শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

শৌভিক দে

সমকালীন ছোটগল্প


 

চিনিলে না আমারে কি

সাড়ে সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে সাধনবাবু বিশ্বরূপ দর্শনের মত একখানা পেল্লায় হাই তুলে থাকেন। তার বিশ্বাস এই প্রক্রিয়ায় ফুসফুসে জমে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড আর মাথায় জমে থাকা সারা রাতের দুঃস্বপ্ন বা দুশ্চিন্তা হই হই করে পালিয়ে যায়। তো - আজ সেই প্রক্রিয়ার মাঝ পথে তিনি দেখলেন সামনের দেওয়ালে টিকটিকিটা ওত পেতে আছে। কী মতলব? ঝপ করে ঝাঁপ দেবে না কি? টপ করে হাঁ বুজিয়ে সাধনবাবু সাধনচিত ভঙ্গিতে বসলেন। দিনের প্রথম হাইটাই ঠিক হল না। বাকি সাড়ে সতেরো ঘণ্টা কেমন যাবে কে জানে। টিকটিকিটা বলল 'ঠিক ঠিক'। মশা মারার ব্যাটটা তুলে তাড়া লাগাতেই সেটা কাশিবাসী হল। অর্থাৎ কিনা দেওয়ালে টাঙ্গানো 'দশাশ্বমেধ ঘাটের' ছবিটার পিছনে নিজের ঘরে সেঁধোল। আচ্ছা 'টিকটিক' বলল না 'খিক খিক' করলো? টিকটিকি কি হাসতে পারে? কে জানে । সাধন-বাবু আরো বেজার হয়ে নাক চুলকাতে লাগলেন। উৎকলিকা  মেথি ভেজানো জল নিয়ে ঘরে ঢুকে মুখ ঝামটা দিলেন 'আজও উঠতে আটটা বাজালে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। ভুলে গেছ না কি আজ ও বাড়ি যেতে হবে। আমি কিন্তু সাড়ে নটায় বেরোবো। আর হ্যাঁ ... ঠিক করে দাড়ি কামাবে। গতবার তোমার গোঁপ দেখে মেজ বৌদি হেসে খুন’। মেথির কাপ ঠক করে টেবিলে নামল আর উৎকলিকা যেন উড়েই চলে গেলেন। সাধনবাবু বিড়বিড় করলেন মনে মনে 'হুঁ বাপের বাড়ি যাবে যে। আর - র হালায় টিকটিকির পো তরে আমি দ্যাখত্যাসি'। ব্যাজার মুখে বিছানা গোছাতে লাগলেন এবার।

গতবারের কিসসাটা তিনি ভোলেননি। গোঁপ জোড়া দুদিকে দুরকম হয়ে গেছল। সব দোষই যে সাধনবাবুকে দেওয়া যায় - তা নয়। উৎকলিকা যথা নিয়মে সকালে শাস্ত্রীয় গান শুনছিলেন। সাধন তখন বাঁ দিকের গোঁপটা দুরুস্ত করে ডান দিকে ব্লেড লাগিয়েছেন - গমগমে গায়ক তার-সপ্তকে পিলে চমকানো গিটকিরি ঝেড়ে দিলেন। ব্যাস। সেই নাদ ব্রহ্মের ঠেলায় এক কোপে গোঁপের আদ্ধেকটা নেমে গেল। তাড়া ছিল সেদিনও কাজেই আর মেরামত করা হয়ে ওঠেনি। একবারই এমন দুর্ঘটনা হয়েছে, তাও বারো বছর আগে, তবু সাধনবাবু গঞ্জনা শুনছেন আর মেজবৌদি তাকে দেখলেই হাসছেন। তার 'হস ধাতুর' প্রতি দৌর্বল্য আছে।

আসলে সাধনবাবু তার আইনি পরিজনদের একমাত্র জামাই। যত্ন আত্তি যা পাবার - পেয়ে থাকেন। পালে পার্বণে টি শার্ট / পাঞ্জাবি - তাও পান। দিয়েও থাকেন। কিন্তু সবার ছোট হবার কারণে যেন ঠিক জাতে উঠতে পারেননি, বালখিল্য রয়ে গেছেন। এক তো তিনি পেশায় তথ্য প্রযুক্তির প্রকৌশলী। ভাষা সাহিত্যে তেনার জ্ঞান কিছুটা ভাসা ভাসা। রবীন্দ্রনাথ থেকে শ্রী-জাত অল্প স্বল্প পড়েছেন কিন্তু বাংলায় এক পাতা লিখতে গেলে তার কলম সরে না। ওদিকে  আবার শ্বশুরবাড়িতে সবাই দিগগজ পণ্ডিত। বিশেষত মাতৃভাষায় তাদের বিশেষ বুৎপত্তি রয়েছে। যখন তখন মাণিক-কুরুশোওয়া, কিম্বা গোর্কি - মাণিক বলে চেঁচামেচি শুরু করে দেন সবাই। সাধনবাবুর কাছে সে সব গ্রীক ভাষার চেয়ে সহজ মনে হয় না। শ্বশুর মশাইয়ের  নাম বিরিঞ্চ চট্টরাজ। সাধন একবার ভুল করে বিরিঞ্চি বলেছিলেন বলে সাতিশয় রুষ্ট হয়ে শুধরে  দিয়েছিলেন 'ওটা বিরিঞ্চি নয় বিরিঞ্চ - অর্থাৎ প্রজাপতি ঋষি ব্রম্ভা'। অর্থাৎ আমিই বা কোন কম বা! অবশ্য দেবতাদের রীতি অনুসরণ করে ছয় ছেলের জন্ম দেননি, দুটিতে ক্ষান্ত দিয়েছে। নাম রেখেছেন পুলস্ত্য আর পুলহ। মেয়ের নাম তো বলাই হয়েছে। সেই নাম নিয়েও অল্প সাবধান বাণী দিয়েছিলেন 'তুমি আবার মনে করো না যে মেয়েকে কলিঙ্গ থেকে কিম্বা ওডিশা এম্পোরিয়াম থেকে কিনে এনেছি। উৎকলিকা মানে ফুলের পাঁপড়ি। ছোটবেলা প্রায় ঝরা ফুলের মতই উড়েই বেড়াত কি না'! সাধনবাবু মাথার বালিশ পিটিয়ে গোল করতে করতে একবার বিড় বিড় করলেন,  ‘এখন কি দেখতে পান না - সেই ফুলের পাঁপড়ি প্রায় ধোপার গাঁঠরির মাপ পেয়েছে। উড়ে বেড়াবে কি নড়ে উঠতেই তার একঘণ্টা'। দেখেছেন বিরিঞ্চবাবু নিশ্চয়ই কিন্তু মেয়ের বাবারা ও সব দেখে ও দেখে না। ধৃতরাষ্ট্র যেমন 'অন্ধ আমি অন্দরে বাহিরে'। আর এখন তো দেখার প্রশ্নই নেই। মাসখানেক আগে তিনি সাতাশীতে  আসি বলেছেন। অর্থাৎ সজ্ঞানে গঙ্গা পেয়েছেন। কাজকর্ম হয়েছে যথা বিহিত। আজ তাঁর বিষয় সম্পত্তি বিষয়ে, বিশেষ করে ইচ্ছাপত্র বা উইল পাঠ হবে। উৎকলিকা ও  সাধনবাবু সেখানে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ পেয়েছেন।

সাধনবাবু বা তার পিতৃপুরুষ সবাই পণ প্রথার ঘোর বিরোধী। বিবাহে কোন দেনমোহর দেওয়া নেওয়া হয়নি। বিরঞ্চবাবু এ ব্যাপারে বিশেষ প্রীত ছিলেন। বহুবার উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন সমাগমে। সাধনবাবুও সদা সতর্ক থাকতেন যেন হাত পাতা না হয়ে যায়। একেবারে 'দাঁতের বদলে দাঁত' পদ্ধতি অনুসরণ করে টি-সার্টের বদলে টি-সার্ট আর পাঞ্জাবীর বদলে পাঞ্জাবি দিয়ে গেছেন। কিন্তু এইবার বড় সম্বন্ধী তাকে আগেই অবসার্ভার বলে দেওয়া তে তার একটু খটকা লেগেছে। আবার যেন অবজ্ঞার মিহিদানা দেখতে পাচ্ছেন? এমন নয় যে কিছু না পেলে - তার চলবে না। প্রায় তেইশ বছরের চাকরির পর তার মাইনে মন্দ নয়। নিজের বাড়ি, গাড়ি। তাছাড়া মাঝে মধ্যে অনসাইটের দৌলতে একমাত্র মেয়ের জন্যে সঞ্চয় রয়েছে ভালো মতই। মেয়েও পড়া শোনায় ভালো। টুকটাক জলপানি পায়। এখন পড়ছে 'ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান' খড়গপুরে। সেখান থেকে বেরোবার পর দু / পাঁচ বছরেই বাবাকে ধরে নেবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে 'অর্থ নয়, কীর্তি নয়, আরো কোন বিপন্ন বিস্ময়' সাধনবাবুর 'অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে'। একটা সূক্ষ্ম প্রতিশোধের কথা তার মাথায় এসেছে। সেটা কী?

বেড কভারের তিন দিকের ঝুল সমান হয়েছে কিনা ভালো করে দেখে নিয়ে (এই সামান্য ব্যাপারের জন্যে তিনি প্রায়ই উৎকণ্ঠিতা উৎকলিকার গঞ্জনা শোনেন) মোবাইলে ধরলেন বড় সম্বন্ধীকে। তিনি স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন -

- 'আরে সাধনবাবুর আজ ছুটির দিনে সাত সকালেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে? তোমরা ... মানে এই প্রযুক্তির মানুষ জন - এগারো সাড়ে এগারোর আগে তো দিনের আলো দেখ না। তোমরা হলে ... যাকে বলে নিশিকুটুম্ব। অবশ্য ও কথাটার মানে তেমন সুবিধের নয়। হা হা হা ...'।

= হে হে হে। বলছিলাম বড়দা, বাবার সম্পত্তিতে আমার ও কিছু ভাগ হয় তো? একমাত্র জামাই বলে কথা'।

- ' খক খক খক! না না কিছু না । চা খাচ্ছিলাম ... বোধহয় শ্বাসনালীতে... হ্যাঁ তো তুমি কি বলছিলে'?

= ' বলছিলাম বাবার যা বিষয় আছে তার কিছু তো আমারও প্রাপ্য হয় ... এই আর কি'।

- ' হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই। সে আর বলতে। অবশ্যই অবশ্যই। তা কি তোমার বাসনা যদি বল তবে ... এতে আর বলার কি আছে। আমাদেরই তো বলা উচিৎ ছিল। তাহলে মানে ...'।

= ' ঠিক আছে। তাড়া কিসের আমি তো আসছিই। তখন কথা হবে । ছাড়ছি তাহলে, দেখা হচ্ছে'।

মোবাইল ছেড়ে মনে মনে ঢাক বাজিয়ে একপাক বিসর্জনের নাচ নেচে নিল সাধনবাবু। দেখ কেমন লাগে। সব সময় চিমটি। সাড়ে এগারোর আগে ঘুম ভাঙ্গে না। নিজে ওঠে বটে সাতটায়। তারপর বিছানায় গড়িয়ে গড়িয়ে চা খায় আর বই পড়ে। বাথরুমে ঢুকতে অন্তত সওয়া দশ, বেরোয় এগারোটা দশে। তারপর দুপুর দেড়টায় কলেজে পৌঁছে বড় জোর দুটি ক্লাস। বাড়ি ফিরে কোনো না কোনও সভা সমিতিতে গিয়ে - হয় সালভাদোর দালির বিমূর্ত চিত্রকলা নইলে রথীন্দ্রনাথের ব্যক্তি জীবন চটকানো - এই তো জীবন। আর সাধনবাবুর বারোটা থেকে বারোটা, অফিসে বা ঘরে ল্যাপটপে লেপটে বসে থাকা। কপাল খারাপ থাকলে বারোটার পরে আবার ম্যারিকান গ্রাহকদের সামনে ভিডিও কলে বসে থাকা। সে ব্যাটা ঘুম থেকে উঠে গামলার মত একটা কফি কাপে চুমুক দেয় আর সাধনবাবুর রুটি রাজস্থানি পাঁপড় হয়ে যায়। পাশে উৎকলিকার নাক ডাকে ফুড়ুত ফুড়ুত। যাইহোক  - এবার তিনমাথা এক হও, ধড় পড় করো। করে দিলাম দিল হুম হুম আর আমি চললাম বাথরুম।

প্রথম আক্রমণ এলো পরিকল্পনা মাফিক। সাধনবাবু, প্রাত্যহিকতা সেরে, গোঁপ জোড়া ঠিক ঠাক ব্যাল্যান্স করে, পরিপাটি স্নানের পর দরজা খুলতেই সামনে উৎকলিকা। ভুরু দুটি যেন সিন্ধু সারসের ডানা। একে ফরটি সেভেনের মত গুলি ধেয়ে এল।

- ' তুমি সম্পত্তির ভাগ চেয়েছ'?

= ' বাঃ। তোমাকে আজ বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে তো! যাই বল হলুদ শাড়িতে তোমাকে খুব মানায়'।

- ' বাজে কথা রাখো । তুমি বলেছ অমন কথা'?

= ' কী কথা বল তো। ওহ ওই যে তোমাকে আজ ভালো দেখাচ্ছে। হ্যাঁ বললাম তো। সত্যি বলতে কি ...'।

- ' আবার? তোমার জন্যে কি গলায় দড়ি দেবো? কিসের অভাব আছে আমাদের যে তোমাকে ...। ছি ছি আমার মাথা কাটা যাচ্ছে'।

= ' মাথা কাটা গেলে আর গলায় দড়ি দেবে কী করে! আমি বলি কি এত কিছুর দরকার নেই। চল সেখানে যাই। দাদারা সবাই খুব বিবেচক। বললে কি আর দেবেন না'!

- ' দিলেই তুমি নেবে কেন? এত বছর বিয়েতে তো কোনদিন নাওনি। যখন আমাদের সত্যি সচ্ছলতা ছিল না , বাবা তো নিজের থেকেই কত কিছু দিতে চেয়েছিলেন। তুমি তখন কিছুতেই নিতে দাওনি। আর এখন তো সবার আশীর্বাদে আমাদের অভাব নেই। তাহলে কেন...'।

= ' ব্যাস ব্যাস। এই একটা কথা বারবার বলা - এটা বাঙলা সিরিয়ালের প্রভাব। তুমি একটু কম টিভি দেখো এবার থেকে। আর তোমাকে কে বলেছে অভাব থাকলে তবেই আরো কিছু চাইতে হয়? তাহলে - যার বৌয়ের একদিনের খরচ কম বেশী এককোটি - সেই সব পৃথিবী কাঁপানো বড় লোকরা প্রতি বছর - পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প করব, নতুন শিল্প করব - বলে কফি খাচ্ছে কেন। শ্যামাসঙ্গীত শোনোনি ওই অভাব আমার মিশেছে স্বভাবে'।

- ' অন্যের বৌয়ের খবর রাখো আর নিজের বৌয়ের মন জানো না। দেখো তুমি কিছুতেই কিছু চাইতে পাবে না। আমাকে মেজবৌদি ফোন করে বলল কি চাই জামাইয়ের একবার বলুক, আমরা বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসবো। আমি ... আমি ...'।

= ' আবার রিপিট করছ। নাহ। সিরিয়াল একেবারে অস্থি মজ্জায় ...'।

- ' চুপ করো। এসব মতলব ছাড়। আমি কিছুতেই যাব না তোমার সঙ্গে'।

= ' সেটা ভালোই হবে। তুমি বাড়িই থাকো। আসলে তোমার সামনে চাইতে আমার একটু বাধ বাধ ঠেকবে। তাহলে আমি একাই যাই'?

- ' কিছুতেই না। তোমাকে একা ছাড়াই যাবে না। কী আবার কেলেঙ্কারি করবে। আমি এখুনি মিঠিকে ফোন করছি'।

= ' আহা বাচ্চামেয়ে, ওকে আবার বিরক্ত করা কেন। তাছাড়া আজ রবিবার হলেও ওদের নানা রকম এক্সট্রা ক্লাস থাকে'।

- 'না বলব। ওর জানা উচিৎ ওর বাপের কীর্তি কলাপ'।

= 'আচ্ছা আমি কী এমন করেছি বল দেখি? আমি কি আর ওদের তিনতলা বাড়িটাই চেয়ে বসব নাকি? এমন কিছু ওদেরও অসুবিধে হবে না অথচ আমারও ...'।

- ' আমি আর এ ব্যাপারে কোনো কথা বলব না। শেষ কথা বলে দিলাম তুমি কিছু চাইতে পারবে না'।

= ' তাহলে উৎকলিকা তুমিও হুইন্যা রাখো আমাদের বাপের বাড়ি ঢাহা। আমিও শ্যাস দেইখ্যা ছাড়ুম'।

সাশ্রু নয়না উৎকলিকার প্রস্থান। সাধনবাবু গেলেন সাজগোজ করতে। সেকাল হলে বর্ম চর্ম পরতে হত,  একালে পাঞ্জাবিটাই মাথায় গলালেন। মোবাইলে বাজল 'আয় খুকু আয়'। মেয়ের ফোন। তিনি ধরলেন।

- ' হাই ড্যাড। আই কান্ট বিলিভ! কী করছো তুমি'?

= ' নাথিং অ্যামেজিং মা। পাঞ্জাবী পরছি'।

- ' ইউ আর ইনকরিজিবল। তুমি নাকি বড় মামার থেকে টাকা চেয়েছ'?

= ' টাকা চেয়েছি কে বলল'?

- ' হোয়াট এভার। কী চেয়েছ? বিষ না বিষয় কি বলল মা হাউ হাউ করে - বুঝলাম না। যাইহোক কাম ক্লিন। বল দেখি নতুন কী বাধিয়েছ'?

= ' তুই কি রাতে ফ্রি থাকবি? তখন না হয় উই উইল ডিসকাস ইন ডিটেইলস। এখন একটু তাড়া আছে মা'।

- ' ড্যাডি ইটস আ কাইন্ড অফ হোক্সিং গেম। ইস্নট ইট? আই আন্ডারস্টান্ড'।

= ' তোর বুদ্ধি যদি সবার থাকত মা তবে তো ... রাতে ফোন করছি। চিন্তা করিস না'।

- ' আই নো মাই প্রাঙ্কিস ড্যাডি। বাই ফর নাও। রাতে কিন্তু ডিটেইলস চাই, হুমমম'।

= ' হুমমম, বাই বেটা'।

এরপর পিন পতনের নীরবটা চৌদিকে। উৎকলিকা চুপচাপ তৈরি হয়ে সঙ্গে চললেন। মুখে - কী যেন বলে - আষাঢ়ের মেঘ। সাধনবাবু আড়চোখে দেখলেন হলুদ শাড়ি পরনে নেই, একটা সাদামাটা সালোয়ার কামিজ। এটাও একরকম সাধনবাবুকে শিক্ষা দেবার চেষ্টা। না কি শোকের প্রকাশ? মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে গাড়ির চাবি লাগালেন তিনি। মোটামুটি ঘণ্টা দেড়েকের পথ। আজকের অভ্যর্থনা তেমন উচ্চ পর্যায়ের হল না। সব থেকে বড়কথা মেজবৌদির হাসিটা কেমন যেন বেলা বারোটার সবজি বাজারের মত, ম্রিয়মাণ। পুলস্ত্য আর পুলহবাবুর হাঁকডাক নেই। বেশ গুরুদশার আবহ। যেদিন সাতাশী বছরের গৃহস্বামী এ বাড়ি থেকে স্বর্গরথে চড়েছিলেন - সেদিনও কথা হচ্ছিল অনেক বেশী। কিছুটা অস্বস্তিকর সময় পার হলে - বড়দা একবার অহেতুক গলা ঝাড়া দিয়ে শুরু করলেন -

- ' তাহলে সবাই এসেই পড়েছ। এবার কাজের কথাটা আলোচনা করে নিলে হয়। মোটামুটি বাবা তার বিষয় সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা করেই গিয়েছেন। আমরা দুভাই ছাড়া অবশ্য উৎকলিকা ... মানে ওই সাধনদের জন্যে কিছু তেমন আলাদা করে রাখা হয়নি। বরং তিনি সাধনের নির্লোভ চিত্তের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন তার শেষ ইচ্ছাপত্রে । অবশ্য এও বলেছেন যে যদি তারা কিছু ...'।

সাধনবাবু একবার বাধা দিয়ে বললেন -

= ' আগে একটু চা হলে হত না। প্রায় দুঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আসা। তাছাড়া আগে তো ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই মেজবৌদি চায়ের কাপ নিয়ে আসতেন। আজ দেখছি ...'।

সবাই একযোগে হাঁহাঁ করে উঠলেন । মেজবৌদি মা কালির মত জিভ কেটে দৌড়লেন রান্নাঘরে। আবার কিছুক্ষণ শ্মশানের শান্তির পরে চা বিস্কুট এসে গেল। এক কাপই। অন্যদের চায়ে রুচি দেখা গেল না। সাধনবাবু চায়ে আয়েস করে এক চুমুক লাগিয়ে বললেন -

= ' সত্যি মেজবৌদির হাতে বানানো চা! এমনটা আর কোথাও পাই না। কি বল'?

শেষ কথা উৎকলিকার উদ্দেশ্যে এবং বিনিময়ে রক্তচক্ষু দর্শন। সাধনবাবু উপেক্ষা করে চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে বললেন -

= ' দাদা তাহলে কী বলছিলেন ... কথা শেষ হয়নি'।

পুলস্ত্যবাবু আর একবার গলা ঝেড়ে ফের শুরু করলেন -

- ' হ্যাঁ যা বলছিলাম ... কী বলছিলাম যেন? ও হ্যাঁ - বাবা তার ইচ্ছাপত্রে সাধনের নির্লোভ প্রবৃত্তির বিশেষ প্রশংসা করার সঙ্গে সঙ্গে এও বলে গেছেন যে, তার যদি কিছু দাবি জানায় তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। সেই পরিস্থিতিতে আজকের এই সভায় ... না না ... ঘরে আবার সভা কি ... এই সবাই একসঙ্গে বসে স্থির করে নেওয়া যাক ওদের কি চাই। আমি মুক্তকণ্ঠে বলতে চাই ... মেজও সহমত যে ... যা কিছু আমাদের আদরের বোন পুঁচকি মানে উৎকলিকা চাইবে আমরা সর্বান্তকরণে স্বীকার করবো। কী সাধন, কিছু বলতে চাইছ বোধহয়। বল বল নির্দ্বিধায় বল আমরা শুনছি'।

= ' বলছিলাম বিস্কুটগুলো একেবারে মিইয়ে গেছে। মেজদা - ওই গুরুদশার সময় যে অত কাজু বাদাম পড়েছিল ... সব শেষ বোধহয় ... না কি '?

উৎকলিকা এবার প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন -

- ' কেন তুমি এ রকম করছ আজ, তোমার আক্কেল বুদ্ধির জলাঞ্জলি হয়েছে - কিন্তু আমার বাপের বাড়ির সম্মানটুকু তো রাখতে পারো'?

সবাই আবার হাঁ হাঁ করে উঠলেন। 'জামাই একটু কাজু খেতে চেয়েছে, তুই তার অন্য মানে করছিস কেন?  এখুনি দিচ্ছি বাবা'। কাজুর টিন বসল টেবিলে। পুলহবাবু এবার হাল ধরে বললেন -

- ' তাহলে এবার দাবী দাওয়াটা যদি পরিষ্কার হয় - তবে ...'।

= ' লাঠি'।

- ' অ্যাঁ! লাথি'?

= ' ছি ছি দাদা কী যে বলেন! লাথি নয়, লাথি নয়, লাঠি। বাবার লাঠি'।

- ' বাবার লাঠি? ও! ওই পিতলের বাঘের মুণ্ডু লাগানো বেতের লাঠিটা। তুমি কী করবে'?

= ' ওটাকে দরজার উপরে টাঙ্গিয়ে রাখবো। যেন চিরকাল আমাদের মাথার ওপরে থাকে আর আমরা প্রতিক্ষণ বাবার উপস্থিতি অনুভব করি'।

- ' সে বেশ তো, বেশ তো, নিয়ে যাও। কিন্তু আর সব বিষয় আশয় ...’

= ' বিষয় বিষ দাদা। সেসব নিয়ে এই বয়সে এতজন আত্মীয় বিয়োগের ধাক্কা সইব? আমার মা বাবা বলতে আর কেউ রইলেন না। এখন আপনারা থাকুন মাথার উপর চিরকাল। শুধু বাবার লাঠিটা দিয়ে দিন, নিয়ে যাই। অন্য কিছু থাকলে বলতে পারেন নইলে আজকের সভা শাট ডাউন করি'।

হিং টিং ছট কবিতার উপসংহারে যেমন হয়েছিল ঠিক তেমনি হল এবার। পুলস্ত্যবাবু আজকের ষোল নম্বর সিগারেট ভুল করে পুলহবাবুকে দিয়ে দিলেন। পুলহবাবু জিভ কেটে সেটা ছাইদানে ফেললেন। 'এক দণ্ডে খুলে গেল রমণীর মুখ'। বড়বৌদি বললেন 'ওমা তোমার পেটে পেটে এত! হ্যাঁরে পুচকি'? মেজবৌদি হেসে গড়িয়ে পড়লেন আবোল তাবোলের ছবির মত। তারপর মহিলারা ধেয়ে গেলেন রান্নাঘরে। উৎকলিকা অবশ্য ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন, তবে সেটা অন্যরকম। সাধনবাবু চায়ের তলানিটা সাবড়ে দিয়ে গিন্নীকে বললেন

= ' আমারে সন্দেহ করসিলা মিঠির মা? হগ্গলেই বোধহয় করসে। কিন্তু তুমি আমারে এতদিন ধইরা দ্যাখতাস, তুমিও করবা? এহোনো বাঙ্গাল চিনলা না। থাউক, কেমন দিসি কও দ্যাহি'।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন