামনে দাঁড়িয়ে দুজনে একসঙ্গে বলে উঠলো-

- ও শিট!

একটি পুরুষ কন্ঠ একটি মহিলা কন্ঠ।এরকম বিরক্তি প্রকাশের কারণ চাবি। দুজনের পকেট থেকে বের হয়ে  এসেছে যেটা, সেটা গাড়ির চাবি। ফ্ল্যাটের চাবি নয়। তাহলে দরজা খুলে ঘরে ঢুকবে কী করে? দুজনেরই মনে হলো। তার মানে ফ্ল্যাটের চাবি গাড়িতেই রয়ে গেছে। কিন্তু গাড়ির কোথায়?

সবচেয়ে প্রবাবেল জায়গা ল্যাপটপের ব্যাগ। কিন্তু ল্যাফটপ সহ ল্যাপটপের ব্যাগ তো কাঁধে ঝুলছে। দুজনকেই রাত জেগে অফিসের কাজ করতে হবে। সেজন্যই সাথে আনা। তাহলে বাড়ির চাবি কোথায় আছে? গাড়িতে কোথায়? মহিলা নিজেই স্বগতোক্তি করলেন-

- শিট! চাবিটা নিশ্চয়ই বার্গারের প্যাকেটে রয়ে গেছে!

- আমি তো বার্গার খাইনি!

- আরে আপনার কথা তো হচ্ছে না। আমি আমার ফ্ল্যাটের চাবির কথা বলছি।

- তাই বলুন। কিন্তু বার্গারের প্যাকেট কি চাবি রাখার জায়গা?

- না তো! তবে ভুল করে সেটা হলেও হতে পারে। পারে না?

- পারে বোধহয়।

- আমি অবশ্যি খুব সিওর না। মনে হলো তাই বললাম।

- তো এখন কী করবেন?

- গাড়ি চালিয়ে অফিসে যেতে হবে। চাবি খুঁজতে। খাবারের খালি প্যাকেটটা তো ডাস্টবিনে ফেলে এসেছিলাম। তার মানে চাবিটা তার সাথে ডাস্টবিনে চলে গেছে। সেখানেই আছে।

- আপনাদের অফিসে ডাস্টবিন কখন ক্লিন করা হয়?

- আমরা বের হয়ে আসার পরে পরেই।

- আর অফিস গেটে তালা কখন পড়ে?

- সাড়ে নটা নাগাদ। 

- এখন সাড়ে নটা। তারমানে এখন তালা লাগানো হচ্ছে। আপনার অফিসটা কোথায়?

- সারজাপুর রোড।

- তার মানে গাড়িতে গেলে আধঘন্টার পথ। তাও রাস্তায় জ্যাম না থাকলে। সুতরাং গিয়ে লাভ নেই।

- তাহলে?

- কাল সকালে অফিসে গিয়ে খোঁজ করতে হবে। যদিও পাওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।

- তাহলে রাতটা কোথায় কাটাবো?

- যদি আমার ফ্ল্যাটের চাবিটা খুঁজে পেয়ে যাই, তাহলে আমার ফ্ল্যাটেই থাকতে পারেন। ব্যাচেলারস ফ্ল্যাট। খুব একটা গোছালো নয়। কিন্তু আমার ওয়াইফাইয়ে বুস্টার লাগানো আছে। খুব ভালো কানেক্টিভিটি আর নেট স্পিড। ঝড়ের গতিতে কাজ করা যায়। কাঁধে ল্যাপটপ ঝুলছে যখন, রাত জেগে কাজ করার প্ল্যান তো নিশ্চয়ই আছে। আমারও আছে।

- কিন্তু ফ্ল্যাটের চাবি তো আপনিও পাচ্ছেন না। কোথায় আছে সেটা?

- সেটাই তো মনে পড়ছে না।

- বাহ্। বেশ মানুষ তো আপনি! চাবির হদিস নেই, দিব্যি ফ্ল্যাটে রাত কাটাবার নেমন্তন্ন করে দিলেন। আর  এখন আপনি বা কেন লিফ্ট দিয়ে বেসমেন্টে নামছেন?

- বেসমেন্টেই তো কার পার্কিং।

- সে তো জানি। কিন্তু আপনার ফ্ল্যাটের চাবি আপনার গাড়িতে কি আছে? থাকলে গাড়ির কোথায় আছে?

- সেটাই তো গিয়ে দেখতে হবে।

- আপনি তো আচ্ছা আহাম্মক।

- তা বলতে পারেন। মাও বলতো। বান্ধবীরাও বলে।

- বান্ধবীরা মানে আপনার কি অনেক বান্ধবী?

- এখন তো গোটা বিশ্বেই নারী পুরুষ একসাথে কাজকর্ম ইত্যাদি সবকিছুই করছে। তাই পুরুষদের বান্ধবী থাকা বা নারীদের পুরুষবন্ধু থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। আপনার নেই?

- হুঁ আছে। আছে কয়েকজন। তবে তারা কেউই সেই অর্থে বয়ফ্রেন্ড নয়।

- কোন অর্থে?

- আপনি ঠিকই বুঝেছেন। অযথা প্রশ্ন করছেন।

- আরে লিফট তো অনেকক্ষণ হলো বেসমেন্টে এসে থেমে আছে। বের হয়ে পার্কিং জোনে যেতে হবে তো!

- হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন।

- এই নীল রংএর গাড়িটা আমার।

- আমারটা রেড। ম্যাজেন্টা রেড। একটু স্মোকি। আনকমন রং।

- আনকমন গাড়িটা নিশ্চয় এখন খুলবেন না আপনি?

- না।

- আমিও ভাবছি আমার গাড়িটা খুলবো না । লাভ নেই। চাবিটা ওখানে থাকবে না। আমি শিওর।

- তাহলে আমরা লিফটে করে নামলাম কেন?

- এটা বোঝার জন্য যে লিফ্ট শুধু লিফ্টই করে না। নামায়ও।

- এটা বুঝে কী লাভ?

- এখন তো এই সব বোঝাটাই আমার কাজ। আমার কোম্পানি আমাকে এই কাজটাই দিয়েছে। আমি সেখানে সাইকোলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন অফিসার।

- ও বাবা! এরকম অফিসারও হয়। কী কাজ তাদের?

- আইটি সেক্টরের কর্মচারীদের সাইকোলজিক্যাল ডিগ্রেডেশনের তত্ত্ব তল্লাশ করা।

- কেমন?

- এই ধরুন। একঘেঁয়ে কাজ করতে করতে তারা বোর হয়ে যাচ্ছেন কি না! তাদের স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে কি না! তারা ভুলো মন হয়ে পড়ছেন কি না! এগুলোই তো আই টি সেক্টরের কর্মচারীদের মানসিক সংকট।  যা কিনা প্রডাক্টিভিটির সংকট। আল্টিমেটলি কোম্পানিগুলোর প্রফিটিবিলিটির সংকটও। তাই আমি কোম্পানির পয়সায় ওসব নিয়ে গবেষণা করি। একি, আপনি হাসছেন কেন?

- হাসছি কারণ গবেষকের তো নিজেরই ভুলো মন। ফ্ল্যাটের চাবি ভুলে বসে আছেন। আমি তো তবু কিছু  একটা অনুমান করতে পারছি। আপনার তো সে বোধটুকুও নেই। পুরোটাই ভুলে বসে আছেন।

- আপনার চেয়ে আমার ভুলো মনের ব্যাপারটা আরো বেশি খারাপ বলছেন?

- বলছিই তো। যদি না...

- যদি না আবার কী?

- যদি না আর কোনো বদ উদ্দেশ্য থেকে থাকে।

- বদ উদ্দেশ্য?

- হ্যাঁ, যে বদ উদ্দেশ্য নিয়ে ছেলেরা মেয়েদের ফাঁদে ফেলে। ওমা আপনি আবার হাসছেন কেন?

- হাসছি। কারণ এটাও তো বিশ্বজুড়ে আই টি সেক্টরের আরেকটি প্রোডাক্টিভিটির সংকট। হয়তো বা সবচেয়ে  বড়ো সংকট। বর্তমানে নারীপুরুষ আর সংসার করতে চাইছে না। সন্তান জন্ম দিতে চাইছে না। এমনকি সেক্স করতেও চাইছে না।

- ওমা সে কী?

- কেন আপনি নিজেকেই বিচার করে দেখুন না! এখন এই ভরা যৌবনে থেকেও আপনার সেক্সের ইচ্ছে  টিচ্ছে হয়?

- না তো। কক্ষনো হয় না। ঠিকই বলেছেন আপনি।

- তাদেরও কি হয়? মানে আপনার ছেলে বন্ধুদের কথা বলছি।

- নিশ্চয় না।

- এতো জোর দিয়ে বলছেন কী করে?

- অতটুকু বোঝার ক্ষমতা মেয়েদের থাকে। বিধাতা প্রদত্ত।

- বিধাতা প্রদত্ত অনেক কিছুই তো নষ্ট হয়ে গেছে।

- তা গেছে। কিন্তু এটা যায়নি।

- ওহো।

- আমি ভাবছি…

- আপনাকে কিছু ভাবতে হবে না। চলুন ফ্ল্যাটে ফিরি।

- কী হবে ফিরে? চাবি তো নেই।

- না আছে। এই যে আমার চাবি। পকেটেই ছিল।

- তাহলে অযথা এই নাটক?

- নাটক নয় গবেষণা। চলুন আমার ঘরে চলুন। আপনার একটা ইন্টারভিউ নেবো। তার প্রিন্ট আউটে আপনার সই নেবো। আগামীকাল অফিসে সেটা জমা করে দেবো। একটা লাইভ ইন্টারভিউ পেপার। গবেষণার প্রয়োজন।

- আপনি তো সাংঘাতিক লোক মশাই!

- তা বলতে পারেন। সাংঘাতিক কিন্তু একটুও বিপজ্জনক নই।

- উঁহু। কোনো বিশ্বাস নেই।

- মানে?

- হ্যাঁ। শুধু আপনার ওপর কোন, আমার নিজের ওপরেও তো নেই!

- এ্যাঁ!

- হ্যাঁ। চলুন চলুন। আপনার ফ্ল্যাটে গিয়ে আমিও একটা গবেষণা করে দেখি। মনে হয় সেটাও কম ইন্টেরেস্টিং হবে না। খুব সম্ভব আপনি যে রোগের লক্ষণ নিয়ে গবেষণা করছেন, তার ওষুধের সন্ধান পেয়ে যেতে পারেন।

শেষ কটা সংলাপ কি ওরা আদৌও বলেছিল? কী জানি! সে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন