প্রতিবেশী সাহিত্য
ড.মারী লুই ফন ফ্রানৎস-এর ড্যানিশ রূপকথা
এক রাজকুমারী ও তার বারো জোড়া সোনার জুতো (মূলগ্রন্থঃ Archetypal Patterns in Fairy Tales)
(অনুবাদ: অর্ঘ্য দত্ত বক্সী)
(লেখক
পরিচিতিঃ মারী লুই ফন ফ্রানৎস ইয়ুঙের সবথেকে ঘনিষ্ঠতম বিস্ত
সহযোগী ও শিষ্যা। ইয়ুঙিয়ান মনস্তত্ত্বের বহু প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছে। রূপকথা নিয়ে ইয়ুঙের রচনাটি হল The
Phenomenology of the Spirit in Fairy tales. ইয়ুঙ সর্বদাই মনে করতেন রূপকথা যৌথ নির্জ্ঞানকে অধ্যয়নও পর্যবেক্ষণ করার এক অতি গুরুষপূর্ণ হাতিয়ার। রূপকথার মধ্যে
বহু প্রাচীনকাল থেকে প্রবাহিত চেতন ও অবচেতন অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। রূপকথার
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণটি বেশ অভিনব। এই গ্রন্থে সাতটি বিভিন্ন দেশের রূপকথা ও তার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করছেন লুই
ফন ফ্রানৎস। তারমধ্যে প্রথম রূপকথাটির অনুবাদ করা গেল। এই এটি ছাড়াও ফন ফ্রানৎসের রূপকথার উপর উল্লেখযোগ্য
বই, The psychological Meaning of Redemption Motifs in Fairy
tales, Mother Archetypes in Fairy tales etc. এই অনুবাদে যথাযথ আক্ষরিক অনুবাদ করা হয়নি, কিছু অংশ বাদ দেও হয়েছে। সেই
অংশগুলি বর্তমান দশকের বাঙালি পাঠকের উপজীব্য নয় বলেই। তবু মূল এসেন্স ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।)
একদা এক যুবক নিজের ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়ল।
তার যাত্রাপথে তার সঙ্গে এক বৃদ্ধের দেখা হল যে তার কাছে কিছু অর্থসাহায্য চাইল। যুবকটি
বলল, আমার কাছে টাকা নেই কিন্তু আমি আমার খাবার আপনার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি। তাতেই
বুড়ো রাজি হল। সুতরাং তারা একটি বৃক্ষের নিচে বসে খাবার খেতে লাগল। খাওয়া শেষ হলে বুড়ো
বলল, তোমার কাছে যা কিছু ছিল তা তুমি আমার সঙ্গে ভাগ করে নিলে; এর বদলে আমি তোমাকে
এই ছড়ি ও বল দিচ্ছি যা তোমার ভাগ্য ফিরিয়ে দেবে। ছড়িটা সামনে তুলে ধরলে তুমি অদৃশ্য
হয়ে যাবে। আর বলটাকে ছড়ি দিয়ে মারলে সেটা তোমার আগে আগে গড়িয়ে গিয়ে তোমাকে তোমার গন্তব্যস্থলে
পৌছে দেবে।
যুবকটি এই উপহারের জন্য ধন্যবাদ জানাল, তারপর বলটা
মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে ছড়ি দিয়ে ওটাকে মারল, এবং বলটা তার সামনে দিয়ে দ্রুত গড়াতে শুরু
করল। ওটা চলতে চলতে এক বড় শহরে যুবকটিকে নিয়ে এল। এখানে এসে সে দেখল শহরটাকে বেষ্টন
করে রাখা প্রাচীরের গায়ে অসংখ্য কাটা মুণ্ড গেঁথে রাখা হয়েছে। আসলে ব্যাপারটা কী সেটা
সে একজনের কাছে জানতে চাইল। লোকটি বলল যে এই দেশে এক প্রবল উৎকণ্ঠা বিরাজিত কারণ এখানকার
রাজকুমারী প্রতি রাতে বারো জোড়া সোনার জুতো ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে। কেউ জানে না কিকরে
ব্যাপারটা ঘটে। এখানকার রাজা এই নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত এবং কীভাবে এই ঘটনা ঘটছে তার
রহস্য জানার শপথ নিয়েছেন তিনি। যে এই রহস্যের সমাধান করবে তাকে তিনি রাজকন্যা ও অর্ধেক
রাজত্ব দেবেন, কিন্তু তা না করতে পারলে তাকে মেরে ফেলা হবে। অনেক বড় বড় লোকই আগে এসে
চেষ্টা করেছেন কারণ রাজকন্যা অনন্য সুন্দরী, কিন্তু তাদের সবাইকেই মরতে হয়েছে এবং এর
জন্য রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে আছেন।
যুবকটি এই কথা শুনে সেই দুঃসাহসিক অভিযানে নিজেকে
নিযুক্ত করার প্রবল ইচ্ছা অনুভব করল এবং দুর্গে প্রবেশ করে পরের রাতে রহস্য সমাধানের
চেষ্টা করার আর্জি জানাল। বৃদ্ধ রাজা তার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত হল এবং তাকে এই কাজ না
করতে বলল কারণ তাহলে তার পরিণতিও অন্যান্যদের মতোই হবে। কিন্তু যুবকটি জোর করল, সুতরাং
রাজা তাকে জানালেন যে তাকে তিন রাত রাজকন্যার শয়নকক্ষে শুতে হবে এবং এই ঘটনা কিকরে
ঘটছে তা আবিষ্কার করতে হবে। যদি তিন দিনেও যদি সে কিছু উদ্ধার করতে না পারে তবে তাকে
মরতে হবে। যুবকটি এতে খুশি হল। সন্ধেবেলা এক পরিচারিকা তাকে রাজকুমারীর শোয়ার ঘরে নিয়ে
গেল যেখানে তার জন্যও একটা বিছানা ছিল। সে বিছানার পাশে তার ছড়ি রাখল, তার পাশেই রাখল
তার থলে, আর বিছানায় চড়ে বসল এবং ঠিক করল যে কিছুতেই সে দু চোখের পাতা এক করবে না।
বহুক্ষণের জন্য সে জেগেও রইল, কিন্তু কিছুই ঘটল না। শেষে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর হঠাৎ
জেগে উঠে দেখল সকাল হয়ে গেছে। সে নিজের উপর অসম্ভব রেগে গেল কারণ সে কিছুই দেখতে পায়নি।
সে প্রতিজ্ঞা করল যে পরবর্তী রাতে সে আরো বেশি সজাগ থাকবে।
পরের রাতেও একইরকম ঘটনা ঘটল এবং এখন নিজের জীবন
বাঁচানোর জন্য যুবকটির কাছে মাত্র একটি রাতই পরে রইল। তৃতীয় রাত্রে সে ঘুমিয়ে থাকার
ভাণ করল ও অনেক পরে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল যে রাজকন্যার কাছে জানতে চাইল যে যুবকটি
ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা। রাজকুমারী বলল হ্যাঁ, এবং সাদা কাপড় পরিহিত একটি যুবতী রাজকন্যার
বিছানার কাছে এল ও বলল, ‘কিন্তু আমি পরীক্ষা করে দেখব যে সত্যিই ও ঘুমিয়েছে কিনা’।
সে একটা সোনার সূচ নিয়ে যুবকটির গোড়ালিতে ফুটিয়ে দিল। যুবকটির ব্যথা লাগলেও সে একটুও
নড়াচড়া করল না এবং যুবতীটি সেই সূচ সেখানেই ফেলে রেখে চলে এল। তারপর যুবকটি দেখল যে
রাজকুমারী ও সেই মেয়ে কীভাবে খাট সরিয়ে দিল আর দেওয়ালে একটি সিঁড়ি বেরিয়ে এল এবং তারা
সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলল। যুবকটি দ্রুত সূচটা বের করে নিয়ে নিজের থলেতে রাখল।
তারপর তার ছড়ি দিয়ে নিজেকে অদৃশ্য করে ফেলল আর তাদের পিছু নিল যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা
একটি বনে উপনীত হল যেখানে সব কিছু রুপোয় গড়া : গাছ, ফুল ঘাস সবকিছু। যখন তারা সেই বনের
শেষপ্রান্তে এল সে একটি ডাল ভেঙে নিজের থলেতে রাখল। রাজকুমারী পিছনে কিছু শব্দ শুনতে
পেল কিন্তু ঘুরে তাকিয়ে সে কাউকেই দেখতে পেল না। সে সাদা মেয়েটিকে বলল, ‘আমার মনে হয়
কেউ আমাদের পিছু নিচ্ছে’। ‘আরে না না, ও বাতাস বইছে’ মেয়েটি বলে। তারপর তারা এক বনে
এল যেখানে সবকিছু সোনা দিয়ে নির্মিত : গাছ, ফুল সবকিছু। আবার যুবকটি একটি ডাল ভেঙে
রাখল, আবার রাজকুমারীর মনে হল যে কেউ তাদের পিছু নিচ্ছে এবং আবার সাদা মেয়েটি বলল যে
ও শুধুই বাতাসের শব্দ। তারপর আবারও তারা একটা বনে এল যেখানে সব হিরে দিয়ে তৈরি এবং
আবারও যুবকটি একটি ডাল ভেঙে থলেতে রাখল।
তারপর তারা একটি পুষ্করিণীর কাছে এল যেখানে একটি
ছোট নৌকা বেঁধে রাখা ছিল। রাজকন্যা ও মেয়েটি সেই নৌকায় চেপে বসল, কিন্তু যখন তারা পার
থেকে নৌকাটা ঠেলে এগিয়ে গেল যুবকটি ঠিক তখনই দ্রুত লাফ দিয়ে নৌকায় উঠে পড়ল। নৌকোটা
তাতে এত দুলে উঠল যে রাজকুমারী ভয়ার্ত হয়ে উঠল, এবার সে নিশ্চিত হল যে কেউ অবশ্যই তাদের
ধাওয়া করছে, কিন্তু আবার সেই সাদা মেয়েটি বলল, ‘ না না, ও কেবল বাতাস’। তারপর তারা
পুষ্করিণী পাড় হয়ে এক বিরাট দুর্গের কাছে এল। তার দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হলে এক কুৎসিত
দৈত্য রাজকুমারীকে অভ্যর্থনা করল এবং তার দেরি করে আসার কারণ জানতে চাইল। রাজকুমারী
জানালো যে তার মনে হচ্ছিল কেউ তাদের পিছু নিয়েছে এবং চরবৃত্তি করছে কিন্তু সে কাউকেই
দেখতে পায়নি। তারা টেবিলে খেতে বসল আর যুবকটি রাজকন্যার ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের
খাওয়া হয়ে গেলে সে রাজকুমারীর সোনার থালা চামচ নিয়ে আবার তার থলেতে ভরে রাখল। দৈত্য
ও রাজকন্যা বুঝতে পারল না যে কিকরে ওগুলো আর দেখতে পাওয়া গেল না কিন্তু দৈত্য সেদিকে
বেশি গুরুত্ব দিল না বরং তারা পরস্পর নাচতে আরম্ভ করল। তারা মোট বারোরকমের নাচ নাচল
এবং প্রতিটি নাচে রাজকুমারী একটা করে সোনার জুতো ছিঁড়ে ফেলল। শেষ নাচটি নাচার পর রাজকন্যা
শেষ জুতোটা ঘরের এককোণে ছুঁড়ে ফেলে দিল, যুবকটি সেটি সংগ্রহ করে তার ঝোলায় রেখে দিল।
তারপর দৈত্য রাজকুমারীকে নৌকায় ছাড়তে এল আর যুবকটি আগেরমত নৌকায় লাফিয়ে উঠল আর নৌকা
পারে ভিড়তেই আগে নেমে দৌড়ে বিছানায় এসে শুয়ে পরল। রাজকুমারী ফিরে এসে দেখল যে সে ঘুমিয়ে
আছে।
পরেরদিন সকালে বৃদ্ধ রাজা তার কাছে জানতে চাইল
যে সে কিছু আবিষ্কার করতে পেরেছে কিনা, এবং সে বলল না, সে কিছুই দেখতে পায়নি। রাজা
খুবই ব্যথিত হলেন, কিন্তু রাজকুমারী বিজয়িনীর মতো আনন্দিত হয়ে উঠল আর সেই যুবকের হত্যার
দৃশ্য উপভোগ করতে চাইল। সুতরাং তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হল এবং রাজা, রাজকুমারী
ও রাজসভার সকল পার্শ্বদেরা সেখানে জমায়েত হল। ফাঁসিকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে যুবকটি কাল
রাতে দেখা একটি অদ্ভুত স্বপ্নের কথা রাজাকে জানাতে অনুমতি চাইল এবং রাজা অনুমতি দিলেন।
তখন সে বলল যে সে স্বপ্নে দেখল যে একটি সাদা কাপড় পরা মেয়ে রাজকন্যার কাছে এসে জানতে
চাইল যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা আর তা পরখ করতে একটা সোনার সূচ তার পায়ে ফোটাল। সে বলল,
‘আমার মনে হয় এই সেই সোনার সূচ’ আর তা বের করে দেখাল। সে বলে চলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম
কী করে আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম আর একটি রুপোর বনে উপনীত হলাম আর মনে হয় এটি সেই
বনের একটি ডাল’। সোনার আর হিরের বনের সম্বন্ধেও সে একইরকম প্রমাণ দেখাল। তারপর দৈত্যের
সঙ্গে সান্ধ্যভোজনের কথা সে জানাল ও বলল ‘আমার মনে হয় এই সেই থালা যেটিতে রাজকুমারী
ভোজন করেছিলেন এবং সে থালা আর চামচটি দেখাল। তারপর নাচের বিষয়টি সে বলল আর সোনার জুতো
জোড়া সবাইকে দেখাল। ‘এরপর আমি স্বপ্নে দেখলাম যে রাজকন্যা আবার ঘরে ফিরে এলেন কিন্তু
তার আগেই আমি ঘরে চলে এসেছিলাম আর তিনি পৌছোনোর সময় আমি বিছানাতেই শুয়ে ছিলাম’। রাজা
সব শুনে ভীষণরকম আনন্দিত হয়ে উঠলেন, কিন্তু রাজকুমারী আতঙ্কে আধমরা হয়ে গেল আর ভাবতে
লাগল যে কিকরে এসব সম্ভব হল।
এরপর রাজা যুবকটির সঙ্গে রাজকন্যার বিবাহ দিতে
চাইলেন, কিন্তু সে প্রথমে সেই দৈত্যের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিতে চাইল। সে রাজকুমারীর
থেকে সেলাইয়ের সময় আঙুলে পরার সোনার ঢাকনা চাইল, রাজকুমারী তা তাকে দিল এবং সেই সোনার
সূচ দৈত্যের হৃদয়ে ফুটিয়ে সে তাকে মেরে ফেলল। তারপর তার হৃদয়ের থেকে তিন ফোঁটা রক্ত
নিয়ে সে সেই ঢাকনায় সঞ্চয় করল। ফিরে আসার সময় সে হিরের বনে গেল। এখানে সে এক ফোঁটা
দৈত্যের রক্ত মাটিতে ফেলল আর বনের সব গাছ, ফুল আর ঘাসেরা পুরুষ, নারী ও শিশুতে পরিণত
হল আর তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে উঠল কারণ তাদের শাপগ্রস্ততা থেকে মুক্তি পেয়ে পুনর্জীবিত
হল। তারা যুবকটিকে নিজেদের রাজা মনোনীত করল, সেই বন এখন একটি গোটা রাজত্বে পরিণত হয়েছে।
তারপর সে সোনার বনে গেল, এবং সেখানেও দৈত্যের একফোঁটা রক্ত দিয়ে সে সেই রাজ্যের সবাইকে
পুনর্জীবিত করল যারা সেই দৈত্যের দ্বারা গাছ, ফুল আর ঘাসে পরিণত হয়েছিল এবং তারাও তাকেই
তাদের রাজা মনোনীত করল। তারপর সে রুপোর বনে গেল, একই কাজ করল এবং সেখানেও একই ব্যাপার
ঘটল।
সব মানুষেরা তাদের শাপমুক্তির জন্য তাকে ধন্যবাদ
জানাল, এবং তারা তাকেই তাদের রাজা বানাতে চাইল। তারা সবাই বৃদ্ধ রাজার কাছে গেল ও তাকে
সব কথা জানাল, এবং এখন রাজকুমারী খুবই আনন্দিত হয়ে উঠল কারণ সেও তার শাপ থেকে মুক্তি
পেয়েছিল। বিরাট আনন্দ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যুবকটি রাজকন্যাকে বিবাহ করল এবং তিন রাজ্যের
রাজায় পরিণত হল।
বিশ্লেষণ:
গ্রীমভাইদের রূপকথায় আমরা এই কাহিনিরই সমান্তরাল কিন্তু আরো একটু জটিল কাহিনি পাবো যার নাম ‘নাচের ফলে নষ্ট হয়ে যাওয়া জুতোরা’ বা ‘যে জুতোগুলো নাচতে নাচতে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল’। পার্থক্য থাকলেও ওই রূপকথাটি এটির তুলনায় দুরূহ, এটি সহজ ও স্পষ্ট। সুতরাং ডেনমার্ক দেশের এই রূপকথাটিকেই মূল ধরে এগোবো এবং অন্যটিকে ব্যাপারটি বিশদ বুঝতে ব্যবহার করব।
প্রথমে এই গল্পের সঙ্গে ওই গল্পটির মুখ্য পার্থক্য
বলে নেওয়া যাক। জার্মানিতে চালু ওই গল্পে ছিল বারোজন রাজকুমারী যারা প্রতি রাতে নাচত
কিন্তু সুদূরের সেই দৈত্যের সঙ্গে নয়, বরং বারোজন অভিশপ্ত রাজপুত্রের সঙ্গে। রাজকুমারীদের
সাথে নাচের পর গল্পের শেষে সেই রাজকুমারেরা আবার অভিশপ্ত হয়ে যায়। এছাড়াও অন্যকিছু
গল্পে কিছু কিছু পার্থক্য চোখে পরে। তাদের মধ্যে অন্যতম মুখ্য একটি কাহিনিতে নায়ক একজন
বয়স্ক সৈন্য যে সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর অভিযানে বেরিয়ে পরে।
একটি প্রসঙ্গ যা আমরা এই ডেনমার্কীয় কাহিনিতে পাই,
যা এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক, একটি সূত্র যা জার্মান গল্পটি পড়ে যা আমি কখনই ভালো বুঝতে
পারিনিঃ এখানে রূপা, সোনা আর হিরের বনগুলি এক একটি রাজত্ব যেগুলি দৈত্যের রক্তের একটি
ফোঁটায় পুনরায় মানুষী রাজ্যে পরিণত হয়। এই প্রসঙ্গটি জার্মান কাহিনিতে একেবারেই নেই।
সুতরাং যদি একটি রূপকথার কোনো বিষয়বস্তু বা প্রসঙ্গ বোঝা না যায় তবে তাকে বোঝার জন্য
নাছোড়বান্দা থাকা প্রয়োজনীয়। এবং সমান্তরাল কাহিনিগুলির দিকে মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ,
কারণ কখনও কখনও তার মাধ্যমেই সেগুলি বোধগম্য হতে পারে। তখন আরো জটিল কাহিনিগুলির দিকে
দৃষ্টিপাত করা যায়।
একটি দরকারি পরামর্শ হল: যখনই কোথাও আটকে যাবে,
শুধু উপাদানগুলির বিশদীকরণে মন দেবে না বরং সমান্তরাল কাহিনিগুলির দিকে দৃষ্টি দেবে,
কারন সেটা করলে শুধু সেই উপাদান/প্রসঙ্গটিই ভাল বুঝবে না, তারসঙ্গে আরো অনেক উপাদানক্রমগুলিও
বুঝতে পারবে। সমান্তরাল কাহিনিগুলি এমন কিছু সূত্র দিতে পারে যা অন্য কোনোভাবেই পাওয়া
সম্ভব নয়। যতক্ষণ না এই ড্যানিশ কাহিনিটি আমি পেয়েছিলাম ততক্ষণ এর জার্মান সংস্করণটি
আমার কাছে প্রহেলিকাময় হয়ে ছিল।
প্রথম বাক্যটি একেবারে সাধারণ, একদা এক যুবক নিজের
ভাগ্যান্বেষণের জন্য অভিযানে বেরিয়ে পড়ল। এটা এতই নৈর্ব্যক্তিক এবং এরকম সব ক্ষেত্রেই
এগুলো এরকম। অথবা তিনটি ও একটি অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে তুমি শুরু করতে পারো। তোমার যদি
চিন্তাশীল ব্যক্তিধরণ হয়, সেই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যদি তোমাকে আনন্দ দেয়, তাহলে পরামর্শ
হল তুমি তেমনই একটি পদ্ধতি অবলম্বন কর যেখানে তুমি চারটি রাজত্বই পাবে। প্রথমত তো রাজা
আর রাজকুমারীর রাজত্ব। তারপর আরো তিনটি রাজত্ব : রুপোর, সোনার আর হিরের। এই তিনটির
রাজা তো যুবকটি হলই। কাহিনির শুরুতে রাজা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে যুবকটি তার রাজত্বের
অর্ধেক পাবে, কিন্তু শেষে তার কোনো উল্লেখ নেই, সেখানে শুধু লেখা আছে যুবক অন্য তিনটি
রাজ্যের রাজা হল। এটা বোধহয় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে যে সে রাজার রাজত্বের
অর্ধেকের মালিকানা পেল।
তাহলে একটি যুবক শুধু শূন্য থেকে শুরু করল, ‘একদা
একটি যুবক…’। তার কোনো পিতা মাতা নেই, এমনকী একটা নামও নেই। একজন বৃদ্ধের সাহায্যে
সে গোটা সাম্রাজ্যের রাজা হল। রুপো, সোনা ও হিরের রাজত্ব দৈত্যের দ্বারা অভিশপ্ত ছিল,
কিন্তু শেষপর্যন্ত সেই দৈত্যকে হত্যা করে সে এই তিন রাজ্য জয় করল।
আমরা একটি সাদা মেয়েকেও গল্পে পাচ্ছি। তার ও দৈত্যের
মধ্যে কিছু তো সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে কারণ বলতে গেলে সে রাজকুমারীর কাছে দূত হয়ে আসে।
সে রাজকুমারীর সঙ্গে ফিরে যায় না, শুধু তাকে নিয়ে আসে। এ ছাড়াও তাদের মধ্যে একটা মিল
আছেঃ কেউ পিছু নিচ্ছে মনে হলে রাজকন্যা ভীষণ আতঙ্কিত উঠছে কিন্তু সেই সাদা মেয়ে আর
দৈত্য তাতে পাত্তা দিচ্ছে না। তারা বিপদ সম্বন্ধে সচেতন নয়; কী ঘটে চলেছে সে ব্যাপারে
তারা একেবারেই ওয়াকিবহাল নয়। যে সোনার সূচ দিয়ে নায়ক দৈত্যকে বধ করেছিল সেটিও সাদা
মেয়েটির কাছ থেকেই পাওয়া যায়।
আপনার যদি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে জ্ঞানলাভ করার বা
সংবেদনশীল ব্যক্তিধরণ হয়, তবে দুর্বলতার জায়গা দিয়ে কাহিনিটিকে বিশ্লেষণ শুরু না করাই
ভাল, বরং তথ্য সত্যগুলির দিকে নজর দিয়ে, বাক্যগুলি ধরে ধরে এগোনো ভাল। ‘একটি যুবক তার
কোনো নাম নেই…’, ‘নায়ক কাকে প্রতীকায়িত করছে?’ … এইভাবে, ধাপে ধাপে এগোনো উচিত।
আপনার যদি বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই উপলব্ধি বলে জানা
বা স্বজ্ঞামূলক ব্যক্তিধরণ হয়, তবে কাহিনির সাধারণ গঠন বা সমগ্রতা দেখেই হয়তো আপনার
মধ্যের অন্তর্দৃষ্টি ঝলসে উঠতে পারে। অথবা আপনার যদি আবেগপ্রবণ বা অনুভূতিশীল ব্যক্তিধরণ
হয়, তবে আপনার নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে এই আশ্চর্য কাহিনিটি আমার মধ্যে কী অনুভূতি
তৈরি করছে?
সত্যিই এটি একটি আশ্চর্য কাহিনি। অনুভূতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে দীর্ঘদিন ধরে এই গল্পটি আমার ভালো লাগেনি। আমার মধ্যে একে নিয়ে এক বিপদের আভাসপূর্ণ অনুভূতি হচ্ছিল যা বলছিল যে এর মধ্যে কিছু এমন আছে যা আমার পক্ষে ঠিক গ্রহণযোগ্য নয়। এখন আমি বুঝতে পারি তা কেন কিন্তু তা আমি পরে বলব।
মনের সব ক্রিয়াশীলতা দিয়ে একটি কাহিনিতে বিচরণ
করলে তবেই বাস্তবিকভাবে তাকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে গল্পের মূল বিষয়টিকে
বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেখা উচিত অনুভূতিশীল অবস্থান থেকে কাহিনিটি গ্রহণযোগ্য কিনা,
অথবা এটি মানসকে কোনোভাবে পুনরুদ্ধার করছে কিনা অথবা হয়ত একটা শয়তানি অস্বাচ্ছন্দ্য
রেখে যাচ্ছে। এবং তারপর সব ধরনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণকে বিবেচনা করতে হবেঃ সত্য ও তথ্যকে,
প্রাথমিক থেকে বারংবার তথ্যে মন দিতে হবে। মূল পাঠে সংযুক্ত হতে হবে আর সব ধরনের ব্যক্তিগত
প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। আবার কখনো কখনো নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এর সমগ্রতাকে
ধরতে হবে এবং সঠিক বিশদীকরণটি নির্বাচন করে নিতে হবে। আর সেখানে থাকতে হবে স্বজ্ঞার
ভাগ্যবান অন্তর্দৃষ্টি।
যদি রূপকথা সম্পর্কে কিছু অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে
দেখা যায় যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নায়ক হয় রাজপুত্র বা কন্যা অথবা এই কাহিনির মতো অজ্ঞাতকুলশীল
কেউ, অথবা সামাজিকভাবে অবহেলিত মানুষেরা, গরীব নেতিবাচক ব্যক্তিরা, কোনো সৈন্য যাকে
পরিত্যাগ করা হয়েছে, কোনো বোকা যাকে সকলেই বুদ্ধু বানায়, অথবা বামনসদৃশ, খোঁড়া ইত্যাদি।
সুতরাং হয় রাজপুত্র বা এককথায় সম্পন্নরা অথবা অবহেলিত দুঃস্থরা। তৃতীয় একটি শ্রেণিও
পাওয়া যায় যারা আরো ‘সাধারণ’ ব্যক্তি : হয়তো চাষি বা চাষির ছেলে, কখনো কখনো হয়তো জেলে
বা শিকারি। ৯৮ ভাগ রূপকথার নায়কেরা হল এরাই। কখনো কখনো হয়তো কোনো ব্যবসায়ী নায়ক পাওয়া
যায় কিন্তু তা খুবই বিরল।
সুতরাং এখন আমাদের খুব গভীরভাবে এই বিষয়টি নিয়ে
ভাবতে হবে : নায়ক হিসাবে এক চাষি বা এক জেলে/শিকারি, বা এক দুঃস্থ ব্যক্তিকে পাওয়ার
মধ্যে অর্থগত পার্থক্য কী? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি রাজকন্যাকে বিবাহ করার মধ্য
দিয়ে পরবর্তী রাজা হিসাবে মনোনীত হয়, তাই কাহিনিটি খুব নিচু অথবা নামগোত্রহীন যৌথব্যক্তিত্ব
থেকে রাজদরবারে অন্যতম প্রধান ভূমিকাপালন কর্তা হিসাবে নায়কের উত্থানের বর্ণনা করে।
স্বাভাবিকভাবেই এটি এই ইঙ্গিত দেয় যে বর্তমান বৃদ্ধ রাজার মৃত্যুর পর সেই রাজা হবে।
কখনো কখনো আমরা এমন রাজপুত্রকে পাই যে হয়তো কাহিনিতে ভবিষ্যতে রাজা হবে কিন্তু সে কোনো
সমস্যায় পড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সে হয়তো তিনভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠতম যাকে হয়ত
সবাই অবজ্ঞা করে। সর্বকনিষ্ঠ হিসাবে হয়ত সে নিজের দেশে রাজা হতে পারে না কিন্তু অন্য
কোনো রাজ্যের সার্বভৌম ক্ষমতা লাভ করে। অথবা হয়ত নিজের দেশেই অপ্রত্যাশিতভাবে রাজা
হয়ে যায়। কখনো কখনো খুব সাধারণভাবেই হয়তো কোনো সামাজিকভাবে অবহেলিত ব্যক্তি রাজা হওয়ার
বদলে খুব ধনী কোনো মানুষের কন্যাকে বিয়ে করে আর ঐশ্বর্যপূর্ণ শাসকে পরিণত হয়। তাও এটা
বড় সামাজিক উত্থান তো বটেই।
এবার কাহিনির নায়কের সঙ্গে এক ব্যক্তির অহংকে এক
করে ফেলার এক প্রবল বাসনা থাকে যা প্রায় অর্ধ-বৈধতা পেয়েই বিরাজিত। অনভিজ্ঞ ব্যক্তির
প্রায়ই এটা করে ফেলা পর্যন্তই এর বৈধতা। একসময় আমি একটা পরীক্ষা করেছিলাম যেখানে এক
শিক্ষিকা তার অঙ্কন ক্লাসে আমাদের রূপকথাগুলি বাচ্চাদের শোনাতো ও তার মধ্যে থেকে তাদের
ইচ্ছামত যে কোন একটি দৃশ্য তাদের আঁকতে বলত। এটা খুব স্পষ্ট বোঝা যেত যে মেয়েরা কাহিনির
নারী চরিত্রের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করত, এমনকী সে যদি গল্পের নায়িকা না হয় তাহলেও।
তারা হয়ত রাজকুমারীর নৌকোয় পুষ্করিণী পার হওয়ার দৃশ্য আঁকত, সেই যুবকের গাছের নিচে
বৃদ্ধের সাথে খাবার ভাগ করে নেওয়ার দৃশ্য কখনোই নয়। অন্যদিকে ছেলেরা সেই দৃশ্য আঁকত
যেখানে গল্পের আসল নায়ক সেই যুবকটি কোনো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, স্পষ্টভাবেই
তার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার কোনো অন্তর্গত সূত্রে। এবং আমি নিশ্চিত যে আপনারা পুরুষরা যদি
ছোটবেলার স্মৃতি মন্থন করেন তবে খুব স্বাভাবিকভাবেই নায়কের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার কথা
মনে পড়বে। এবং সেই প্রবণতার ফলে আপনি ইয়ুঙের অ্যানিমা বা ছায়া সত্তাকে রূপকথার এক একটি
চরিত্র হিসাবে দাগিয়ে দেবেন এবং একটি পরিপূর্ণ ভ্রান্তি করে বসবেন। বলতে থাকবেন যে,
যুবকটি তার অ্যানিমা সত্তার সন্ধানে প্রবৃত্ত ছিল আর সেই সাদা মেয়ে হল অ্যানিমার ছায়া
আর সেই দৈত্য হল তার বা রাজার ছায়া… এবং এরকম অনেক গোলগল্প যা সম্পূর্ণ ভুল দিকে নিয়ে
চলে যায়। কারণ তখন আমিও বলতে পারি যে, না রাজকন্যাটি বৃদ্ধ রাজার অ্যানিমা, সে পিতৃ
গূঢ়ৈষাসম্পন্ন। অথবা বলতে পারি, দেখছ আমরা অভিক্ষেপণে জড়িয়ে পড়েছি।
ভুলে গেলে চলবে না যে ইয়ুং তার অ্যানিমা অ্যানিমাস
ছায়া ও আত্মন তত্ত্ব বানিয়েছিলেন এক ব্যক্তির, মহাশয় অমুক বা মহাশয়া তমুকের অচেতনের
অভিজ্ঞতা লাভ করে তা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু রূপকথা সেরকম নয়। একটি রূপকথা কোনো
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কাহিনি নয়। রূপকথা মূলত দুভাবে জন্ম নেয়। যতটা জানা যায় যে কিছু
রূপকথার জন্ম হয় সেইসব মানুষদের থেকে যাদের ইন্দ্রিয়াতীত মনস্তত্ত্ব বা স্বপ্নজগত বা
অতীন্দ্রিয় দৃশ্যাবলী দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তাদের বারবার হয় আর তার থেকে
তারা সম্প্রসারিত হয়ে সেই গোষ্ঠীর কাহিনিতে পর্যবসিত হয়। অন্যক্ষেত্রে কাহিনিগুলি সেভাবেই
তৈরি হয় যেমন করে সাহিত্য রচনা হয়: সেইরকম মানুষদের মধ্যে যারা লেখে না, যাদের অসামান্য
প্রতিভাসম্পন্ন কল্পনাশক্তি থাকে। লোকসমাজের কিছু মানুষের সক্রিয় কল্পনাশক্তির মাধ্যমে
এই সব রূপকথার জন্ম হয়। রূপকথার মূলকেন্দ্রটি অতীন্দ্রিয় দৃশ্যদর্শন বা বড় স্বপ্ন বা
ইন্দ্রিয়াতীত মনস্তাত্ত্বিকভাবে অথবা কোনো লোককবি গল্পকারের মাধ্যমে যেভাবেই জন্ম হয়ে
থাক না কেন তাকে যৌথচেতনের মানসের মধ্যে মানানসই হয়ে থাকতে হবে। অথবা তাকে বরদাস্ত
করা হবে না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন