শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

জয়িতা ভট্টাচার্য

 

বর্ণমালার সাতকাহন

 


(পর্ব ৩৮)

বাড়ির বড়ো সন্তানের জ্যৈষ্ঠ মাসে বিয়ে হয় না। বেশি তাড়া থাকলে পনের দিনের পর। তাড়া! খুব তাড়া ছিল কি কন্যা বিদায়ের! মেয়েটিও বোবা। ভয়ে বলতে পারছে না, বললেও মিনমিন করে কয়েকবার বলা, সেই কন্ঠ অভিভাবকের আধিপত্যর তলায় হারিয়ে গেছে। এ শুধু একা বিশেষ ওই মেয়েটার নয় বাংলা তথা মাতৃভূমির কোণায় কোণায় এই মেয়ে আছে, হাতে আইপ্যাড এবং সমৃদ্ধ সি ভি নিয়ে তারা এগিয়ে যায় খাদের দিকে, তাদের অপরিণত বয়সের ছোট্ট ভুলের মাসুল এবং সেই সুযোগে কন্যা বিদায়ের সুযোগকে আর ছাড়ে শ্রেণী নির্বিশেষে যে কোনও গড় পরিবারে।

বাসী বিয়ের দিন কাঁদেনি একফোঁটা মেয়েটা। বাইরের  লোকের সামনে কাঁদা অভ্যেস নেই। কেঁদেছিল তার বাবা। একটি বাঙালি গতানুগতিক বিয়ের উপাচারগুলি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় কী চরম পুরুষতান্ত্রিক আমাদের সমাজ ছিল। যে প্যাট্রিয়ার্কি সযতনে বছরের পর বছরে চালু রাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে নারীরা।

দরজার চৌকাঠে গরম দুধ আলতার সরার সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে তৃষ্ণায় ক্লান্তিতে মুখ শুকনো। সেই সময় ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসেছিলেন ছোটোখাটো ফর্সা পানপাতা মুখের সুন্দরী উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। তারপরেও উপাচার। জ্যান্ত ল্যাটা মাছ হাতে ধরা...  কোথায় যেন সমগ্র ব্যপারটার নিচে বয়ে যায় আদিমতা,  যৌন ইঙ্গিত।  দুটি মানুষের সমাজ ও আইন স্বীকৃত নিয়মিত যৌনতার বন্দোবস্ত, সন্তান উৎপাদন ও ঘরের কাজে রাতদিনের পরিচারিকা দাসপ্রথা নিয়োগ! এখানে ভালোবাসা অথবা প্রণয়ের জায়গা কই। এখন আর ওরকম নেই দিন পাল্টেছে এমনটা ভাবতে পারলে খুব সুখের হতো। হয়ত শুধু আঙ্গিকটুকু পাল্টেছে ভেতর বাড়িতে দৃশ্য এক। আর থাকবে নাই বা কেন আদতে নারী জাতি ফ্যাসিজমের বাহক তারা অবচেতনে হেলে স্যাডোম্যাসোকিসমের দিকে। নারীর এই গুপ্ত স্বভাবের দেশি দৃষ্টান্ত দেখেছি পাড়ায় পাড়ায় বহুতল ফ্ল্যাটের অন্দর থেকে তেপান্তরের গাঁয়ে। মার খেতে গোপন সুখ নারীর। পরাধীনতা তাদের প্রিয়, সহজে যা হয় শরীর যৌনতা ব্যবহার করে তাতেই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে মন। অনিশ্চের পথে একা পথে ফণা তুলতে তারা সহজে চায় না। এই গোত্রের বাইরে কোনো নারীকে তাই তারা সমর্থন করে না। প্রধানত নারীর হাত পাখার স্নিগ্ধ বাতাসে রাষ্ট্র ফ্যাসিজমের ধ্বজা ওড়ায়। না হলে পুরুষ অতি দুর্বল নারী চাইলে কবেই সমাজ থেকে মুছে যেতো পুরুষতন্ত্র। "স্বাভাবিক মধ্য শ্রেণী, নিম্ন শ্রেণী, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিধি থেকে ঝরে এরা তবু মৃত নয়।" যাইহোক, সহজ সুন্দর সেই  সব দিন যেন এ আই নির্মিত গল্প। গল্প তবু গল্প নয় জীবন। স্বামী স্ত্রীর একান্তের মুহূর্তেরাও তো মিথ্যে নয়। ভ্রমণের নেশায় কখনও রাত দূর পাল্লার বাসে লং জার্নি করে টাকা বাঁচিয়ে, টুকটাক খেয়ে জন পরিবহন চড়ে তবু আমরা সেই সব রাঙা দিন কাটিয়েছি। সেই সব পাহাড়ের মাথায় এসে অনেক দূর সমতলের মতো সমুদ্র পৃষ্ঠের যাবতীয় সমস্যা মুছে গেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্যে এসে প্রেমে আধ্যাত্মিক পরিবেশে, আরণ্যক পরিবেশে দিন সোনা বাঁধানো হয়েছে তা সাময়িক হলেও সত্য। জীবন শুধু ডেবিট নয় প্রাপ্তিরও। পেছনে ফিরে তাকালে দেখি সেই নবীন দাম্পত্যের নিষ্পাপ দিন। আমরা দিনের পরে দিন তখন নাটক দেখতে গেছি, সিনেমা দেখতে গেছি, টাটা সেন্টারে মকবুল ফিদার  প্রদর্শনী, বিকাশ ভট্টাচার্যের প্রদর্শনী দেখে বেরিয়েছি। মধুচন্দ্রিমায় এসে মেয়েরা ভেবেছে পৃথিবীর সকল সুখ বুঝি পাওয়া হলো। তবু ঘড়ির কাঁটা জায়গা বদল করে। সরে।

দুঃখের একটানা দিন এলে মনে হয় বুঝি আর সইবে না কিন্তু "যে সয় সে রয়" জীবন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটি যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তখন সকলেই ভেবেছিল বুঝি আর কিছু হবার নেই  মেয়েটির। কিন্তু এই সমাজের ক্ষতগুলো মেনে একমনে পাখির চোখ থাকলে অযাচিত অনেক আনন্দ এসে জড়ো হলো আবার একদিন। জীবনের লম্বা যুদ্ধে ঘোর নাস্তিক হয়েও খটকা লেগেছে অনেকবার, মনে হয়েছে এসব আমি করিনি কেউ করে দিয়েছে, সহ্য আমি করিনি সহ্য শক্তি কেউ যুগিয়েছে। যা পাবার নয় তা কেউ এনে দিয়েছে নিরুপায়কে উপায় এনে দিয়েছে কেউ। কিন্তু কে সে নিয়ে ভাবি না। একজন সাগর পার হচ্ছে তাকে অভয় দিয়েছে পেছনে মধুসূদন আছে রক্ষা করবে। মাঝপথে যাবার পর তার মনে হলো দিব্যি তো পার হয়ে যাচ্ছি তবে কি সত্যিই পেছনে আছে? যেই দেখতে যাওয়া অমনি সে ডুবে গেলো। আমাকে একজন বলেছিলেন জীবনে সবটাই যুক্তি দিয়ে হবে না যুক্তির বাইরেও কিছু আছে। থাকতে পারে বা পারে না।  "তোমাকে দেখার মতো চোখ নেই তবু

গভীর বিস্ময়ে  আমি টের পাই তুমি

আজও এই পৃথিবীতে রয়ে গেছো"

বেড়াতে যাওয়ার একটা খুব বড় গুণ হলো কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাদের জীবন যাপন তাদের সমস্যার কথা সুখ দুঃখের কত কথা জানা যায়। আমি আমি ভাবটা চলে যায়। ট্রেন জার্নি করতে গিয়ে পরিচিত হয়েছি এমন কত পরিবারের সঙ্গে। নতুন বিয়ের পরে কোথাও যাচ্ছি, মাঝে ট্রেন দাঁড়িয়েছে। স্বামী জল ভরতে গেছে বোতলে। তখন এতোটা জলের বোতল পাওয়া যেতো না। সামনে এক মারোয়াড়ি পরিবার। দূরপাল্লার ট্রেন কেমন একটা নিঃশব্দে ছেড়ে চলে যায়, ভয় পাচ্ছি তখনও খুবই কাঁচা বয়স যদি ট্রেন ছেড়ে দেয় ওর কাছে তো কিছুই নেই কি হবে, সেদিন সামনের ভদ্রলোক দাঁত বার করে হেসে হেসে বলেছিলেন আপ বাঙালি লোগ রিস্ক লেনে সে ডরতে হো ইসলিয়ে বাঙালি নোকরি করতে হ্যায় বিজনেস নেহি। নিজের জাতির প্রতি এই অপমান আজও মনে আছে, খুব ছোটো থাকায় এবং ভাবনায় থাকার জন্য সেদিন জবাব দিতে পারিনি।

কেদারে পথে যেতে যেতে দেখেছি কী কঠিন জীবন পাহাড়ের ঢালে বাস করা মানুষদের। ঘোড়াওলাদের ছ’মাস কাজ থাকে না। তবু তারা হাসে। গান গায়। পাহাড়ের মাথায় বরফ  নিচে বরফ মন্দির ঢেকে আছে বরফে। সব সমস্যা যেন ভ্যানিশ হয়ে গেলো। এ জীবন ধন্য মনে হলো। মন্দির নয় এই ধূসর বালিয়ারির মধ্যে জয়সালমিরের মরুতে সূর্যাস্ত দেখে, মুসৌরির পথে, বদরিনাথের খাড়া হিমালয়ের দৃশ্যে এখানেও জীবন। বেনারসের নৌকো বিহার আর হরিদ্বারে সন্ধ্যারতী, ফতেপুর সিক্রী এবং আজমের শরিফ সব জায়গায় আমরা গেলাম, আরো কত স্থানে তারপর সময় বললে এবার শুরু হোক জীবনের পরীক্ষা। এভাবে একদিন বহুদিন পর দেখা হলো সেই পুরনো রাস্তায়। সুলেমান চাচা এখনও বেঁচে আছে। আমায় বললে ভাল আছো খুকি? কোথায় যাচ্ছ অবেলায়? আমি সমস্ত শব্দ ভাণ্ডার খুঁজে চলেছি সেই থেকে। আমি ভালো আছি না খারাপ? আমি এই অবেলায় কোথায় যাচ্ছি?

(ক্রমশ)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন